কি হতে পারে ৮ ফেব্রুয়ারী,মামলার রায় হবে নাকি পিছাবে” নাকি বিএনপি তার শক্তির জানান দিবে

মোহাম্মদ জাফর ইকবাল: আগামী ৮ ফেব্রুয়ারি বিএনপি চেয়ারপার্সন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার বিুরদ্ধে দায়ের করা জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলার রায় ঘোষণা করা হবে। এই মামলায় নেতিবাচক’ রায় হলেও শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের নির্দেশ দিয়েছেন খালেদা জিয়া। তিনি দলের নেতাকর্মীদের উদ্দেশ্যে স্পষ্ট করে বলেছেন, এই সরকার বিচার বিভাগকে দলীয়করণ করেছে। এদের কাছে ন্যায় বিচার কখনোই আশা করা যায়না। ন্যায় বিচার হলে বিচারকে কি হয় তা দেশবাসীসহ সবাই জানেন। আমিও ন্যায় বিচারের আশা করিনা। তাই রায় নেতিবাচক হলে আপনারা সরকারের হঠকারী কোনো কিছুতে পা দেবেন না, দলকে বিপদে ফেলার মতো কিছু করবেন না। সবাই একতাবদ্ধ থাকবেন। এবার যদি কেউ দলের বিরুদ্ধে কিছু করে থাকে তাদের চিহ্নিত করা হবে এবং তাদেরকে ভবিষ্যতে কোনো পদ দেয়া হবে না। আমার বিশ্বাস সকলে ঐক্যবদ্ধ থেকে দলকে শক্তিশালী রাখবেন।

এদিকে বিএনপির পক্ষ থেকে যখন শান্তিপূর্ণ কর্মসূচির কথা বলা হচ্ছে তখন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ তার উল্টোটা ঘোষনা দিয়েছেন। তারা সর্বশক্তি দিয়ে রাজপথে থাকার ঘোষণা দিয়েছে। তারা বলেছে, রায় ঘিরে আগামী ৮ ফেব্রুয়ারি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে আওয়ামী লীগ, এর অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা মাঠের দখল রাখবে। তারা আন্দোলন করতে বিএনপির কাউকে রাস্তায় নামতে দেবে না। সেভাবেই নিজেদের প্রস্তুত রাখছে ক্ষমতাসীনরা। আওয়ামী লীগ নেতারা জানিয়েছে, সুনির্দিষ্ট কোনো কর্মসূচি তারা না দিলেও রায়ের দিন ঢাকাসহ সারাদেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে নেতাকর্মীদের সতর্ক অবস্থান নিতে বলা হয়েছে। যে কোন ধরণের কর্মসূচি প্রতিহতের নির্দেশনাও তাদের দেয়া রয়েছে।

আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের নেতাকর্মীদের উদ্দেশে বলেছেন, আমরা কোনো উস্কানি দেব না। কিন্তু, আক্রমণ হলে সমুচিত জবাব দিতে হবে। সেজন্য প্রস্তুত হোন, মানসিকভাবে সতর্ক থাকুন। তারা রাস্তায় তা-ব করলে, সন্ত্রাস করলে বাংলাদেশের জনগণকে সঙ্গে নিয়ে প্রতিরোধ করবেন। তিনি বলেন, এবার আমরা আরো সংগঠিত ও সুশৃঙ্খল। কাজেই আগুন নিয়ে খেলবেন না। আগুন নিয়ে খেললে তার সমুচিত জবাব পেয়ে যাবেন।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামালও বলেছেন, খালেদা জিয়ার রায়ের পরিপ্রেক্ষিতে কেউ বিশৃঙ্খলার চেষ্টা করলে উপযুক্ত ব্যবস্থা নেয়া হবে। আমাদের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এ বিষয়ে সতর্ক আছে।

পুলিশের নবনিযুক্ত মহাপরিদর্শক (আইজিপি) ড. জাবেদ পাটোয়ারি বলেছেন, বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়ার রায়কে কেন্দ্র করে জনসাধারণের জানমাল রক্ষায় কঠোর অবস্থানে থাকবে পুলিশ। যেকোনো ধরনের নাশকতা বা সহিংসতার চেষ্টা হলে, তা রুখে দেয়া হবে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, আদালতের রায় বিরুদ্ধে গেলে ভিকটিম পক্ষ কিছুটা ক্ষিপ্ত হওয়াটাই স্বাভাবিক। এটা প্রায়শ: দেখা যায়। প্রতিবাদে হরতাল, অবরোধ, বিক্ষোভ কর্মসূচি থাকেই। অথচ এখানে বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া নিজেই ঘোষণা দিয়েছেন, কোন অবস্থাতেই সরকারের হঠকারি সিদ্ধান্তে পা দেয়া যাবেনা। প্রতিবাদ হবে শান্তিপূর্ণ উপায়ে। তারা বলছেন, খালেদা জিয়ার এ বক্তব্য বাংলাদেশের ইতিহাসে নজিরবিহীন। তিনি বিচারের দায়িত্ব জনগণের উপর ছেড়ে দিয়েছেন। একইসাথে বলেছেন, সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ আছেন। তিনিই আসল বিচারের মালিক।

সূত্র মতে, গত ২৫ জানুয়ারি জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলার যুক্তিতর্ক শেষে আগামী ৮ ফেব্রুয়ারি রায়ের দিন ধার্যা করেন ঢাকার ৫ নম্বর বিশেষ জজ আদালতের বিচারক ড. মো. আখতারুজ্জামান। এরপর থেকেই এই ইস্যুতে রাজনৈতিক অঙ্গন উত্তপ্ত হতে শুরু করে। সরকারি দল এবং রাজপথের বিরোধী দল- দু’পক্ষই বেশ মুখোমুখি অবস্থানে রয়েছে। নেতারা পরস্পরের প্রতি হুমকি ছুড়ে বাক্যবিনিময় করছেন। বিএনপির পক্ষ থেকে রায়ে নেতিবাচক কিছু হলে রাজপথে আন্দোলনের পাশাপাশি আইনতভাবে মোকাবেলার ঘোষণা দেয়া হয়েছে। সরকারি দল তাদের এ ঘোষণাকে ‘নৈরাজ্য সৃষ্টির পায়তারা’ দাবি করে সর্বোচ্চ শক্তি দিয়ে মোকাবেলার হুমকি দিয়েছে।

জানতে চাইলে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান আহমেদ আজম খান বলেন, ম্যাডাম বলেছেন- কী রায় হবে সেটা আদালত জানেন। আপনারা (নেতাকর্মীরা) সকলে শান্ত থাকবেন। কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা যেন না হয়। খালেদা জিয়া বলেছেন, গণতন্ত্র ও ভোটের অধিকার পুনরুদ্ধারের আন্দোলনে আছি, এটা চলমান। এই আন্দোলন হবে সুশৃঙ্খল এবং শান্তিপূর্ণ। আন্দোলনকে বেঘাত ঘটাতে পারে এমন কাজ না করার জন্য সাবধান করেছেন।

বিএনপির যুগ্ম-মহাসচিব মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল বলেন, রায়ের পরের অবস্থার প্রেক্ষিতে যে নির্দেশনা দায়িত্বশীল নেতাদের মাধ্যমে দেয়া হবে সেটা পালন করার জন্য তাদের ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। নেতিবাচক রায় হলে কর্মসূচি হবে অত্যন্ত শান্তিপূর্ণ। সরকার যাতে এখানে কোনো রকম উস্কানি দিতে না পারে।

বিএনপির সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক নজরুল ইসলাম মঞ্জু বলেন, ম্যাডাম জেলে গেলে আমরা কি বসে থাকব? আমরাও রাজপথে নামব, প্রয়োজনে জেলে যাব।

রাজশাহী থেকে আসা বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য রমেশ দত্ত বলেন, রায় নিয়ে একটা ষড়যন্ত্র হতে পারে। যার যে অবস্থান, সে অবস্থান থেকে ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের জন্য নির্দেশনা দিয়েছেন। তিনি বার বার বলছেন আমাদের ঐক্যবদ্ধ থাকতে।

মেহেরপুর জেলা বিএনপির সভাপতি মাসুদ অরুন বলেন, আগরতলার মামলা হয়েছিল, সে ইতিহাস আপনাদের কারো অজানা নয়। এখন আবার বকশী বাজারে নতুন করে বিচারের নামে একটি মামলা সাজানো হয়েছে। আমরা স্পষ্ট ভাষায় বলতে চাই- বেগম জিয়ার কোনো ধরনের সাজা হলে, সারাদেশে গণ-অভ্যুত্থানের পরিস্থিতি তৈরি করা হবে।

আগামী ৮ ফেব্রয়ারি বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়ার রায়ের বিষয়ে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহাবুব উল আলম হানিফ বলেন, ৮ ফেব্রুয়ারি বিশেষ কোনো দিন নয়। এই নিয়ে কোনো ধরনের সন্ত্রাসী কর্মকা- মেনে নেয়া হবে না। যে কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলা হতে পারে। যদি অভিযোগ প্রমাণিত হয় তাহলে তিনি শাস্তি পাবেন এটাই আইন, এটাই বিধান। এ নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার কারণ নেই। তিনি আরও বলেন, ৮ ফেব্রয়ারি কোনো ধরনের নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি হলে আওয়ামী লীগের কর্মী এবং জনগণকে সঙ্গে নিয়ে তা প্রতিহত করা হবে। যদি কোনো এলাকায় বিএনপির কর্মীরা বিশৃঙ্খলা করতে চায় আপনারা তাদেরকে পুলিশের হাতে তুলে দেবেন।

জানা গেছে, রায়কে ঘিওে সরকারি দল ঢাকাসহ সারাদেশে একটি নৈরাজ্যকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করবে। যা পরবর্তীতে বিরোধীদেও উপর চাপিয়ে দেয়া হবে। এছাড়া বিএনপির একটি পক্ষকে ম্যানেজ কওে রাজপথে সহিংস ঘটনাও ঘটাতে পারে। যেমনটি হয়েছিল গত ৩০ জানুয়ারি খালেদা জিয়া আদালত থেকে হাজিরা দিয়ে ফেরার পথে দুই নেতা আটক হলে পুলিশের প্রিজনভ্যানে হামলা চালিয়ে তাদের ছিনিয়ে নেয়ার ঘটনা। এ ঘটনায় শাহবাগ থানায় বিএনপির নেতাকর্মীদের নামে দুটি মামলাও হয়েছে। ইতোমধ্যে সিনিয়র নেতা গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, আমানউল্লাহ আমান, নাজিম উদ্দিন আলমসহ ৫ শতাধিক নেতাকর্মীকে গ্রেফতারের দাবি করেছে দলটি।

বিশ্লেষকরা বরছেন, সরকারের উদ্দেশ্য হচ্ছে আতংক ও ভীতি ছড়িয়ে দেয়া। যাতে করে আগামী নির্বাচনকে কেন্দ্র বিরোধী দলের নেতাকর্মীরা রাজপথে নামতে না পারে। তারা গত ৩০ জানুয়ারি একটা টেস্ট করেছে। হামলার ঘটনার পর থেকে গণহাওে গ্রেফতারের পরও বিএনপির সার্বিক অবস্থায় ক্ষমতাসীনদের ভাবনায় ফেলে দিয়েছে। দলটিকে বেশ চাপে রাখার চেষ্টা করলেও কতটুকু সফল হওয়া গেছে তা নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। যদিও সরকারি দলের দাবি ইতোমধ্যে গ্রেফতারে বিএনপিতে আতঙ্কও ছড়িয়েছে। তাদের আর রাজপথে দেখা যাবেনা।

জানা গেছে, দেশব্যাপী গণগ্রেফতারএড়াতে বিএনপি নেতাকর্মীরা কিছুটা গা ঢাকা দিলেও পুরোদস্তুর মাঠ দখলে রাখারা প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছে আওয়ামী লীগ। এ উপলক্ষে ঢাকা মহানগর উত্তর গতকাল সভা করেছে। ঢাকা মহানগর দক্ষিণ ৬ ফেব্রুয়ারি বর্ধিত সভা ডেকেছে। এ সভা থেকে তারা নিজেদের করণীয় ঠিক করবেন।

এই দুই শাখার সাধারণ সম্পাদক শাহে আলম মুরাদ ও সাদেক খান বলেছেন, আমরা সেদিন (৮ ফেব্রুয়ারি) কোনো কর্মসূচি দিয়ে এক জায়গায় হব না। তবে প্রতিটি নেতাকর্মী তাদের নিজ পাড়া-মহল্লায় অবস্থান নেবে। কোনো বিশৃঙ্খলা হলে প্রতিহত করবে।

বিএনপির একাধিক নেতা জানান, খালেদা জিয়ার রায় ঘিরে ক্ষমতাসীন দলের অব্যাহত হুমকি উপেক্ষা করে ওইদিন আদালত এলাকায় সতর্ক অবস্থানের পরিকল্পনা নিয়েছে বিএনপি। দলটির ভাষ্যে, এই রায়কে কেন্দ্র করে সরকার একটি ইস্যু তৈরি করবে। সেই অজুহাতে বিএনপিকে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের বাইরে রাখার চেষ্টা করবে। বিএনপির নেতারা বলছেন, এবার এসব হতে দেয়া হবে না। বিএনপির নেতাকর্মীরা ওইদিন আদালত এলাকায় সতর্ক অবস্থান নিয়ে মূলত যেকোনো ধরনের ‘সরকারি অপতৎপরতার পরিকল্পনা’ ভ-ুল করে দেবে। বলা চলে নিজেরাই কড়া পাহারা বসাবে। একই সঙ্গে চেষ্টা থাকবে শান্তিপূর্ণ অবস্থান জানান দেয়ার। রাজধানীর মত সারাদেশেই একই ধরনের ‘সতর্কতা বর্ম’ তৈরির নির্দেশনা নেতাকর্মীদের দিয়েছেন স্বয়ং দলীয় চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া।

Facebook Comments
Please follow and like us: