সৌদিতে ঐকমত্যের শাসনের অবসান রাজপরিবার নয় চলছে সুলতানি ক্ষমতা

ক্রাইমবার্তা আন্তজার্তিক রিপোর্ট:ঐকমত্যের শাসনের কয়েক দশকের পুরনো পদ্ধতি বাতিল করে সৌদি ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান বর্তমানে রাজনৈতিক ও আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতার ঝুঁকি নিচ্ছেন।

২০১৫ সালে সিংহাসনে আরোহণের পর বর্তমান সৌদি বাদশাহ সালমান বিন আবদুল আজিজ আল সৌদের তার উত্তরসূরি ভাইপো সাবেক ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন নায়েফকে সরিয়ে দিয়ে তার স্থলে নিজপুত্র মোহাম্মদকে অভিষিক্ত করেন।

ক্রাউন প্রিন্স হিসেবে দায়িত্ব নেয়ার পরপরই ৩২ বছর বয়সী মোহাম্মদ নিজের ক্ষমতা আরও পাকাপোক্ত করার অভিযানে নেমেছেন।

এক্ষেত্রে তিনি সৌদি রাজপরিবারের অভ্যন্তরের অন্য সদস্যদেরকে এবং একই সঙ্গে দেশের ধর্মীয় ব্যক্তিদের নিজেরকে প্রতিদ্বন্দ্বী করে তুলেছেন।

চলতি বছরের সেপ্টেম্বরে প্রখ্যাত ইসলাম প্রচারক সালমান আল-আওদাহ ও আওয়াদ আল-কারনিসহ কয়েকডজন ধর্মীয় ব্যক্তিত্বকে গ্রেফতার করে সৌদি পুলিশ। তাদের সবাইকে কারাগারে বন্দি করে রাখা হয়েছে।

মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থার সাবেক কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তাসহ সৌদিবিষয়ক বিশেষজ্ঞদের বরাত দিয়ে এক প্রতিবেদনে আলজাজিরা এ সব কথা জানিয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, সিংহাসনের বর্তমান উত্তরাধিকারী মোহাম্মদের সবচেয়ে বেশি উচ্চাভিলাষী পদক্ষেপটি আসে শনিবার। বেশ কয়েকজন বয়োজ্যেষ্ঠ মন্ত্রীকে বরখাস্ত করেন তিনি।

অন্যদিকে দুর্নীতির অভিযোগে দেশের সবচেয়ে ধনী ব্যবসায়ীদের বেশ কয়েকজনকে গ্রেফতার করা হয়। এদের মধ্যে রয়েছেন তার চাচাতো ভাই ও বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ ধনী আল-ওয়ালিদ বিন তালাল, রাজপরিবারের অন্তত ১৭ জন প্রিন্স, ৪ জন শীর্ষ মন্ত্রী এবং কয়েকজন সাবেক মন্ত্রী।

মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম বৃহত্তম মিডিয়া কোম্পানি মিডিলইস্ট ব্রডকাস্টিং সেন্টারের (এমবিসি) চেয়ারম্যান ও রিয়েল এস্টেট ব্যবসায়ী ওয়ালিদ আল- ইবরাহিম এবং সৌদি বিনলাদেন গ্রুপের চেয়ারম্যান বকর বিন লাদেনকেও গ্রেফতার করা হয়।

এদিকে সাবেক ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন নায়েফ এখন কোথায় কি অবস্থায় রয়েছেন, তা নিয়ে জনমনে সংশয় তৈরি হয়েছে। চলতি বছরের জুন থেকে তাকে প্রকাশ্যে দেখা যায়নি। গুজব রয়েছে, তাকে গৃহবন্দি করে রাখা হয়েছে।

সৌদি রাজপরিবারের জায়গায় এখন দেশটি ‘একজন ব্যক্তির শাসন’ চালু হয়েছে। ডারহাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ক্রিসটোফার ডেভিডসনের মতে, সৌদি আরবে পারিবারিক শাসন যে এখন একনায়কতান্ত্রিক শাসনের দিকে যাচ্ছে তা দেশটির দীর্ঘস্থায়ী এলিট শ্রেণীকে টার্গেট বানানো সেই পরিবর্তনকে সামনে আনছে।

তিনি বলেন, দুর্নীতির অভিযোগ তুলে মোহাম্মদ বিন সালমান ও আবুধাবিতে তার মিত্রদের ‘রাঘববোয়াল’দের পিছু ধাওয়া মোহাম্মদের নতুন প্রতিষ্ঠিত সুলতানি ক্ষমতারই ইঙ্গিত দিচ্ছে। প্রভাবশালী প্রিন্সই হোক, মিডিয়া মোগলই হোক বা রিয়েল এস্টেট ব্যবসায়ীই হোক দেশের ধনী ব্যক্তিদের এই গণগ্রেফতারের মধ্য দিয়ে তিনি আসলে দেখাতে চাচ্ছেন যে, কেউই তার নিয়ন্ত্রণের বাইরে নয় এবং তিনিই এখন ‘এক ব্যক্তি নির্ভর’ সেই অধিক কর্তৃত্বপরায়ণ শাসনের শীর্ষে অবস্থান করছেন। ফলে চলতি বছরের শুরু থেকে কিছু ক্ষেত্রে গত প্রায় এক শতাব্দীকাল ধরে চলে আসা রাজপরিবারের পুরনো ঐকমত্যভিত্তিক শাসনের পতন হতে শুরু করে।

বিশ্লেষকেরা বলছেন, মোহাম্মদ বিন সালমানের চলতি সপ্তাহের এ অভিযান ব্যাপক বিস্তৃত আল সৌদ পরিবারের সদস্যদেরকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলতে পারে।

আর এটা এমন একটা সময়ে ঘটছে, যখন দেশটিতে তেলের দাম কমে যাওয়ার মাঝে দেশের অর্থনীতিতে ভারসাম্য আনার চেষ্টা চলছে।

সিআইএ’র সাবেক কর্মকর্তা ও ব্রুকিংস ইন্টেলিজেন্স প্রজেক্টের পরিচালক ব্রুস রিডেল ডেভিডসনের সঙ্গে একমত প্রকাশ করে সৌদি আরবের সাম্প্রতিক গণগ্রেফতারকে ‘নজিরবিহীন’ বলে বর্ণনা করেছেন।

তিনি বলেন, সৌদি রাজপরিবারের রাজনীতি ঐতিহ্যগতভাবে ঐকমত্যভিত্তিক যা পরিবারের সদস্যদের প্রতি সমান মর্যাদা ও সম্মানের সুরক্ষার প্রতি বেশ গুরুত্ব দিয়ে থাকে।’

তিনি আরও বলেন, সৌদির সেই ঐতিহ্যগত ঐকমত্যের শাসনে ভাঙন দেশটির অভ্যন্তরে বিপর্যয় ডেকে আনবে। এক্ষেত্রে পরিবারের মধ্যে অসন্তুষ্টি ও ক্ষোভ সৃষ্টি হবে এবং রাজ্য একটা অস্থিতিশীলতার দিকে এগুবে।’

Please follow and like us:
Facebook Comments