উচ্চতর স্কেলে বেতন পাবেন ৩২ হাজার শিক্ষক যোগ্যতাবিহীন ৫ হাজার সহকারী শিক্ষককে প্রমার্জন * গেজেটেড মর্যাদা পেলেন না প্রধান শিক্ষকরা

সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকদের বেতন স্কেল নিয়ে সৃষ্ট জটিলতার অবসান হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণার পৌনে ৪ বছর পর এসব শিক্ষক বর্ধিত হারে বেতন-ভাতা পাবেন। অর্থ মন্ত্রণালয় বুধবার এ সংক্রান্ত সিদ্ধান্তের কথা প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়কে জানিয়েছে। তবে প্রধান শিক্ষকদের ‘গেজেটেড’ মর্যাদা বা সংশ্লিষ্ট বেতন গ্রেড দেয়া হচ্ছে না।
অপরদিকে প্রাথমিক স্কুলগুলোতে কর্মরত প্রায় ৫ হাজার যোগ্যতাবিহীন সহকারী শিক্ষকও ‘প্রমার্জন’ পেয়ে গেছেন। এসব শিক্ষক এসএসসি পাস। এইচএসসি বা পিটিআই পাসের জন্য এদের ৩ বছরের সময়সীমা বেঁধে দেয়া হয়েছিল। পরে এ নিয়ে নানা দেন-দরবার ও টানাপোড়েন চলে। শেষ পর্যন্ত প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সুপারিশের পরিপ্রেক্ষিতে জুনে মন্ত্রিসভা এসব শিক্ষককে প্রমার্জনের বিষয়টি অনুমোদন করে। তারই আলোকে প্রমার্জনের আদেশ রোববার জারি করে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়।
জানতে চাইলে মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব ড. এএফএম মনজুর কাদির যুগান্তরকে বলেন, ‘উন্নীত বেতন স্কেলে বেতন-ভাতা পেতে প্রধান শিক্ষকদের যে সমস্যা চলছিল, তার সমাধান হয়েছে। এ ব্যাপারে অর্থ মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত আমরা পেয়েছি। তবে এটি বাস্তবায়নে মূল কাজটি করবে থানা শিক্ষা ও হিসাবরক্ষণ অফিস। অর্থ মন্ত্রণালয়ের এ সংক্রান্ত চিঠি সংশ্লিষ্ট দফতরগুলোকে অবহিত করা হবে। আর যোগ্যতাবিহীন সহকারী শিক্ষকদের ব্যাপারেও আদেশ জারি হয়েছে।’
সংশ্লিষ্টরা জানান, সারা দেশে বর্তমানে ৬৪ হাজার সরকারি প্রাথমিক স্কুল আছে। এর মধ্যে ২৬ হাজার স্কুলের প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য। বাকি ৩৭ হাজারের মধ্যে ৩২ হাজারই এখন উন্নীত স্কেলে বেতন-ভাতা পাবেন। বাকি ৫ হাজার প্রধান শিক্ষকের চাকরির বয়স ২০১৪ সালের ৯ মার্চ ৮ বছর পূর্ণ হয়নি। অর্থাৎ, ওই দিন পর্যন্ত যারা কোনো টাইম স্কেল পাননি, তারা উন্নীত স্কেল পাবেন না।
এ ব্যাপারে অর্থ মন্ত্রণালয়ের জারি করা আদেশে বলা হয়েছে, সরকারি প্রাথমিক স্কুলের প্রধান শিক্ষক পদের বেতন স্কেল উন্নীতকরণের ফলে উন্নীত বেতন স্কেলে বেতন নির্ধারণের জটিলতা নিরসনের লক্ষ্যে সরকার তিনটি নীতি অনুসরণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তা হচ্ছে- বেতন স্কেল উন্নীত হওয়ার আগে সরাসরি নিয়োগ পাওয়া প্রধান শিক্ষকদের যিনি যে ক’টি টাইম স্কেল পেয়েছেন, সে ক’টি উন্নীত স্কেলের সঙ্গে গণনা করা হবে। এরপর যদি দেখা যায় যে, এর আগে কারও সর্বশেষ প্রাপ্য মূল বেতনের সঙ্গে বেতন স্কেল উন্নীতকরণের তারিখে সরাসরি নির্ণীত সর্বশেষ স্কেলের কোনো ধাপে মিলে গেছে, তাহলে সেই ধাপে বেতন-ভাতা দেয়া হবে। কিন্তু কোনো ধাপে না মিললে বিএসআর প্রথম খণ্ডের ৪২(আই)(২) বিধি অনুসরণে নিন্মধাপে নির্ধারণ করতে হবে। এক্ষেত্রে অবশিষ্ট টাকা পার্সোনাল পে (পিপি) হিসেবে প্রদান করতে হবে। উক্ত পিপি পরবর্তী বার্ষিক বেতন বৃদ্ধিতে সমন্বয়যোগ্য হবে। পদোন্নতি পাওয়া প্রধান শিক্ষকদের ক্ষেত্রেও এ একই নীতি অনুসরণ করা হবে। আদেশে আরও বলা হয়, ওই বেতন নির্ধারণকালে মাঝখানে কোনো বেতন স্কেল বা গ্রেডে বেতন নির্ধারণ করা যাবে না।
২০১৪ সালের ৯ মার্চ জাতীয় শিক্ষা সপ্তাহের অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রাথমিক শিক্ষকদের দ্বিতীয় শ্রেণীর ‘গেজেটেড’ মর্যাদা দেয়ার ঘোষণা দেন। সে অনুযায়ী অন্যান্য মন্ত্রণালয়ের প্রয়োজনীয় অনুমোদন ও পরামর্শ নিয়ে প্রাথমিক এবং গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় প্রধান শিক্ষকদের বেতন স্কেল ৬৪০০ টাকায় (সপ্তম পে-স্কেলে) উন্নীত করে। কিন্তু এটি দ্বিতীয় শ্রেণীর নন-গেজেটেড কর্মকর্তার বেতন স্কেল। মন্ত্রণালয়ের এমন পদক্ষেপে নানা জটিলতা তৈরি হয়। বিশেষ করে পুরনো প্রধান শিক্ষকদের বেতনসীমা কমে যায়। শিক্ষক নেতাদের দাবি, মন্ত্রণালয়ের এ পদক্ষেপ তাদের দাবি এবং প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণাবহির্ভূত। তাদের দাবি ছিল, ‘গেজেটেড’ এবং ‘দ্বিতীয় শ্রেণী’। কিন্তু ‘গেজেটেড’ মর্যাদা দেয়া হয়নি।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির মহা-সম্পাদক মো. আমিনুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, ‘আমাদের দাবি ছিল প্রধান শিক্ষকদের দ্বিতীয় শ্রেণীর গেজেটেড কর্মকর্তার মর্যাদা। কিন্তু দীর্ঘদিনেও যেহেতু কাজের অগ্রগতি হচ্ছে না ও সরকারি মহল থেকেও ছাড় পাওয়া যাচ্ছিল না, তাই তারা এখন যা দিতে চাচ্ছে, তাতেই আমরা আপাতত রাজি হচ্ছি। এটি পাওয়ার পর বেতন গ্রেড পরিবর্তনের আন্দোলনে নামব।’
অতিরিক্ত সচিব ড. কাদির বলেন, নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী প্রধান শিক্ষকদের মধ্যে যারা নতুন যোগদান করেছেন ও প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত তারা এখন ১১ নম্বর গ্রেডে বা সপ্তম পে-স্কেলের হিসাবে ৬৪০০ টাকা স্কেলে বেতনভাতা পাবেন। পুরনোরা পাবেন এ স্কেলের সঙ্গে তাদের অর্জিত সব টাইম স্কেল যোগ করে যে স্কেল দাঁড়ায়। জাতীয়করণকৃত স্কুলের এমপিওভুক্ত প্রধান শিক্ষকরাও টাইম স্কেলসহ বর্ধিত স্কেল পাবেন।
শিক্ষক নেতা আমিনুল ইসলাম বলেন, এ হিসাবে পুরনো শিক্ষকদের কেউ ১১০০০ আবার কেউ ১২০০০ টাকা স্কেলে বেতন পাবেন। এটা সপ্তম পে-স্কেলের হিসাব। ২০১৫ সালের স্কেলে এর পরিমাণ প্রায় দ্বিগুণ হয়ে যাবে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, প্রধান শিক্ষকদের উন্নীত বেতন স্কেল নির্ধারণ নিয়ে জটিলতার অবসান ঘটাতে ২০১৬ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে অর্থ মন্ত্রণালয়ে ফাইল পাঠানো হয়। ফাইলে মহা-হিসাবরক্ষক কর্মকর্তার চাওয়া ব্যাখ্যা ও আপত্তির জবাব সংবলিত সর্বশেষ পত্র যুক্ত করা হয়েছে। ওই ফাইল পাঠানোর পরও কাজের অগ্রগতি না দেখে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সভাপতি মুহা. আ. আউয়াল তালুকদার ও মহা-সম্পাদক মো. আমিনুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল গত বছরের ১৪ ফেব্রুয়ারি অর্থ প্রতিমন্ত্রী এমএ মান্নানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। তাতেও সমস্যার সমাধান হয়নি। এরপর ১০ এপ্রিল অর্থমন্ত্রী এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রীর নেতৃত্বে আন্তঃমন্ত্রণালয় সভা অনুষ্ঠিত হয়। ওই সভার পরিপ্রেক্ষিতে অর্থ মন্ত্রণালয় এ নির্দেশনা জারি করল।যুগান্তর
Please follow and like us:
Facebook Comments