সংকটের সমাধান না করেই হঠাৎ ভোটের আওয়াজ

ক্রাইমবার্তা ডেস্করিপোর্ট:জাফর ইকবাল : হঠাৎই ভোটের আওয়াজ। জাতীয় নির্বাচন, নির্বাচনী হাওয়া। সরকারি দল, বিরোধী দল সবাই নির্বাচন নিয়ে কথা বলছে। নির্বাচন কিভাবে হবে, কার অধীনে হবে, কখন হবে এসব নিয়ে চলছে পাল্টপাল্টি বক্তব্য। সরকারি দল তাদের নেতাকর্মীদের নির্বাচনের প্রস্তুতি নিতে বলছেন। দলের সাধারণ সম্পাদক আগাম নির্বাচনের ইঙ্গিত দিয়েছেন। দেশের প্রধান বিরোধী দল বিএনপি বলছে, তারাও নির্বাচনের জন্য প্রস্তুত। কিন্তু সেই নির্বাচন হতে হবে নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অধীনে তারা কোনো নির্বাচনে অংশ নেবে না। নির্বাচন নিয়ে এমন অবস্থায় সম্ভাব্য প্রার্থীরাও ছুটে চলেছেন নিজ নিজ এলাকায়। সামাজিক অনুষ্ঠানে যোগ দিচ্ছেন তারা। পাড়ায়-মহল্লায় দেদারছে নিজের পক্ষে প্রচারণা চালাচ্ছেন। অনেকেই পোস্টার-ব্যানারের মাধ্যমে নিজের উপস্থিতির জানান দিয়ে যাচ্ছেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও কেউ কেউ নির্বাচন করার ইচ্ছে পোষণ করছেন। অনেকেই দলীয় প্রতীকে পোস্টার তৈরী করে মতামত চাইছেন।
দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচন নিয়ে স্বোচ্চার হলেও যারা ভোট দিবেন তারা অনেকটা নীরব। তারা স্বাধীনভাবে ভোট দিতে চান। কিন্তু নির্বাচনকালীন সরকার প্রশ্নে তাদের মধ্যে একটা আতংক বিরাজ করছে। আদৌ দেশে কোনো নির্বাচন হবে কিনা তা নিয়ে উৎকন্ঠায় রয়েছে দেশবাসী। তাদের উৎকন্ঠা-শংকা আরও বাড়ছে যখন নির্বাচন প্রশ্নে সরকার ও বিরোধী জোট নিজ নিজ অবস্থানে অনঢ়। সরকারি দল আওয়ামী লীগ বলছে, তাদের অধীনেই আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। আন্দোলন করে কোনো লাভ হবে না। অন্যদিকে বিএনপি-জামায়াতে ইসলামীসহ দেশের অধিকাংশ রাজনৈতিক দল ও বিদেশীরা বলছে, নির্বাচনকালীন নির্দলীয় সরকারের অধীনেই আগামী নির্বাচন হতে হবে। দলীয় সরকারের অধীনে দেশে কোনো নির্বাচন হবে না এমনকি হতেও দেয়া হবে না।
সূত্র মতে, ২০১৪ সালের সংসদ নির্বাচনে ৫ শতাংশ ভোটারও কেন্দ্রে যাননি। ১৫৩ জন সদস্য বিনা ভোটে সংসদ সদস্য হয়েছেন। এরপর অনুষ্ঠিত স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও ঠিকভাবে ভোট দিতে পারেনি জনগন। কারণ কেন্দ্র দখল, মারামারি, ভয় দেখানো, মামলা-হামলার কারণে তারা ভোট দিতে যায়নি। এবারো যদি কেন্দ্রে যেতে শংকা থাকে তাহলে ভোটাররা যাবে না। ভোটাররা বলছেন, আগামী নির্বাচনও যদি একইভাবে অনুষ্ঠিত হয় তাহলে তাতে তারা অংশ নেবেন না।
সূত্র মতে, নির্বাচন প্রশ্নে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ তাদের আগের অবস্থান থেকে এখনো সরে আসেনি। গতকাল সোমবারও সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছেন, সংবিধান অনুযায়ী সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। সেই নির্বাচনে বিএনপিকে অংশ নিতেই হবে। কক্সবাজারের কলাতলীর একটি হোটেলে রোহিঙ্গাদের জন্য আওয়ামী লীগ নেতাদের দেয়া টাকা জেলা প্রশাসকের কাছে হস্তান্তরের অনুষ্ঠানে তিনি বলেছেন, আগামী সংসদ নির্বাচনে না এলে বিএনপিকে মুসলিম লীগের ভাগ্যবরণ করতে হবে। সেতুমন্ত্রী কাদের বলেন, বিএনপির আসলে কোনো পুঁজি নেই, অর্থ-পুঁজি আছে। কথামালার চাতুরি ও স্ট্যান্টবাজি ছাড়া তাদের কোনো পুঁজি নেই। আগামী নির্বাচনে জেতার মতো বিএনপির কাছে কোনো ধরনের পুঁজি নেই। যত দিন যাচ্ছে, বিএনপির মধ্যে নেতিবাচক রাজনীতির চর্চা বাড়ছে মন্তব্য করে কাদের বলেন, ক্রমাগত মিথ্যাচারের ভাঙা রেকর্ড বাজাতে বাজাতে বিএনপি এখন এমন অবস্থায় উপনীত হয়েছে, তারা নিজেরাও জানে আগামী নির্বাচনে না এলে মুসলিম লীগের মত করুণ পরিণতি অপেক্ষা করছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, সরকারি দল যদি তাদের অবস্থানে অনড় থাকে তাহলে দেশে আবারো একটি অরাজক পরিস্থিতি তৈরী হবে। দীর্ঘদিন নীরব থাকার পর রাজপথ আবারো উত্তপ্ত হয়ে উঠবে। বিরোধী জোট ঘোষণা দিয়ে রেখেছে, সরকার যদি নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকারের দাবি মেনে না নেয় তাহলে আন্দোলনের মাধ্যমে তারা সংকটের সমাধান করবে। এক্ষেত্রে আবারো টানা হরতাল-অবরোধের মতো কর্মসূচি আসতে পারে। ফলে সাধারণ মানুষ দীর্ঘ একটি রাজনৈতিক সংকটের মধ্যে পড়তে পারে। এতে করে স্ব্ভাাবিক জীবনযাপনে ফের বিঘœ সৃষ্টি হবে। আন্দোলনের কারণে দেশে একটি অস্বাভাবিক পরিবেশ তৈরী হবে। দেশবাসী মনে করছেন, ক্ষমতাসীন দল ও বিরোধী জোট নির্বাচন প্রশ্নে সমঝোতায় না এলে দেশে কোনো নির্বাচন হবে না। এখন যেগুলো বলা হচ্ছে সেগুলো শুধুই আইওয়াশ। আগাম নির্বাচন বা যথাসময়ে নির্বাচন হবে এসব বলে ভোটারদের ধোঁকা দেয়া হচ্ছে।
জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস বলেন, নির্বাচন প্রশ্নে ক্ষমতাসীনদের সাথে কোনরকম কম্প্রোমাইজ করার সুযোগ নেই। সরকারকে উদ্দেশ্যে করে সাবেক এই মন্ত্রী বলেন, একবার আপনারা ৫ জানুয়ারি কুত্তা মার্কা নির্বাচন করেছেন কিন্তু এবার মানুষ মার্কা নির্বাচন করতে হবে। এবার বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়ার রুপরেখা অনুযায়ী আপনাদেরকে নির্বাচন দিতে হবে এবং সেই নির্বাচনে দেশের মানুষ অংশগ্রহণ করবে। অপর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আন্দোলন ও নির্বাচন দুটোর জন্যই বিএনপি সমানভাবে প্রস্তুত আছে। এবার কোন ছাড় নয়। মির্জা আব্বাস বলেন, আওয়ামী লীগের যুদ্ধ হল ক্ষমতায় ঠিকে থাকার আর আমাদের যুদ্ধ হল জনগণের কাছে হারানো গণতন্ত্র ফিরিয়ে দেয়া। বিএনপিকে ক্ষমতায় যেতেই হবে এমন কথা কখনও বিএনপি বলে না, ভাবেও না। বিএনপির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারন ফোরামের এই সদস্য বলেন, আমরা দেশটাকে স্বাধীন করেছি পাকিস্তানিদের হাত থেকে। এখনও আমার মনে হয় দেশটাকে আবারও স্বাধীন করতে হবে। বাংলাদেশ এখন আর স্বাধীন নেই, আরও একটি যুদ্ধের প্রয়োজন আছে।
বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু বলেন, বিএনপি নির্বাচনে যাবে শুনলে আওয়ামী লীগের অবস্থা খারাপ হয়ে যায়। সেই নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকার বা সহায়ক সরকারের অধীনে হবে শুনলে প্রধানমন্ত্রী এবং তার দলের নেতাদের ঘুমই হারাম হয়ে যায়। তিনি বলেন, সত্য এবং বাস্তবতা হচ্ছে, ২০১৮ সালে যে নির্বাচন হবে, তাতে বিএনপি অংশ নেবে এবং সেই নির্বাচন শেখ হাসিনার অধীনে হবে না। বিএনপির এই নেতা বলেন, বিরোধী দল হিসেবে বিএনপি এবং অন্যান্য বিরোধী দল যে অবস্থানে থাকবে, সেই অবস্থানে থেকেই শেখ হাসিনার দলকে আগামী নির্বাচনে অংশ নিতে হবে। সমানে সমানে লড়াই হবে, মানুষের ভোটাধিকার ফিরে আসবে।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেন, নির্বাচনের জন্য বিএনপির প্রস্তুতির দরকার নেই। আগামীকাল নির্বাচন হলেও বিএনপি ৩০০ আসনে প্রার্থী দিতে পারবে। তাতে প্রার্থী খোঁজা লাগবে না। শেখ হাসিনার প্রস্তুতির দরকার আছে। মানুষ ভোট দিতে পারবে এমন নির্বাচনের জন্য প্রস্তুত বিএনপি। তিনি বলেন, আমরা শক্তিশালী নির্বাচন কমিশন চাই। এজন্য সকল দলের সাথে আলোচনা করে নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন গঠন করতে হবে। এমন ইসি গঠন করতে হবে যারা জনগণের ভোটের নিরাপত্তা দিতে পারবে। মেরুদণ্ডহীন নির্বাচন কমিশনের অধীনে কখনো নির্বাচন সুষ্ঠু হবে না। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ নির্বাচনে বিশ্বাস করে না। ৫ জানুয়ারির মতো নির্বাচন হলে প্রস্তুতির দরকার নেই। তাদের (আওয়ামী লীগের) তো র‌্যাব, পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনী  আছেই। ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে ভোটকেন্দ্রে গরু, ছাগল, কুকুর দেখলাম সন্ধ্যার পর দেখি ৪৫ শতাংশ ভোট পড়েছে। এরকম নির্বাচনে আবার কিসের প্রস্তুতি।
নির্বাচন প্রশ্নে আওয়ামী লীগের সিনিয়র নেতা বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ বলেছেন, নির্ধারিত সময়েই আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে এবং এ নির্বাচন ঠেকানোর ক্ষমতা কারও নেই। তিনি বলেন, বর্তমান সরকারই অন্তর্বর্তীকালীন সরকার হিসেবে দায়িত্ব পালন করবে এবং নির্বাচন কমিশন নির্বাচন পরিচালনা করবে। তাই তত্ত্বাবধায়ক সরকার নিয়ে মায়াকান্না করে কোনো লাভ নেই। এই ব্যবস্থা বাংলাদেশে আর কোনোদিন ফিরবে না।
সূত্র মতে, আগামী নির্বাচনের প্রস্তুুতির প্রথম পর্ব সেরে ফেলেছে আওয়ামী লীগ। দলের কাউন্সিল আবর্তিত হয়েছে নির্বাচনের প্রস্তুতি ঘিরে। অন্যান্য প্রসঙ্গও এসেছে। তবে প্রাধান্য পেয়েছে নির্বাচনের কৌশলের বিষয়টিই। নতুন সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের টপ এজেন্ডাতেও রয়েছে নির্বাচন। বেশি ইস্যু নিয়ে কাজ করবেন না তিনি। নিজেই বলেছেন, এক ঝুড়িতে বেশি ডিম রাখলে তা ভেঙে যেতে পারে। এ কারণে হাতে এজেন্ডা রেখেছেন কম। তার প্রধান এজেন্ডা নির্বাচনের প্রস্তুতি।
জানা গেছে, কাউন্সিলে দলের নেতাদের নির্বাচন নিয়ে নির্দেশনা দেয়ার পর গণভবনে আলোচনায় নেতাদের একই নির্দেশনা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। জেলা নেতাদের উদ্দেশে তিনি বলেছেন, সামনে ইলেকশন, মনে রাখতে হবে। ইলেকশনের প্রস্তুতি নিতে হবে। জনগণের জন্য কী কী কাজ করলাম, জনগণকে তা জানাতে হবে। আওয়ামী লীগকে ভোট দিলে আরো উন্নয়ন হবে। অর্থনীতিকে সুসংহত করার জন্য যে কাজগুলো আমরা করে যাচ্ছি এই কথাগুলো না বললে মানুষজন জানবে কিভাবে? এখন থেকেই কাজ শুরু করার তাগিদ দেন আওয়ামী লীগ সভানেত্রী। এরপর অন্যান্য সমাবেশ ও সভাতেও উন্নয়ন ও পরিবর্তনের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে আওয়ামী লীগকে তৃতীয় দফা নির্বাচনে জয়ী হতে হবে বলে নেতাকর্মীদের সেই লক্ষ্যে প্রস্তুত হওয়ার নির্দেশনা দিচ্ছেন দলীয় সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন যে, দেশের ভেতরের বাইরের সার্বিক পরিবেশ এখন বিএনপির অনুকূলে। জনসমর্থন এখন বলা যায় ‘তুঙ্গে’। সরকারের সংস্থাগুলোই এমন রিপোর্ট দিচ্ছে। বলা হচ্ছে, নিরপেক্ষ নির্বাচনের ব্যবস্থা করা হলে চরম ভরাডুবি হবে আওয়ামী লীগের। আর যে পরিস্থিতি দাঁড়িয়েছে তাতে নিরপেক্ষ নির্বাচন দেওয়া ছাড়া উপায়ও নেই। একদিকে বিএনপির জনপ্রিয়তাকে উপেক্ষা করা এবার আর সম্ভব হচ্ছে না, অন্যদিকে দেশের ভেতরে বাইরে আওয়ামী লীগ বলা যায় এক রকমের বন্ধুহীন হয়ে পড়েছে। বন্ধু তো নেই-ই, উল্টো শত্রুর সংখ্যা এতো বেড়ে গেছে যে, এরা সবাই সময় গুণছে বা সময়ের অপেক্ষা করছে কখন ভোটের সুযোগ আসে।

Please follow and like us:
Facebook Comments