আল্লাহর ওলিদের নেতা বড় পীর হজরত আবদুল কাদের জিলানী (র.)-এর ওফাত দিবস পবিত্র ফাতেহা-ই-ইয়াজদাহম আজ

স্টাফ রিপোর্টার: যথাযোগ্য মর্যাদায় আজ শনিবার সারাদেশে পবিত্র ফাতেহা-ই-ইয়াজদাহম উদযাপন করা হবে। বড় পীর হজরত আবদুল কাদের জিলানি (র.)-এর ওফাত দিবস বিশ্বের মুসলমানদের কাছে ‘ফাতেহা-ই-ইয়াজদাহম’ নামে পরিচিত।
‘ইয়াজদাহম’ ফারসি শব্দ, যার অর্থ এগারো। ‘ফাতেহা-ই-ইয়াজদাহম’ বলতে রবিউস সানি মাসের এগারো-এর ফাতেহা শরিফকে  বোঝায়।
এ দিবসটি উপলক্ষে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে শনিবার সন্ধ্যায় বায়তুল  মোকাররম জাতীয় মসজিদে আলোচনা সভা ও মিলাদ মাহফিল অনুষ্ঠিত হবে।
মিলাদ মাহফিলে ওয়াজ করবেন বায়তুল  মোকাররম জাতীয় মসজিদের সিনিয়র  পেশ ইমাম হাফেজ মাওলানা মুহাম্মদ মিজানুর রহমান। মাহফিলে সভাপতিত্ব করবেন ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক সামীম  মোহাম্মদ আফজাল।

আল্লাহর ওলিদের নেতা বড় পীর হজরত আবদুল কাদের জিলানী (র.)-এর ওফাত দিবস উপলক্ষে মুসলিম জাহানজুড়ে উদ্যাপিত ফাতিহা অনুষ্ঠান ‘ফাতিহা-ই-ইয়াজদাহম’ নামে পরিচিত। ‘ইয়াজদাহম’ ফারসি শব্দ, যার অর্থ এগারো; ‘ফাতিহা-ই-ইয়াজদাহম’ বলতে এগারো-এর ফাতিহা শরিফকে বোঝায়। এককথায় রবিউস সানি মাসের ১১ তারিখের ইছালে সওয়াব মিলাদ মাহফিলকে ‘ফাতিহা-ই-ইয়াজদাহম’ বলে। তা ফারসি ভাষার প্রভাবে বাংলাদেশ-ভারত-পাকিস্তান উপমহাদেশসহ আফগানিস্তান, ইরান, বৃহৎ রাশিয়ার মুসলিম-অধ্যুষিত অঞ্চল, ইরাক প্রভৃতি স্থানে ‘ফাতিহা-ই-ইয়াজদাহম’ অর্থাৎ এগারো-এর ফাতিহা নামে উদ্যাপিত হয়। আউলিয়ায়ে কিরাম মুমিন বান্দাদের জীবনচরিত আলোচনাকালে আল্লাহর রহমত ও বরকত নাজিল হয়। তাই মুসলিম সমাজে ফাতিহা-ই-ইয়াজদাহমের গুরুত্ব ও তাৎপর্য অপরিসীম।
নবী-রাসুলদের অবর্তমানে এমন এক যুগসন্ধিক্ষণে সমাজে মানুষ যখন ধর্মীয় অনুশাসন ভুলে গিয়ে দুর্নীতি, অন্যায়, অত্যাচার, পাপাচার ও ব্যভিচারে লিপ্ত হয়, তখনই আল্লাহর নির্দেশিত পথ দেখানোর জন্য আল্লাহর ওলিরা পৃথিবীতে আগমন করেন। মুসলিম জাতি যখন সত্য ও সুন্দরের পথ ভুলে আঁধারের পথে হারিয়ে যাচ্ছিল, তখন আল্লাহ তাআলা বড় পীরকে পৃথিবীতে পাঠান। তিনি মুসলমানদের নতুন করে ইসলামের আলোকিত পথ দেখিয়ে দেন। তাই আউলিয়া কিরামের মধ্যে বড় পীরের কোনো তুলনা হয় না।
ওলিকুল শিরোমণি ১০৭৭ খ্রিষ্টাব্দ মোতাবেক ৪৭০ হিজরি সালের ১ রমজান ইরাকের বাগদাদের প্রায় ৪০০ মাইল অদূরে জিলান নগরের সুবিখ্যাত সাইয়্যেদ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম হজরত সাইয়্যেদ আবু সালেহ মুসা। মাতার নাম উম্মুল খায়ের ফাতেমা। তাঁর বাবার বংশ হজরত ইমাম হাসান (রা.)-এর সঙ্গে এবং মায়ের বংশ হজরত ইমাম হোসাইন (রা.)-এর সঙ্গে মিলিত হয়; এ কারণে তাঁকে ‘আল-হাসানি ওয়া আল-হোসাইনি’ বলা হয়। পিতৃকুল-মাতৃকুল উভয় দিক থেকেই হজরত আলী (রা.)-এর বংশধর অর্থাৎ মহানবী (সা.)-এর বংশধর। ইসলামকে নতুন জীবন দেওয়ার জন্য তিনি পরবর্তী সময়ে হজরত মুহিউদ্দিন আবদুল কাদের (র.) নামে পরিচিতি লাভ করেন। জিলান শহরের অধিবাসী বিধায় তাঁর নামের শেষে ‘জিলানী’ উপাধি সংযুক্ত করা হয়েছে।
শৈশব থেকেই তিনি ছিলেন অত্যন্ত উন্নত চরিত্রের অধিকারী। কৈশোরের একটি সত্যবাদিতার বাস্তব ঘটনা তাঁর অসাধারণতার প্রমাণ দেয়। একদা তাঁর মা লেখাপড়ার জন্য বিদেশ গমনের সব ব্যবস্থা করে ৪০টি স্বর্ণমুদ্রা গোপনে সংরক্ষণ করে দিয়ে বললেন, ‘বাবা আবদুল কাদের, বিপদ যতই কঠিন হোক না কেন, আল্লাহর ওপর ভরসা রাখবে। সদা সত্য কথা বলবে, কখনো মিথ্যা কথা বলবে না।’
তিনি বাগদাদের উদ্দেশে বণিক কাফেলার সঙ্গে পথ চললেন। একপর্যায়ে বণিক কাফেলা ডাকাত দলের কবলে পড়লে সব মালপত্র লুণ্ঠিত হয়। ডাকাত দল যাত্রীদের সব অর্থকড়ি কেড়ে নিয়ে বালক হজরত আবদুল কাদের জিলানী (র.)-এর কাছে এসে বলল: ‘এই ছেলে! তোমার কাছে কী আছে?’ বালক উত্তর দিল, ‘আমার জামার আস্তিনের ভেতর ৪০টি স্বর্ণমুদ্রা আছে।’ বালক অত্যন্ত শান্ত অথচ দৃঢ় কণ্ঠে ডাকাতদের বলল: ‘আমার আম্মা আমাকে বিদায়কালে উপদেশ দিয়ে বলেছেন, “বাবা, কখনো মিথ্যা কথা বলবে না, সদা সত্য কথা বলবে।” তাই আমি আপনাদের কাছে সত্য কথা বলে দিয়েছি। আমার মাতৃ-আজ্ঞা পালন করেছি।’
বালকের মুখে এমন জবাব শুনে ডাকাত-সর্দার দারুণ ভয় পেল। এক অদৃশ্য মহাসত্তার ভয়ে তার অন্তর কেঁপে উঠল। ডাকাত-সর্দার বালকের পায়ে লুটিয়ে পড়ল, অনুনয়-বিনয় করে ক্ষমা চাইল। ডাকাত-সর্দার তাঁর সত্যবাদিতার পরিচয় পেয়ে যাত্রীদের প্রত্যেকের অর্থকড়ি ও মালামাল ফিরিয়ে দেয় এবং তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা রেখে মুসলমান হয়ে যায়।
আল্লাহর বাণী ও মিষ্টভাষী বক্তৃতা দিয়ে বড় পীর কোটি কোটি মানুষকে ইসলামের পথে ফিরিয়ে আনেন এবং সমকালীন বিশ্বে আউলিয়া কিরামের ওপর সুউচ্চ মর্যাদা লাভ করেন। সারা বিশ্বের মধ্যে তাঁর ভক্ত ও মুরিদের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি বলে খ্যাতি ছিল। আল্লাহ তাঁকে সব ওলির চেয়ে অধিক কারামতি দান করেছিলেন। ফলে তিনি আল্লাহর দ্বীনকে দুনিয়াতে ছড়িয়ে দেওয়ার ক্ষমতা অর্জন করেছিলেন। ইসলামের চির আলোকময় পথে ডাকার জন্য তিনি অনেক ওয়াজ-নসিহতও করেছেন; যাতে ছিল বিস্ময়কর প্রভাব। তাঁর প্রতিটি কথা মানুষের হূদয়ে দারুণভাবে গেঁথে যেত, তাঁদের পরকালের চিন্তায় বিভোর করে তুলত। আর সত্যিই একমাত্র আল্লাহকে সন্তুষ্ট করার জন্য হূদয়ের অন্তস্তল থেকে যে কথা বেরিয়ে আসে, তা মানুষের অন্তরে গভীরভাবে রেখাপাত না করে পারে না।
তিনি শরিয়ত ও মারিফতের ওপর অনেক ধর্মীয় কিতাব রচনা করে গেছেন। তাঁর লিখিত গ্রন্থাবলির মধ্যে গুনিয়াতুত তালেবিন ও ফাতহুল গায়ব বিশেষভাবে প্রসিদ্ধ; যাতে শরিয়তের মাসআলা-মাসায়েল ও তরিকতের নসিহত রয়েছে। এ ছাড়া ফাতেহ রব্বানী ও কাছিদায়ে গাওছিয়া উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ। এগুলো ফারসি, উর্দু, বাংলাসহ বিভিন্ন ভাষায় প্রকাশিত হয়ে মুসলিম সমাজে বিশেষভাবে সমাদৃত।
সারা জীবন পথহারা মানুষকে সঠিক পথের সন্ধান দিয়ে আল্লাহ প্রেমিক মহান সাধক, ওলিকুল শিরোমণি ১১৬৮ খ্রিষ্টাব্দ মোতাবেক ৫৬১ হিজরির ১১ রবিউস সানি ৯১ বছর বয়সে পরলোকগমন করেন। সারা বিশ্বের লাখ লাখ মুসলমান আজও আলোর পথের সেই মহান দিশারিকে ‘ফাতিহা-ই-ইয়াজদাহম’ উপলক্ষে ওরস, ফাতিহা, ওয়াজ মাহফিল, আলোচনা সভা, কাছিদায়ে গাওছিয়া আদায় করে স্মরণ করেন।
ড. মুহাম্মদ আবদুল মুনিম খান: বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, গবেষক ও কলাম লেখক।
dr.munimkhan@yahoo.com

Please follow and like us:
Facebook Comments