রংপুর সিটি নির্বাচন- উৎসবের ভোটে লাঙ্গলের জয়,আমার কাছে সব দলের সব মতের মানুষ নিরাপদ থাকবে : নবনির্বাচিত মেয়র মোস্তফা

ভোট কেন্দ্র ১৯৩টি : প্রাপ্তফল ১৯৩টির : প্রাপ্ত ভোট:- লাঙ্গল- ১৬০৪৮৯, নৌকা- ৬২৪০০, ধানের শীষ -৩৫১৩৬, হাত পাখা-২৪০০৬ 

 মোহাম্মদ নুরুজ্জামান রংপুর:  রংপুর সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে লাঙ্গল প্রতীক নিয়ে জাতীয় পার্টির প্রার্থী মোস্তাাফিজার রহমান মোস্তফা বিপুল ভোটের ব্যবধানে জয় পেয়েছেন। ভোটের হিসেবে দ্বিতীয় অবস্থানে আওয়ামী লীগ সমর্থিত নৌকার প্রার্থী সরফুদ্দিন আহম্মেদ ঝন্টু। আর তৃতীয় অবস্থানে বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী ধানের শীষ প্রতীকের কাউসার জামান বাবলা।

নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, রংপুর সিটি কর্পোরেশনে মোট ভোটার সংখ্যা ৩ লাখ ৯৩ হাজার ৯ শ’ ৯৪। ১৯৩টি কেন্দ্রে তারা ভোট দিয়েছেন। এবার ৭৩ দশমিক ৩০ ভাগ ভোটার তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন। প্রাপ্ত ফলাফলে দেখা গেছে বিজয়ী  জাতীয় পার্টির লাঙ্গল প্রতীক পেয়েছে- ১৬০৪৮৯ ভোট, নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বি আওয়ামী লীগের নৌকা পায় ৬২৪০০ভোট, বিএনপির ধানের শীষের প্রাপ্ত ভোটের সংখ্যা-৩৫১৩৬ এবং ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলনের হাতপাখা প্রতীক ২৪০০৬  ভোট পায়। বিজয়ী লাঙ্গলের সঙ্গে নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বি নৌকার ভোটের পার্থক্য প্রায় এক লাখ। এদিকে কারচুপির অভিযোগ এনে নির্বাচন বয়কট করেছেন বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী।

এর আগে গতকাল সকাল ৮টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত ভোটগ্রহণ চলে। ভোট গ্রহণের সময় বড় ধরণের কোন ঘটনা ঘটেনি। তবে বিচ্ছিন্নভাবে কিছু ঘটনা লক্ষ করা গেছে বিভিন্ন ভোট কেন্দ্রে।

দৈনিক সংগ্রামের প্রতিবেদক বিকেল পৌনে ৪ টায় ৩ নং ওয়ার্ডের উত্তম স্কুল এন্ড কলেজ কেন্দ্রে গিয়ে দেখেন সেখানকার মহিলা ভোট কেন্দ্রের একটি ভোট কক্ষের গোপন কক্ষে না গিয়েই ভোটাররা প্রকাশ্যে সিল মেরে ব্যালট বাক্সে ব্যালট ঢুকাচ্ছেন। এছাড়াও সেখানে খুব ধীর গতিতে ভোট হওয়ার অভিযোগ করেছেন ভোটাররা। ওই কেন্দ্রে লাঙ্গলের এজেন্ট থাকলেও নৌকা, ধানের শীষসহ অনেকেরই এজেন্ট দেখা যায় নি।

এ বিষয়ে ওই কেন্দ্রের প্রিজাইটিং অফিসার টিটিসির শিক্ষক গোলাম ফারুক জানেিয়ছেন, বিষয়টি লক্ষ্য না করার কারণে হয়েছে। তবে নলেজে আসা মাত্রই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তিনি জানান, ওই কেন্দ্রে ১ হাজার ৯৫৩ ভোটের মধ্যে পৌনে ৪ টা পর্যন্ত প্রায় ৮০ ভাগ ভোট দেওয়া হয়েছে। কোন ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি তার কেন্দ্রে।

দুপুর পৌনে ২ টায় ১৪ নং ওয়ার্ডের দেওডোবা জামালিয়া সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে গিয়ে দেখা গেছে সেখানে ভোটাররাদের ভীড় লেগেই আছে। ওই কেন্দ্রের প্রিজাইটিং অফিসার অগ্রনী ব্যাংকের সিনিয়র অফিসার মাহফুজুর রহমান জানান, ওই কেন্দ্রে ভোটার সংখ্যা ২ হাজার ২৯৭ জন। এরমধ্যে পৌনে ২ টা পর্যন্ত ৭০ ভাগ ভোট পোল হয়েছে। ১৫ নং ওয়ার্ডের ফতেহপুর উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে গিয়ে দেড়টায় গিয়ে দেখা গেছে সেখানে তেমন একটা ভোটার নেই। ওই কেন্দ্রের প্রিজাটিং অফিসার অগ্রনী ব্যাংকের সিনিয়র অফিসার এনামুল হক জানান,  তার কেন্দ্রে ভোটার সংখ্যা রয়েছে ২ হাজার ১৮৫। দেড়টা পর্যন্ত ভোট দেওয়া হয়েছে ৬৫ ভাগ।

এছাড়াও চারটার কিছু আগে ১৫ নং ওয়ার্ডের মডার্ন পাবলিক স্কুল কেন্দ্রে ডালিম প্রতীকের প্রাথী শাফিউল ইসলাম শাফীর সমর্থক শাহিন মিয়াকে ব্যাপক মারধোর করে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর লোকজন। এসময় সেখানে উত্তেজনা তৈরি হলে প্রশাসন গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। অন্যদিকে ১৯ নং ওয়ার্ডের রংপুর মেডিক্যাল কলেজ পাবলিক স্কুল কেন্দ্রে মেডিক্যাল কলেজ শাখার দুই ছাত্রলীগ নেতা জাল ভোট দিতে গিয়ে ধরা পড়লে তাদেরকে পুলিশের হাতে সোপর্দ করা হয়। অন্যদিকে ৩৩ নং ওয়ার্ডের আজিজুল্লাহ উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে দুই প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে ধাওয়া পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে।

বিএনপি প্রার্থী কাওছার জামান বাবলার প্রধান নির্বাচনী এজেন্ট শহিদুল ইসলাম মিজু অভিযোগ করেছেন, ১৫ নং ওয়ার্ডের ফতেহপুর উচ্চ বিদ্যালয়, ১৪ নং ওয়ার্ডের দেওডোবা জামালিয়া সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং ৯ নং ওয়ার্ডের একটি কেন্দ্রে  ধানের শীষের প্রতীকের এজেন্টকে বের করে দেয়া হয়েছে। এছাড়াও বিভ্ন্নি জায়গায় ইলেকশনকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করা হয়েছে। তবুও মানুষ স্বত:স্ফুর্তভাবে ভোট কেন্দ্রে গেছে। মানুষের অংশগ্রহনের কারনে ভোট প্রদানের সময় কোন কারচুপি করতে পারে নি ইলেকশন কমিশন। মানুষ বিএনপির ধানের শীষে নিরব ভোট বিপ্লব ঘটিয়ে দিয়েছে। এখন ভোট গননার সময় যদি কোনভাবে ইঞ্জিনিয়ারিং করা হয় তাহলেই কেবল আমাদের প্রার্থীর বিজয় ঠেকানো সম্ভব।

এর বাইরে লাঙ্গল প্রতীকের প্রার্থী মোস্তাফিজার রহমান মোস্তফার প্রধান নির্বাচনী এজেন্ট এসএম ইয়াসির অভিযোগ করেছেন, কেরামতিয়া স্কুল এন্ড কলেজে বেলা ১২ টায় যুবলীগ ও ছাত্রলীগের বাহিনী ভোটারদের মাঝে প্রভাব বিস্তার করে জাল ভোট দেয়ার চেষ্টা করে। পরে আমরা সেখানে গিয়ে বিষয়টি প্রতিহত করি। এছাড়াও দুপুরের পড়ে মেডিকেল কলেজ কেন্দ্রে মেডিকেল কলেজ ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা প্রভাব বিস্তার করার চেষ্টা করে। এসময় বেশ উত্তেজনা তৈরি হয় সেখানে।

এদিকে কঠোর নিরাপত্বা বলয়ে সাধারণ ভোটাররা ভোট কেন্দ্রে ভীড় জমিয়েছিলেন কেস্ট শিষ্টে। তবে যানবাহন সংকটের মধ্যে পড়েন ভোটাররা। নগরীর প্রধান সড়কে দুই একটি অটো রিকশা ও রিকশা দেখা গেলেও কড়া নিরাপত্ত্বার কারনে লিংক সড়কগুলোতে অন্য কোন যানবাহন চলেনি। ফলে ভোটাররা করে ভোট কেন্দ্রে পৌঁছেছেন। অটো রিকশা মাঝে মধ্যে চললেও তা তল্লাশীর  পাল্লায় পড়ছে।

রংপুর পুলিশ সুপার মিজানুর রহমান জানান, নির্বিঘœ ভোট নিশ্চিত করতে সাড়ে পাঁচ হাজার বিভিন্ন পর্যায়ের আইনশৃংখলা বাহিনীর সদস্যকে মোতায়েন করা হয়েছে। ভোট কেন্দ্র ছাড়াও ভোট কেন্দ্রের বাইরে মোবাইল টিম, স্ট্রাইকিং ফোর্স, স্ট্যান্ডবাই ফোর্স, মহাসড়কে রণ পাহারা, চেক পোস্ট, সেক্টর ডিউটিসহ বিভিন্ন শিরোনামে এসব দায়িত্ব পালন করছে আইনশৃংখলা বাহিনী।  পুরো নগরী নিচ্ছিদ্র নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেয় আইনশৃংখলা বাহিনী। তিনি আরও বলেন, এই নির্বাচনে ১১ জন জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে ১১ টি এবং ৩৩ টি ওয়ার্ডে  একজন করে নির্বাহী ম্যাজিষ্ট্রেটের নেতৃত্বে ৩৩ টি ভ্রাম্যমান আদালত, ২১ প্লাটুন মোট ৫২৫ জন বিজিবি ও ৩৩ টি র‌্যাবের টিমে ২৬৪ জন র‌্যাব সদস্য মাঠে কাজ করছে।

রংপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে রিটার্নিং কর্মকর্তা সুভাষ চন্দ্র সরকার জানান, রংপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে ১৯৩ টি ভোট কেন্দ্রের ১ হাজার ১২২ টি ভোট কক্ষে। এখানে ভোটার সংখ্যা প্রায় ৩ লাখ ৮৯ হাজার। এছাড়াও অস্থায়ী ভোট কক্ষ ছিল ১৬৬ টি।  এরমধ্যে ১২৮ টি কেন্দ্রকে ঝুকিপূর্ণ ধরা হয়েছে। এই নির্বাচনে ২৫ নম্বর ওয়ার্ডের বেগম রোকেয়া সরকারী কলেজ কেন্দ্রে ইভিএম দিয়ে ভোট গ্রহন ছাড়া সব কেন্দ্রে আগের মতোই ব্যালট ও সিলে ভোট গ্রহন করা হয়েছে। ভোট গ্রহনের জন্য নিয়োগ দেয়া হয়েছে ১৯৩ জন প্রিজাইটিং অফিসার, ১ হাজার ১২২ জন সহকারী প্রিজাইটিং অফিসার এবং ২ হাজার ২৪৪ জন পোলিং অফিসার। মোট ৩ হাজার ৫৫৯ জন ভোট গ্রহন কর্মকর্তা ভোট গ্রহন কাজে নিয়োজিত আছেন। এবার এই নির্বাচনে মেয়র পদের জন্য ৭ জন, ১১টি সংরক্ষিত কাউন্সিলর পদে ৬৫ জন এবং ৩৩ টি সাধারণ কাউন্সিলর পদে ২১১ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বীতা করছেন।

এবার রংপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে এবার মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বীতা করেছেন ৭ জন। এদের মধ্যে জাতীয় পার্টি মনোনিত মোস্তাফিজার রহমান মোস্তফা লাঙ্গল, আওয়ামীলীগ মনোনিত সরফুদ্দীন আহম্মেদ ঝন্টু নৌকা, বিএনপি মনোনিত কাওছার জামান বাবলা ধানের শীষ, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ মনোনিত এটিএম গোলাম মোস্তফা হাতপাখা, ন্যাশনাল পিপলস পার্টি মনোনিত সেলিম আখতার আম, বাসদ মনোনিত আব্দুল কুদ্দুস মই এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী হোসেন মকবুল শাহরিয়ার আসিফ হাতি প্রতিক নিয়ে নির্বাচনে অংশ নেন।

এদিকে ২৫ নং ওয়ার্ডের বেগম রোকেয়া সরকারী কলেজে কেন্দ্রের ইভিএম কেন্দ্রটির ফলাফল আগেই প্রকাশ করা হয়। সেখানে লাঙ্গল ৬৭৮, নৌকা ৩৩৪ এবং ১১৭ টি ধানের শীষের পায়।

বিএনপি প্রার্থীর ফল প্রত্যাখ্যান :

এদিকে ভোট কারচুপির অভিযোগ এনে রংপুর সিটি করপোরেশনের ফলাফল প্রত্যাখ্যান করেছেন বিএনপি প্রার্থী কাওসার জামান বাবলা। বৃহস্পতিবার রাতে তিনি ভোট প্রত্যাখান করেন। বিএনপি এই নির্বাচন টেস্ট কেস হিসেবে নিয়েছিল উল্লেখ করে বাবলা বলেন, বর্তমান সরকারের অধীনে কোনও নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে সম্ভব নয়।

বাবলা অভিযোগ করে বলেন, নির্বাচনী তফসিল ঘোষণার পর থেকেই আমরা ভেবেছিলাম নির্বাচন সুষ্ঠু হবে। কিন্তু তা আর হলো না। আজকে ভোটগ্রহণের শুরু থেকেই প্রায় সকল কেন্দ্রেই ভোটাদের উপস্থিতি ছিল অনেক কম। কারণ হিসেবে তিনি বলেন ভোটারদের মাঝে আতঙ্ক বিরাজ করেছিল। ভোট কেন্দ্রে গেলে তাদের জীবননাশের হুমকি দেয়া হয়েছিল। এ জন্যই হয়তো ভোটারদের উপস্থিতি কম ছিল।

তিনি অভিযোগ করে বলেন, পোলিং এজেন্টদের কেন্দ্রে ঢুকতে দেয়া হয়নি। ভোট গ্রহণ শুরুর অনেক পরে বিভিন্ন কেন্দ্রে আমাদের পোলিং এজেন্টদের ঢুকতে দেয়া হয়েছে। ভোটগ্রহণ চলাকালীন সময়ে দুপুর ২ টার দিকে ৩৩ নম্বর ওয়ার্ডে ব্যালট পেপারে প্রিসাইডিং অফিসারের সীল ও সই কিছুই ছিল না বলেও অভিযোগ করেন তিনি। তিনি বলেন, প্রিসাইডিং অফিসারের সাথে তাৎক্ষণিক এ বিষয়ে কথা বললে তিনি ঠিক করে দিচ্ছেন বলে ১ ঘণ্টা পরেও জেনেছি তা ঠিক করেন নি।

বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রে ইভিএমের মাধ্যমে ভোট গ্রহণ দেখতে গিয়ে সেখানে জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারের সঙ্গে দেখা হলে ৩৩ নম্বর ওয়ার্ডের ভোট জালিয়াতি কিংবা অনিয়মের কথা জানালে তারা পদক্ষেপ নেবেন বলে আশ^স্ত করেন। জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তাকে জানালে তিনিও পদক্ষেপ নেবেন বলে জানান। কিন্তু কেউই কোন পদক্ষেপ নেননি।

Please follow and like us:
Facebook Comments