টেকনাফে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী পরিচয়ে রাতে বসতবাড়িতে ঢুকে তাণ্ডব, এলাকায় আতঙ্ক

টেকনাফ: কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলার বাহারছড়া এলাকায় আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর 1501987359পরিচয়ে গভীর রাতে  বসতবাড়িতে ঢুকে ব্যাপক মারধর, ভাঙচুর ও লুটের অভিযোগ পাওয়া গেছে।
তাণ্ডবকারীরা কোনো সময় পুলিশ, কোস্টগার্ড কিংবা গোয়েন্দা সংস্থার লোক পরিচয় দিয়ে এসব কাজ করছে। চালাচ্ছে শিশু ও নারীদের উপর নির্যাতন। এমনকি রেহায় পাচ্ছে না স্কুলগামী ছেলে মেয়েরাও। গত ১০ দিনে একটি এলাকায় অন্তত ৮টি বসতবাড়িতে এরকম ঘটনা ঘটেছে। এতে করে সন্ধ্যা নামলেই পুরো এলাকায় আতঙ্ক দেখা দেয়। পুরুষশূন্য হয়ে গেছে অনেক বসতঘর।
বাহারছরা ইউনিয়নের উত্তর শিলখালী নয়াবাজার এলাকার কুলসুমা আকতার নামে গৃহিনী বলেন, সপ্তাহখানেক আগে রাত অনুমান ৩ টার দিকে একদল লোক এসে প্রথমে দরজা খুলতে বলে। পুলিশ পরিচয় দেয়ায় দরজা খোলার সাথে সাথে তারা জানতে চায়- স্বামী কোথায় ? এরপর আমার স্বামীকে হাজির করতে বলে। তারা বলে, ‘আমরা ডিবির লোক। ইয়াবা খুঁজতে এসেছি। ইয়াবা কোথায় রেখেছ? দেখিয়ে দাও। অন্যথায় টাকা দাও। এসব বলতে বলতে ঘরের মূল্যবান আসবাপত্র ভেঙে তছনছ করে চলে যায়। যাওয়ার সময় ঘটনা প্রকাশ না করার জন্যও হুমকি দেয়।’
পশ্চিমপাড়ার রেহেনা আকতার নামে আরেক নারীর বাড়িতে গেলে সাংবাদিক পরিচয় পেয়ে চোখের পানি ছেড়ে দেন। তিনি বলেন, ৪/৫ দিন আগে খাকি পোশাক পরিহিত অবস্থায় ৭/৮ জন লোক রাত ৩ টার দিকে ঘরের দরজা ধাক্কাতে থাকে। ডিবি পুলিশ পরিচয় দিয়ে বাড়িতে ঢুকে ছেলে মেয়েদের মারধর করে। কোমর থেকে ইয়াবার একটি প্যাকের বের করে বলে- টাকা দিলে দে। নইলে ইয়াবা ধরাইয়া দিমু।
আফরাহ আকতার নামে মাদরাসা ছাত্রী চোখ চেপে ধরে বলেন, রাতের আধারে দরজা ধাক্কাধাকি কে করছে দেখতে গিয়ে তারা আমার চোখে আঘাত করে। বাবা না থাকায় চোখের চিকিৎসা করতে পারছিনা। ওই দিন থেকে ভয়ে রাত কাটে। ঘুম আসে না। চোখের যন্ত্রণায় মাদরাসায়ও যেতে পারছিনা। আফরাহ আকতার স্থানীয় তাফহীমুল কোরআন মাদরাসায় ৫ম শ্রেণিতে পড়ে। বাবা শাকের আহমদও ভয়ে অনেক দিন ধরে বাড়ির বাইরে। অসহায় সময় কাটছে তাদের।
কুলসুমা খাতুন নামে ভুক্তভোগী অরেক মহিলা বলেন, রাতটা যেন আমাদের আতঙ্ক আর যন্ত্রণার। ডিবি পরিচয়ে অকারণে জালাতন করা হচ্ছে। ঘরে ঢুকামাত্র মোবাইলগুলো কেড়ে নেয়- যেন কোথাও ফোন করতে না পারি। এরপর বিভিন্নভাবে হুমকি ধমকি প্রদান করে। কাপড়ের ভেতর ইয়াবা ঢুকিয়ে দিয়ে ফাঁসাতে চেষ্টা করে। মাঝে মধ্যে ইয়াবা খোঁজার কথা বলে ঘরে ঢুকে পড়ে কোস্টগার্ডের পোশাক পরা লোকজন। আদৌ বুঝতে পারিনা এরা আসলে কারা? কুলসুমার প্রশ্ন- আমরা তো কোনো মামলার আসামি নই। আমাদের পরিবারের কারোর নামে ওয়ারেন্টও নেই। কেন আমাদের উপর অমানবিক নির্যাতন? আমরা পরিত্রাণ চাই।
কাদের হোসেন নামে সত্তরোর্ধ বৃদ্ধ বলেন, আমার ছেলে আবদুর রহমানের জন্য বউ এনেছি এক মাস হয়নি। হঠাৎ এক রাতে কিছু লোক ( গোয়েন্দা পুলিশ ) ডিবি পরিচয় দিয়ে বাড়ি ঢুকে। প্রথমে আমাকে কাঁথা দিয়ে মুড়িয়ে ফেলে রাখে। এরপর আমার ছেলের কক্ষে ঢুকে সব চুরমার করে দিয়েছে। নিয়ে যায় জায়গা জমির কাগজপত্র সহ অনেক মূল্যবান জিনিসপত্র। জীবনে এ ধরনের জুলুম দেখিনি।
এরকম অভিযোগ অন্তত একশ মানুষের, যারা ভয়ে ঘুমুতে পারেনা। স্বাভাবিক জীবনচলা তাদের থেমে গেছে। অসহায়ত্বে দিন কাটছে ওই এলাকার মানুষদের।
এ বিষয়ে স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান মাওলানা আজিজ উদ্দিন বলেন, বেশ কিছু দিন ধরে এমন ঘটনায় এলাকাবাসীর মাঝে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। অনেকে ঘর ছেড়ে অন্যত্র অবস্থান নিয়েছে।  মানবেতর জীবন যাপন করছে অনেক নারীপুরুষ। তিনি আরো বলেন, চেয়ারম্যান হিসেবে যতটুকুন সম্ভব অপরাধ দমনে চেষ্টা করছি। মানুষের বিপদ আপদে ছুটে যাচ্ছি। কিন্তু গভীর রাতে এসব ঘটনা ঘটায় সহজেই রহস্য বের করা যাচ্ছে না। প্রশাসনকে জানিয়েছি। কোনো ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে না।
এ প্রসঙ্গে টেকনাফ মডেল থানার ওসি মো. মাঈন উদ্দিন খান বলেন, আমাদের কোনো লোক এরকম ঘটনা ঘটানোর কথা নয়। অভিযোগও কেউ করেনি। এরপরও খোঁজ নিয়ে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

Please follow and like us:
Facebook Comments