সময়ের পরিক্রমায় আজ শনিবার হলেও একাত্তরের ৯ ডিসেম্বর ছিল বৃহস্পতিবার-মেঘনা তীরবর্তী জনপদগুলোর মুক্ত হওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হওয়া এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সপ্তম নৌবহরের যাত্রা থমকে যাওয়া

ক্রাইমবার্তা ডেস্করিপোর্ট:সাদেকুর রহমান : লড়াকু মুক্তিযোদ্ধারা মিত্র বাহিনীকে সাথে নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। সে এক অন্য রকম দৃশ্য। অন্য রকম অভিজ্ঞতা। প্রতি মুহূর্তেই রচিত হচ্ছে স্বাধীনতা যুদ্ধ জয়ের অমর গাঁথা। ঊনিশশ’ একাত্তর সালের আজকের দিনের উল্লেখযোগ্য ঘটনা হলো মেঘনা তীরবর্তী জনপদগুলোর মুক্ত হওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হওয়া এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সপ্তম নৌবহরের যাত্রা থমকে যাওয়া। সময়ের পরিক্রমায় আজ শনিবার হলেও একাত্তরের ৯ ডিসেম্বর ছিল বৃহস্পতিবার। এদিকে আজকের দিনের এক সরকারি ঘোষণায় বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজসহ সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ভারতীয় হামলার কারণ দেখিয়ে বন্ধ করে দেয়া হয়। একই সঙ্গে নেয়া হয় চরম দুরভিসন্ধিমূলক এক সিদ্ধান্ত। দেশের শিক্ষকদের বেসামরিক প্রতিরক্ষা কাজে নিয়োজিত হতে হবে।
এদিন বিকেলে মিত্রবাহিনীর প্রধান জেনারেল অরোরা কলকাতায় এক সাংবাদিক সম্মেলনে বলেন, ‘আমরা এখন ঢাকা লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুত আছি।’ এর আগেই চতুর্দিক থেকে অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে পাকিস্তানি বাহিনী। মিত্র ও মুক্তিবাহিনী দ্রুত ঢাকা পৌঁছার লক্ষ্য নিয়ে চারদিক থেকে অগ্রসর হচ্ছে।
এছাড়া ভারতীয় সেনাবহিনীর প্রধান জেনারেল মানেকশ বাংলাদেশে পাকিস্তানী সেনাদের উদ্দেশ করে বলেন, ‘ভারতীয় বাহিনী বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। তোমরা যদি বাঁচতে চাও, ভারতীয় বাহিনীর কাছে অস্ত্র জমা দিয়ে আত্মসমর্পণ করো, নতুবা তোমাদের নির্মমভাবে হত্যা করা হবে।’
বাংলা একাডেমি প্রকাশিত কবি আসাদ চৌধুরীর ‘বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ’ শীর্ষক গ্রন্থে এ দিনের ঘটনা প্রবাহ তুলে ধরে বলা হয়, “৯ ডিসেম্বর মিত্রবাহিনী পাক বাহিনীকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে ফেলেছে। তাদের আর একত্র হওয়ার সুযোগ নেই বা ঢাকা ফেরার পথ নেই। আশুগঞ্জ, দাউদকান্দি, চাঁদপুর মিত্রবাহিনীর দখলে। আরেকটি বাহিনী কুষ্টিয়া মুক্ত করে গোয়ালন্দের দিকে। হালুয়াঘাট থেকে এগিয়ে আসা বাহিনীও ময়মনসিংহের দ্বারপ্রান্তে। নৌবাহিনীর গানবোট ঢাকার দিকে। বিমানবাহিনীর আক্রমণও সমানে চলছে।”
এইদিনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সপ্তম নৌবহর বাংলাদেশের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেয়। মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সনের নিরাপত্তা উপদেষ্টা ড. হেনরি কিসিঞ্জার তাকে পরামর্শ দিলেন বঙ্গোপসাগরের দিকে সপ্তম নৌবহরকে যাত্রা শুরু করার নির্দেশ দিতে। ইয়াহিয়া খান ও তাদের পশ্চিমা মিত্ররা ভেবেছিল এই সপ্তম নৌবহর আসার কথা শুনে যৌথবাহিনীর মনোবল ভেঙ্গে যাবে। কিন্তু স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে এই কথা জেনে মুক্তিযোদ্ধারা আরো বিপুল উৎসাহে ঝাঁপিয়ে পড়েন যুদ্ধে। সেদিন বাঙালির মুক্তিযুদ্ধের আরেক মিত্র, তৎকালীন পৃথিবীর অন্যতম পরাশক্তি সোভিয়েত ইউনিয়ন আমেরিকার সপ্তম নৌবহর পাঠানোর সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানায় এবং এর বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের হুমকি দেয়। ফলে সপ্তম নৌবহরের যাত্রা শুরু হওয়ার পরই থেমে যায়। এই শক্তিশালী নৌবহরের গঠন ছিল বঙ্গোপসাগরে ভারতের নৌ অবরোধ ব্যর্থ করা, পাকিস্তানি স্থল বাহিনীর তৎপরতায় সাহায্য করা, ভারতীয় বিমান তৎপরতা প্রতিহত করা এবং মার্কিন নৌসেনা অবতরণ করা।
এদিনে জাতিসংঘের অধিবেশনে প্রতিনিধিত্বকারী পাকিস্তানি দলের নেতা মাহমুদ আলী দেশে ফিরে এসে আজকের দিনে দেখা করেন প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার সঙ্গে। পরে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, সোভিয়েত ইউনিয়নের উচিত বিশ্ব শান্তির প্রতি গুরুত্ব দিয়ে ভারতের পাশ থেকে সরে দাঁড়ানো। চীন ও আমেরিকার সমর্থনের পরিপ্রেক্ষিতে তিনি বলেন, ‘পাকিস্তান তাদের নির্ভীক ও ঐতিহাসিক সমর্থনের জন্য অত্যন্ত কৃতজ্ঞ।’
বাংলাদেশ সরকারের মন্ত্রীসভা ও আওয়ামীলীগ, ন্যাপ, কমিউনিস্ট পার্টি জাতীয় কংগ্রেসের সমন্বয়ে গঠিত উপদেষ্টা পরিষদের যৌথ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় এদিন। ভারত ও ভূটান বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দানের পর উপদেষ্টা পরিষদের এটিই ছিল প্রথম বৈঠক। বৈঠকে মুক্ত এলাকায় অসামরিক প্রশাসনের কার্যক্রম শুরু এবং খাদ্য, চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের ওপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়। মিত্রবাহিনীর বিমানবাহিনী টাঙ্গাইলের নিকটবর্তী কোনো এক এলাকায় ৭০০ ছত্রীসেনা এবং ৮০ টন সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহ করে।
এদিন চাঁদপুর ও কুমিল্লার দাউদকান্দি এলাকা হানাদার বাহিনীর কবল থেকে মুক্ত করেছিল বীর মুক্তিযোদ্ধারা। এর মধ্য দিয়েই শুরু হয় মেঘনা তীরের অঞ্চলগুলো মুক্তির প্রক্রিয়া। দিন না পার হতেই মেঘনার পুরো পূর্বাঞ্চলসহ বিস্তীর্ণ এলাকা শত্রুমুক্ত হয়। স্বাধীনতা যুদ্ধের চূড়ান্ত এই পর্যায়ে অন্য অঞ্চলের সাথে মুক্ত হয়েছিল ফেনীর ছাগলনাইয়া। এক নম্বর সেক্টরের ক্যাপ্টেন মাহফুজের নেতৃত্বে একদল মুক্তিযোদ্ধা এই এলাকা মুক্ত করার লড়াইয়ে অংশ নেয়। বিজয়ী মুক্তিযোদ্ধাদের একটি অংশ ফেনী-চট্টগ্রাম সড়ক ধরে এবং অন্য একটি অংশ মুহুরী নদী হয়ে চট্টগ্রামের দিকে অগ্রসর হয়। তুমুল গণযুদ্ধ শেষে আজকের দিনে জামালপুরও মুক্ত হয়। এটি মুক্ত হওয়া ছিল একটি মাইলফলক। পরবর্তীতে মুক্তি বাহিনী টাঙ্গাইল হয়ে ঢাকায় পৌঁছে ছিল। দেশের অন্য প্রায় সকল অঞ্চলে তখন চলছিল ঢাকা দখলের চূড়ান্ত প্রস্তুুতি। এদিন থেকেই সব দিক থেকে মুক্তিবাহিনী ঢাকার দিকে অগ্রসর হতে শুরু করে।
এদিকে পূর্ব পাকিস্তানের গবর্নর ডা. মালিকও মরিয়া হয়ে উঠেন। সেদিন পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জেনারেল ইয়াহিয়া খানের কাছে পাঠানো চিঠিতে তিনি বলেছিলেন, আশু যুদ্ধ বিরতি এবং রাজনৈতিক মীমাংসা বিবেচনার জন্য আরো একবার আপনার প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি। ঐদিন রাতে ইয়াহিয়া খান তার উত্তরে লিখেছিলেন, পূর্ব পাকিস্তানের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেয়ার বিষয়টি আমি সম্পূর্ণরূপে আপনার ওপর ছেড়ে দিচ্ছি। আপনি যে সিদ্ধান্ত নেবেন তাই আমি অনুমোদন করবো। একই সাথে জেনারেল নিয়াজীকে নির্দেশ দিচ্ছি তিনি যেন আপনার সিদ্ধান্ত মেনে নেন এবং সেই অনুসারে সবকিছুর আয়োজন করেন। মূলত এই বার্তার মাধ্যমে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট সেদিন বাংলাদেশের স্বাধীনতা স্বীকার করে নিয়েছিলেন। আত্মসমর্পণের অনুমতি দিয়েছিলেন। অথচ এই আগের দিনের চিঠিতেও তিনি যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন। বাংলার বীরসেনাদের যুদ্ধ ও জনগণের ঐক্যবদ্ধ সংগ্রাম অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠেছিল বলেই ইয়াহিয়া খান এই নির্দেশ দিয়েছিলেন।
একাত্তরের এই দিনে আরো হানাদারমুক্ত হয় কুষ্টিয়ার কুমারখালী, কুমিল্লার তিতাস, খুলনার পাইকগাছা, গাইবান্ধা, শেরপুরের নকলা, যশোরের অভয়নগর, ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জ, গফরগাঁও ও ত্রিশাল, নেত্রকোনাসহ বিভিন্ন এলাকা। মুক্ত এলাকাগুলোতে সগৌরবে স্বাধীন দেশের পতাকা উড়ে।

০৯ ডিসেম্বর ২০১৭,শনিবার:ক্রাইমর্বাতাডটকম/ সংগ্রাম/আসাবি

Please follow and like us:
Facebook Comments