সাতক্ষীরায় দু’বছরে বেড়িবাঁধ ভেঁঙেছে ৯ বার !

ক্রাইমবার্তা ডেস্করিপোর্ট:সাতক্ষীরা সংবাদদাতা :আশাশুনির প্রতাপনগর ইউনিয়ন দু’বছরে পানি উন্নয়ন বোর্ডের বেড়িবাঁধ ভেঙেছে ৯ বার। পানিবন্দি মানুষ দু’বছরে সরকারি সাহায্য পেয়েছে মাত্র একবার। বছরের পর বছর ধরে নদীভাঙনে এ ইউনিয়নের লোকজন সর্বশান্ত হয়ে এলাকা ত্যাগ করতে বাধ্য হচ্ছে। প্রতিবছর এ ইউনিয়নের ভৌগলিক মানচিত্রের পরিবর্তন হচ্ছে। ভাঁঙ্গনের ফলে পানি উন্নয়ন বোর্ডের কিছু অসাধু কর্মকর্তা ও ঠিকাদারের ভাগ্যের পরিবর্তন হচ্ছে।
প্রতাপনগর ইউপি মেম্বর জুলফিক্কার রহমান জুলু জানান, বারবার বাঁধ ভেঙে পানিবন্দি হয়ে কাঁচা রাস্তা, ইটের সোলিং, ফ্লাট সোলিং ও পিচের রাস্তা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়ে গ্রামের ভেতরে ছোট ছোট রাস্তা চলাচলের অনুপোযোগি হয়ে পড়ছে। দীর্ঘদিন ধরে প্লাবনে ডুবতে থাকায় নিচু এলাকায় নতুন করে কেউ কাঁচা ঘরবাড়ি তৈরি করতে সাহস পায় না। দু’বছরে ৯ দফায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সংখ্যা ৩ হাজার ৭শ ৭০। এরমধ্যে সরকারি ভাবে ৭ জনকে ৭ হাজার করে টাকা ও ২ বান করে ঢেউটিন প্রদান করা হয়। এর আগে ২০০৯ সালের ২৫ মে আইলায় প্লাবিত পুরা ইউনিয়নের প্রায় ৫০০ পরিবার বসতভিটা হারিয়ে এখনো সুভদ্রাকাটি বাঁধের উপর টোঙ বেঁধে মানবেতর জীবন-যাপন করছে। এ পরিবার গুলির জন্য পার্শ্ববর্তী সরকারি খাস জমিতে প্রধানমন্ত্রী আশ্রয়ন প্রকল্প-২ এর জায়গা বরাদ্দ হলেও অদৃশ্য কারনে আজও ফাইলগুলি উপজেলা অফিসে বাক্সবন্দি হয়ে পড়ে আছে।
আশাশুনি উপজেলার প্রকল্প বাস্তবায়ন অফিস সুত্রে জানা যায়, গত বছর সেপ্টেম্বর মাসে ২ ও ৩ তারিখে ইউনিয়নের চাকলা, সুভদ্রাকাটি, শ্রীপুর, দীঘলারআইট গ্রামের বেড়িবাঁধ ভেঙে ১৪০ পরিবার পানিবন্দি হয়ে ক্ষতিগ্রস্তহয়। একই মাসের ২০ তারিখে আবারো প্রতাপনগর, হরিশখালী ও চাকলা গ্রামের বেড়িবাঁধ ভেঙে যায়। এ প্লাবনে ক্ষতিগ্রস্ত হয় ১০০ পরিবার। ঐ বছর ১৫ অক্টোবর কোলা, হরিশখালী ও শ্রীপুর আবারো ভেঙে গেলে ক্ষতিগ্রস্ত হয় ১৫০ পরিবার। এই ১৫০ পরিবারের মধ্যে সরকারি ভাবে ৭ জনকে ৭ হাজার করে টাকা ও ২ বান করে ঢেউটিন প্রদান করা হয়। চলতি বছর প্রথমে ৩০ মার্চ চাকলা গ্রামের বেড়িবাঁধ ভেঙে ২৪০ পরিবার পানিবন্দি হয়। এরপর ১৫ মে আবার চাকলা গ্রামের বাঁধ ভেঙে ক্ষতিগ্রস্ত হয় ৩৫০টি পরিবার। ২৯ মে চাকলা, দীঘলারআইট ও শ্রপুর গ্রামের বাঁধ আবারো ভেঙে যায়। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয় কমপক্ষে ১০০ পরিবার। ৮ সেপ্টেম্বর মাদারবাড়িয়া, প্র্রতাপনগর, দরগাহতলারআইট ও বন্যতলা গ্রামের বাঁধ ভেঙে ১৫০০ পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ঠিক একমাস পরে অক্টোবর মাসের ৮ তারিখে আবারো মাদারবাড়িয়া, প্রতাপনগর, দরগাহতলারআইট, চাকলা, কোলা, হিজলিয়া, হরিশখালী ও বন্যতলা এই ৮ গ্রামের বাঁধ ভেঙে আবারো প্লাবিত হয় ৪,৫ ও ৬ নং ওয়ার্ডের গ্রামগুলি। সরকারি হিসাবমতে এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয় ১১৮০টি পরিবার। এরমধ্যে ছোট খাটো ভাঙনের হিসাব নেই, যেটা পরিষদের পক্ষ থেকে মেরামত করা হয়েছে। বানভাসি লোকজন মনে করেন, পানি উন্নয়ন বোর্ডের ৭/২ পোল্ডারের নদী ভাঙনই এ ইউনিয়নের প্রধান সমস্যা। এলাকার আয় ও উন্নয়নের ক্ষেত্রে প্রধান প্রতিবন্ধকতা এই নদী ভাঙনই। প্রতিবছর মানুষের আশা আকাঙ্খার যবনিকাপাত ঘটায় কপোতাক্ষ নদ ও খোলপেটুয়া নদীর ভাঙন। প্রতিবছর ভাঙনে ৩৩.৮৯ বর্গ কিঃমিঃ আয়তনের এ ইউনিয়নটির ভৌগলিক পরিবর্তন ঘটছে। নদীশাসন না করে পাকিস্তানি আমলের নকশা দিয়ে বাঁধ নির্মান করা, পানি উন্নয়ন বোর্ডের সীমাহিন দুর্নীতি, অবহেলা, সময়োপযোগী তড়িৎ পদক্ষেপ না নেয়া, জরুরী অবস্থায় ইউনিয়ন পরিষদে ফান্ড না থাকা, স্থানীয় প্রশাসনের দুর্বলতা, স্থবিরতা সবকিছু মিলিয়ে ফলাফল প্রতিবছর লোনাপানিতে ডুবতে থাকা। শীতকাল ব্যতিত বছরের অন্যান্য সময় নদীভাঙনের ফলে উদ্বেগ, উৎকন্ঠায় কাটাতে হয় ২৯হাজার ২৫০ জন ইউনিয়নবাসীকে।
ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ জাকির হোসেন গত বছর ১০ মে জেলা প্রশাসক বরাবর লিখিত আবেদনে করেন, চাকলা রজব ঢালীর বাড়ি থেকে চাকলা ফিরোজ ঢালীর বাড়ি পর্যন্ত ৮০ চেইন, একই গ্রামের ফিরোজ ঢালীর বাড়ি থেকে শাহজাহান সরদারের বাড়ি পর্যন্ত ৪০ চেইন, সুভদ্রাকাটি সোহরাবের ঘের থেকে একই গ্রামের সাঈদের বাড়ি পর্যন্ত ৬০ চেইন, শ্রীপুর গ্রামের রুহুল বারির বাড়ি থেকে একই গ্রামের আজগরের বাড়ি পর্যন্ত ৬৫ চেইন, পূর্বনাকনা স’মিল থেকে সনাতনকাটি গ্রাম পর্যন্ত ৫০ চেইন ও হিজলীয়া বাস ষ্ট্যান্ড থেকে কোলাগামী ওয়াপদা রাস্তা ২০ চেইন মোট ৩১৫ চেইন ঝুঁকিপুর্ন ওয়াপদা রাস্তা জরুরী ভিত্তিতে সংস্কার ও নির্মানের জন্য। কিন্তু দৃশ্যমান কোন অগ্রগতি তো হয়নি বরঞ্চ এ বছরও উপরোক্ত তারিখে ৫ বার বাঁধ ভেঙে এলাকা প্লাবিত হয়েছে। প্রকল্প বাস্ত বায়ন অফিস সুত্রে জানাগেছে, গত দু’বছরে প্রতাপনগর ইউনিয়নে ক্ষতিগ্রস্ত উপরোক্ত পরিবার গুলির জন্য উর্ধতন কর্তৃপক্ষের কাছে বরাদ্দের আবেদন করা হয়েছে। বরাদ্দ মঞ্জুর হলে তা ক্ষতিগ্রস্তদের মাঝে প্রদান করা হবে। শুকনো মৌসুমে ইউনিয়নের ক্ষতিগ্রস্ত বাঁধগুলি মেরামত ও স্থায়ী সমাধানের জন্য দাবী জানিয়েছেন এলাকাবাসি

Please follow and like us:
Facebook Comments