বাদ পড়ছেন বিতর্কিত শতাধিক এমপি : কপাল খুলছে জনপ্রিয়দের অভিযোগ তদন্তে মাঠে যাচ্ছে ১৫টি টিম * অনেককে আগাম সবুজ সংকেত, বিকল্পদের প্রস্তুত থাকার নির্দেশ

ক্রাইমবার্তা ডেস্করিপোর্ট:একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী বাছাই শুরু করেছে আওয়ামী লীগ। বিতর্কিত শতাধিক এমপির আসনে জনপ্রিয় প্রার্থীদের খুঁজছে দলটি। অনেককে সবুজ সংকেত দেয়া হয়েছে। ভুল শুধরাতে বিতর্কিত অনেক এমপি ধরনা দিচ্ছেন আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের কাছে। আর এই সুযোগের সদ্ব্যবহার করতে মাঠে আরও সক্রিয় হয়েছেন দলটির জনপ্রিয় দাবিদার মনোনয়নপ্রত্যাশীরা।

জানা যায়, সরকারের বিভিন্ন সংস্থা ও দলীয় রিপোর্টের ওপর ভিত্তি করে মনোনয়নের একটি খসড়া তালিকা প্রস্তুত করেছেন আওয়ামী লীগ সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। যেখানে বিতর্কিত এমপিদের আমলনামাসহ মনোনয়নপ্রত্যাশী নতুনদের ভালো-মন্দ ঠাঁই পেয়েছে। বেরিয়ে এসেছে এমপি না হয়েও ইতিমধ্যে নির্বাচনী এলাকায় জনপ্রিয়তা অর্জন করেছেন যারা। আছে কাদের জয়ের সম্ভাবনা। সূত্র বলছে, তালিকার একটি অংশজুড়ে আছে নেতিবাচক ইমেজে আচ্ছাদিত বেশ কিছুসংখ্যক এমপির হালচাল। কারা একেবারে জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছেন, সিন্ডিকেট আর স্বজনপ্রীতির আশ্রয় নিয়ে কারা ব্যক্তিস্বার্থে জনস্বার্থ লঙ্ঘন করেছেন, নানা বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের জন্য এমপি-মন্ত্রী হয়েও মাঠ পর্যায়ে অনেকটা জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছেন- এমন ব্যক্তিদের নামও আছে এ তালিকায়। জানা গেছে, এ রকম বিপদসংকুল আসনগুলোতে নতুন মুখ তালাশ করা হচ্ছে। এছাড়া ক্ষমতার অপব্যবহার করে ক্যাডার বাহিনী গড়ে তুলে যারা জমি দখল, সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা, দখলবাজি, নিয়োগ-বদলি বাণিজ্য, টিআর-কাবিখা প্রকল্প লুটপাট, টেন্ডারবাজি, কমিশন বাণিজ্য ছাড়াও সব মিলিয়ে এলাকায় ত্রাসের রাজস্ব কায়েম করেছেন- তাদের এক রকম কালো তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। অবশ্য আশার কথা, এসব আসনে বিতর্কিত এমপিদের শূন্যতা পূরণে অনেক ত্যাগী ও জনপ্রিয় নেতা তৈরি হয়েছেন। দলের অনেকে মনে করেন, এসব নেতাকে মনোনয়ন দেয়া হলে নির্বাচনী ফল ভালো হবে। তবে পূর্বশর্ত হল- নির্বাচনের আগে দলীয় কোন্দল একেবারে সমূলে উৎপাটন করতে হবে।

প্রসঙ্গত, জনপ্রিয় প্রার্থীদের মনোনয়নের বিষয়ে দলের বিভিন্ন বৈঠকে শেখ হাসিনা একাধিকবার বলেন, বিতর্কিত কাউকে মনোনয়ন দেয়া হবে না। ফলে এ জনপ্রিয় মনোনয়নপ্রত্যাশীদের ভাগ্য সুপ্রসন্ন হওয়ার সম্ভাবনা অনেকটা উজ্জ্বল।

আওয়ামী লীগের ধানমণ্ডির কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, ২৬ জানুয়ারি থেকে সফরে যাওয়া টিমের নানা পর্যবেক্ষণে সম্ভাবনাময় প্রার্থীদের তুলে আনবেন সংশ্লিষ্টরা। এছাড়া বিভিন্ন সময়ে কেন্দ্রে জমা পড়া এমপিদের বিরুদ্ধে হাজারও অভিযোগের ফাইলও থাকবে নেতাদের হাতে। সফরে গিয়ে এসব অভিযোগের চুলচেরা বিশ্লষণ করবেন তারা। শুনবেন অভিযোগ নিয়ে সাধারণ মানুষের মতামতও। একান্ত বৈঠক করবেন নেতাকর্মীদের সঙ্গে। আর এসব অনুসন্ধান ও বিশ্লেষণ থেকে পাওয়া সারসংক্ষেপের ভিত্তিতে প্রতিবেদন প্রস্তুত করা হবে। তবে মনোনয়ন প্রদানে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে সংশ্লিষ্ট মনোনয়ন বোর্ড।

এদিকে প্রাথমিক অনুসন্ধানে বিতর্কিত প্রায় শতাধিক এমপিকে চিহ্নিত করা হয়েছে। তাদের আসনে বিকল্প প্রার্থীদের প্রস্তুত থাকার নির্দেশনাও গেছে কেন্দ্র থেকে। সবুজ সঙ্কেত পেয়ে কাজও শুরু করেছেন অনেকে।

সমালোচিত ও ব্যর্থ এমপিদের আগামী নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন দেয়া হবে না জানিয়ে আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য লে. কর্নেল (অব.) ফারুক খান  বলেন, আগামী নির্বাচনে দলীয় মনোনয়নের জরিপ কাজ চলছে। ২৬ জানুয়ারি থেকে ১৫টি টিম মাঠে কাজ করবে। তারাও একটি রিপোর্ট কেন্দ্রে জমা দেবেন। তৃণমূল থেকেও নাম আসবে। ইতিমধ্যে কেন্দ্র থেকে অনেককে সবুজ সঙ্কেত দেয়া হচ্ছে এলাকায় কাজ করতে। পর্যায়ক্রমে আরও অনেককে সবুজ সঙ্কেত দেয়া হবে। তবে মনোনয়ন চূড়ান্তের বিষয়টি নির্ভর করবে জনপ্রিয়তা ও নেতাকর্মী সম্পৃক্ততার ওপর। দলের ভাবমূর্তি ক্ষুণœ হয় এমন কাউকে মনোনয়ন দেয়া হবে না বলেও জানান ফারুক খান।

সম্প্রতি বিরোধপূর্ণ বিতর্কিত ও দলের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করা এমপি ও নেতাদের ঢাকায় ডেকে এনে কঠোর নির্দেশনা দিয়েছেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। এ প্রসঙ্গে গত সপ্তাহে তিনি  বলেন, আগামী নির্বাচনে বিতর্কিত ও অগ্রহণযোগ্য কাউকেই মনোনয়ন দেয়া হবে না। আমাদের অনেক ভুল আছে, তা সংশোধন করতে হবে। এখনও অনেক পথ পাড়ি দিতে হবে। তবে নিজ নিজ এলাকায় যেসব এমপি বিতর্কিত, আগামী সংসদ নির্বাচনে তাদের মনোনয়ন দেয়া হবে না। বিতর্কিত এমপিদের আসনে বিকল্প প্রার্থী খোঁজা হচ্ছে বলেও জানান তিনি।

এদিকে তথ্যানুসন্ধানে মাঠপর্যায় থেকে বেশ কয়েকজন এমপির বিষয়ে নেতিবাচক অনেক অভিযোগ পাওয়া যায়। সংশ্লিষ্ট আসনগুলোতে দলের বিকল্প ও জনপ্রিয় দাবিদার প্রার্থীরাও নড়েচড়ে বসেছেন। আগামী নির্বাচনে দলের আসন ধরে রাখতে মরিয়া তারা। কেউ কেউ কেন্দ্রের সবুজ সঙ্কেত পেয়ে জোরেশোরে প্রচারণা চালাচ্ছেন। অবশ্য তাদের সিটিং এমপি ও তার লোকজনের পক্ষ থেকে প্রবল বাধাও সামাল দিতে হচ্ছে।

নেত্রকোনা-২ আসনের এমপি যুব ও ক্রীড়া উপমন্ত্রী আরিফ খান জয়। অনুষ্ঠানের ব্যানারে নিজের নাম না থাকায় নিজ মন্ত্রণালয়ের এক যুগ্মসচিবের কক্ষ ভাঙচুর ও আরেক সিনিয়র সহকারী সচিবের কক্ষে তালা দেয়ার অভিযোগটি দেশজুড়ে সমালোচনার ঝড় তোলে। দলও বিব্রত হয়। এ ছাড়া তার বিরুদ্ধে আদম পাচারের অভিযোগ আছে। নিজ এলাকায় ভাইদের আধিপত্যে কোণঠাসা দলীয় নেতাকর্মীরা। এ ছাড়া তার বিরুদ্ধে দলীয় নেতাকর্মী এবং পুলিশ পেটানোর অভিযোগও আছে। খেলার মাঠে পিস্তল বের করে বেশ সমালোচিত তিনি। আসনটিতে জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি ও জেলা পরিষদের সাবেক প্রশাসক মতিয়ুর রহমান খান গণসংযোগ করছেন। এ ছাড়া বর্তমান জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান প্রশান্ত রায়, জেলা আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক এমপি মুক্তিযোদ্ধা আশরাফ আলী খান খসরু, আওয়ামী লীগ নেতা কর্নেল (অব.) আবদুন নূর খান এবং নেত্রকোনা পৌরসভার মেয়র নজরুল ইসলাম খান প্রচারণা চালাচ্ছেন।

ঠাকুরগাঁও-২ আসনে বর্তমান সংসদ সদস্য জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মো. দবিরুল ইসলাম। এমপির ছেলের দাপটে এলাকার মানুষ অতিষ্ঠ। ছেলে ও তার বিরুদ্ধে জেলার বালিয়াডাঙ্গী উপজেলার সীমান্তবর্তী এলাকায় সংখ্যালঘু পরিবারের জমি দখলের অভিযোগ আছে। জমি ফেরত চাইতে গেলে ওই পরিবারের লোকজনের ওপর এমপির বাহিনী হামলা করে। এ ছাড়া দলের বাইরে একটি বলয় সৃষ্টি ও তা দিয়ে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড পরিচালনার অভিযোগ স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাদের। দীর্ঘ দিন থেকে এমপি থাকা দবিরুলের এই আসনে নতুন প্রার্থী সন্ধান করছে আওয়ামী লীগ। আসনটিতে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেতে জোর কাজ করছেন জেলা সাংগঠনিক সম্পাদক মোস্তাক আলম টুলু। ব্যাপক গণসংযোগ আছেন তিনি। বালিয়াডাঙ্গী উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক চেয়ারম্যান প্রবীর কুমার রায়ও মনোনয়ন প্রত্যাশী। তিনিও মাঠে আছেন।

কুষ্টিয়া-৪ (খোকসা-কুমারখালী) আসনে আওয়ামী লীগের এমপি আবদুর রউফ। ব্রাজিল থেকে আমদানি করা গম গুদামে ঢুকতে না দেয়া নিয়ে আলোচনায় আসেন তিনি। এ নিয়ে বিব্রতবোধ হয় আওয়ামী লীগ। আগামীতে এই আসনে তার মনোনয়ন না পাওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।

আসনটিতে জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আলহাজ সদরউদ্দিন খান, খোকসা শহর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মিজানুর রহমান বিটু, সাবেক এমপি সুলতানা তরুণ প্রচার-প্রচারণায় এগিয়ে আছেন।

আওয়ামী লীগের মনোনয়ন প্রত্যাশী মিজানুর রহমান বিটু  বলেন, ‘দলে অনেকে বিতর্কিত প্রার্থী আছেন। তবে জনপ্রিয়তার বিচারে আমি অনেক এগিয়ে আছি। কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগ এবার জনপ্রিয় প্রার্থীদের প্রাধান্য দেবে। এ বিবেচনায় আমি মনোনয়ন প্রত্যাশী।’

নীলফামারী-৩ আসনে সরকারদলীয় এমপি গোলাম মোস্তফার বিরুদ্ধে ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা সনদ নেয়ার অভিযোগ স্থানীয় আওয়ামী লীগের। প্রথমবার এমপি নির্বাচিত হয়ে বিভিন্ন কাজে বিতর্কিত হয়ে পড়েছেন তিনি।

আসনটিতে গণসংযোগ করছেন জেলা আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক মমতাজুল হক। এছাড়া আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর ব্যারিস্টার তুরিন আফরোজও এলাকায় গণসংযোগে সময় দিচ্ছেন।

এদিকে সব অভিযোগ অস্বীকার করে এমপি গোলাম মোস্তফা বলেন, ‘আমাকে ঘায়েল করতে প্রতিপক্ষ নানা অপকৌশলের আশ্রয় নিচ্ছে।’ নিজেকে মুক্তিযোদ্ধা দাবি করে তিনি বলেন, ‘আমি শেখ হাসিনার উন্নয়নে এলাকা ভাসিয়ে দিয়েছি। এলাকার জনসমর্থন আমার প্রতি এত বেশি যে সমালোচকরা তার ধারেকাছেও নেই।’

কক্সবাজার-৪ (উখিয়া-টেকনাফ) আসনে বর্তমান সংসদ সদস্য আবদুর রহমান বদি। ইয়াবা সম্রাট হিসেবে বিশেষ পরিচিত পাওয়া বদিকে নিয়ে শুরু থেকেই বিব্রত আওয়ামী লীগ। অবৈধ সম্পদ অর্জনকারী বদির বিরুদ্ধে অভিযোগ এনেছে দুর্নীতি দমন কমিশন। এতে নিন্ম আদালত ৩ বছরের কারাদণ্ড দিলেও উচ্চ আদালত থেকে জামিনে আছেন তিনি। এছাড়া সন্ত্রাসী তৎপরতা, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, চোরাচালান, জমি দখলের অভিযোগ রয়েছে বদির বিরুদ্ধে। নিজ দলের নেতাকর্মীদের পাশ কাটিয়ে জামায়াত-শিবিরের সঙ্গে সখ্য গড়ায় কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগ নেতারাও তার ওপর বেজায় ক্ষুব্ধ।

আসনটিতে দলের প্রার্থী পরিবর্তন হওয়ার আভাসে প্রচার-প্রচারণায় নেমে পড়েছেন স্থানীয় আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতারা। এ সুযোগে সাবেক সংসদ সদস্য ও টেকনাফ উপজেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি অধ্যাপক মোহাম্মদ আলী নিজেকে গুছিয়ে নিচ্ছেন। এছাড়া কক্সবাজার জেলা পরিষদ সদস্য ও সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান শফিক মিয়া, জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি শাহ আলম ওরফে রাজা দলীয় মনোনয়নের জন্য প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন।

চট্টগ্রাম-১৫ (সাতকানিয়া-লোহাগাড়া) আসনের সংসদ সদস্য আবু রেজা মুহাম্মদ নেজামউদ্দিন নদভী। ৫ জানুয়ারি নির্বাচনের আগেও তিনি জামায়াত ঘরানার লোক হিসেবেই এলাকায় পরিচিত ছিলেন। তার শ্বশুর মোমিনুল হক চৌধুরী জামায়াতে ইসলামের কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য। দলীয় নেতাদের অভিযোগ, এমপি নদভী দল ও সরকারকে নয়, নিজেকে জাহির করতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন। উপজেলা পর্যায়ে দলের শীর্ষস্থানীয় নেতাদের বাদ দিয়ে নদভী দলে জামায়াত-শিবিরের লোকজন ভিড়িয়ে নিজস্ব বলয় সৃষ্টি করেছেন। আসনটিতে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় উপ-প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক আমিনুল ইসলাম আমিন ব্যাপক প্রচার-প্রচারণা চালাচ্ছেন। এছাড়া চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগ নেতা আবু সুফিয়ান, বনফুল গ্রুপের চেয়ারম্যান এমএ মোতালেব, স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদ (স্বাচিপ) নেতা আ ম ম মিনহাজুর রহমান গণসংযোগ করছেন।

স্থানীয় আওয়ামী লীগকে ধ্বংস করেছেন এমপি নদভী মন্তব্য করে লোহাগাড়া উপজেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি খোরশেদ আলম চৌধুরী শুক্রবার বলেন, এমপি নদভী আমাদের পার্টির কেউ নন। তাকে কেন্দ্র হায়ার করে এমপি বানিয়েছে। এমপি হয়ে তিনি জামায়াতের আদর্শ প্রতিষ্ঠা করতে তাদের চাকরি দিয়েছেন। স্থানীয় আওয়ামী লীগ কর্মীদের জেলে পুরেছেন, হামলা, নির্যাতন করেছেন।

খুলনা-৬ (কয়রা-পাইকগাছা) আসনে বর্তমান সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট নূরুল হক। তার বিরুদ্ধে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় জালিয়াতি ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগে মামলা হয়েছে। স্থানীয় এক আওয়ামী লীগ নেতার পরিবারকে বাড়ি থেকে উৎখাতের চেষ্টার অভিযোগ তার ও তার পরিবারের বিরুদ্ধে। উঁচু দেয়াল তুলে যাতায়াত বন্ধ করে দেয়া হয় সেই পরিবারের। অমানবিক এ বিষয়টি গণমাধ্যমে প্রকাশিত হলে আলোড়ন ওঠে দেশজুড়ে। এ নিয়ে বেকায়দায় পড়েন এমপি নুরুল হক। কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের হস্তক্ষেপে ওই দেয়াল ভাঙা হয়। এমপি নুরুল হক ভুল স্বীকার করে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদকের কাছে ভবিষ্যতে আর এমন কাজ না করার প্রতিশ্রুতি দেন। তবে আগামী নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ও স্থানীয় জনগণ তাকে সে সুযোগ দেবে বলে মনে করেন না নেতারা।

আসনটিতে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেতে দৌড়ঝাঁপ করছেন সাবেক এমপি অ্যাডভোকেট সোহরাব আলী সানা, প্রধানমন্ত্রীর অর্থনীতিবিষয়ক উপদেষ্টা ড. মসিউর রহমান, জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আক্তারুজ্জামান বাবু। তবে জনপ্রিয়তা থাকলেও বর্তমান এমপির মতো সাবেক এমপি অ্যাডভোকেট সোহরাব আলী সানা বিভিন্ন কারণে বিতর্কিত। সূত্র বলছে, এখন পর্যন্ত মনোনয়ন দৌড়ে এগিয়ে আছেন জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আক্তারুজ্জামান বাবু। শেষ পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ড. মসিউর রহমানও মনোনয়ন পেলে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না।

চট্টগ্রাম-১১ (হালিশহর-পতেঙ্গা) আসনে আওয়ামী লীগের এমপি এমএ লতিফ। কম্পিউটারে ফটোশপের মাধ্যমে নিজের শরীরের অংশের সঙ্গে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর মুখমণ্ডল লাগিয়ে তুমুল বিতর্কের জন্ম দেন তিনি। বিষয়টি নিয়ে ব্যাপকভাবে সমালোচিত হন এবং এতে আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতারা তার ওপর নাখোশ। এ আসনে চট্টগ্রাম নগর আওয়ামী লীগ নেতা খোরশেদ আলম সুজন, আলতাফ হোসেন চৌধুরী বাচ্চু দলীয় মনোনয়ন পেতে প্রচার-প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন।

টাঙ্গাইল-৩ আসনের এমপি আমানুর রহমান খান রানা। আলোচিত আওয়ামী লীগ নেতা ফারুক আহমেদ হত্যা মামলায় তিনি এখন কারাগারে আছেন। হত্যা মামলা ছাড়াও সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, জমি দখলসহ বিভিন্ন অভিযোগ তার বিরুদ্ধে।

আসনটিতে প্রার্থী পরিবর্তনের হাওয়া বইছে। সম্ভাবনাময় প্রার্থীরা বিবাদে জড়িয়ে পড়েছেন। তবে আসনটিতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি ডা. কামরুল হাসানের মনোনয়ন পাওয়ার সম্ভাবনা আছে। এ ছাড়া ঘাটাইল উপজেলা আওয়ামী লীগের আহ্বায়ক শহিদুল ইসলাম লেবু, টাঙ্গাইল জজকোর্টের সাবেক পিপি আওয়ামী লীগ নেতা অ্যাডভোকেট এস আকবর খান, শিল্পপতি সৈয়দ আবু ইউসুফ আবদুল্লাহ তুহিন প্রচারণা চালাচ্ছেন।

নরসিংদী-৫ (রায়পুরা) আসনের এমপি রাজিউদ্দিন আহমেদ রাজু নিজ এলাকায় বিতর্কিত। এলাকার নেতাকর্মীদের মূল্যায়ন না করে উল্টো তাদের ওপর হামলা-মামলার অভিযোগ আছে তার বিরুদ্ধে। আসনটিতে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির কার্যনির্বাহী সদস্য অ্যাডভোকেট রিয়াজুল কবীর কাওছার ব্যাপক গণসংযোগ করছেন। দলের হাইকমান্ডের নির্দেশনা পেয়েই তিনি কাজ করছেন বলে শোনা যাচ্ছে। এ বিষয়ে রিয়াজুল কবীর কাওছার শুক্রবার যুগান্তরকে বলেন, সাধারণ মানুষ চায় তাদের প্রিয় কেউ জনপ্রতিনিধিত্ব করুক। এ ছাড়া এখানকার অধিকাংশই তরুণ ভোটার। তাদের চাওয়া নতুন প্রজন্মের কেউ তাদের প্রতিনিধি হোক। তার দাবি, ‘এলাকার মানুষ আমাকে ভালোবাসে। আমি তাদের হয়ে কাজ করতে গণসংযোগ করছি। এখন মনোনয়ন দেয়ার এখতিয়ার দলীয় সভাপতির।’

ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৩ (সদর-বিজয়নগর) আসনে এমপি জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও বর্তমান সংসদ সদস্য র. আ. ম. উবায়দুল মোকতাদির চৌধুরী। নাসিরনগরে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বসতবাড়িতে হামলা, লুটপাট, অগ্নিসংযোগের বিস্তর অভিযোগ তার বিরুদ্ধে। এলাকায় দলের মধ্যে একাধিক গ্রুপ তৈরির অভিযোগ স্থানীয় আওয়ামী লীগের। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী প্রয়াত ছায়েদুল হকের সঙ্গে বিরোধে জড়ানোয় তাকে ভালো চোখে দেখছে না কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগ। আগামীতে আসনটিতে দলীয় মনোনয়ন হাতছাড়া হতে পারে মোকতাদির চৌধুরীর।

আসনটিতে জেলা আওয়ামী লীগের সিনিয়র সহসভাপতি ও সাবেক পৌর মেয়র মো. হেলাল উদ্দিন, ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা নাগরিক কমিটির সভাপতি ও জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি তাজ মো. ইয়াছিন শক্তিশালী প্রার্থী। জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ও সাবেক জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি শফিকুল আলম এমএসসিও প্রচারণা চালাচ্ছেন।

রাজশাহী-৫ (পুঠিয়া-দুর্গাপুর) আসনের সংসদ সদস্য আবদুল ওয়াদুদ দারা। সম্প্রতি স্থানীয় আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী একটি অংশ এলাকায় তাকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করে। এ ছাড়া তার বিরুদ্ধে দলীয় নেতাকর্মী বিচ্ছিন্ন ও জনসম্পৃক্ততা না থাকার অভিযোগ করছেন স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতারা। আছে বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগও। আসনটিতে জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি ও এমপি তাজুল ইসলাম মোহাম্মাদ ফারুক প্রচারণা চালাচ্ছেন।

ফেনী-২ (সদর) আসনের এমপি নিজাম উদ্দিন হাজারী। জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক তিনি। তার বিরুদ্ধে দলীয় নেতাকর্মী হত্যা, নির্যাতনসহ নানা অভিযোগ স্থানীয় আওয়ামী লীগের। এ নিয়ে সংবাদ সম্মেলন করে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছেন জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য ও সদর উপজেলার ধর্মপুর ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান এম আজহারুল হক আরজু।

আসনটিতে সাবেক এমপি জয়নাল আবেদিন হাজারী, ফেনী জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য চেম্বারের সহসভাপতি শিল্পপতি সাহেদ রেজা শিমুল প্রচার-প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন।

আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী মহল থেকে জানা যায়, এরকম বিতর্কিত প্রায় একশ’র বেশি এমপি আছেন যাদের আসনে জনপ্রিয় ও ক্লিন ইমজের প্রার্থী খুঁজছে দলটি। জানুয়ারির শেষ সপ্তাহ থেকে সফরে যাওয়া টিমের নানা পর্যবেক্ষণে সম্ভাবনাময় প্রার্থীদের ভাগ্য খুলতে পারে। এ ছাড়া বিভিন্ন সময়ে কেন্দ্রে জমা পড়া এমপিদের বিরুদ্ধে হাজারও অভিযোগের ফাইলও থাকছে নেতাদের হাতে। সেসব অভিযোগ অনুসন্ধান করে তারা প্রত্যেকের বিষয়ে পৃথক প্রতিবেদন জমা দেবেন দলীয় প্রধানের কাছে। বর্তমান এমপি এবং মনোনয়নপ্রত্যাশী নতুনদের বিষয়ে সেখানে সাধারণ মানুষের মতামতও তুলে ধরা হবে।

২০জানুয়ারী,২০১৮শনিবার:ক্রাইমর্বাতা.কম/যুগান্তর/আসাবি

Facebook Comments
Please follow and like us: