ভারতীয় চিনি আসাতে আখ চাষে ধ্বস*সাতক্ষীরাতে আখ চাষে আগ্রহ হারাচ্ছে কৃষকরা

কম শুল্কে বাংলাদেশ চিনি রপ্তানি করতে চায় ভারত* আখের অভাবে বন্ধের পথে সরকারি চিনিকলগুলে* সাতক্ষীরাতে আখ চাষে আগ্রহ হারাচ্ছে কৃষকরা
আবু সাইদ বিশ্বাস: উৎপাদন খরচ বেশি হওয়ায় দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলে আখ উৎপাদন চরম আকারে হ্রাস পেয়েছে। আখের ভরা মৌসুমে সাতক্ষীরা জেলাতে আখের দেখা নেই বললেই চলে। ভারত থেকে চিনি আমদানির কারণে চাষীরা আখ চাষে দিন দিন আগ্রহ হারাচ্ছে। গত কয়েক বছর ধরে এখানকার চাষীরা আখের রশ জ্বালিয়ে পাটালি তৈরি করা হত। যার কদর ছিল যুগ যুগ ধরে। চিনির দাম কমতে থাকায় আখ চাষীরা আখের রশের সাথে চিনি মিশিয়ে পাটালি তৈরি করতে থাকে। এর পর ও ভারতীয় চিনির আমাদানির কারণে সর্বশেষ পাটালি তৈরিতেও আগ্রহ হারিয়েছে আখ চাষীরা। তারা আখের পরিবর্তে,গম,জব,সহ ধান উৎপাদনে ঝুকে পড়েছে।
চলতি মৌসুমে সাতক্ষীরা জেলাতে ১৯৬ হেক্টর জমিতে আখের আবাদ হয়েছে বলে জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অফিস জানায়। যা থেকে উৎপাদনের লক্ষ মাত্রা ধরা হয়েছে ৯ হাজার ৪০৮ মেঃটন। সদরে আবাদ হয়েছে ১৩ হেক্টর জমিতে যা থেকে উৎপাদনের লক্ষ মাত্রা ধরা হয়েছে ৬২৪ মেঃটন। কলারোয়াতে আবাদ হয়েছে ০৩ হেক্টর জমিতে যা থেকে উৎপাদনের লক্ষ মাত্রা ধরা হয়েছে ১৪৪ মেঃটন। তালাতে আবাদ হয়েছে ৯৫ হেক্টর জমিতে যা থেকে উৎপাদনের লক্ষ মাত্রা ধরা হয়েছে ৪৫৬০ মেঃটন। দেবহাটাতে আবাদ হয়েছে ৪০ হেক্টর জমিতে যা থেকে উৎপাদনের লক্ষ মাত্রা ধরা হয়েছে ১৯২০ মেঃটন। কালিগঞ্জে আবাদ হয়েছে ৩৫ হেক্টর জমিতে যা থেকে উৎপাদনের লক্ষ মাত্রা ধরা হয়েছে ১৬৮০ মেঃটন। আশাশুনিতে আবাদ হয়েছে ০৫ হেক্টর জমিতে যা থেকে উৎপাদনের লক্ষ মাত্রা ধরা হয়েছে ২৪০ মেঃটন। শ্যামনগরে আবাদ হয়েছে ০৫ হেক্টর জমিতে যা থেকে উৎপাদনের লক্ষ মাত্রা ধরা হয়েছে ২৪০ মেঃটন।
প্রকৃত পক্ষে আবাদের পরিমান সরকারী হিসাবের চেয়ে কয়েকগুণ কম। কয়েকজন আখ চাষী জানান,আখ চাষে দিন দিন ক্ষতি হচ্ছে। তাই আখ বাদ দিয়ে তারা অন্য ফসল উৎপাদন করছে। গত কাল সাতক্ষীরা তালা ,মাগুরা, ইসলামকাটী,কুমিরা পাটকেলঘাটার সরুলিয়া,খলিষখালী,নগরঘাটা,ধানদিয়ার কয়েকটি গ্রাম ঘুরে আখ চাষের তথ্য সংগ্রহ করা হয়। চোখে মেলে সিমীত পরিসরে আখ চাষ। আশ্বিন-কার্তিক মাসে মান্দার সময়ে যারা আখ কেটে রশ বিক্রয় করে সংসার চালায় তারাই বর্তমানে আখ চাষ করছে বলে জানা যায়। বাণিজ্যিক ভাবে আখ চাষ করতে কম দেখা যাচ্ছে কৃষকদের।
এরই মধ্যে ভারতে আখ উৎপাদন বেশি হওয়ায় বাংলাদেশে চিনি রপ্তানি করা সিদ্ধান্ত নিয়েছে ভারত। আর এজন্য দেশটি প্রতিবেশি বাংলাদেশ ও শ্রীঙ্কাকেই টার্গেট করেছে।
সম্প্রতি রয়র্টাসের খবরে বলা হয়েছে, তুলনামূলক কম শুল্কে বাংলাদেশ ও শ্রীলঙ্কায় চিনি রপ্তানি করতে দুই দেশের সঙ্গে শিগগিরই আলোচনায় বসতে যাচ্ছে ভারত।
ভারত সরকারের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার বরাত দিয়ে রয়টার্স বলছে, চলতি ২০১৭-১৮ অর্থবছরে প্রায় ২৫ মিলিয়ন টন বেশি চিনি উৎপাদন করবে। ফলে তাদের দেশে চিনির কোনো ঘাটতি থাকবে না। বরং বাড়তি চিনি তারা রপ্তানি করবে। খবরে বলা হয়েছে, ভারত সরকার চিনি রপ্তানির জন্য বাংলাদেশ ও শ্রীলঙ্কা সরকারকে আমদানি শুল্ক কমানোর অনুরোধ করবে।
এদিকে ভারতীয় চিনি কল অ্যাসোসিয়েশনের মহা-পরিচালক অবিনাশ বর্মণ বলেন, বাংলাদেশে কমপক্ষে আধা ডজন চিনি রিফাইনারি প্রতিষ্ঠান আছে। তারা অপরিশোধিত চিনি আমদানি করে তা সাদা চিনিতে রূপান্তর করে।
অবিনাশ বর্মণ আশা প্রকাশ করেন, বাংলাদেশ সরকার ভারতীয় চিনির আমদানি শুল্ক কমালে ওইসব রিফাইনারি কারখানাগুলো চিনি আমদানি করতে আগ্রহী হবে।
চলছে চিনি উৎপাদনের ভরা মৌসুম। কিন্তু আখের অভাবে একের পর এক বন্ধ হয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশের সরকারি চিনিকলগুলো। ইতিমধ্যে রাজশাহী, রংপুর, শ্যামপুর, জয়পুরহাট ও পাবনা চিনিকল বন্ধ হয়ে গেছে। আরো কয়েকটি বন্ধের পথে। চিনি শিল্প করপোরেশন চলতি আখ মাড়াই মৌসুমে (২০১৭-১৮) চিনি রিকভারি (আখ হতে প্রকৃত চিনি সংগ্রহ) বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে। ফলে চিনির উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হবে না। তাতে লোকসানের পরিমাণ আরো বাড়বে। গতবছর ৯ লাখ ৯১ হাজার ৪৫৪ মেট্রিক টন আখ মাড়াই করে ৫৯ হাজার ৯৮৪ মেট্রিক টন চিনি উৎপাদন হয়েছিল। আর রিকভারির হার ছিল ৬ দশমিক ০৫ ভাগ। চিনি শিল্প করপোরেশন সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, চলতি চিনি উৎপাদন মৌসুমে চিনি উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধার্য করা হয় সাড়ে ১৩ লাখ মেট্রিক টন আখ মাড়াই করে এক লাখ ২৮০ মেট্রিক টন চিনি। আর চিনি রিকভারির লক্ষ্যমাত্রা ধার্য করা হয় শতকরা ৭ দশমিক ৪৩ ভাগ। চলতি ফেব্রুয়ারী মাসের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত ৯ লাখ ৯৬ হাজার ৬৪২ মেট্রিক টন আখ মাড়াই করে ৫৫ হাজার ৯৩২ টন চিনি উৎপাদন হয়েছে। রিকভারির গড় হার হচ্ছে ৫ দশমিক ৭৩ ভাগ।
সূত্র জানায়, আগে আখ চাষ লাভজনক ছিল। কিন্তু নানাবিধ কারণে চাষিরা আখ চাষ কমিয়ে অন্য ফসল চাষে ঝুঁকে। ফলে চিনি শিল্প করপোরেশনের সংকট শুরু হয়। প্রতি কেজি চিনির উৎপাদন খরচের অনেক কম দামে চিনি বিক্রি করতে হয়। ফলে লোকসানের পরিমাণ বাড়তে থাকে।
সূত্র আরো জানায়, খোলা বাজারের চেয়ে করপোরেশনের চিনির দাম বেশি থাকায় কাক্সিক্ষত পরিমাণ চিনি বিক্রি হচ্ছে না। এদিকে আখ সঙ্কট প্রসঙ্গে চিনি শিল্প করপোরেশনের ইক্ষু বিভাগের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানান, চাষিরা যাতে আখ চাষে ফের আগ্রহী হয় সেজন্য আখের দাম বাড়িয়ে প্রতিমণ ১২৫ টাকা করা হয়েছে। আগামী বছর ১৪০ টাকা করা হবে। চাষিরা যাতে না ঠকে সেজন্য আখ ক্রয় কেন্দ্রগলোতে ডিজিটাল ওজন যন্ত্র বসানো হয়েছে। আর মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমের চাষিদের আখের মূল্য প্রদান করা হচ্ছে।
এবিষয়ে সাতক্ষীরা খামার বাড়ির কৃষি উপপরিচালক আব্দুল মান্নান জানান,আমরা আখ চাষীদের আখ চাষে উদ্ধুদ্ধ করতে নানা মুখি পদক্ষেপ নিয়েছি। কিন্তু চিনির দাম কম থাকায় কৃষকরা আখ চাষে আগ্রহ কম দেখাচ্ছে। এর পরও কৃষি কর্মকর্তাদের চলতি সপ্তাহে আখ চাষে নানা মুখি প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে। চাষীরা যাতে সারা বছরই আখ চাষ করতে পারে সে বিষয়ে কৃষিকর্মকর্তারা চাষীদের পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছে।

Please follow and like us:
Facebook Comments