নাটোরে বিনা চাষের রসুন বুনার কাজে শ্রমিকরা আয় করবে প্রায় একশ’ ১৫ কোটি টাকা

মোঃ রিয়াজুল ইসলাম, নাটোর সংবাদদাতা
নাটোরে এবারে জমিতে শুধু রসুন বুনার কাজেই শ্রমিকরা আয় করবেন প্রায় একশ’ ১৫ কোটি টাকা। দেশের প্রথম বিনাচাষের রসুন উৎপাদনকারী জেলা নাটোরে এখন সর্বাধিক পরিমান রসুন উৎপাদিত হচ্ছে। এবারের রবি মৌসুমে এই জেলায় মোট ২৫ হাজার সাতশ’ ৯৫ হেক্টর অর্থাৎ প্রায় ২৬ হাজার হেক্টর জমিতে বিনা চাষের রসুন আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। বীজ হিসেবে ব্যবহারের জন্যে গোটা রসুনের কোয়া ছাড়িয়ে জমিতে বুনতে নারী ও পুরুষ শ্রমিকের অংশ গ্রহণে নাটোরের গ্রামীণ জনপদে এখন চলছে বিশাল এক কর্মযজ্ঞ। বিগত ১৯৯৪-৯৫ সালে প্রথম এই জেলার গুরুদাসপুর ও বড়াইগ্রামের কৃষকরা স্বপ্রণোদিত হয়ে বিনা চাষে মসলা ফসল রসুনের আবাদ শুরু করে কম খরচে ভাল ফলনও পান। গুরুদাসপুর উপজেলার কাছিকাটা এলাকার কৃষক জেহের আলী কার্তিক মাসে বর্ষার পানি নেমে যাওয়ার পর জমিতে রসুনের কোয়া বুনে বিনা চাষে রসুন উৎপাদনের সূত্রপাত করেন। প্রচলিত পদ্ধতিতে জমি চাষ করে রসুন লাগানো হলেও এই পদ্ধতিতে রসুন আবাদে জমি চাষ করতে হয়না, সেচও লাগেনা। আগাছা থাকে কম এবং সারের ব্যবহার খুবই কম। উৎপাদন ব্যয় তুলনামূলক কম হওয়ার পাশাপাশি উৎপাদনের পরিমান বেশী হওয়ায় এই পদ্ধতি কৃষকদের মাঝে ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করার ফলে বিনাচাষের এই রসুন সারা জেলায় আবাদ ছড়িয়ে পরে। এরপরে প্রসার ঘটে দেশের অন্যান্য জেলাতেও। জেলার বেশিরভাগ রসুন উৎপাদিত হয় গুরুদাসপুর ও বড়াইগ্রাম উপজেলাতে। এসব এলাকার সব খানেই কৃষকরা এখন ব্যস্তসময় পার করছেন জমিতে রসুন বুনে। এই কাজে পুরুষের পাশাপাশি নারী শ্রমিকের অংশগ্রহন চোখে পড়ার মতো। সিংড়া উপজেলার ধুলিয়াডাঙ্গা এলাকায় প্রায় একশ’ বিঘা জমিতে এই রসুন চাষ করা হয়েছে। ওই এলাকার মিজানুর রহমানের দেড় বিঘা জমিতে কর্মরত সাতজনের মধ্যে তিনজনই নারী শ্রমিক। কর্মরত শ্রমিক রহিমা বিবি বলেন, পুরুষদের মজুরী সাড়ে তিনশ’ টাকা হলেও তারা নারী হওয়ায় দেয়া হয় আড়াইশ’ টাকা। এক বিঘা জমিতে রসুন বুনতে ১৫ থেকে ১৬ জন শ্রমিকের প্রয়োজন হয় বলে জানান কৃষক আনসার আলী। মাঠ জুড়ে একদিকে চলছে রসুন বুনা আর অন্যদিকে যুগপৎভাবে জমিতে বুনা রসুনের ওপর ধানের বিছালী দিয়ে ঢেকে দেওয়ার কাজ। বিছালী দিয়ে এভাবে ঢেকে দেয়ায় সহজেই সবুজ অঙ্কুরোদগম হচ্ছে। মাঠের মত কৃষক পরিবারের বাড়ীতেও চলছে একই রকম ব্যস্ততা। বাড়ির ছোট-বড় সব সদস্যকে সাথে নিয়ে মহিলারাও মেতে ওঠেছেন গোটা গোটা রসুনের কোয়া ছড়াতে। এই কাজে তাদেরই পারদর্শিতা বেশী। এক মণ রসুনের কোয়া ছড়াতে পারিশ্রমিক তিনশ’ টাকা। লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী ২৫ হাজার সাতশ’ ৯৫ হেক্টর জমির রসুন বুনতে মোট ২৯ লাখ দুই হাজার শ্রমিকের তিন ভাগ পুরুষ এবং এক ভাগ নারী। সব মিলিয়ে মোট শ্রমিকের সংখ্যা ২১ লাখ ৭৬ হাজার চারশ’ ৫২ জন। জনপ্রতি তিনশ’ ৫০ টাকা হিসেবে তাদের সমষ্টিগত পারিশ্রমিক ৭৬ কোটি ১৮ লক্ষ টাকা। রসুন বুনতে শ্রমিকের প্রয়োজন হয় এক চতুর্থাংশ, এতে করে সাত লাখ ২৫ হাজার নারী শ্রমিকের মোট পারিশ্রমিক দাড়ায় ২০ কোটি ৩১ লাখ টাকা। এছাড়াও জমিতে মোট প্রয়োজনীয় ২৭ টন বীজ ছড়াতে প্রায় সাত লাখ নারী শ্রমিকের মোট পারিশ্রমিক মণ প্রতি তিনশ’ টাকা হিসেবে মোট ১৮ কোটি ১৩ লাখ টাকা। সব মিলিয়ে এই মহা কর্মযজ্ঞে মোট শ্রমের আর্থিক মূল্যমান দাঁড়ায় প্রায় একশ’ ১৫ কোটি টাকা। বড়াইগ্রাম উপজেলার তিরাইল গ্রামের রসুন চাষী তোফাজ্জল হোসেন চলতি মৌসুমে দশ বিঘা জমিতে রসুন আবাদ করে বলেন, বন্যার পানি নামতে দেরী হওয়ায় রসুন আবাদে কিছুটা দেরী হলেও অনুকূল আবহাওয়া থাকায় রসুন বীজের অঙ্কুরোদগম ভাল হচ্ছে, আশা করা যায় তার আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে ফলনও ভাল হবে। নাটোর জেলা কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের উপ পরিচালক মোঃ রফিকুল ইসলাম জানান, চলতি রবি মৌসুমে জেলায় রসুন চাষের ২৫ হাজার ৭৯৫ হেক্টর জমিতে রসূন চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এরমধ্যে বড়াইগ্রাম উপজেলায় সর্বোচ্চ ১১ হাজার আটশ’ ৪৫ হেক্টর, গুরুদাসপুর উপজেলায় দশ হাজার হেক্টর, নাটোর সদর উপজেলায় এক হাজার হেক্টর, সিংড়া উপজেলায় এক হাজার পাঁচশ’ হেক্টর, লালপুর উপজেলায় তিনশ’ ৫০ হেক্টর, বাগাতিপাড়া উপজেলায় দুইশ’ ৫০ হেক্টর এবং নলডাঙ্গা উপজেলায় আটশ’ ৫০ হেক্টর জমিতে চাষ হচ্ছে। তিনি আরও জানিয়েছেন, জেলায় রসুনের আবাদী জমির পরিধি ও উৎপাদন ক্রমশঃই বেড়ে চলেছে। নাটোরে ২০১২ সালে প্রায় ১৫ হাজার হেক্টর জমিতে রসুন আবাদ করে ফলন পাওয়া গিয়েছিল এক লাখ ১১ হাজার চারশ’ ৩৮ টন আর এবারে প্রায় ২৬ হাজার হেক্টর জমিতে রসুন বুনে ফলন দুই লাখ টনেরও বেশী পাওয়া যাবে বলে আশা করা হচ্ছে। কৃষকদের সচেতনতা বৃদ্ধি এবং কৃষি বিভাগের নতুন প্রযুক্তি ও প্রশিক্ষণের সমন্বয়ে প্রচলিত শষ্যের বাইরে কৃষকরা অপ্রচলিত লাভজনক এই মশলা ফসলটির প্রতি বেশী ঝুঁকে পড়ছেন। এখন রসুন বড়াইগ্রাম ও গুরুদাসপুর উপজেলার সবচেয়ে লাভজনক শস্য হওয়ায় ওই এলাকায় রসুনকে তাই হোয়াইট গোল্ড বা সাদা সোনা বলা হয়ে থকে।

১২ ডিসেম্বর,২০১৭ মঙ্গলবার:ক্রাইমর্বাতাডটকম/প্রতিনিধি/আসাবি

Facebook Comments
Please follow and like us: