চাঙা বিএনপিকে নিয়ে দুশ্চিন্তায় আ’লীগ#বিএনপিকে ছাড়া ৫ জানুয়ারির নির্বাচন আজো সরকারের জন্য দেশ-বিদেশে একটি কলঙ্কজনক অধ্যায়#

ক্রাইমবার্তা ডেস্করিপোর্ট:রাজনীতিতে আবারো চাঙা হয়ে ওঠা বিএনপিকে নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। দলটির সাম্প্রতিক কর্মসূচিতে নেতাকর্মীদের সরব উপস্থিতি বেশ ভাবিয়ে তুলেছে সরকারের নীতিনির্ধারকদের। সেজন্য আগামী নির্বাচনকে সামনে রেখে বিএনপির লাগাম টানা হবে নাকি স্বাভাবিক গণতান্ত্রিক কর্মকাণ্ড পালনের সুযোগ দেয়া হবে তা নিয়ে সিদ্ধান্তহীনতায় রয়েছেন সরকারের কর্তাব্যক্তিরা। দল ও সরকারের একাধিক সূত্র এমন তথ্য জানিয়েছে।

সূত্রগুলো জানায়, বিএনপিকে নিয়ে আওয়ামী লীগ ও সরকারে দুই ধরনের মত রয়েছে। দলের কট্টরপন্থী নীতিনির্ধারকদের কেউ কেউ এখনই বিএনপির লাগাম টেনে ধরার পক্ষে। তাদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে বিএনপির কয়েকটি কর্মসূচিতে নেতাকর্মীরা যেভাবে সাড়া দিয়েছেন তা সরকারের জন্য এক রকম অশনিসঙ্কেত। তাদের এভাবে অবাধ রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সুযোগ দেয়া হলে তারা জনগণকে সরকারের বিপক্ষে ক্ষেপিয়ে তুলতে পারে। আগামী নির্বাচনে তা সরকারের জন্য নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। সেজন্য খালেদা জিয়ার গতিবিধি ও দলের কর্মকাণ্ডের ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপের পক্ষে তারা।

অন্য দিকে অপেক্ষাকৃত উদার ও মধ্যমপন্থী নীতিনির্ধারকদের মতে, বিএনপিকে ছাড়া ৫ জানুয়ারির নির্বাচন আজো সরকারের জন্য দেশ-বিদেশে একটি কলঙ্কজনক অধ্যায় হিসেবে রয়ে গেছে। সেজন্য বাংলাদেশের আগামী নির্বাচনে দেশী-বিদেশী পর্যবেক্ষকদের বিশেষ নজর থাকবে। এরই মধ্যে নির্বাচন ইস্যুতে তৎপরতা শুরু করেছে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ভারত ও ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ বিদেশী মহল। আর বিএনপিকে আবারো ঘরে আবদ্ধ রাখলে নির্বাচনকে সামনে রেখে দলের নেতাকর্মীরাও ক্ষোভে ফুঁসে উঠতে পারেন। এতে নির্বাচন-পূর্ব পরিস্থিতি ৫ জানুয়ারির তুলনায় আরো ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে। সেজন্য বিএনপিকে স্বাভাবিক রাজনৈতিক ও গণতান্ত্রিক কর্মকাণ্ড পালনের সুযোগ দেয়ার পক্ষে তারা।

আওয়ামী লীগের একাধিক সূত্র জানায়, দীর্ঘ দিন ধরে সরকারের নানা চাপের মুখে চরম কোণঠাসা অবস্থায় ছিল বিএনপি। হামলা, মামলা, কারাবরণ ও দমন-পীড়নের মুখে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে অন্যতম প্রধান এ রাজনৈতিক দলটি। সরকারের কঠোর নিয়ন্ত্রণের ফলে ঘরেই সীমাবদ্ধ ছিল দলটির রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড। তবে আগামী নির্বাচনকে সামনে সরকারের কিছুটা নমনীয় মনোভাবের কারণে বিএনপি আবারো বেশ চাঙা হয়ে উঠেছে। লন্ডনে তিন মাস অবস্থান শেষে সম্প্রতি দেশে ফিরলে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে বিপুল সংবর্ধনা দেন নেতাকর্মীরা। এরপর বিশেষ আদালতে হাজিরা দিতে গেলে সেখানেও জড়ো হন বিপুল নেতাকর্মী।

সম্প্রতি রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শনে কক্সবাজার যাওয়ার পথে পথে বহরে হামলার পরও নেতাকর্মীদের উপস্থিতি ছিল বেশ লক্ষণীয়। সর্বশেষ জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস উপলক্ষে রোববার রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের সমাবেশে নেতাকর্মীদের উপস্থিতি দেখে কপালে ভাঁজ পড়েছে ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীদের। আশপাশের জেলা থেকে ঢাকামুখী এবং রাজধানীর অভ্যন্তরে এক রকম অঘোষিত পরিবহন ধর্মঘট থাকলেও তা দমাতে পারেনি বিএনপি নেতাকর্মীদের। সব বাধা অতিক্রম করে নেতাকর্মীদের ঢল নেমেছিল সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে। বিষয়টি বেশ ভাবিয়ে তুলছে সরকারের নীতিনির্ধারকদের।

আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন নেতা আলাপকালে বলেন, ‘আসলে খালেদা জিয়া দেশে থাকলেও বিপদ আবার বিদেশে থাকলেও বিপদ। কারণ, বিদেশে থাকলে তার পুত্রের (তারেক রহমান) সাথে বসে একান্তে সরকার ও রাষ্ট্রবিরোধী নানা নীলনকশা প্রণয়ন করেন। সেখানে বিদেশী বিভিন্ন সংস্থার সাথে বসে দেশে ক্যু করার ষড়যন্ত্র করেন। সেজন্য আমরা চেয়েছি খালেদা জিয়া যাতে তাড়াতাড়ি দেশে ফিরে আসেন। এখন দেখছি তাও বিপদ। দেশে ফিরে বড় বড় শোডাউন করে বেড়াচ্ছেন। এ অবস্থায় সরকারের কৌশল কী হবে এখনো পরিষ্কার নয়।’

দায়িত্বশীল সূত্রগুলো বলছে, বিদেশ থেকে ফিরেই খালেদা জিয়া এভাবে মাঠে নেমে পড়বেন, এটা আওয়ামী লীগ আগে থেকে আঁচ করতে পারেনি। আওয়ামী লীগ নেতারা মনে করছেন, সরকার রোহিঙ্গা সঙ্কটসহ নানা পরিস্থিতি মোকাবেলায় কয়েক মাস ধরে ব্যস্ত আছে। এই সুযোগ নেয়ার জন্যই তড়িঘড়ি করে মাঠে নেমেছে বিএনপি। আর এ ক্ষেত্রে রাজনীতির জন্য শুরুতেই রোহিঙ্গাদেরই বেছে নিলেন তিনি। কারণ, রোহিঙ্গাদের ত্রাণ দিতে গেলে সরকার যদি বাধা দেয় তা দেশ-বিদেশে সরকারের ইমেজ ক্ষুণœ করবে। এ ছাড়া আন্তর্জাতিক দাতা দেশগুলোও রোহিঙ্গা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে পারে। সেজন্য খালেদা জিয়ার কক্সবাজার সফরে কোনো ধরনের বাধা দেয়ার সিদ্ধান্ত ছিল না সরকারের। বরং চট্টগ্রাম বিভাগের ডিসি-এসপিরা নির্দেশনা চাইলে সরকারের পক্ষ থেকে সব ধরনের সহযোগিতার নির্দেশ দেয়া হয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও বিরোধী নেত্রীর এ সফর নিয়ে বেশ ইতিবাচক ছিলেন।

এর মাধ্যমে বিএনপি এবং খালেদা জিয়াকে ঘিরে নেতাকর্মীদের আগ্রহ ও অবস্থান পর্যবেক্ষণ করতে চেয়েছিলেন সরকারের নীতিনির্ধারকেরা। তবে অতি উৎসাহী হয়ে সরকারদলীয় এমপিসহ স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাদের নির্দেশে বিভিন্ন পয়েন্টে অবস্থান নেন সরকারদলীয় নেতাকর্মীরা। এ অবস্থায় ফেনীতে খালেদা জিয়ার বহরে হামলার ঘটনাও ঘটে। এতে সাংবাদিক ও নেতাকর্মীসহ অর্ধশতাধিক আহত হন। ক্ষমতাসীন দল এটিকে বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দলের ফল বলে দাবি করলেও বিভিন্ন গণমাধ্যমে হামলাকারী সরকারদলীয় নেতাকর্মীদের ছবিও প্রকাশ পায়। বিষয়টি নিয়ে বেশ ইমেজ সঙ্কটে পড়ে সরকার। ফলে রাজধানীতে বিএনপির সমাবেশে সরাসরি কোনো বাধা দেয়া হয়নি।

অন্য দিকে খালেদা জিয়ার কক্সবাজার সফরকে কেন্দ্র করে তৃণমূল নেতাকর্মীদের নবজাগরণ বিএনপিকে উজ্জীবিত করেছে। এ সফরের পর বেশ ফুরফুরে ও আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠে বিএনপি। যা সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের সমাবেশের মাধ্যমে আরো স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ফলে বিএনপিকে আবারো নানাভাবে চাপে রাখার কৌশলের পক্ষে সরকারের নীতিনির্ধারকদের কেউ কেউ।

আওয়ামী লীগের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কট্টরপন্থী একাধিক কেন্দ্রীয় নেতা জানান, ‘বিএনপি দীর্ঘ দিন ঢাকাসহ সারা দেশে কোথাও জনসভা বা সমাবেশের অনুমতি পায়নি। এমনকি ছোটখাটো কর্মসূচিতেও অনুমতি মিলছিল না দলটির। খুব বেশি প্রকাশ্যে না এসে আত্মগোপনে ছিল নেতাকর্মীরা। সরকারের দমনপীড়ন আর হামলা মামলায় অনেকটাই ঘরোয়া রাজনীতিতে আবদ্ধ ছিল সরকারবিরোধী এ জোট। ফলে তারা খুব বেশি আলোচনায় ছিল না। কিন্তু সম্প্রতি বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া লন্ডন থেকে ঢাকায় ফেরা, কক্সবাজার সফর এবং সর্বশেষ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের জনসভায় এমন শোডাউন বিএনপির মনোবল বাড়িয়ে দিয়েছে। এভাবে বিএনপির প্রতি জনসমর্থন ফুটে উঠছে। সে জন্য বিএনপিকে এখনই নিয়ন্ত্রণ করা উচিত।’

তবে বিএনপির রাজনৈতিক কর্মসূচি পালনে বাধা না দিয়ে বরং সহায়তা করার পক্ষে আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারকদের অনেকেই। সভা-সমাবেশের সুযোগ তৈরি করে দিয়েই দলটির লাগাম টেনে ধরতে চান তারা। তাদের মতে, বিএনপিকে মাঠে নামার সুযোগ দিচ্ছে না, সভা-সমাবেশ করতে দেয়া হয় না বলে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে বিএনপির অভিযোগ ভিত্তিহীন প্রমাণ করা ও বিএনপির ‘ষড়যন্ত্রের রাজনীতি’ থামাতে এই কৌশল নিতে হবে। কারণ, বিএনপি মাঠে থাকলে জ্বালাও-পোড়াও, সঙ্ঘাত-সংঘর্ষ ও জনভোগান্তি সৃষ্টি করবে এবং এর ফলে তাদের কাছ থেকে জনগণ মুখ ফিরিয়ে নেবে। আর জ্বালাও-পোড়াও, সঙ্ঘাত-সংঘর্ষে জড়ালে তাদের নেতাকর্মীদের আইনের আওতায় এনে আবারো দলটির লাগাম টেনে ধরা যাবে। আর ভবিষ্যতে এর সুফল আওয়ামী লীগের ঘরেই যাবে বলে মত তাদের।

সম্পাদকমণ্ডলীর গুরুত্বপূর্ণ এক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘আমাদের কাছে তথ্য আছে তারা ষড়যন্ত্র করার চেষ্টা করছে। তাই রাজনৈতিক কর্মসূচি পালনের মাধ্যমে বিএনপিকে ব্যস্ত রাখা গেলে আর ষড়যন্ত্রের সুযোগ পাবে না।’
তার মতে, বিএনপিকে মাঠে নামার সুযোগ দেয়ার মাধ্যেমে নির্বাচনের আগে বিএনপির শক্তি সামর্থ্য সম্পর্কে অবহিত হওয়া যাবে এবং সে অনুযায়ী আমরাও ‘ম্যাকানিজম’ ঠিক করতে পারব।’

এ ব্যাপারে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছেন, ‘আমরা তাদের কোনো কর্মসূচিতে বাধা দেই না। সরকার যে গণতান্ত্রিক তা কক্সবাজার সফরে সহযোগিতা এবং সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে নির্বিঘেœ সমাবেশের অনুমতি দেয়ার মাধ্যমে প্রমাণ হয়ে গেছে। বিএনপি ইতিবাচক রাজনৈতিক ধারায় ফিরলে আমরা তাদের স্বাগত জানাব।’

দলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফ বলেন, আমরাও চাই বিএনপি তাদের কর্মসূচি পালন করুক। কিন্তু কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে তারা বিভিন্ন সময় অশান্তি সৃষ্টির চেষ্টা করেছে। তাদের অতীত কর্মকাণ্ডে জনগণ শঙ্কিত। তাদের কোনো কর্মসূচিতে সরকার বাধা দেয়নি, বরং নিজেদের অভ্যন্তরীণ কোন্দলের কারণে নিজেরাই কোনো কর্মসূচি পালন করতে পারেনি। এ ছাড়া বিভিন্ন কর্মসূচিতে জ্বালাও-পোড়াওয়ের কারণে প্রশাসনও তাদের প্রতি আস্থা রাখতে পারছিল না। এখন তারা যদি নাশকতার সেই পথ থেকে ফিরে এসে স্বাভাবিক কর্মসূচি পালন করতে চায় সরকারও তাদের সহযোগিতা করবে। তবে রাজপথে আবারো কোনো নাশকতা করতে চাইলে জনগণকে সাথে নিয়ে আওয়ামী লীগ আবারো প্রতিহত করবে।

দলের অন্যতম সাংগঠনিক সম্পাদক খালিদ মাহমুদ চৌধুরী বলেন, আওয়ামী লীগ রাজনৈতিক কর্মসূচি পালন করতে দিচ্ছে না বলে বিএনপি দীর্ঘ দিন ধরে ঢালাও অভিযোগ করে আসছে। কিন্তু বিএনপির অভ্যন্তরীণ বিশৃঙ্খল অবস্থা, কোন্দল এবং সর্বোপরি নিজেদের শক্তি সামর্থ্য নেই বলে কর্মসূচি পালন করতে পারে না। আমরা যে তাদের বাধা দিচ্ছি না, বরং সুযোগ করে দিচ্ছি সেটি জনগণ দেখুক। তারা নিয়মতান্ত্রিক গণতান্ত্রিক ও শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি পালন করলে সরকারের বাধা দেয়ার ইচ্ছা নেই।dailynayadiganta.com

Please follow and like us:
Facebook Comments