করস্বর্গের নতুন তথ্য ফাঁস : উঠে এলো ব্রিটিশ রানীর নাম

ক্রাইমবার্তা ডেস্করিপোর্ট:বিশ্বের প্রভাবশালী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কর ফাঁকির তথ্য ফাঁস করা ‘পানামা পেপার কেলেঙ্কারি’র পর এবার সামনে এলো ‘প্যারাডাইস পেপার্স কেলেঙ্কারি’।

বারমুডার একটি ল’ ফার্মের এক কোটির বেশি গোপন নথি ফাঁস হয়েছে, যাতে ব্রিটেনের রানিসহ বিশ্বের অনেক প্রভাবশালী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের গোপনে বিপুল পরিমাণ অর্থ করস্বর্গ হিসেবে পরিচিত দেশ ও অঞ্চলের অফশোর কোম্পানিতে বিনিয়োগের তথ্য বেরিয়ে এসেছে।

প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বাণিজ্যমন্ত্রীর মালিকানা থাকা একটি কোম্পানির যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা রুশ কোম্পানির সঙ্গে লেনদেন করার তথ্যও এসেছে।

বিবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্যারাডাইস পেপার্স নাম দিয়ে এক কোটি ৩৪ লাখ গোপন নথি ফাঁস করা হয়েছে, যার অধিকাংশই বারমুডাভিত্তিক আইনি সহায়তাদাতা প্রতিষ্ঠান অ্যাপলবি থেকে পাওয়া গেছে। অফশোর ইন্ডাস্ট্রির শীর্ষ পর্যায়ের সেবাদাতা এই প্রতিষ্ঠান গ্রাহকদের কর ফাঁকির পথ বাতলে দেয়।

গত বছর ফাঁস হওয়া পানামা পেপার্সের মতো এবারও এসব নথি প্রথমে জার্মান দৈনিক জুয়েডয়েচে জাইটুং-এর হাতে আসে। সেসব নথি ইন্টারন্যাশনাল কনসোর্টিয়াম অফ ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিস্টসকে (আইসিআইজে) দিয়েছে তারা।

আইসিআইজে-এর কাছ থেকে সেসব নথি পেয়েছে বিবিসি, গার্ডিয়ানসহ বিভিন্ন দেশের ১০০টি সংবাদমাধ্যম। এখন চলছে এসব নথির বিশ্লেষণ।

এসব নথিতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের কয়েকশ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কর ফাঁকি ও গোপন আর্থিক ব্যবস্থাপনার তথ্য উঠে এসেছে, যার ক্ষুদ্র একটি অংশ রোববার প্রকাশিত হয়েছে বলে বিবিসি বলছে।

রাজনীতিবিদ, দ্বৈতনাগরিক, উচ্চ পর্যায়ের ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষাকারী ও জনপ্রিয় ব্যক্তিরা কীভাবে কর ফাঁকি দিতে বা গোপনীয়তার আবরণে নিজেদের লেনদেন ঢাকতে জটিল কাঠামোর ট্রাস্ট, ফাউন্ডেশন ও শেল কোম্পানি গড়ে তুলছেন, তা উঠে এসেছে অনেক নথিতে।

রুশ-সম্পর্কিত কোম্পানিতে মার্কিন মন্ত্রীর বিনিয়োগ
বিবিসির দেখা কিছু দলিলপত্রে দেখা যাচ্ছে যে মার্কিন বাণিজ্যমন্ত্রী উইলবার রসের এমন একটি কোম্পানিতে শেয়ার আছে – যার সাথে ক্রেমলিনের সম্পর্ক আছে।

এই দলিলগুলো থেকে উদঘাটিত হয়েছে যে মি. রসের ‘নেভিগেটর হোল্ডিংস’ নামে একটি শিপিং কোম্পানিতে মালিকানায় অংশীদারিত্ব রয়েছে – যা রুশ জ্বালানি কোম্পানি সিবুর-এর জন্য তেল ও গ্যাস পরিবহন করে লক্ষ লক্ষ ডলার আয় করে থাকে।

সিবুর-এর মালিকের মধ্যে দু’জন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার আওতায় আছেন, এবং তারা প্রেসিডেন্ট পুটিনের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত।

বিবিসির একজন সংবাদদাতা বলছেন, মি. রস যদিও অন্যায় কিছু করেননি, কিন্তু এই তথ্য প্রকাশ পাওয়াটা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের জন্য অস্বস্তিকর হতে পারে।

প্রকাশিত দলিলপত্রে ব্রিটেনের রানির বিনিয়োগ তথ্য
এই তদন্তে আরো জানা গেছে যে রানি এলিজাবেথের এক কোটি পাউন্ড পরিমাণ ব্যক্তিগত অর্থ কেম্যান দ্বীপপুঞ্জ এবং বারমুদার ‘অফশোর ফান্ডে’ বিনিয়োগ করা হয়েছে।

এই অর্থের খানিকটা এমন একটি ব্যবসায় গিয়েছে যাকে নিম্ন আয়ের গ্রহীতাদের প্রতি খারাপ ব্যবহার করার কারণে ক্ষতিপূরণ দিতে বাধ্য করা হয়েছিল।

ব্রাইটহাউস হচ্ছে এমন একটি ‘হায়ার-পারচেজ’ কোম্পানি যা অতিরিক্ত দাম রাখার কারণে এবং ৯০ শতাংশেরও বেশি সুদহারের কারণে সমালোচিত হয়েছিল।

এর ফলে তাদের পণ্য সরাসরি কিনলে যে দাম হতো তার দ্বিগুণেরও বেশি ব্যয়সাপেক্ষ হতে পারে।

এই বিনিয়োগ করা হয়েছিল ১০ বছর আগে, এবং তখন তার মূল্য ছিল পাঁচ লক্ষ ডলারের সামান্য কম।

রাজকীয় কর্মকর্তারা বলছেন, এই অর্থ বিনিয়োগের সিদ্ধান্তের সাথে রানি সংশ্লিষ্ট ছিলেন না।

আরো উল্লেখযোগ্য যাদের নাম এসেছে
উইলবার রস ছাড়াও ট্রাম্পের মন্ত্রিসভার সদস্য, অর্থদাতা ও মিত্র ডজনখানেক ব্যক্তির নাম এসব নথিতে উঠে এসেছে বলে আইসিজের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে।

এর বাইরে উল্লেখযোগ্যদের মধ্যে কানাডার প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডোর এক ঘনিষ্ঠজনের অফশোর কোম্পানিতে লেনদেনে সম্পৃক্ততার তথ্য উঠে এসেছে। স্টেফেন ব্রনফম্যান নামের ওই ব্যক্তি ট্রুডোর দল লিবারেল পার্টির প্রধান তহবিল সংগ্রাহক।

এ ঘটনা কর ফাঁকি ঠেকাতে অফশোর বিনিয়োগ বন্ধের পক্ষে সোচ্চার ট্রুডোর জন্য লজ্জাজনক পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে।

যুক্তরাজ্যের ক্ষমতাসীন কনজারভেটিভ পার্টির সাবেক ডেপুটি চেয়ারম্যান ও অন্যতম অর্থদাতা লর্ড অ্যাশক্রফটের অফশোর বিনিয়োগের তথ্য বেরিয়ে এসেছে।

অ্যাপল, নাইকি ও উবারসহ প্রায় ১০০ বহুজাতিক কোম্পানির কর পরিকল্পনার বিস্তারিত উঠে এসেছে ফাঁস হওয়া এসব নথিতে।

Please follow and like us:
Facebook Comments