যেখানে পরীক্ষা সেখানেই প্রশ্ন ফাঁস#* এসএসসি পরীক্ষার আট দিনে আটটি বিষয়েরই প্রশ্নপত্র ফাঁস

* এসএসসি পরীক্ষার আট দিনে আটটি বিষয়েরই প্রশ্নপত্র ফাঁস

সামছুল আরেফীন: পরীক্ষা হলেই প্রশ্ন ফাঁস। বর্তমান সরকারের সময়ে প্রশ্ন ফাঁসের ভয়াবহতা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, যেখানে প্রশ্ন হয়, সেই প্রশ্নই ফাঁস হয়ে যাচ্ছে। চলতি এসএসসি পরীক্ষায় প্রতিদিনই পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস হচ্ছে। প্রশ্ন ফাঁস রোধে সরকারের নেয়া কোন পদক্ষেপই কোন কাজে আসছে না। খোদ মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব মো. সোহরাব হোসাইনও স্বীকার করেছেন, চলমান পরীক্ষা পদ্ধতি অনুসারে প্রশ্ন ফাঁস রোধ করা সম্ভব হবে না। এখন পরীক্ষা পদ্ধতিও পরিবর্তনের চিন্তা চলছে। এক্ষেত্রে ‘ওপেন বুক এক্সাম’ অর্থাৎ বই দেখে পরীক্ষা নেয়ার কথাও আলোচনায় রয়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, বর্তমান সরকারের আমলে শিক্ষার গুণগত মান ক্রমেই অবনতির দিকে যাচ্ছে। সর্বক্ষেত্রে অনিয়ম, দলীয়করণ এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, কোন ধরনের পদক্ষেপই প্রশ্ন ফাঁস ঠেকাতে পারছে না। বিভিন্ন সময় প্রশ্ন ফাঁসের সাথে সরকারি দলের নেতাকর্মীদের নাম আসলেও মূল হোতারা ধরা ছোয়ার বাইরেই থেকে যাচ্ছে।
১ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হয়েছে এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষা। বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ফাঁস হওয়া প্রশ্ন ছড়িয়ে পড়ছে আর শিক্ষার্থীরা খুব সহজেই তা মোবাইলের মাধ্যমে পেয়ে যাচ্ছে। চলতি এসএসসি পরীক্ষায় এ পর্যন্ত আটদিনে আটটি বিষয়েরই প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়েছে, যা প্রশ্নপত্র ফাঁসের রেকর্ড।
গতকাল মঙ্গলবার পরীক্ষা শুরুর এক ঘণ্টা আগে বাসভর্তি শিক্ষার্থীদের হাতে প্রশ্ন পাওয়া যায়। পদার্থবিজ্ঞান পরীক্ষার আগে চট্টগ্রামের এক স্কুলের পরীক্ষার্থীদের মোবাইল ফোনে পাওয়া গেছে ফাঁস হওয়া প্রশ্ন, যা পরীক্ষার আসল প্রশ্নের সাথে মিলেও গেছে। বন্দরনগরীর ওয়াসা মোড়ে পরীক্ষার আগে দাঁড়িয়ে থাকা শ্যামলী পরিবহনের একটি বাসে অভিযান চালিয়ে ওই প্রশ্ন পাওয়া যায় বলে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সৈয়দ মুরাদ আলী জানান। ওই বাসে পটিয়া আইডিয়াল স্কুলের ৫০ জন পরীক্ষার্থী ছিল। বাংলাদেশ মহিলা সমিতি (বাওয়া) উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে পরীক্ষায় বসার জন্য তারা ওয়াসার মোড়ে বাসের ভেতরে অপেক্ষা করছিল।
প্রশ্নপত্র ফাঁস রোধে পরীক্ষার সময় কোচিং সেন্টার বন্ধ, পরীক্ষার্থীদের আধা ঘণ্টা আগে পরীক্ষাকক্ষে বসা এবং কেন্দ্রের ভেতর মোবাইল ফোন না নেয়ার ঘোষণা দিয়েছিল সরকার। কিন্তু কোনো পদক্ষেপই কাজে আসেনি। পরে প্রশ্ন ফাঁসকারীদের ধরিয়ে দিলে পাঁচ লাখ টাকা দেয়ার ঘোষণাতেও লাভ হয়নি। পরীক্ষার দিন ইন্টারনেট সাময়িক সময়ের জন্য বন্ধের চেষ্টা করেও প্রশ্নপত্র ফাঁস ঠেকানো যায়নি। সরকার প্রশ্নপত্র ফাঁস, ছড়ানো ও প্রশ্নপত্র কেনাবেচার কাজে জড়িত ব্যক্তিদের ধরতে ব্যাপক ধরপাকড়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। পরীক্ষা চলাকালীন কেন্দ্রের ২০০ মিটারের মধ্যে কারও কাছে মোবাইল ফোন পেলে তাকে তাৎক্ষণিকভাবে গ্রেফতার করা হবে। গত রোববার রাতে পরীক্ষার দিন আড়াই ঘণ্টা করে ইন্টারনেট বন্ধের সিদ্ধান্ত নিয়েছিল সরকার। কিন্তু সমালোচনার মুখে সেই সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসে সরকার। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এবারের মতো আগাম ঘোষণা দিয়ে ধারাবাহিকভাবে প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা আগে ঘটেনি।
শুধু এসএসসি নয়, বর্তমান সরকারের সময়ে সব ধরনের পরীক্ষারই প্রশ্ন ফাঁস হচ্ছে। গত বছর  নাটোরে প্রথম শ্রেণির বার্ষিক পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস হয়। এ কারণে পরীক্ষাই স্থগিত করতে হয়েছে।  বরগুনায় ফাঁস হয় দ্বিতীয় শ্রেণির প্রশ্ন। পিএসসি, জেএসসি, জেডিসি, এসএসসি, এইচএসসি, চাকরি বা বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষা, এমন কোনো পরীক্ষা নেই, যেখানে প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা ঘটছে না।
ডিজিটাল পদ্ধতিতে প্রশ্ন ফাঁস: এখন প্রশ্নপত্র ফাঁস হলেও প্রথমে গণহারে সবাই পায় না। সিন্ডিকেট চক্র পরীক্ষার কয়েক দিন আগে নির্দিষ্ট প্রার্থীদের সঙ্গে যোগাযোগ করে টাকা চায়। যারা টাকা পরিশোধ করে, শুধু তাদেরই বিভিন্ন স্থানে নিয়ে গোপনে প্রশ্নপত্র ফাঁস করা হয়। বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ডিজিটাল এ অপরাধ সবচেয়ে বেশি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। প্রচলিত পদ্ধতির পাশাপাশি যুক্ত হয়েছে আধুনিক প্রযুক্তি। মোবাইল ফোন, ইন্টারনেট সুবিধা সহজলভ্য হওয়ায় কয়েক বছর ধরে প্রশ্নপত্র ফাঁসের ধরন বদলেছে। এতে ফাঁসের আগেই তথ্য পাওয়া, অপরাধীদের চিহ্নিত ও শাস্তির আওতায় আনা দুরূহ হয়ে পড়ছে। এ কারণে বারবার পার পেয়ে যাচ্ছে অপরাধীরা। মোবাইল, ইলেকট্রনিক ডিভাইস ও ইন্টারনেট ব্যবহারের মাধ্যমে ফাঁস হওয়া প্রশ্ন মুহূর্তের মধ্যেই দেশের একপ্রান্ত থেকে অন্যপ্রান্তে পৌঁছে যাচ্ছে। সিন্ডিকেট চক্র প্রশ্ন মুহূর্তের মধ্যেই বাইরে পাঠিয়ে দিচ্ছে। তা কারেকশন করে সিন্ডিকেট চক্রের সঙ্গে আগে থেকে যোগাযোগ রাখা অসদুপায় অবলম্বনকারী প্রার্থীদের মোবাইল ফোনে খুদেবার্তার মাধ্যমে পাঠিয়ে দিচ্ছে। গত কয়েক বছর এমন ঘটনা প্রত্যেক প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় অহরহ ঘটছে। এতে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষের টনক নড়ে। তারা পরীক্ষার হলে মোবাইল, সব ধরনের ইলেকট্রনিক ডিভাইস নিয়ে প্রবেশ নিষিদ্ধ করে। পরীক্ষার্থী হল থেকে মোবাইল, ইলেকট্রনিক ডিভাইস ব্যবহার করার অপরাধে অনেকেই হাতেনাতে ধরা পড়েছে। এবার ফেসবুক, ওয়াটসআপসহ সামাজিক গণমাধ্যমে প্রশ্ন পাওয়া যাচ্ছে।
প্রেস থেকে প্রশ্ন ফাঁস: শুধু ডিভাইসের মাধ্যমে না, প্রশ্নপত্রও ফাঁস করতো চক্র। বিপুল টাকার বিনিময়ে পরীক্ষার্থীদের কাছে প্রশ্নপত্র সরবরাহ করা হতো। যে প্রেসে প্রশ্নপত্র ছাপানো হতো সেই প্রেসের এক কর্মচারীর মাধ্যমেই এই প্রশ্নপত্র সংগ্রহ করতো চক্র। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁসে জড়িত থাকার অভিযোগে খান বাহাদুর (২৮) নামের ওই প্রেস কর্মচারীকে গ্রেফতার করেছে সিআইডি। খান বাহাদুরের মাধ্যমে প্রশ্নপত্র পৌঁছে যেতো চক্রের পাবনা জেলা ক্রীড়া কর্মকর্তা রকিবুল হাসান ইসামীর হাতে। চক্রের শীর্ষ এই দুই হোতাকে গ্রেফতার করেছে সিআইডি।
সিআইডির অর্গানাইজড ক্রাইম বিভাগের বিশেষ পুলিশ সুপার মোল্লা নজরুল ইসলাম জানান, প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় গত তিন মাসে ২২ জনকে গ্রেফতার করেছে সিআইডি। তিনি জানান, চক্রের হোতারা প্রশ্নপত্র সংগ্রহ করতো ও সরবরাহ করতো। মাঠের কর্মীরা ভর্তিচ্ছু ছাত্র সংগ্রহ করে রকিবুলের কাছে সরবরাহ করতো। এভাবেই চলছিল তাদের প্রশ্নপত্র ফাঁস বাণিজ্য। বনি ইসরাইল ও মারুফের দেয়া তথ্যে জানা গেছে, এদের মধ্যে ডিভাইস সাপ্লাই গ্রুপই নয়, প্রশ্নফাঁসের গ্রুপও জড়িত।
গত ২০শে অক্টোবর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘ঘ’ ইউনিটের ভর্তি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। এর আগের দিন রাতেই প্রশ্নের ইংরেজি অংশটি ফাঁস হয়ে যায়। বিষয়টি গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশিত হলে তোলপাড় শুরু হয়। পরীক্ষার আগের রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই শিক্ষার্থী মহিউদ্দিন রানা ও আব্দুল্লাহ আল মামুনকে আটক করা হয়। প্রক্টরিয়াল টিমের সদস্যরা তাদের কাছ থেকে একটি ইলেকট্রনিক ডিভাইস উদ্ধার করেন। মাস্টার কার্ডের মতো দেখতে ওই ডিভাইস নিয়ে পরীক্ষার্থী হলে প্রবেশ করতো। এতে থাকে মোবাইল সিম ও পরীক্ষার হলে ব্যবহারের জন্য থাকে অতি ক্ষুদ্র লিসেনিং কিট। ওই ডিভাইসের মাধ্যমে বাইরে থাকা চক্রের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ হতো পরীক্ষার্থীর। আটক শিক্ষার্থী রানা ও আব্দুল্লাহর তথ্যের ভিত্তিতে ১৩ পরীক্ষার্থীকে আটক করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।
একের পর এক প্রশ্ন ফাঁস: ইতিহাসের সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনা ঘটেছে এই আমলে। ২০০৯ সাল থেকে এ পর্যন্ত বিসিএস, গোয়েন্দা কর্মকর্তা, সমাজসেবা কর্মকর্তা, খাদ্য অধিদফতরের কর্মকর্তা, অডিট, এনবিআর, এটিইও, মেডিকেল, প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষা, এসএসসি, এইচএসসি, অগ্রণী ব্যাংক, রূপালী ব্যাংক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষাসহ বিভিন্ন পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনা ও অভিযোগ পাওয়া যায়। মন্ত্রণালয় সূত্র, বিশিষ্টজন ও চাকরি প্রার্থীদের মতে, বর্তমান সরকরের সময়ের মতো অতীতে এত বেশি ও গণহারে প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনা ঘটেনি। গত বছরের ৩১ মে ফাঁস হয়ে যায় অগ্রণী ব্যাংকের সিনিয়র অফিসার নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্ন। প্রশ্নপত্র ফাঁসের সত্যতা পাওয়ার পর ১২ জুন ওই পরীক্ষা বাতিল করা হয়।
২০১০ সালের ৮ জানুয়ারি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস হয়। ফাঁস হওয়া প্রশ্নে পরীক্ষা হলেও পরীক্ষা বাতিল হয়নি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৯১ বছরের ইতিহাসে প্রথম প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা ঘটে গত ২০১০ সালের ২১ জানুয়ারি। শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইআর) ২০০৯-১০ শিক্ষাবর্ষে অনার্স প্রথম বর্ষ ভর্তি পরীক্ষার তিনটি সেটের সবটাই ফাঁস হয়। এ ঘটনায় ওই পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছিল। প্রশ্ন ফাঁসের সিন্ডিকেটের কয়েক জনকে গ্রেফতার ও তদন্ত কমিটিও করা হয়। তবে শেষ পর্যন্ত সিন্ডিকেট চক্রটি আইনের ফাঁকফোকরে পার পেয়ে যায়।
২০১০ সালের ১৬ জুলাই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসা কর্মকর্তা পদে নিয়োগের লিখিত পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস হয়। এতে ওই পরীক্ষা বাতিল করে কর্তৃপক্ষ। ২০১০ সালের ২৮ আগস্ট উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা নিয়োগের লিখিত পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস হয়। ২০১০ সালের ৮ জুলাই সরকারি মাধ্যমিক স্কুলের সহকারী নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস হওয়ায় পরীক্ষা স্থগিত করা হয়। ২০১০-১১ সালে মেডিকেল কলেজের ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁসের অভিযোগ ওঠে। ২০১১ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনায় সিন্ডিকেট চক্রের ছাত্রলীগ, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকসহ ২৪ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছিল।
২০১১ সালে অডিট বিভাগের নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁসের অভিযোগ ওঠে। ২০১২ সালের ২৭ জানুয়ারি ফাঁস হওয়া প্রশ্নেই খাদ্য অধিদফতরের নিয়োগ পরীক্ষা নেয়া হয়। শেষ পর্যন্ত ওই পরীক্ষা বাতিল করা হয়। ২৭ জুলাই জনতা ব্যাংকের নির্বাহী কর্মকর্তা পদে নিয়োগ পরীক্ষার আগের রাতে পুরান ঢাকার একটি হোটেল থেকে ফাঁস হওয়া প্রশ্নসহ ১৬ জনকে আটক করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
২০১৪ সালে প্রতিটি পাবলিক পরীক্ষার শুরু থেকেই প্রতিটি বিষয়ে একের পর এক প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা এবং অভিযোগ আসতে থাকে। ফাঁস হওয়া অনেক প্রশ্নের সাথে পরীক্ষার হলের প্রশ্নপত্র হুবহু মিলে যায়। তারপরও একটি পরীক্ষা স্থগিত ছাড়া অন্যসব পরীক্ষা চালিয়ে নেয়া হয়। ২০১৪ সালে সবচেয়ে আলোচিত প্রশ্নপত্র ফাঁস ছিল এইচএসসির। পরিস্থিতি বেগতিক আকার ধারণ করায় স্থগিত করা হয় ইংরেজি দ্বিতীয় পত্রের পরীক্ষা। তবে বাংলা, ইংরেজি প্রথম পত্র, গণিত, রসায়ন, পদার্থ বিজ্ঞানসহ বিষয়ের প্রশ প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা ঘটে। এ সত্ত্বেও এসব পরীক্ষা বাতিল করা হয়নি।
২০১২ সাল থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত প্রাথমিকের সমাপনী পরীক্ষায়ও একের পর এক প্রশ্নপত্র ফাঁস ঘটতে থাকে। ২০১৪ সালে সমাপনী পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা ঘটে ধুমধামের সাথে।
২০১৩ সালে সমাপনী পরীক্ষায় ইংরেজি এবং বাংলা বিষয়ে প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা তদন্তে প্রমাণিত হয়। ইংরেজি ৮০ এবং বাংলা ৫৩ শতাংশ প্রশ্ন মিলে যায় ফাঁস হওয়া প্রশ্নের সাথে। তবু এ পরীক্ষা বাতিল হয়নি। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব এস এম আশরাফুল ইসলাম তখন জানান তদন্তে প্রশ্নপত্র ফাঁস প্রমাণিত হয়েছে। তবে পরীক্ষা বাতিল করা হচ্ছে না।
২০১২ সালেও সমাপনী পরীক্ষায় বাংলা ও গণিতে প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা ঘটে।
২০১৪ সালে সমাপনী পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় ভ্রাম্যমাণ আদালত বিভিন্ন জেলায় দায়ীদের শাস্তি দিয়েছেন। প্রশ্নপত্র ফাঁসের বিরুদ্ধে সোচ্চার অনেকে অনলাইনে ফাঁস হওয়া প্রশ্ন প্রকাশ করে শিক্ষামন্ত্রণালয়কে চ্যালেঞ্জ জানিয়েছেন। তাদের কাছে প্রশ্নপত্র ফাঁসের প্রমাণ রয়েছে। কিন্তু তারপরও প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী মোস্তাফিজুর রহমান ফিজার গত ৪ ডিসেম্বর নেত্রকোনা কেন্দুয়ায় একটি অনুষ্ঠানে বলেছেন প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ পাওয়া গেলেও এর পক্ষে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্যপ্রমাণ পাওয়া যায়নি।
২০১৩ সালের এসএসসি ও সমানের পরীায়ও সব প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ ওঠে। গণিত, ইংরেজি প্রথম পত্রসহ বিভিন্ন বিষয়ে ফাঁস হওয়া প্রশ্নের হুবহু মিল পাওয়া যায়।
প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগের ভিত্তিতে স্থগিত করা হয় ৩৩তম বিসিএস লিখিত পরীক্ষা ও অগ্রণী ব্যাংকের নিয়োগ পরীক্ষা। একই কারণে প্রাইমারি স্কুলে সহকারী শিক্ষক নিয়োগের পরীক্ষাও ১৭ জেলার বাতিল করা হয়েছে। এ ছাড়া ৩৪তম বিসিএসের লিখিত পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁসেরও অভিযোগ রয়েছে।
টিআইবির অনুসন্ধান: টিআইবির প্রকাশিত একটি গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিভিন্ন পাবলিক পরীক্ষায় ৪০টি ধাপে প্রশ্ন ফাঁস হয়। তার মধ্যে ২৩টি ধাপ থেকে সবচেয়ে বেশি প্রশ্নপত্র ফাঁস হচ্ছে। প্রশ্নপত্র প্রণয়ন, মডারেশন, বিজি প্রেসে কম্পোজ, প্রুফ দেখা, সিলগালা করা ও বিতরণ এবং পরীক্ষার দিন পরীক্ষা কেন্দ্রে শিক্ষকদের মাধ্যমে প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়। প্রশ্নপত্র ফাঁসের সাথে শিক্ষাবোর্ড, মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদফতর, প্রাথমিক শিক্ষা একাডেমি, কোচিং সেন্টার, গাইড বই ব্যবসায়ী ও সরকারদলীয় ছাত্র সংগঠন সরাসরি জড়িত। ফাঁস হওয়া প্রশ্নে আকারভেদে ২০ টাকা থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত অর্থের লেনদেন হয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী (পিইসি), জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট (জেএসসি), মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট (এসএসসি) এবং উচ্চ মাধ্যমিক সার্টিফিকেট (এইচএসসি) এ চারটি পাবলিক পরীক্ষার প্রশ্ন প্রণয়ন, মডারেশন, ছাপানো, সংরক্ষণ ও বিতরণের প্রক্রিয়া পর্যালোচনা করে এসব তথ্য পাওয়া গেছে। ২০১৫ সালের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত এ গবেষণা কার্য পরিচালনা করা হয়।
গবেষণার সার্বিক পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, প্রশ্ন ফাঁসের সাথে সরকারি ও বেসরকারি উভয় অংশীজন জড়িত। প্রশ্ন প্রণয়ন, ছাপানো ও বিতরণে এবং তদারকির সাথে সম্পৃক্ত সরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একাংশ কোনো না কোনো পর্যায়ে প্রশ্ন ফাঁসের সাথে জড়িত। প্রতিবেদন অনুয়ায়ী, প্রশ্ন প্রণয়নের দীর্ঘ প্রক্রিয়া, ম্যানুয়াল পদ্ধতির সাথে অনেকের সম্পৃক্ততাও প্রশ্ন ফাঁসের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।
সরকারি নথিপত্র অনুযায়ী ১৯৭৯ সালে প্রথম এসএসসি পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস হয়।
আওয়ামী লীগের আগের আমলেও প্রশ্ন ফাঁস: ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় আলোচিত এসএসসি পাবলিক পরীক্ষার প্রশ্নও দুইবার ফাঁস হয়েছে। ১৯৯৭ সালে এসএসসি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা ঘটে। ওই ঘটনায় কারও শাস্তি হয়নি। ১৯৯৯ সালে আবার এসএসসি পরীক্ষার আগে ভোলার একটি কেন্দ্র থেকে ইংরেজি দ্বিতীয়পত্র পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়। এ ঘটনায় পরীক্ষা বাতিল করে গঠন করা হয় তদন্ত কমিটি। কিন্তু কারও শাস্তি হয়নি। এছাড়া ওই আমলে বিসিএসসহ বিভিন্ন চাকরির নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁসের অভিযোগ ওঠে।
তদন্ত কমিটি হয়, সুপারিশ হয়, হয় না শাস্তি: ১৯৭৯ সালের প্রশ্ন ফাঁসের আলোচিত সেই ঘটনায় প্রথমবারের মতো তদন্ত কমিটিও গঠন করা হয়। কমিটির রিপোর্টে প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনার জন্য সেই সময় সাভারের সার্কেল অফিসার (উন্নয়ন), ব্যাংকের এক কর্মকর্তা এবং সাভার অধরচন্দ্র হাই স্কুলের প্রধান শিক্ষককে দায়ী করা হয়েছিল। প্রশ্নপত্রের সিলমোহর করা প্যাকেট কেটে ওই বছর প্রশ্ন ফাঁস করা হলেও শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক কারণে দায়ী ব্যক্তিদের গায়ে আঁচড় লাগেনি। আর সেই থেকে শুরু। এর পর এসএসসি পরীক্ষাতেই প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনা ঘটে ১৯৯১ সালে। এবারও তদন্ত কমিটি নোয়াখালীর এক স্কুলের প্রধান শিক্ষককে দায়ী করেন। আবারও একই কারণে পার পেয়ে যায় অপরাধী। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৯৭ সালের এসএসসি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা ঘটে পদার্থবিদ্যা, হিসাববিজ্ঞান এবং বাংলা প্রথমপত্র পরীক্ষায়। ১৯৯৮ সালের ১৬ এপ্রিল এসএসসি পরীক্ষা শুরুর আগেই ফাঁস হয়ে যায় প্রশ্ন। হয় তদন্ত কমিটি, কিন্তু ফল একই। এভাবে বছরের পর বছর ধরে চলছে এ কর্মকাণ্ড। প্রথমে প্রশ্ন ফাঁস, পরে অনেক ক্ষেত্রে পরীক্ষা স্থগিত করে তদন্ত কমিটি। এর পর যথারীতি ঘটনা ধামাচাপা পড়ে যায়।
প্রশ্নপত্র ফাঁস, প্রকাশ বা বিতরণের সঙ্গে জড়িত থাকার শাস্তি ন্যূনতম তিন বছর থেকে সর্বোচ্চ ১০ বছরের কারাদ-সহ অর্থদণ্ড। পাবলিক পরীক্ষাসমূহ (অপরাধ) আইন, ১৯৮০ এবং সংশোধনী ১৯৯২-এর চার নম্বর ধারায় এই শাস্তির বিধান রয়েছে। কিন্তু এই আইন প্রণয়নের পর বিসিএসসহ বিভিন্ন পরীক্ষায় ৮০ বারের বেশি প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা ঘটলেও শাস্তির নজির নেই। তদন্ত হয়েছে মাত্র ৩৩টির। অপরাধীরা পার পেয়ে যাচ্ছে প্রতিটি ঘটনায়।
টিআইবি এর নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, কোচিং বাণিজ্য বন্ধ করার জন্য ২০১২ সালে একটা নীতিমালা হয়েছিল। এতে শিক্ষকদের কোচিং বাণিজ্য বন্ধ করার সুস্পষ্ট নির্দেশনা আছে। কিন্তু এটা লংঘন করে শিক্ষক-কর্মকর্তাদের একাংশ এর সাথে জড়িত আছে। প্রশ্ন ফাঁস করার শান্তি আগে ছিল ১০ বছরের কারাদন্ড, কিন্তু ১৯৯২ সালে এটা কমিয়ে ৪ বছর করা হয়। এতে একটা দৃষ্টান্ত স্থাপন হলো যে অপরাধটা তত গুরুতর নয়। তাও আবার কখনো কারো শাস্তি হয় নি।
সরকার কেন এ নিয়ে কিছু করতে পারছে না? এর জবাবে তিনি বলেন, সরকার এটা স্বীকার করতে চায় না। মন্ত্রীরা পার্লামেন্টে দাঁড়িয়ে বলেছেন যে প্রশ্ন ফাঁসের কথা অস্বীকার করেছেন এমনও হয়েছে।
কোচিং সেন্টার একটি লাভজনক ব্যবসা। এ ব্যবসায় শুধু শিক্ষকরা এককভাবে জড়িত তা নয়। প্রশ্নপত্র  তৈরি, ছাপা বিতরণ- এ কাজ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা করেন। তাই পুরো ব্যাপারটার একটা প্রতিষ্ঠানিকীকরণ ঘটে গেছে। এর প্রভাবে ছাত্রছাত্রী শিক্ষার্থীদের অভিভাবকরাও এর সাথে জড়িয়ে যাচ্ছেন। যদি তার প্রতিবেশির সন্তান ফাস হওয়া প্রশ্ন পেয়ে যায়, তাহলে তারা পাবেন না কেন – এ প্রতিযোগিতায় তারা জড়িত হয়ে পড়ছেন, তাদের কোন উপায় নেই।

Facebook Comments
Please follow and like us: