শেখ হাসিনার অধীনে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন হতে পারে না

# দলীয় সরকারের অধীনে বিএনপি নির্বাচনে যাবে না
# ম্যাজিস্ট্রেসি পাওয়ার দিয়ে সেনা মোতায়েন করতে হবে
# নির্বাচনে কোনো ইভিএম চলবে না
# বিএনপি রাজনীতিতে গুণগত পরিবর্তন আনতে চায়
# সকল দলকে নিয়ে বিএনপি জাতীয় ঐক্য গড়ে তুলবে
# ক্ষমতাসীন আ’লীগ হাজার হাজার কোটি টাকা লুটপাট করেছে
# আ’লীগ আবারো ক্ষমতায় থাকতে জোর করে নির্বাচন করতে চায়
# বন্দুক-গুলী নয়, আমাদের শক্তি জনগণ
মোহাম্মদ জাফর ইকবাল ও ইবরাহীম খলিল : আবারো নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে জাতীয় নির্বাচনের দাবি জানিয়ে বিএনপি চেয়ারপার্সন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া বলেছেন, শেখ হাসিনার অধীনে কোনো নির্বাচন হবে না। হাসিনার অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন হবে না, হতে পারে না। নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন দিতে হবে। যেখানে জনগণ নির্বিঘেœ তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন। প্রধান নির্বাচন কমিশনারসহ কমিশনারদের উদ্দেশে তিনি বলেন, দেশে একটি সুষ্ঠু নির্বাচন করার দায়িত্ব আপনাদের। আপনারা নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচনের কথা বলুন। নির্বাচনে সেনাবাহিনী মোতায়েনের দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, শুধু মোতায়েন করলেই হবে না, তাদের ম্যাজিস্ট্রেসি পাওয়ারও দিতে হবে। ইলেক্ট্রনিক ভোটিং মেশিনে আপত্তি জানিয়ে বিএনপি চেয়ারপার্সন বলেন, কোনো ইভিএম চলবে না। ইভিএম বন্ধ করতে হবে। ইভিএম আমরা চাই না। তিনি বলেন, বিএনপি কোনো সংঘাতে যেতে চায় না। সুষ্ঠু রাজনীতি করার মাধ্যমে রাজনীতিতে গুণগত পরিবর্তন আনতে চায়। এজন্য সকল দলকে নিয়ে বিএনপি জাতীয় ঐক্য গড়ে তুলবে। জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস উপলক্ষে গতকাল রোববার রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বিএনপি আয়োজিত মহাসমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। এসময় তিনি সরকার গঠন করলে কিভাবে দেশ পরিচালনা করবেন সে বিষয়েও দীর্ঘ আলোচনা করেন।
গত বছরের ১ মে শ্রমিক সমাবেশে বক্তৃতার পর গতকাল প্রথম সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে জনসভা করলেন খালেদা জিয়া। এই সমাবেশে জনসমাগম ঠেকাতে ঢাকার আশপাশের জেলাগুলো থেকে সরকার পরিকল্পিতভাবে বাস চলাচল বন্ধ করে দেয় বলে অভিযোগ করেন বিএনপি নেতারা। সমাবেশে জনসমাগমে পথে পথে বাধা দেয়ার অভিযোগ তুলে তার নিন্দা জানান খালেদা জিয়া। বেলা ২টায় বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সভাপতিত্বে জনসভা শুরুর এক ঘণ্টা পর খালেদা জিয়া সমাবেশস্থলে পৌঁছান। এসময় চার দিক থেকে তার নামে স্লোগান ওঠে। তিনি হাত উঁচিয়ে নেতা-কর্মীদের শুভেচ্ছার জবাব দেন। ৭ নবেম্বর ‘বিপ্লব ও জাতীয় সংহতি দিবস’ উপলক্ষে এই সমাবেশ ডাকা হলেও এতে বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি গুরুত্ব পায়। বিকেল ৪টা ৮ মিনিটে শুরু করে ৫টা ১০ মিনিটে বক্তব্য শেষ করেন তিনি। মঞ্চের পেছনে লাগানো ব্যানারে লেখা ছিল- ‘৭ নবেম্বর জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস উপলক্ষে বহুদলীয় গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার ও অবাধ, সুষ্ঠু নির্বাচনের দাবিতে জনসভা’। জনসভার জন্য উদ্যানে ৬০ ফুট লম্বা ও ৩০ ফুট প্রশস্ত মঞ্চ নির্মাণ করে বিএনপি। মঞ্চের চারপাশে বসানো হয় সিসি টিভি ক্যামেরা। মঞ্চের সামনে ৩০ ফুট জায়গায় বেষ্টনি দেয়া হয়। পুরো জনসভা সুশৃঙ্খল রাখতে যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল, ছাত্রদলের দুই হাজারের বেশি নেতাকর্মী নিয়ে স্বেচ্ছাসেবক টিম গঠন করা হয়েছিল। জনসভা ঘিরে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের আশ-পাশের এলাকা সাজানো ছিল নানা রঙের ব্যানার-ফেস্টুনে। এসব ডিজিটাল ব্যানারে ছিল জিয়াউর রহমান, খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের ছবি। মহাসচিব মির্জা ফখরুল এই জনসভার পুরো কার্যক্রম সমন্বয় করেন। তাকে সহযোগিতা করেন দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল্লাহ আল নোমান, জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী, যুগ্ম মহাসচিব হাবিব উন নবী খান সোহেল। সমাবেশে বিএনপির সিনিয়র নেতারা বক্তব্য রাখেন।
দেড় বছর পর ঢাকায় প্রথম জনসভায় এসে বিচার বিভাগের বিষয়ে খালেদা জিয়া বলেন, দেশে বিচার বলতে কোনো কিছু নেই। বিচার ব্যবস্থাকে সরকার নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে। প্রধান বিচারপতিকে (সুরেন্দ্র কুমার সিনহা) তার পদ থেকে সরে যেতে বাধ্য করা হয়েছে। সত্য কথা বলায় তাকে বিদায় নিতে হলো। তিনি বলেন, প্রধান বিচারপতি ছুটি শেষে দেশে আসতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তাকে সরকারের পক্ষ থেকে নিরাপত্তাসহ সার্বিক সহায়তা দেয়া হয়নি। জোর করে তাকে পদত্যাগে বাধ্য করা হয়েছে। বিদেশে সরকারের এজেন্সির লোক পাঠিয়ে তাকে পদত্যাগে বাধ্য করা হয়েছে। এ কারণে তিনি দেশে আসতে পারেননি। এর আগে তাকে অসুস্থ বানিয়ে জোর করে বিদেশে পাঠানো হয়। তিনি বলেন, প্রধান বিচারপতি বলেছিলেন এই সরকার বিচার বিভাগকে নিয়ন্ত্রণে নেয়ার চেষ্টা করছে। এই সত্য কথা বলায় তাকে বিদায় নিতে হয়েছে।
আওয়ামী লীগ নেতাদের বিরুদ্ধে অর্থপাচারের অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, গত ১০ বছরে দেশ থেকে সাড়ে ৪ লাখ কোটি টাকা পাচার হয়েছে। আওয়ামী লীগ যেহেতু ক্ষমতায়, সেহেতু তারাই এই টাকা পাচার করেছে। ২০১৫ সালে সুইস ব্যাংকে ৫ হাজার কোটি টাকা জমা পড়েছে। জনগণ জানে, গত ১০ বছর কারা ক্ষমতায় আছে। তারাই এই টাকা পাচার করেছে। তিনি বলেন, ব্যাংক থেকে চুরি হয়েছে ৩০ হাজার কোটি টাকা। কারা এসব করেছে তা মানুষ জানে। এই দেশের মানুষ মরলো না বাঁচলো এই নিয়ে ক্ষমতাসীনদের কোনো মাথা ব্যথা নেই। কিন্তু আমরা চাই, দেশে একটি জবাবদিহিমূলক সরকার থাকুক। যারা জনগণের ভোটে নির্বাচিত হবে।
সুষ্ঠু ভোট হলে বিএনপি জয়লাভ করবে মন্তব্য করে খালেদা জিয়া বলেন, জনগণ ভোট দেযার সুযোগ পেলে ধানের শীষে ভোট দিয়ে দেখিয়ে দিবে কাদের জনপ্রিয়তা বেশী। তারা প্রমাণ করবে, শহীদ জিয়া এখনো মানুষের মনের মনিকোটায় রয়েছেন। আমরা দেশের জন্য মানুষের জন্য কাজ করতে চাই। রাজনীতিতে গুণগত পরিবর্তন আনতে চাই। যেখানে একটি শক্তিশালী কার্যকর বিরোধী দল থাকবে। যেখানে সরকার সবার সাথে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নিবে। যেখানে সরকারের জবাবদিহিতা থাকবে। সবার সমালোচনা করার সযোগ থাকবে। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ চায় জোর করে আবারো ক্ষমতায় থাকতে। কিন্তু জনগণ সেটি হতে দিবে না।
তিনি বলেন, আমরা ভিশন ২০৩০ ঘোষণা করেছিলাম। তাতে অনেক কিছুই আছে। যাতে ভোটের অধিকার, ন্যায় বিচার, কর্মসংস্থান, বেকারত্বের অবসান, শিক্ষা কার্যক্রম, বেতন বাড়ানো, কৃষিঋণ মওকুফ করাসহ সব বিষয় প্রাধান্য পেয়েছে। তিনি বলেন, আমাকে দেশের বাইরে পাঠিয়ে দিতে চেয়েছিল। কিন্তু পারেনি। আমি বলেছি, দেশেই আমার সব কিছু। বিদেশে আমার কোনো ঠিকানা নেই। এই জন্য তারা আমার দুই ছেলেকে পঙ্গু করে দিয়েছে। একজনকে আমি চিরকালের জন্য হারিয়েছি। এসময় তিনি কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন। আরেক ছেলে পঙ্গুত্ব বরণ করে দেশের বাইরে অবস্থান করছে। তিনি বলেন, এবার আমি চিকিৎসার জন্য বাইরে গিয়েছিলাম। সমালোচনকরা বলেছে, আমি আর দেশে আসবো না। আমি তাদের আবারো বলতে চাই, বিদেশে আমার কোনো ঠিকানা নেই। দেশই আমার সব, জনগণই আমার সব। আমি দীর্ঘ একবছর জেল খেটেছি। তারপরও দেশের বাইরে যাইনি। বন্দুক-গুলী আমাদের শক্তি নয়, আমাদের শক্তি হচ্ছে জনগণ। ইনশাআল্লাহ জয় আমাদের হবেই।
দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির সমালোচনা করে খালেদা জিয়া বলেন, ক্ষমতায় আসার আগে ১০ টাকা কেজি চাল খাওয়াতে চেয়েছিলেন শেখ হাসিনা। আমি জানতে চাই- ১০ টাকা কেজি চাল খাওয়ানোর কথা বলে এখন কেন ৭০ টাকায় জনগণকে চাল খাওয়ানো হচ্ছে। এছাড়া অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় সব কিছুর দামই কয়েকগুণ বেড়ে গেছে। তিনি বলেন, কৃষকরা এই সরকারের কাছে জিম্মী। তারা বিনামূল্যে সার দেয়ার কথা বলেছিল। অথচ এখন বিএনপি আমলের চাইতে ৫ গুণ বেশী দামে সারসহ কৃষিপণ্য কিনতে হচ্ছে। এই সরকার কৃষকদের মারার ব্যবস্থা করেছে। তিনি বলেন, এই সরকার ঘরে ঘরে চাকরি দেয়ার কথা বলেছে। এসময় উপস্থিত জনতার উদ্দেশ্যে জানতে চান, আপনারা কি চাকরি পেয়েছেন? জবাব আসে না। তিনি বলেন, চাকরিতো দেয়ইনি উল্টো ঘরে ঘরে বেকার সৃষ্টি করেছে। তারা উন্নয়নের নামে লুটপাট করছে।
গুম-খুন বন্ধের আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, আমাদের ছেলেদের (নেতাকর্মী) নামে মিথ্যা মামলা দেয়া হয়। তাদেরকে ধরে নিয়ে গুলী করে হত্যা করা হয়। আওয়ামী লীগ নেতাদের বক্তব্যের সমালোচনা করে তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ বলছে- বিএনপি ক্ষমতায় আসলে মানুষ হত্যা করবে। আমরা মানুষ হত্যা করি না, মানুষ হত্যা করে আওয়ামী লীগ। এটা আওয়ামী লীগের কাজ, বিএনপির নয়।
খালেদা জিয়া বলেন, মানুষ পরিবর্তন চায়। আমরা আগেই বলেছি, পরিবর্তন হতে হবে নির্বাচনে। পরিবর্তন হতে হবে ভোটের মাধ্যমে। একটি নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচনের মাধ্যমে পরিবর্তন হতে হবে। মানুষকে ভোট দেয়ার সুযোগ  তৈরি করে দিতে হবে। সরকারের উদ্দেশে তিনি বলেন, নিরপেক্ষ নির্বাচন দিয়ে দেশের মানুষ কী চায় সেইটা যাচাই করুন। তিনি বলেন, ২০১৪ সালে কোনো নির্বাচন হয় নাই। যেখানে ১৫৪ জনই বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছে। এছাড়া অন্য যারা নির্বাচিত হয়েছেন তারাও নিজেদের ভোটটি দিতে পেরেছেন বলে মনে হয় না। এরাও ৫ শতাংশ ভোট পায় নাই। এ সংসদ অবৈধ, এ সরকার অবৈধ। কীভাবে বলবে জনগণের সরকার?-যোগ করেন তিনি।
বিএনপি চেয়ারপার্সন বলেন, চুরি করে জেতার মধ্যে আনন্দ নেই। যারা জনগণকে পাশ কাটিয়ে জিততে চায়, তারা জনগণকে ভয় পায়। তিনি বলেন, জনগণকে নিয়ে আমাদের রাজনীতি। তিনি বলেন, জনগণকে তাদের ভোটের অধিকার ফিরিয়ে দিতে হবে। যা এই সরকার জোর করে কেড়ে নিয়েছে। এজন্য প্রয়োজন নির্দলীয়-নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন। তিনি বলেন, হাসিনার অধীনে স্থানীয় সরকার নির্বাচনও অসম্ভব। তারা যেভাবে ভোট ডাকাতি করেছে, কেন্দ্র দখল করেছে তা ছিল নজিরবিহীন। অনেকেই ভোট বয়কট করেছে।
সরকারি কর্মকর্তাদের আশ্বস্ত করে সাবেক এই প্রধানমন্ত্রী বলেন, ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে সরকারি কর্মকর্তাদের চাকরিচ্যুত করা হবে। আমি স্পষ্ট ভাষায় বলতে চাই, এসব (চাকরিচ্যুত করা) কাজ বিএনপির নয়। সরকারি কর্মকর্তাদের দক্ষতা দেখা হবে। কারো চাকরি খাওয়া হবে না। প্রত্যেকের পদোন্নতি হবে তাদের মেধা ও দক্ষতার ভিত্তিতে।
এসময় নেতাকর্মীদের উদ্দেশে বিএনপি চেয়ারপার্সন বলেন, সমাবেশ যাতে সফল না হয় এজন্য অনেক বাধা দেয়া হয়েছে। এমনকি আমিও যাতে আপনাদের সামনে পৌঁছাতে না পারি এজন্য গুলশানে বাস দিয়ে রাস্তা আটকে রাখা হয়। এই হলো এদের (সরকার) অবস্থা। এরা যে কত ছোট মনের তা প্রমাণ করে দিয়েছে। এতো ছোট মন নিয়ে রাজনীতি করা যায় না। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ সরকার জনগণকে সবচেয়ে বেশি ভয় পায়। এ জন্য বিএনপি, যুবদল ও ছাত্রদলের ছেলেদের প্রতিনিয়ত সরকার জেলে পুড়ছে।
মিয়ানমার সরকারের হাতে হত্যা-নির্যাতনের শিকার হয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গাদেরকে সরকার সঠিকভাবে সেবা দিতে পারেনি মন্তব্য করে খালেদা জিয়া বলেন, নির্যাতিত রোহিঙ্গাদের যেভাবে সেবা দেয়ার দরকার ছিল, সরকার সেভাবে সেবা দিতে পারেনি। যারা তাদের সহায়তা দিতে গিয়েছিল তাদেরও বাধা দেয়া হয়েছে। তিনি বলেন, বিএনপির পক্ষ থেকে আমি রোহিঙ্গাদের মাঝে ত্রাণ গিতে গিয়েছিলাম। যাওয়ার পথে ফেনীতে সরকারি দলের সন্ত্রাসীরা আমার গাড়িবহরে হামলা করেছে। হামলায় সাংবাদিকসহ বেশ কয়েকজন নেতাকর্মী গুরুতর আহত হয়েছে। এছাড়া আসার সময়ও হামলা চালানো হয়েছে। তিনি বলেন, হামলা করেছে সরকারি দলের ক্যাডাররা অথচ বিএনপি নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা দিয়ে গ্রেফতার করা হয়েছে। এখনো গ্রেফতার করা হচ্ছে।
রোহিঙ্গাদের সসম্মানে তাদের দেশে ফিরিয়ে নিতে হবে মন্তব্য করে খালেদা জিয়া বলেন, এটা শুধু অবৈধ ভোটারবিহীন সরকারের সমস্যা না। এটা জাতীয় সমস্যা। আমরা মানবিক কারণে তাদের আশ্রয় দিয়েছি। এটি বেশী দিন সম্ভব নয়। আমি বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা ও বড় দেশ বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরারাজ্য, চীন, রাশিয়া, ভারতসহ অন্য দেশগুলোকে বলব, আপনারা মিয়ানমারের উপর চাপ প্রয়োগহ করুন। যাতে করে তারা রোহিঙ্গাদের তাদের দেশে ফিরিয়ে নেয়। শুধু ফিরিয়ে নিলেই হবে না। তাদের নাগরিকত্ব প্রদানসহ মৌলিক অধিকারগুলো দিতে হবে। যাতে করে তারা নির্ভয়ে সেখানে বসবাস করতে পারে।
খালেদা জিয়া বলেন, তারা কথায় কথায় উন্নয়নের কথা বলে। কিন্তু তারা উন্নয়নের নামে লুটপাট করছে। বিদেশে হাজার হাজার কোটি টাকা পাচার করছে। সুইস ব্যাংকে তারা টাকা জমাচ্ছে। তিনি বলেন, ইউরোপ-আমেরিকায় রাস্তা নির্মাণে যে খরচ হয় তার চেয়েও তিন-চারগুণ খরচ করে রাস্তা নির্মাণ করা হচ্ছে। তাও সেগুলো ঠিকভাবে হচ্ছে না, ভেঙে ফেলতে হচ্ছে। তিনি বলেন, কুইক রেন্টাল পাওয়ার প্লানকে দায় মুক্তি দেয়া হয়েছে। সব পুরনো জিনিস বিদেশ থেকে আনা হয়েছে। এগুলো একবার চলে, আবার বন্ধ হয়ে যায়।
বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হলেও মানুষ বিদ্যুৎ পাচ্ছে না। প্রতি পদে পদে ধোঁকাবাজি। বিনা টেন্ডারে দলীয় লোকদের দিয়ে কুইক রেন্টালের ব্যবস্থা করা হয়েছে। তারপরও মানুষ বিদ্যুৎ পাচ্ছে না। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে লেখাপড়া নেই উল্লেখ করে খালেদা জিয়া বলেন, ছাত্রলীগ-যুবলীগ সব নিয়ন্ত্রণ করছে। শিক্ষকদের গায়ে হাত তুলছে। নারীদের নির্যাতন করছে। আগে গণঅত্যাচার দেখিনি। নতুন নতুন জিনিস আমদানি করছে তারা। এখন বাসে এবং ট্রেনে নারীদের নির্যাতন করা হচ্ছে।
তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রসঙ্গে খালেদা জিয়া বলেন, তত্ত্বাবধায়কের দাবি আওয়ামী লীগ ও জামায়াতে ইসলামীর। এ দাবিতে তারা ১৭৩ দিন হরতাল করেছিল। রাস্তায় অরাজকতা সৃষ্টি করেছিল। তত্ত্বাবধায়ক দাবির জন্য সমুদ্রবন্দর দিনের পর দিন বন্ধ রেখেছিল। তিনি বলেন, আ’লীগ গান পাউডার দিয়ে জীবন্ত মানুষকে হত্যা করেছে।
দেশ এখন অচল উল্লেখ করে তিনি বলেন, রূপনগরে সরকারি অফিস মাত্র দুই ঘণ্টা চলে বলে পত্রিকায় খবর এসেছে। যদি এটি সঠিক হয় তাহলে দেশ চলবে কিভাবে। নির্বাচন হলে সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। আওয়ামী লীগ গাড়িতে আগুন দিয়ে মানুষ হত্যা করে এ দাবি করে বিএনপি নেত্রী বলেন, বাসে বাসে আগুন দিয়ে মিথ্যা মামলা দায়ের করে। আমরা মানুষ হত্যা করব না। আমরা আপনাদের শুদ্ধ হওয়ার সুযোগ দিতে চাই।
আওয়ামী লীগ সরকার অঘোষিতভাবে বাকশালী শাসন কায়েম করতে চায়-এমন অভিযোগ করে খালেদা জিয়া বলেন, আওয়ামী লীগ গণতন্ত্রকে ভয় পায়, এরা মানুষকে ভয় পায়, জনগণকে ভয় পায় বলে যেমন একদলীয় বাকশাল কায়েম করেছিল, তেমনি একদলীয় শাসন কায়েম করতে চায়। তারা জনগণের কথা বলার অধিকার কেড়ে নিয়েছে। বিএনপি ক্ষমতায় এলে দেশে রাজনৈতিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে সব ধরনের ছাড় দেবে উল্লেখ করে দলের চেয়ারপার্সন বলেন, আমি বলেছি আমি তাদের ক্ষমা করে দেব। কিন্তু জনগণ জানে, এরা কত অবিচার করেছে। জনগণ সেটা মানতে রাজি নয়। তারপরও বলেছি। আমরা দেশে সুষ্ঠু এবং সুন্দর একটা রাজনৈতিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে চাই। কেন না আমাদের রাজনীতি বহুদলীয় ঐক্যের রাজনীতি।
সভাপতির বক্তব্যে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, খালেদা জিয়া ছাড়া আগামীতে দেশে কোনও নির্বাচন হবে না। তিনি বলেন, শেখ হাসিনার অধীনেও দেশে কোনও নির্বাচন হবে না, হতে দেয়া হবে না। বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়াকে মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানি করা হচ্ছে অভিযোগ করে মির্জা ফখরুল বলেন, জনগণ এর বিচার করবে। যারা দেশের টাকা বিদেশে পাচার করছে তাদেরকেও একদিন জনতার আদালতে দাঁড় করাবে এদেশের জনগণ।
খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, আগামী ২০১৮ সাল হবে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপির বিজয়ের মাস। শেখ হাসিনার নেতৃত্ব আর কোনও নির্বাচন হবে না। খালেদা জিয়ার রূপরেখা অনুযায়ী নির্বাচন হবে।
সমাবেশে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমেদ বলেন, দেশের প্রধান একটি রাজনৈতিক দলকে ২৩টি শর্তে সমাবেশ করার অনুমতি দেয়া হয়েছে। এতে প্রমাণ হয় দেশে গণতন্ত্র নেই। প্রধান বিচারপতি দেশের গণতন্ত্র এবং বিচার বিভাগ নিয়ে কথা বলায় সরকারের আক্রোশে পড়েছেন। তাকে জোর করে পদত্যাগ করানো হয়েছে। সরকার নিজের হাতে বিচার বিভাগের স্বাধীনতাকে ধুলোয় মিশিয়ে দিয়েছে উল্লেখ করে মওদুদ বলেন, জনগণ আগামীতে নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে খালেদা জিয়াকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দেখতে চায়।
ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার বলেন, আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে গুম খুন গণগ্রেফতার করছে। এদের উৎখাত করে দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করবো।
স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস বলেন, যারা খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানকে বাইরে রেখে নির্বাচন করার চিন্তা করছেন, তাদের বলবো সেই নির্বাচন এ দেশে হতে দেয়া হবে না। যারা বলে বিএনপির জনসমর্থন আছে কিন্তু সংগঠন নেই তাদের বলবো আজকের জনসভা দেখেন। বাধা দেওয়ার পরও কিভাবে মানুষ জনসভায় অংশ নিয়েছে। আওয়ামী লীগকে উদ্দেশ করে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস বলেন, যানবাহন বন্ধ, গুলী করেও সমাবেশের জনস্রোত ঠেকাতে পারেননি। দেখে যান।
মির্জা আব্বাস বলেন, বারবার প্রমাণ হয়েছে বিএনপির প্রতি জনগণের আস্থা রয়েছে। তাই সব বাধা পেরিয়ে আজকের জনসভায় এই জনস্রোত। তিনি বলেন, আজকের সমাবেশ ঠেকানোর জন্য বাস, লঞ্চসহ যানবাহন বন্ধ করে দিয়েছে সরকার। তবুও এই জনস্রোত। নির্বাচন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানকে বাদ দিয়ে কোনভাবে নির্বাচন করা সম্ভব নয়।
স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেন, শেখ হাসিনার আদালতের বাইরে আরেকটি আদালত আছে তার নাম জনতার আদালত। সেই জনগণকে সঙ্গে নিয়ে গণতন্ত্র উদ্ধার করবেন খালেদা জিয়া।
ড. মঈন খান বলেন, দেশ এখন ক্রান্তি লগ্নে। বেগম জিয়ার নেতৃত্বে দেশে আবার বহুদলীয় গণতন্ত্র উদ্ধার করবো।
গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে আবারো আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেন বিএনপির আরেক স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান। আজ জনতার ঢেউ উঠেছে, জোয়ার উঠেছে থামানো যাবে? মাঠে উপস্থিত নেতাকর্মীদের উদ্দেশে প্রশ্ন ছুঁড়ে দেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। মাঠ থেকে উত্তর আসে না………। ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল্লাহ আল নোমান বলেন ১৯৭৫ সালের ৭ নবেম্বর জিয়াউর রহমান দায়িত্ব না নিলে দেশে গৃহযুদ্ধ শুরু হতো। আজও গণতন্ত্র নিয়ে ষড়যন্ত্র হচ্ছে। এই ষড়যন্ত্র উপড়ে ফেলতে হবে।

Please follow and like us:
Facebook Comments