সরকারি খাদ্যগুদাম অরক্ষিত পাঁচ হাজার টন চাল চুরি দোষী প্রমাণিত হওয়ায় ১১ কর্মকর্তা চূড়ান্ত বরখাস্ত, ৮ জন সাময়িক, ৬১ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা * প্রভাবশালীরা ধরাছোঁয়ার বাইরে

বাজারেimage-22482 আস্বাভাবিক দামের কারণে সরকারি গুদাম থেকে চাল চুরি হচ্ছে। প্রায় অরক্ষিত কয়েকটি খাদ্যগুদাম থেকে প্রায় পাঁচ হাজার টন চাল-গম চুরি হয়েছে। চারটি খাদ্যগুদাম থেকে সাড়ে তিন হাজার টন এবং একটি গুদামে নেয়ার পথেই দেড় হাজার টনের বেশি চাল সাবাড় করে দেয়া হয়। হাওরের ভাঙন এবং বন্যার সময় দেশের বিভিন্ন স্থানে ত্রাণের চাল চুরির অভিযোগ উঠেছে। রাতের অন্ধকারে গুদাম থেকে ট্রাকভর্তি চাল সরানোর সময় একটি চালান ধরা পড়ে। আবার অন্যত্র খাতাপত্রে চাল-গমের যে পরিমাণ উল্লেখ আছে, বাস্তবে সে পরিমাণ খাদ্যগুদামে প্রবেশই করেনি। হঠাৎ গুদামের মজুদ পরীক্ষা করতে গিয়ে চুরির ঘটনা শনাক্ত হয়েছে। কবে চুরি হয়েছে বা কবে থেকে বাস্তব মজুদ কম, তা শনাক্তের চেষ্টা চলছে। খাদ্য বিভাগের কিছু দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা এবং অসাধু ব্যবসায়ীর একটি সিন্ডিকেট এর সঙ্গে জড়িত। অসৎ কর্মকর্তারা দুর্নীতির মাধ্যমে অর্থ আত্মসাতের উদ্দেশ্যেই দুর্নীতির মাধ্যমে চাল চুরি করে অসাধু ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করছে।

এ ধরনের ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার দায়ে এক বছরে খাদ্য অধিদফতরে দেড় শতাধিক বিভাগীয় মামলা হয়েছে। এসব মামলায় দোষ প্রমাণিত হওয়ায় ১১ জনকে চূড়ান্ত বরখাস্ত করা হয়েছে। আটজনকে সাময়িক বরখাস্তসহ ৬১ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেয়া হয়েছে।

খাদ্য বিভাগের এমন ভয়াবহ দুর্নীতির বিষয় স্বীকার করেছেন খাদ্যমন্ত্রী মো. কামরুল ইসলাম। তিনি যুগান্তরকে বলেন, যারাই খাদ্যশস্য নিয়ে দুর্নীতি করবে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেয়া হবে। খাদ্য অধিদফতরের কিছু দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা এর সঙ্গে জড়িত। এরা অতীতেও এ ধরনের কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত ছিল, এখনও আছে। এদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থাসহ ফৌজদারি মামলা দেয়া হচ্ছে।

সূত্র জানায়, নিয়ম হচ্ছে, জেলা-উপজেলা পর্যায়ের কর্মকর্তারা প্রতি মাসে কমপক্ষে দু’বার গুদামের মজুদ পরিস্থিতি তদারকি রিপোর্ট দেবেন বিভাগীয় কর্মকর্তার দফতরে। সেখান থেকে রিপোর্ট আসবে কেন্দ্রে। কিন্তু নিয়মিতভাবে কাজটি করা হয় না। অনেক এলাকার খাদ্যগুদাম কয়েক বছরে একবার পরীক্ষা না করার নজিরও আছে। কেন তদারকি রিপোর্ট দেয়া হচ্ছে না, এজন্য সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের অধিকাংশ সময় কোনো প্রশ্নও করা হয় না। ওইসব গুদামের মজুদ থেকে চাল-গম বিক্রি হয়ে যাচ্ছে। আবার অবস্থা বেগতিকের পূর্বাভাস পাওয়ামাত্র বাজার থেকে কিনে হিসাব মেলানোর ঘটনাও ঘটে। সব গুদামে মজুদ এবং গুদাম থেকে বের করা এবং প্রবেশ সংক্রান্ত হিসাব কাগজপত্রে ঠিক রাখা হয়। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা পরিদর্শনে গেলে তাদের প্রথমে খাতাপত্র দেখিয়ে বোঝানোর চেষ্টা করা হয়। এরপর সরেজমিন মজুদ দেখতে চাইলে গুদামের সামনের দিকে দেখানো হয়। এরপরও কোনো কর্মকর্তা আরও অনুসন্ধান করতে চাইলে পেছনের দিকে নেয়া হয়। অনেক সময় এতেই বেরিয়ে আসে চুরির ঘটনা। আবার কিছু ক্ষেত্রে গভীর অনুসন্ধানের পর প্রকৃত ঘটনা বের হয়ে আসে। কিন্তু বেশিরভাগ কর্মকর্তা এত কষ্ট করে চুরি বা দুর্নীতি ধরার আগ্রহ দেখান না বলে একাধিক কর্মকর্তা জানান। অধিকাংশ গুদামে খাতাপত্রের হিসাবের সঙ্গে বাস্তব মজুদের গরমিল পাওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেন ওই কর্মকর্তা। তিনি বলেন, বাস্তবে চুরি হয়ে যাওয়া চালের পরিমাণ অনেক। চুরির ভাগ অনেক দূর পর্যন্ত যায়। প্রভাবশালীদের জন্য নির্দিষ্ট বরাদ্দ থাকে। কাজেই নিচের দিকে খুব বেশি সমস্যা হয় না। বড় ধরনের সমস্যা বা বেশি হইচই না হলে কারও বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হয় না।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে খাদ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক বদরুল হাসান যুগান্তরকে বলেন, এসব বিষয়ের সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের কোনো কর্মকর্তার যোগসাজশ বা কারও গাফিলতি রয়েছে কিনা তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। কাউকে ছাড় দেয়া হবে না। যাদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে তাও কঠিনভাবে মোকাবেলা করা হবে।

কুমিল্লার লাকসাম উপজেলার দৌলতগঞ্জ খাদ্য গুদামের এক হাজার ৫৫০ টন চাল-গম পথ থেকেই সাবাড় করে দেয়া হয়েছে। বিপুল পরিমাণ চাল-গম গুদামে মজুদ না করে পথেই বিক্রি করে দেন ওই গুদামের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা একেএম মহিউদ্দিন। এ ঘটনায় সরকার তদন্ত কমিটি গঠন করে।

খাদ্য অধিদফতরের অতিরিক্ত পরিচালক সালাউদ্দিন আহম্মদকে প্রধান করে তিন সদস্যের এক তদন্ত কমিটি গঠন করে সরকার। কমিটি তাদের রিপোর্ট খাদ্য মন্ত্রণালয়ে জমা দিয়েছে। এতে চুরির ঘটনার জন্য এককভাবে দায়ী করা হয়েছে দৌলতপুর খাদ্যগুদামের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা একেএম মহিউদ্দিনকে। প্রতিবেদনে বলা হয়, গুদামের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মহিউদ্দিন খুবই সুকৌশলে এ দুর্নীতি করেছেন, এজন্য তিনি সরাসরি দায়ী। তাকে সহায়তা করেছেন আরও সাত কর্মকর্তা। নিয়ম অনুযায়ী গুদামে খাদ্যশস্য মজুদ করার কথা থাকলেও মহিউদ্দিন ওই খাদ্যশস্য রাস্তা থেকেই আত্মসাৎ করেন। তবে কাগজে-কলমে সবই ঠিক রাখেন। ওইসব রেকর্ডপত্র তিনি গুদামে না রেখে জেলা সদরে নিজ বাসভবনে রাখতেন। কোনো কর্মকর্তা গুদাম পরিদর্শনে গেলে তিনি বাধা দিতেন। এমনকি নানাভাবে হুমকি-ধমকি ও হেনস্থা করতেন। এরপরও কেউ পরিদর্শনে গেলে তাকে রেকর্ডপত্র দেখাতেন না। যে কারণে বিষয়টি ধরা পড়েনি। উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকরা বিষয়টি জেলা খাদ্য কর্মকর্তাকে জানালেও পাত্তা দেননি ডিসি ফুড। এমনকি ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার দায়িত্ব ৪ মাসেও হস্তান্তর না করলেও কোনো ব্যবস্থা নেননি তিনি। এসব কারণে আত্মসাতের সুযোগ পেয়েছে সংশ্লিষ্টরা। প্রতিবেদনে বলা হয়, নীতিমালা লঙ্ঘন করে উপজেলার উৎপাদনের চেয়েও অধিক পরিমাণ খাদ্যশস্য ক্রয় করে সরকারি অর্থ আত্মসাতের সুযোগ দেয়া হয়েছে। এমনকি সংশ্লিষ্ট উপজেলার বাইরের চালকল মালিকরাও এ গুদামে চাল সরবরাহ করেছেন যা নীতিমালার সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক সালমা আক্তার ও মনিন্দ্র চন্দ্র সাহা বাস্তব মজুদ যাচাই ও গুদামের রেকর্ডপত্র গুদামে সংরক্ষণের কোনো কার্যকরী উদ্যোগ গ্রহণ করেননি। ইনভয়েসে প্রতিস্বাক্ষরের ক্ষেত্রেও যথাযথভাবে দায়িত্ব পালন না করায় চুরির সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। খাদ্য গুদামের উপপরিদর্শক আবু তাহের অন্ধের মতো ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার নির্দেশ পালন করা, মজুদ শাখার ইনচার্জ মনোয়ারা বেগম ও মজিবুর রহমানের দায়িত্ব অবহেলা এবং ডিসি ফুডের পক্ষে ইনভয়েসে প্রতিস্বাক্ষরকারী কর্মকর্তা সংগীত কুমার সরকার সাপ্তাহিক প্রাপ্তি বিবরণী ছাড়াই মাসের পর মাস ভি-ইনভয়েসে স্বাক্ষর করায় চুরির পথ সুগম হয়েছে। এর সঙ্গে জড়িত আট কর্মকর্তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। একেএম মহিউদ্দিনের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা দেয়া হয়েছে। দুর্নীতি দমন কমিশন মামলাটি তদন্ত করছে।

চট্টগ্রামে গুদাম থেকে পাচারকালে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা ২শ’ টন চাল উদ্ধার করেছেন। আটক করা হয়েছে চট্টগ্রাম সিএসডির ব্যবস্থাপক প্রণয়ন চাকমাকে। এ ঘটনায় মামলা হয়েছে। ৫ জনকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। এছাড়া জেলার হালিশহর ও দেওয়ান হাটের সরকারি খাদ্য গুদামের (সেন্ট্রাল সাপ্লাই ডিপো-সিএসডি) ২ হাজার টনেরও বেশি চাল ও গম উধাও হয়ে গেছে। হালিশহর সিএসডিতে শুধু গমের ঘাটতি হলেও দেওয়ান হাট সিএসডিতে গম ও চাল দুই পণ্যেরই ঘাটতির তথ্য পাওয়া গেছে। অভিযোগ উঠেছে, কর্মকর্তাদের যোগসাজশে গত কয়েক মাসে সরকারি ডিও (ডিমান্ড অর্ডার) ছাড়া ভুয়া কাগজপত্রে বিপুল পরিমাণ এ গম ও চাল লোপাট করা হয়। সোমবার রাতে ৭টি ও মঙ্গলবার রাতের অভিযানে আকবর শাহ থানার কবির মাঝির গুদাম থেকে আরও তিনটি চালভর্তি ট্রাক জব্দ করে র‌্যাব। ১০টি ট্রাকে সবমিলিয়ে ২শ’ টন চাল পাচার হচ্ছিল। এদিকে বুধবার সন্ধ্যায় আকবর শাহ থানা এলাকায় অভিযান চালিয়ে সরকারি চাল ভর্তি আরও একটি ট্রাক আটক করেছে র‌্যাব-৭। আটক ট্রাকে ২৭০ বস্তা চাল রয়েছে বলে জানিয়েছেন র‌্যাবের চান্দগাঁও ক্যাম্পের কমান্ডার আশিকুর রহমান। তিনি যুগান্তরকে জানান, বুধবার সন্ধ্যায় গোপন সংবাদে আকবর শাহ এলাকার একটি গোডাউনে অভিযান চালিয়ে ২৭০ বস্তা চাল উদ্ধার করা হয়েছে।

মে মাসে গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার গোলাপবাগ সরকারি খাদ্যগুদাম থেকে ৪২ টন চাল চুরি হয়। গুদামে চালের ঘাটতির অভিযোগে খাদ্যগুদামের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসিএলএসডি) মো. আবদুল্লাহর বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। বর্তমানে তিনি পলাতক রয়েছেন বলে জানিয়েছেন গোবিন্দগঞ্জ উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক কর্মকর্তা মো. আহাদ আলী। জানা যায়, গোবিন্দগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আবদুল হান্নান আকস্মিকভাবে উপজেলা সদরে অবস্থিত গোলাপবাগ সরকারি খাদ্যগুদামে যান। এ সময় তিনি গুদামের মজুদের খোঁজখবর নিতে গেলে ৪২ টন চাল ঘাটতির বিষয়টি ধরা পড়ে। তবে এ ঘটনায় ধরা-ছোঁয়ার বাইরে রয়েছেন উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক, জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক এবং আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রক।

কাছাকাছি সময়ে রংপুর জেলা সদর খাদ্য গুদামের প্রায় ৪০০ টন চাল চুরি করে কালোবাজারে বিক্রি করে দেন খাদ্য বিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। গোপনে ওই চাল কালোবাজারে বিক্রির ঘটনা জানাজানি হলে তড়িঘড়ি করে ৩০০ টন নিন্মমানের চাল স্থানীয় বাজার থেকে গুদামজাত করা হলেও এখন ১০০ টন চালের হদিস পাওয়া যায়নি। বিষয়টি নিয়ে তদন্ত করে খাদ্য অধিদফতর ও দুর্নীতি দমন কমিশনও। কাগজে-কলমে সব ঠিক থাকলেও বাস্তবের সঙ্গে মিল ছিল না।

বাগেরহাটের মোল্লারহাট উপজেলার গরফাবাজার খাদ্য গুদামে ৬৮৮ টন খাদ্যশস্য চুরির মাধ্যমে আত্মসাতের ঘটনা ঘটে। এর মধ্যে ৪১৯ টন চাল, ১৩৭ টন ধান এবং ১৩২ টন গম ছিল। ওই সময়ের আলোচিত এ ঘটনায় জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক এমদাদুর রহমানকে শাস্তি হিসেবে পদাবনতি করে খাদ্য পরিদর্শক করা হয়। উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক লায়লা আক্তারকে সাময়িক বরখাস্ত করা হলেও পরে তাকে ঝালকাঠিতে পদায়ন করা হয়। গুদামের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মিলন কুমার মণ্ডল এখনও পলাতক।যুগা।

Please follow and like us:
Facebook Comments