সবার নজর রংপুরে:চলছে ভোট গ্রহণ সার্বিক পরিস্থিতি ইসির অনুকূলে : সিইসি * ত্রিপক্ষীয় লড়াইয়ের আভাস, উৎসবমুখর পরিবেশ * তিন দলের অংশগ্রহণে অগ্নিপরীক্ষায় নির্বাচন কমিশন

সবার নজর রংপুরে চলছে ভোট গ্রহণ
সার্বিক পরিস্থিতি ইসির অনুকূলে : সিইসি * ত্রিপক্ষীয় লড়াইয়ের আভাস, উৎসবমুখর পরিবেশ * তিন দলের অংশগ্রহণে অগ্নিপরীক্ষায় নির্বাচন কমিশন

ক্রাইমবার্তা ডেস্করিপোর্ট:রংপুর সিটি করপোরেশনের ভোটযুদ্ধ শুরু। নির্বাচনকে ঘিরে ভিন্ন রকম এক নগরী এখন দেখছেন নগরবাসী। র‌্যাব-বিজিবি-পুলিশের সতর্ক মহড়া। এ নির্বাচনে সাতজন মেয়র, ৬৫ জন সংরক্ষিত ও ২১১ জন সাধারণ কাউন্সিলর পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। প্রায় চার লাখ ভোটার প্রস্তুত ভোট দানের জন্য। ভোটের সব আয়োজন শেষ। শুধুই এখন ভোট প্রদানের পালা। এ দিকে নির্বাচন পর্যবেক্ষক ছাড়াও সংবাদ পরিবেশনের জন্য এসেছেন দেশী-বিদেশী বিভিন্ন ইলেকট্রনিকস, প্রিন্ট ও অনলাইন মিডিয়ার পাঁচ শতাধিক গণমাধ্যম কর্মী।
রংপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে রিটার্নিং কর্মকর্তা সুভাষ চন্দ্র সরকারের সহায়ক কর্মকর্তা আবু সাঈম নয়া দিগন্তকে জানান, রংপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে ১৯৩টি ভোট কেন্দ্রের ১ হাজার ১২২টি ভোট কক্ষে। এ ছাড়া অস্থায়ী ভোট কক্ষ রয়েছে ১৬৬টি। এরমধ্যে ১২৮টি কেন্দ্রকে গুরুত্বপূর্ণ ধরা হয়েছে। এ নির্বাচনে ২৫ নম্বর ওয়ার্ডের বেগম রোকেয়া সরকারি কলেজ কেন্দ্রে ইভিএম দিয়ে ভোট গ্রহণ ছাড়া সব কেন্দ্রে আগের মতোই ব্যালট ও সিলে ভোট গ্রহণ করা হবে। এবার এ নির্বাচনে মেয়র পদের জন্য সাতজন, ১১টি সংরক্ষিত কাউন্সিলর পদে ৬৫ জন এবং ৩৩টি সাধারণ কাউন্সিলর পদে ২১১ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। ভোট গ্রহণের জন্য নিয়োগ দেয়া হয়েছে ১৯৩ জন প্রিজাইটিং অফিসার, ১ হাজার ১২২ জন সহকারী প্রিজাইটিং অফিসার এবং ২ হাজার ২৪৪ জন পোলিং অফিসার। মোট ৩ হাজার ৫৫৯ কর্মকর্তাকে তিন দফায় ইসিআইর উদ্যোগে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে। এবার এ সিটিতে গত ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত হালনাগাদের তথ্যানুযায়ী ভোটার সংখ্যা ৩ লাখ ৯৩ হাজার ৯৯৪ জন, যা গত বছরের চেয়ে ৩৬ হাজার বেশি। এরমধ্যে পুরুষ ১ লাখ ৯৬ হাজার ৩৫৬ জন। মহিলা ১ লাখ ৯৭ হাজার ৬৩৮ জন।
সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন উপহার দিতে প্রস্তুত আইনশৃঙ্খলা বাহিনী : ডিআইজি
পুলিশের রংপুর রেঞ্জের ডিআইজি খন্দকার গোলাম ফারুক বিপিএম পিপিএম বলেছেন, জনগণকে ভয় দেখাতে নয়, উৎসবমুখর পরিবেশে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ মডেল নির্বাচন উপহার দিতেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নিñিদ্র নিরাপত্তা বেষ্টনী গড়ে তুলেছে রংপুর মহানগরী এলাকায়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা হবে জনগণের সাথে ভালো ব্যবহার করে ভোটাধিকার নিশ্চিত করা এবং আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে কঠোর হওয়া।
গতকাল বুধবার রংপুর পুলিশ লাইন মাঠে সিটি নির্বাচন উপলক্ষে দায়িত্বরত পুলিশ ও আনসার ব্যাটালিয়ন সদস্যের ব্রিফিং অনুষ্ঠানে তিনি এ কথা বলেন। এ সময় রংপুরের ডিসি মুহাম্মদ ওয়াহিদুজ্জামান, পুলিশ সুপার মো: মিজানুর রহমান, জেলা আনসার কমান্ডেন্ট আব্দুস সালামসহ দায়িত্বরত বিভিন্ন পর্যায়ের পদস্থ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
ব্রিফিংকালে ডিআইজি বলেন, আমরা চাই এমন একটি সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন উপহার দিতে যাতে বাংলাদেশ এবং বিশ্বে যেখানেই নির্বাচন হবে রংপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনটি যেন সেখানে মডেল নির্বাচন হিসেবে উপস্থাপিত হতে পারে। সে জন্য সব ধরনের প্রস্তুতি আমরা নিয়েছি। সেটি মাথায় রেখেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে কাজ করতে হবে।
ডিআইজি বলেন, সরকার ও নির্বাচন কমিশন চায় সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন। তাই তাদের চাওয়া পূরণ করতে আমাদের আন্তরিকভাবে কাজ করতে হবে। আমরা পর্যাপ্তের চেয়েও পর্যাপ্ত নিরাপত্তার ব্যবস্থা নিয়েছি। নিরাপত্তার প্রশ্নে আমাদের কোনো সংশয় নেই। আমাদের জনবলের কোনো কমতি নেই। কেউ ন্যূনতম কোনো ঝামেলা করার চেষ্টা করলে ১ থেকে ৩ মিনিটের মধ্যে সেখানে র‌্যাব, পুলিশ, বিজিবির মোবাইল টিম ভ্রাম্যমাণ আদালত হাজির হয়ে যাবে। সুতরাং আপনারা অপরাধীদের অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে মোকাবেলা করবেন।
পুলিশ ও আনসার সদস্যদের উদ্দেশে ডিআইজি বলেন, কোনো আনসার ও পুলিশ সদস্য ভোট গণনার সময় থাকবেন না। সেখানে পোলিং এজেন্ট ও নির্বাচন কমিশনের ভোট গ্রহণ কর্মকর্তারা থাকবেন। আপনারা গণনাস্থলের বাইরে কর্ডন করে রাখবেন। এ সময় তিনি নির্দেশ দিয়ে বলেন, কোনো পোলিং এজেন্ট গণনার সময় যেন মোবাইল ফোন ব্যবহার করতে না পারে। কেউ বাইরে এলে তিনি আর গণনাকক্ষে যেতে পারবেন না। বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে আনসার ও পুলিশ সদস্যদের। আনসার ও পুলিশ সদস্যরা কখনোই কোনো সিল হাতে নেবেন না। যদি কারো বিরুদ্ধে এ ধরনের অভিযোগ পাওয়া যায়, তাহলে তার চাকরি থাকবে না। কেন্দ্রে দায়িত্বপ্রাপ্তরা মোবাইল টিমের সাথে সমন্বয় করে চলবেন। সকালের দিকে সাধারণত ভিড় বেশি হয় ভোটারদের। তাই তাদের লাইন করে দেবেন।
তিনি আনসার ও পুলিশ সদস্যদের নির্দেশ দিয়ে বলেন, আপনারা কোনো প্রার্থী, সাধারণ মানুষ, ভোটার কিংবা পরিচিত লোকজনের কাছে কোনো ধরনের অর্থ গ্রহণ করবেন না। কিংবা তাদের দেয়া খাবার খাবেন না। কারো কাছে কিছুই খাবেন না। পান-সিগারেট, চা-ও না। আমরা যে নগদ টাকা দেবো তা থেকেই খাবেন। প্রয়োজনে সকালে ভালো নাশতা করে নিয়ে দুপুরে কলারুটি খাবেন। তারপর রাতে খাবেন। তিন দিন পেটভরে না খেলেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা তাদের দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করতে পারবেন। তাই যদি না খেয়েও থাকতে হয়, তবু কারো কাছ থেকে খাবেন না।
ডিআইজি আনসার ও পুলিশ সদস্যদের সাবধান করে দিয়ে বলেন, প্রতি সেকেন্ডে আপনাদের কর্মকাণ্ড ভিডিও হবে। দেশ-বিদেশে শত শত ক্যামেরার পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও সাধারণ মানুষের ক্যামেরা থাকবে আপনাদের দিকে। সুতরাং কেউ দায়িত্ব পালনে অবহেলা করা মাত্রই তা ক্যামেরাবন্দী হবে। এতে আপনাদের চাকরির সমস্যা হবে।
পরে পুলিশ লাইন মাঠ থেকে আনসার ও পুলিশ সদস্যদের প্রয়োজনীয় সরঞ্জামা দিয়ে বিভিন্ন কেন্দ্রে পাঠানো হয়।
এ দিকে দুপুরে রংপুর পায়রা চত্বরে অনুষ্ঠিত হয় র‌্যাবের বিশেষ মহড়া। এ সময় র‌্যাব-১৩-এর কমান্ডার আতিকুল্লাহ বলেন, আমাদের ৩৩টি টিম মাঠে থাকবে। প্রতিটি ওয়ার্ডে আমরা নিñিদ্র নিরাপত্তা বলয় তৈরি করেছি। কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনাকে আমরা বরদাশত করব না।
এ দিকে সন্ধ্যায় নির্বাচনের সার্বিক প্রস্তুতির বিষয়ে আঞ্চলিক নির্বাচন কার্যালয়ে ব্রিফিং করেন রিটার্নিং কর্মকর্তা সুভাষ চন্দ্র সরকার।
গণমাধ্যম কর্মী : রংপুর সিটি করপোরেশন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় এখানে দেশী-বিদেশী বিভিন্ন সংস্থার পর্যবেক্ষক টিম এসেছে। এ ছাড়া এসেছেন ঢাকা থেকে এবং দেশের বাইরে থেকে পাঁচ শতাধিক বিভিন্ন ধরনের মিডিয়া কর্মী। ঢাকা থেকে ইলেকট্রনিকস মিডিয়াগুলোর ৩ থেকে ৪টি টিমও এসেছে। তারা বিভিন্ন স্পট থেকে লাইভ করছেন। একাত্তর টেলিভিশন বসিয়েছে স্টুডিও। এখান থেকে তারা দুইবার খবর পরিবেশন করছে। এ ছাড়া বিভিন্ন গণমাধ্যম কর্মীদের মিলনমেলায় পরিণত হয়েছে এখন রংপুর নগরী।
ফাঁকা নেই হোটেল : বাড়তি লোকজন আসার কারণে নগরীর বিলাসবহুল আবাসিক হোটেলগুলো থেকে সাধারণ আবাসিক হোটেলগুলোতেও তিল ধারণের জায়গা নেই। সব সিটেই অতিথিরা উঠেছেন। এ দিকে খাবার হোটেলগুলোর খাবারও ফুরিয়ে যাচ্ছে সময়ের অনেক আগেই। তারা বাড়তি খাবার বানিয়েও কুলিয়ে উঠতে পারছেন না।
রিটার্নিং কর্মকর্তা সুভাষ চন্দ্র সরকার নয়া দিগন্তকে জানান, ভোটের আগের দিন, পরের দিন এবং ভোটের দিন পুরো সিটিতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে এবং ভোটারদের নির্বিঘেœ ভোটকেন্দ্রে আসতে এবং ঘরে ফিরে যাওয়ার ব্যবস্থা করতে সাড়ে পাঁচ হাজার বিভিন্ন পর্যায়ের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যকে মোতায়েন করা হয়েছে। ভোটকেন্দ্র ছাড়াও ভোটকেন্দ্রের বাইরে মোবাইল টিম, স্ট্রাইকিং ফোর্স, স্ট্যান্ডবাই ফোর্স, মহাসড়কে রণপাহারা, চেকপোস্ট, সেক্টর ডিউটিসহ বিভিন্ন শিরোনামে এসব দায়িত্ব পালন করবেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। ইতোমধ্যে পুরো নগরী নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। বসানো হয়েছে চেকপোস্ট। তারা সন্দেহভাজন সব যানবাহন এবং লোকদের তল্লাশি করছে। র‌্যাব ও বিজিবি মহড়া দিচ্ছে নগরীর প্রত্যেকটি সড়কে। তারা অস্ত্র হাতে সতর্ক পাহারা দিচ্ছে। সব মিলে ভিন্ন রকম একটি নগরীর চিত্র দেখা যাচ্ছে এখন। নির্বাচন কমিশন এ নির্বাচনে মোট ১৯৩টি কেন্দ্রের মধ্যে ১২৮টিকেই গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে মাথায় নিয়ে এ আইনশৃঙ্খলা বিন্যাস করেছে। এ ছাড়া নির্বাচনে ১১ জন জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে ১১টি এবং ৩৩টি ওয়ার্ডে একজন করে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্র্রেটের নেতৃত্বে ৩৩টি ভ্রাম্যমাণ আদালত, ২১ প্লাটুনসহ মোট ৫২৫ জন বিজিবি ও ৩৩টি র‌্যাবের টিমে ২৬৪ জন র‌্যাব সদস্য কাজ করবেন মাঠে। মঙ্গলবার থেকেই অনেক জায়গায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে। গতকাল দুপুরের মধ্যেই বাকি সব আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জনবল মাঠে মোতায়েন করা হয়েছে।
রংপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনকে নির্বিঘœ করতে গঠিত হাই প্রোফাইল মনিটরিং টিমের আহ্বায়ক বিভাগীয় কমিশনার কাজী হাসান আহমেদ নয়া দিগন্তকে জানান, সুষ্ঠু. নিরপেক্ষ এবং গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য আমরা সর্বাত্মকভাবে প্রস্তুত। আমাদের কাছে সবাই সমান। এখন শুধু ভোটার এবং প্রার্থীরা আইন মেনে ভোট প্রদান করবেন এবং ফলাফল মেনে নিলেই আমাদের সার্থকতা। ২১ডিসেম্বর২০১৭,বৃহস্পতিবার:ক্রাইমর্বাতাডটকম/প্রতিনিধি/আসাবি

Please follow and like us:
Facebook Comments