অবাস্তব ও পকেট কাটার বাজেট

ক্রাইমবার্তা রিপোট:সরকার আগামী ২০১৭-১৮ অর্থবছরের যে বাজেট ঘোষণা করেছে তার লক্ষ্যমাত্রাগুলো অতি উচ্চাভিলাষী, অবাস্তব এবং বাস্তবায়ন দুঃসাধ্য হবে। আগামী ২০১৯ সালের নির্বাচনকে সামনে রেখে সরকার নিজেকে জনপ্রিয় করতে এ বিশালাকারের বাজেট প্রস্তাব করা হয়েছে বলে অর্থনীতিবিদেরা মনে করছেন। তাদের মতে, বেসরকারি বিনিয়োগ ও শিল্পায়ন না করা গেলে ৭ দশমিক ৪ শতাংশের যে প্রবৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে সেটা অবাস্তব। ভ্যাট ও ব্যাংকে জমাকৃত অর্থের ওপর আবগারি শুল্ক বাড়ানোর মাধ্যমে সাধারণ জনগণের পকেট কেটে আদায় করা হবে রাজস্ব। এতে কেউ কোনো প্রতিবাদ ও কথা বলবে না।

ড. মির্জ্জা এ বি আজিজুল ইসলাম এবং ড. সালেহউদ্দিন আহমেদড. মির্জ্জা এ বি আজিজুল ইসলাম এবং ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ

ড. মির্জ্জা এ বি আজিজুল ইসলাম
প্রস্তাবিত বাজেট অতি উচ্চাভিলাষী, অবাস্তব এবং বাস্তবায়ন দুঃসাধ্য হবে বলে মন্তব্য করেছেন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক অর্থ উপদেষ্টা ও বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. মির্জ্জা এ বি আজিজুল ইসলাম। তার মতে, সরকার আগামী ২০১৯ সালের নির্বাচন সামনে রেখে নিজেকে জনপ্রিয় করতে এ বিশালাকারের বাজেট প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রস্তাবিত বাজেট নিয়ে প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে তিনি এ কথা বলেন। তিনি বলেন, চলমান অর্থবছরের সংশোধিত বাজেট সামনে না রেখেই নতুন বাজেট করা হয়েছে।
আগামী অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৭ দশমিক ৪ শতাংশ, যা চলতি ২০১৬-১৭ অর্থবছরের লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি। এই লক্ষ্যমাত্রা কোনোভাবেই অর্জিত হবে না। তার মতে, ওটাতো সম্ভব হবে না। ওই প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে হলে অবশ্যই বিনিয়োগ জিডিপির ৩২ থেকে ৩৩ শতাংশ দরকার হবে। কিন্তু আমাদের বর্তমান অবস্থা সেখানে নেই। এটা এখন ৩০ শতাংশ। আগামী এক বছরে এ হার ২ শতাংশ বাড়বে এমন কোনো সম্ভাবনা আমি দেখছি না। এটা করতে হলে সরকারি বিনিয়োগের চেয়ে ব্যক্তি বা বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। কিন্তু বর্তমানে দেশে বেসরকারি বিনিয়োগ স্থবির হয়ে আছে। সে ক্ষেত্রে সরকারের এ লক্ষ্যমাত্রা অর্জন দুঃসাধ্য হবে।
তিনি বলেন, চলতি অর্থবছর (২০১৬-১৭) সরকার বলছে, ৭ দশমিক ২৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে। তাদের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৭ দশমিক ২ শতাংশ। এবারের এই অর্জন নিয়ে সরকার যেটা বলছে সেটা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। আমি নিজেই প্রশ্ন তুলেছি। যেখানে বেসরকারি বিনিয়োগ স্থবির সেখানে কিভাবে এটা সম্ভব। এই অর্জন নিয়ে বিশ্বব্যাংকও প্রশ্ন তুলেছে। তারা বলেছে, এটা হবে ৬ দশমিক ৮ শতাংশ।
সরকার আগামী ২০১৭-১৮ অর্থবছরে রাজস্ব আদায়ের প্রাক্কলন করেছে ২ লাখ ৮৭ হাজার ৯৯১ কোটি টাকা। ড. মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, সরকার যে লক্ষ্যমাত্রা ধরেছে তা ১৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধি ধরা হয়েছে। রাজস্ব বোর্ডের মাধ্যমে আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ২ লাখ ৪৮ হাজার ১৯০ কোটি টাকা। রাজস্ব আদায়ের এই লক্ষ্যমাত্রা হলো অতি উচ্চাভিলাষী ও অবাস্তব। এটা অর্জন করা সম্ভব হবে না। কারণ এবারের যে লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল সেটা অর্জন করতে না পারায় অনেকটা কমিয়ে আনতে হয়েছে। আমাদের রাজস্ব আদায়ের সক্ষমতা এখনো বাড়েনি। তিনি বলেন, প্রতি বছরই এনবিআরকে যে টার্গেট দেয়া হয় তা তারা আদায় করতে পারে না। এনবিআরের ক্ষেত্রে বছরে ৮ থেকে ১২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হচ্ছে। সেখানে ৩৫ শতাংশ ধরা হয়েছে, যা সম্ভব নয়। ফলে অর্জন ও ব্যয় কোনোটাই হবে না।
তিনি বলেন, যে বিশাল আকারের বাজেট ঘোষণা করা হয়েছে সেটি বাস্তবায়নে যে অর্থ প্রয়োজন হবে তা সংগ্রহের মতো ভালো ব্যবস্থা আমাদের নেই। এমনকি ব্যয়ের সামর্থ্যও নেই। তিনি বলেন, চলতি অর্থবছরে আমাদের মূল বাজেট ছিল তিন লাখ ৪০ হাজার ৬০৫ কোটি টাকার। এখন সংশোধন করে কমিয়ে করা হলো তিন লাখ ১৭ হাজার কোটি টাকা। আমাদের বাস্তবায়নের সক্ষমতা নেই বলেই ২৩ হাজার কোটি টাকা কাটছাঁট করতে হয়েছে। এখন কাটছাঁট করে যেটা করা হয়েছে সেটাও বাস্তবায়ন হবে না। এখানে জনগণের সাথে এক ধরনের তামাশা করা হচ্ছে। ব্যয়ের ব্যাপ্তি রাজস্ব অর্জনের ব্যর্থতার চেয়ে বেশি।
মির্জ্জা আজিজুল ইসলামের বিশ্লেষণে এবার এক লাখ ৫৩ হাজার ৩৩১ কোটি টাকার যে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) আকার ধরা হয়েছে সেটা অর্জিত হবে না। কখনোই এডিপি সঠিকভাবে নিরূপণ করা হয় না। আমাদের দক্ষতা ও বাস্তবায়নের সক্ষমতার ওপর ভিত্তি করে এডিপি প্রণয়ন করা হয় না। এখানে রাজনৈতিক চাপে অনেক প্রকল্প যুক্ত করা হয়। ফলে ওসব বাস্তবায়ন হয় না। তিনি বলেন, কিছু কিছু প্রকল্প আছে সেগুলো সময় মতো বাস্তবায়ন করা গেলে ভালো হয়। বিশেষ করে অবকাঠামো ও জ্বালানি এবং মেগা প্রকল্পগুলো যদি সঠিকভাবে ও সঠিক সময়ে বাস্তবায়ন করা যায় তাহলে জনগণ সুফল পাবে।
ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ
বাজেটের যে গাণিতিক হিসাব রয়েছে, তা থেকে এবারের বাজেটও ভিন্ন কিছু নয়। এই বাজেটকে সরকারের টাকা আয়ের বাজেট বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ও বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ। তার মতে, সরকার টাকা আয় করবে আর সরকারই ভোগ করবে। জনগণ নয়, এর সুফল পাবে রাজনীতিবিদরা। তাদের বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে সুফল দেয়া হবে।
ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, বেসরকারি বিনিয়োগের কোনো ত্রে তৈরি হবে না। শিল্পের উন্নয়নে কোনো উদ্যোগ নেই। এক পোশাক শিল্পের উপরেই বাজেটে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। এতে অন্য শিল্প গুরুত্বহীন হয়ে পড়ছে। তিনি বলেন, শিল্প-বিনিয়োগ না বাড়লে কর্মসংস্থান বাড়বে না। বিশাল বাজেট বাস্তবায়নের জন্য সাধারণ মানুষের পকেট কেটে টাকা আদায় করা হবে। কিন্তু সাধারণ মানুষের ভাগ্য উন্নয়নে বাজেটে তেমন কোনো উদ্যোগ নেই। তিনি বলেন, চলতি বাজেটের যে আকার ছিল সেটাও বিশাল। সেটাও বাস্তবায়ন করা যায়নি। জনগণ এতে কোনো সুফল পায়নি। এবারের বাজেটের একই অবস্থা। বাস্তবায়নযোগ্য না। জনগণের ওপর করের বোঝা বাড়বে। যেখানে সংস্কারের দরকার ছিল, দক্ষতা বাড়ানোর পদক্ষেপ নেয়ার প্রয়োজন ছিল, সেটা বাজেটে আমরা দেখছি না। এডিপি নেয়া হয়েছে বিশাল আকারের। এটাও বাস্তবায়ন হবে না। হবে শুধু অর্থের অপচয়। সরকারকে চাঙ্গা রাখতে এবং নির্বাচনকে সামনে রেখেই এই বাজেট। আর রাজনীতিবিদদের প্রকল্প দিয়ে সন্তুষ্ট রাখতে এত বড় উন্নয়ন কর্মসূচি। যেখানে বিনিয়োগ বাড়ানোর দরকার ছিল, সেটার কোনো উদ্যোগ দেখছি না।
৭ দশমিক ৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রার বিষয়ে ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, এটার কোনো যৌক্তিকতা নেই। অবাস্তব লক্ষ্যমাত্রা। যেখানে চলতি অর্থবছর সরকার যে ৭ দশমিক ২৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে বলে প্রচার করছে সেটা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। যেখানে রেমিট্যান্স প্রবাহ নি¤œœমুখী, রফতানি আয়ে ভাটা, বিনিয়োগে স্থবিরতা, কৃষিতে শ্লথগতি সেখানে কিভাবে এই প্রবৃদ্ধি ধরা হয়েছে আমার বোধগম্য না। তিনি বলেন, সরকারের এই লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবভিত্তিক নয়।
মূল্যস্ফীতির বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক এ গভর্নর বলেন, আগামী অর্থবছরে সাড়ে ৫ শতাংশ মূল্যস্ফীতির যে লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে সেটা কিভাবে নির্ধারণ করেছে? যেখানে চালের দাম অনেক বেশি, খাদ্যবহির্ভূত খাতে মূল্যস্ফীতি এখনো বেশি, নতুন করে ১৫ শতাংশ ভ্যাট আরোপ করা হয়েছে সেখানে মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়বে। আর সরকার সাড়ে ৫ শতাংশে মূল্যস্ফীতি ধরে রাখবে। এটা আদৌ সম্ভব হবে না। কিভাবে কমাবে আমি বুঝি না। তিনি বলেন, সরকার দেখা যাবে জোড়াতালি দিয়ে জনগণকে বোঝাবে।
ভ্যাট বাস্তবায়ন নিয়ে তিনি বলেন, এক দিকে ১৫ শতাংশ ভ্যাট, কর ও আবগারি শুল্কের কারণে স্থানীয় সঞ্চয় কমবে। জনগণকে প্যারালাইজড (পঙ্গু) করা হবে। সরকার আয় করতে পারছে না। এখন এই সহজ উপায়ে টাকা আদায় করবে। কেউ কিছু বলবে না এটাও তারা জানে।

 

Facebook Comments
Please follow and like us: