প্রকৃতির রহস্যঘেরা রাস মেলা দেখতে লাক্ষ পর্যাটক এখন সুন্দরবনের পথে

আবু সাইদ বিশ্বাসঃসুন্দরবন; প্রকৃতির রহস্যঘেরা সুন্দরবন দেখতে এখন লাক্ষ পর্যাটক সুন্দরবনের পথে। কয়েক হাজার নৌ-যান ভাড়া নিয়ে চার দিনের ভ্রমণের উদ্যেশ্যে এখন সবাই সুন্দর বনে। রাস মেলাকে কেন্দ্র করে প্রতি বছর এসময়ে লক্ষাধিক পর্যাটক আসে সুন্দরবন ভ্রমণে।
পৃথিবীর সবচেয়ে বড় শ্বাসমূলীয় বন সুন্দরবন। বঙ্গোপসাগর উপকূলে বনের পাশের ছোট্ট দ্বীপ দুবলার চর। সাগর তীরের কুঙ্গা ও মরা পশুর নদীর মোহনায় জেগে ওঠা এ চরে দীর্ঘকাল ধরে চলে আসছে রাস মেলা।
প্রতি বছরই কার্ত্তিক-অগ্রহায়ণের শুক্লপক্ষের ভরা পূর্ণিমায় সাগর যখন উছলে ওঠে, লোনা পানিতে ধবল চন্দ্রালোক ছলকে যায় অপার্থিব সৌন্দর্য রচনা করে এবছার ৪ নভেম্বর শুরু হয়ে চলবে ৬ নভেম্বর পর্যন্ত এ মেলা।
সাগর-দুহিতা দুবলার চরের আলোর কোল মেতে ওঠে রাস উৎসবে।
অপরূপ সৌন্দর্যের লীলাভূমির এ সৌন্দর্য উপভোগ করতে প্রতিবছর পর্যটন মৌসুমে সুন্দরবনে ছুটে আসেন বিভিন্ন পেশার মানুষ। মানসিক প্রশান্তির মাধ্যমে সারা বছরের ক্লান্তি দূর করে ফিরে যান যার যার ঘরে। সুন্দরবনের অপরূপ সৌন্দর্যভরা সাতক্ষীরা রেঞ্জের হিরনপয়েন্ট, মান্দারবাড়িয়া, কালিরচর , দোবাকি, কলাগাছিসহ বিভিন্ন স্থানে ঘুরতে আসে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে নানা পেষার মানুষ।
সারি সারি সুন্দরী, পশুর, কেওড়া, গেওয়া এবং গোলপাতা গাছ। দৃষ্টি যতদূর যায় সব খানেই যেন কোন শিল্পী সবুজ অরণ্য তৈরি করে রেখেছেন।
সুন্দরবনের মোহনীয় সাজ পর্যটকদের মোহিত করে। কচিখালী সমুদ্রসৈকত থেকে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত দেখার সুযোগ তো রয়েছেই। সুন্দরবন অনন্য রূপ ধারণ করেছে সুন্দরী, গেওয়া, পশুর, গরান, গোলপাতাসহ ৩৩৪ প্রজাতির গাছপালা। এখানকার স্থলভাগে রয়েছে রয়েল বেঙ্গল টাইগারথ বাঘকুলের মধ্যে যাকে সেরা হিসেবে ভাবা হয়। সুন্দরবনের হরিণ এমন কি বানরও সত্যিকার অর্থে অনন্য। লোনা পানির কুমির, বিশাল আকারের অজগর, সারাবিশ্বে বিলুপ্তপ্রায় ইরাবতী ডলফিনসহ ৩৭৫ প্রজাতির বন্যপ্রাণীর বিচরণক্ষেত্র এই দৃষ্টিনন্দন বাদাবন। এ কারণে দেশি-বিদেশি হাজারও পর্যটক সৌন্দর্যের ক্ষুধা মেটাতে এখানে ছুটে আসেন।
প্রাকৃতিক সৌন্দর্যেও অপরূপ এ নিদর্শনকে ঘিরে দেশের পর্যটন শিল্প বিকাশের যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে। তবে সে সম্ভাবনা নানা প্রতিবন্ধকতায় অনেকটাই বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। দেশি বিদেশি পর্যটকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করার মতো যথেষ্ট উপাদান থাকা সত্ত্বেও কেবল প্রচার প্রচারণা এবং সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার অভাবে এ খাতের বিকাশ হচ্ছে না। 
বিশ্বের অন্যান্য ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চলের চেয়ে সুন্দরবন জীববৈচিত্র্যে অনেক বেশি সমৃদ্ধ। সুন্দরবনে ৩৩৪ প্রজাতির গাছ, ১৬৫ প্রজাতির শৈবাল এবং ১৩ প্রজাতির অর্কিড আছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে জাতিসংঘ সুন্দরবনকে ‘ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ’ বা ‘বিশ্ব ঐতিহ্য’ ঘোষণা করে। সুন্দরবন পর্যটকদের অন্যতম স্থান হিসেবে সরকার শত শত কোটি টাকা উপার্জন করতে সক্ষম। অথচ সুন্দরবন সংলগ্ন তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করে একে হুমকির মুখে ফেলে দিচ্ছে। সুন্দরবনের এই বিশাল বৃক্ষরাজির জন্যই দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল ঝড়-জলোচ্ছ্বাস থেকে রক্ষা পাচ্ছে।
সুন্দরবনকে পর্যটক-বান্ধব এলাকায় পরিণত করার জন্য সরকারের পক্ষ থেকে বেশ কয়েকটি প্রকল্প প্রণয়ন করা হলেও আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রতা আর লালফিতার দৌরাত্ম্যে তার ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে উঠছে। ৬ হাজার ১৭ বর্গ কিলোমিটার আয়তনের বিশ্বের বৃহত্তম বাদাবন এই সুন্দরবন ২৪ ঘণ্টায় কমপক্ষে ৬ বার রূপ বদলায়। খুব ভোরে এ বনভূমি আবির্ভূত হয় এক রূপ, দুপুরে তার চেহারা অন্যরকম। পড়ন্ত বিকালে এই বনভূমি গ্রহণ করে আরেক রূপ। সন্ধ্যায় নেয় ভিন্ন সাজ। মধ্য ও গভীর রাতের সুন্দরবনের সৌন্দর্য আরেক রকম। আর চাঁদনী রাতের রূপের বর্ণনা দেয়া যে কারোর পক্ষে কঠিন। প্রশাসনের প্রক্ষ থেকে পর্যাটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গোটা সুন্দরবন অঞ্চলে কঠোর নিরাপত্তা বলায় গড়ে তুলা হয়েছে। –

Please follow and like us:
Facebook Comments