আ’লীগের নগর কমিটি নিয়ে প্রশ্নসমঝোতা বৈঠকে সাঈদ খোকনকে তুলোধোনা

ক্রাইমবার্তা ডেস্করিপোর্ট:ঢাকা মহানগর দক্ষিণ আওয়ামী লীগের কমিটি নিয়ে প্রশ্ন তুলে কেন্দ্রীয় নেতাদের তোপের মুখে পড়েছেন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র মোহাম্মদ সাঈদ খোকন। নগর আওয়ামী লীগের কোন্দল নিরসনে অনুষ্ঠিত এক সমঝোতা বৈঠকে সাম্প্রতিক সময়ে গ্রুপিং ও সংঘর্ষের ঘটনায় তুলোধোনা করা হয় তাকে। বৈঠকে উপস্থিত একাধিক সূত্র বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।

গতকাল রোববার সন্ধ্যায় আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার ধানমন্ডির রাজনৈতিক কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এ বৈঠকে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ডা: দীপু মনি, সাংগঠনিক সম্পাদক মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল, দফতর সম্পাদক ড. আবদুস সোবহান গোলাপ, উপদফতর সম্পাদক ব্যারিস্টার বিপ্লব বড়–য়া, মহানগর দক্ষিণ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শাহে আলম মুরাদ ও মেয়র মোহাম্মদ সাঈদ খোকন উপস্থিত ছিলেন।

সম্প্রতিক সময়ে নগর আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের গ্রুপিং, একাধিকবার হাতাহাতি ও সংঘর্ষের ঘটনার প্রেক্ষাপটে শাহে আলম মুরাদ ও সাঈদ খোকনকে নিয়ে এ সমঝোতা বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে মুরাদ ও খোকনকে একা ডাকা হলেও সিটি করপোরেশনের কয়েকজন কাউন্সিলর কার্যালয়ের সামনে অবস্থান নেন। তবে মুরাদকে হেঁটে একাই কার্যালয়ে প্রবেশ করতে দেখা যায়।
বৈঠক সূত্রগুলো জানায়, বৈঠকের শুরুতে নগর আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মেয়র সাঈদ খোকন কেন্দ্রীয় নেতাদের উদ্দেশে বলেন, মহানগর দক্ষিণ আওয়ামী লীগের এই কমিটি দিয়ে আগামী নির্বাচন মোকাবেলা করা যাবে না। সেখানে যোগ্য লোকদের কমিটিতে রাখা হয়নি। কিছু পকেটের লোককে পদে রাখা হয়েছে। এ সময় লালবাগ, চকবাজারসহ বিভিন্ন থানা কমিটির কয়েকজনের নাম উল্লেখ করে তিনি বলেন, বরিশালের লোকদের প্রাধান্য দেয়া হয়েছে কমিটিতে। আর ঢাকার স্থানীয় নেতাদের কমিটিতে স্থান দেয়া হয়নি। এ ছাড়া কাউন্সিলর নির্বাচনে পরাজিতদের অনেককেও কমিটিতে স্থান দেয়া হয়েছে। সেজন্য আগামী নির্বাচনে ঢাকার লোকদের পাওয়া যাবে না। ফলে আওয়ামী লীগের ভরাডুবি হবে।

এই প্রসঙ্গে দক্ষিণ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শাহে আলম মুরাদ বলেন, ‘নেত্রীর নির্দেশে এই কমিটি করেছেন দলের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ড. আবদুর রাজ্জাক। সেখানে প্রতিটি পৃষ্ঠায় নেত্রীর স্বাক্ষর রয়েছে। এখানে আমার কোনো হাত ছিল না।’

অন্য দিকে কমিটি নিয়ে সাঈদ খোকনের মন্তব্যে চরম ক্ষোভ প্রকাশ করেন দায়িত্বপ্রাপ্ত কেন্দ্রীয় নেতারা। তারা বলেন, ‘কমিটি নিয়ে কোনো অভিযোগ থাকলে সরাসরি নেত্রীকে অভিহিত করতে পারতেন। কারণ, কমিটিতে স্বয়ং নেত্রী স্বাক্ষর করেছেন। তাই এ কমিটিকে চ্যালেঞ্জ করা চরম অবমাননাকর। এটি ঠিক নয়।’ গত বৃহস্পতিবার আজিমপুরে মহানগর আওয়ামী লীগের অনুষ্ঠানস্থল পার্ল হারবারের সামনে স্তূপ রাখার বিষয়ে মেয়র সাঈদ খোকনকে দায়ী করেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। তিনি বলেন, ‘এটি শুধু নগর নয়, পুরো আওয়ামী লীগের ইমেজ চরমভাবে নষ্ট করেছে।’

সাঈদ খোকনকে উদ্দেশ করে তিনি আরো বলেন, ‘আপনি বোঝেন না সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের সমাবেশের দিন মেয়র হিসেবে আপনার নাম থাকা সত্ত্বেও নেত্রী কেন আপনাকে বক্তৃতা দিতে দিলেন না?’
এ সময় ডা: দীপু মনি বলেন, ‘মেয়র নির্বাচনের সময় মুরাদের কোনো ভূমিকা ছিল না? দিনরাত আপনার পক্ষে কাজ করেনি? আপনার ওপর তার পূর্ণ সমর্থন ছিল না। আজ আপনার কাউন্সিলররা ময়লার স্তূপ রেখে সংঘর্ষে জড়িয়েছে। কিন্তু কই মেয়র হিসেবে আপনি তো এখন পর্যন্ত কোনো কাউন্সিলরের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেননি।’

তিনি আরো বলেন, ‘ওই দিনের ঘটনা দলের ভাবমার্যাদা ুণœ করেছে। এ ধরনের ঘটনা থেকে দলের সবাইকে বিরত থাকা উচিত।’

মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল বলেন, সেদিনের এ ন্যক্কারজনক ঘটনার দায়ভার তো সিটি করপোরেশনকেই নিতে হবে।
আবদুস সোবহান গোলাপ বলেন, ‘এ ঘটনার পর নেত্রী আপনার সালামেরও জবাব দেননি।’
এ সময় মুরাদ বলেন, ‘আপনার নির্বাচন করায় নগরে অনেকের কাছেই আমি শত্রু হয়েছি। নির্বাচনী গণসংযোগ করে অসুস্থ হয়ে ল্যাবএইড হাসপাতালে ভর্তিও ছিলাম। আপনার বিরুদ্ধে অনাস্থা আনা হয়েছিল এবং সেটি আমি ঠেকাইনি?’

এ সময় একটি অনলাইন নিউজ পোর্টালের একটি নিউজ লিংক দেখিয়ে- মেয়র সাঈদ খোকন বলেন, ‘দেখেন আমাকে নাকি আর মনোনয়ন দেয়া হবে না- এমন খবরও বেরিয়েছে। এ ময়লার স্তূপ আমাকে শেষ করে দিয়েছে। আপনারা তদন্ত করে দেখেন ময়লার ঘটনায় যদি সিটি করপোরেশনের কেউ জড়িত থাকে তার বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
মগবাজার-মৌচাক ফাইওভার উদ্বোধনের দিন কাউন্সিলর মান্নাফিকে লাঞ্ছিত করা হয়েছে বলে অভিযোগ আনেন সাঈদ খোকন।

জবাবে মুরাদ বলেন, ‘আপনি অসত্য বলছেন। আপনার এপিএসই ওইদিনের ঘটনার মূল নায়ক।’
বৈঠকে এক-এগারো সেনা সমর্থিত সরকারের সময় তৎকালীন অবিভক্ত মহানগর আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মোহাম্মদ সাঈদ খোকনের রাজনৈতিক ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। এ সময় শাহে আলম মুরাদ বলেন, ‘সে সময়কার ভূমিকা তো সবাই জানে।’

এ দিকে আগামীকাল মঙ্গলবার ঢাকা সিটি করপোরেশনের নির্বাচিত প্রথম মেয়র মোহাম্মদ হানিফের মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে স্মরণসভার আয়োজন করেছে দক্ষিণ সিটি করপোরেশন। এতে প্রধান অতিথি থাকবেন আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। এ অনুষ্ঠানে মহানগর দক্ষিণ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের অংশ গ্রহণ করার নির্দেশ দেন তিনি। এ সময় তিনি শাহে আলম মুরাদকে আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণ জানানোর নির্দেশ দেন মেয়রকে।

জবাবে মুরাদ বলেন, ‘আমার সভাপতি হাসনাত ভাইকেও বলতে হবে।’
জবাবে মেয়র বলেন, ‘আমি এখন কি করবো’ : জবাবে মুরাদ বলেন, ‘আপনি সভাপতিকে ফোন করে দাওয়াত দেন।’ পরে সাঈদ খোকন তা মেনে নিলে মুরাদও অনুষ্ঠানে অংশ গ্রহণের প্রতিশ্রুতি দেন।

বৈঠকে মুরাদ ও খোকনকে সব ভুলে এক সাথে মিলে মিশে কাজ করার নির্দেশ দেন দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতারা। এ সময় দু’জনকে হাত মিলিয়ে কুশল বিনিময় করতে বলা হলে তারা পরস্পরের হাত ধরে কুশল বিনিময় করেন।

বৈঠক সম্পর্কে জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ সিটি করপোরেশন মেয়র মোহাম্মদ সাঈদ খোকন বলেন, ‘এইগুলো আমাদের দলের অভ্যন্তরীণ বিষয়। এইগুলো নিয়ে বাইরে কোনো কথা বলতে চাই না।’

অন্য দিকে মহানগর দক্ষিণ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শাহে আলম মুরাদ বলেন, ‘আমাদের দলের সাধারণ সম্পাদক ডেকেছিলেন, সেখানে গিয়েছিলাম। সাংগঠনিকসহ অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন বিষয়ে কথা হয়েছে। এর বাইরে কিছু হয়নি।’

Please follow and like us:
Facebook Comments