এতবড় ঘটনা, জানে ক’জন?

আজ ২৮ মার্চ। আমাদের জাতীয় ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হল বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ। এই যুদ্ধের স্থায়িত্বকাল ছিল অল্পদিনের। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ থেকে ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত। স্বাধীনতা যুদ্ধের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হল যুদ্ধের সময়ের পরিধির তুলনায় ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ। অর্থাৎ মাত্র ৮ মাস ২০ দিনের যুদ্ধে যে ব্যাপক লোকবল এবং ধনসম্পদ ক্ষয় হয়েছে তা অন্য কোনো যুদ্ধে লক্ষ করা যায় না। ৩০ লাখ প্রাণ ও ২ লাখ মা-বোনের সম্ভ্রমহানির বিনিময়ে আমরা পেয়েছি আমাদের কষ্টার্জিত স্বাধীনতা।

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হলেও এর বীজ বপন হয়েছিল অনেক আগে, ১৯৫২ সালের বাংলা ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে। তারপর স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস দীর্ঘ। পূর্ববাংলার জনগণ পাকিস্তান সৃষ্টির পর থেকেই একটু একটু করে প্রস্তুত হতে থাকে বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য। ১৯৪৭ সালে ভারত বিভক্তির পর বাঙালি জাতি বুঝে গিয়েছিল, পাকিস্তানের সঙ্গে সহাবস্থান সম্ভব নয়। ধর্মের ভিত্তিতে অভিন্ন হলেও জাতিতে কিংবা সংস্কৃতিতে আমরা ছিলাম ভিন্ন। আমাদের সত্তা, আমাদের কৃষ্টি কোনোভাবেই পাকিস্তানিদের সঙ্গে যায় না। ওদের লুটেরা স্বভাব বাঙালিরা মেনে নিতে পারেনি। সার্বিক বিবেচনায় বাংলাদেশের স্বাধীনতা ছিল অবধারিত।

আমরা যদি বাংলাদেশের সঠিক ইতিহাস বুঝে থাকি, তাহলে দেখতে পাই বাংলাদেশের স্বাধীনতার সর্বপ্রথম ইঙ্গিতবহ প্রকাশ্য বক্তব্যটি আসে ১৯৫৭ সালে কাগমারী সম্মেলনে পাকিস্তান শাসকগোষ্ঠীর উদ্দেশে মজলুম জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর ঐতিহাসিক ‘আসসালামু আলাইকুম’ বলার মাধ্যমে। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৬৬ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের উত্থাপিত ৬ দফা প্রস্তাব, ১৯৬৯ সালে আগরতলা মামলাকে কেন্দ্র করে অসহযোগ আন্দোলন এবং ১৯৭১ সালে বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণের মাধ্যমে বাঙালি জাতিকে দেয়া বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের চূড়ান্ত নির্দেশ।

১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোট পাওয়ার পর আলোচনার নামে টালবাহানা করে ২৫ মার্চ কালরাতে পাকিস্তান সেনাবাহিনী নিরস্ত্র বাঙালিদের ওপর বর্বরোচিত হামলা চালায়। এই হামলা মোকাবেলায় আমাদের যথেষ্ট প্রস্তুতি না থাকলেও তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া ছিল স্বতঃস্ফূর্ত। ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জে ছাত্র-জনতা বিভিন্ন রাস্তায় ব্যারিকেড তৈরি করে বাঙালি নিধনে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর অগ্রযাত্রাকে ব্যাহত করে। যদিও এই ব্যবস্থা ছিল অপ্রতুল। একইভাবে তৎকালে পূর্ব পাকিস্তানে অবস্থিত ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট, ইপিআরের বাঙালি অফিসার ও সৈনিক এবং পুলিশ সদস্যরা পাকিস্তানের পক্ষ ত্যাগ করে স্বাধীনতা যুদ্ধে শামিল হয়। ২৫ মার্চের ক্র্যাক ডাউনের পর পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে বিচ্ছিন্নভাবে প্রতিরোধ গড়ে উঠলেও সম্মিলিতভাবে সেনানিবাস আক্রমণের ঘটনা একমাত্র রংপুরে ঘটেছিল। ২৮ মার্চ রংপুরের স্বাধীনতাপ্রিয় সংগ্রামী জনতা রংপুর সেনানিবাস আক্রমণের মাধ্যমে যে অনন্য উদাহরণ সৃষ্টি করেছে তা পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল।

’৭০-এর সাধারণ নির্বাচনের পর পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান ১৯৭১ সালের ৩ মার্চ পাকিস্তান জাতীয় পরিষদ অধিবেশনের আহ্বান করেন। কিন্তু পাকিস্তান পিপলস পার্টির নেতা জুলফিকার আলী ভুট্টোর পরামর্শক্রমে ১ মার্চ দুপুরে পাকিস্তান রেডিও মারফত সে অধিবেশন স্থগিত করা হয়। দেশবাসী অধীর আগ্রহে আশা করেছিল জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ক্ষমতা গ্রহণ করবেন। কিন্তু পাকিস্তান শাসকগোষ্ঠী বাঙালির এই আকাক্সক্ষাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখাল। জাতীয় পরিষদ অধিবেশন স্থগিতের ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে প্রচণ্ড বিক্ষোভে ফেটে পড়ে সমগ্র বাঙালি জাতি। ভুট্টো-ইয়াহিয়া চক্রের এই কূটকৌশলকে দেশবাসী ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করে তীব্র প্রতিবাদে রাজপথে বেরিয়ে আসে। বঙ্গবন্ধু তখন নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য ও সিনিয়র নেতাদের নিয়ে ঢাকার হোটেল পূর্বাণীতে মিটিং করছিলেন। ততক্ষণে ঢাকার বিভিন্ন এলাকা থেকে বিক্ষোভ মিছিল একে একে হোটেল পূর্বাণীর সামনে এসে সমবেত হতে থাকে। উদ্দেশ্য বঙ্গবন্ধু পরবর্তী কী নির্দেশ দেন। বঙ্গবন্ধু হোটেল থেকে বেরিয়ে এসে বিক্ষোভরত জনতার মুখোমুখি হলেন। তিনি তার সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে ইয়াহিয়া খানের জাতীয় পরিষদ অধিবেশন স্থগিতের ঘোষণায় ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন এবং এর প্রতিবাদে ২ মার্চ ঢাকায় ও ৩ মার্চ সারা দেশে হরতালের ডাক দেন।

দেশের অন্যান্য জেলার মতো ৩ মার্চ রংপুরে হরতাল পালিত হল। সেদিন সকালে হরতালের সমর্থনে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের নেতৃত্বে রংপুর শহরের কাছারি বাজার এলাকা থেকে একটি মিছিল বেরিয়ে পৌরসভা বাজার, প্রেস ক্লাব, তেঁতুলতলা এলাকা হয়ে আলমনগর এলাকার দিকে অগ্রসর হচ্ছিল। মিছিলের অগ্রভাগে ছিলেন নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য সিদ্দিক হোসেন, জাকির আহমেদ সাবু, অলক সরকার, মুখতার এলাহী, জায়েদুল আলম, হারেস উদ্দিন সরকার, রফিকুল ইসলাম গোলাপসহ আরও অনেক রাজনৈতিক নেতা ও সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের রংপুর জেলার নেতারা। ছাত্র-শিক্ষক, শ্রমিক-যুবা সর্বস্তরের প্রতিবাদী মানুষ এ মিছিলে যোগ দেয়। মিছিলটি যখন আলমনগর এলাকার ভেতর দিয়ে যাচ্ছিল, তখন মিছিলে অংশগ্রহণকারী শংকু সমজদার নামে ১২ বছরের এক কিশোর রাস্তার পাশেই অবস্থিত এক অবাঙালি ব্যবসায়ী সরফরাজ খানের বাড়ির দেয়ালে উর্দুতে লেখা একটি সাইনবোর্ড দেখতে পায়। দেখামাত্র সে যখন সাইনবোর্ডটি নামিয়ে আনতে যায়, ঠিক তখনই সরফরাজ খানের বাসা থেকে মিছিলের ওপর গুলিবর্ষণ শুরু হয়। গুলি এসে শংকু সমজদারকে আঘাত করে। গুলির আঘাতের সঙ্গে সঙ্গে শংকু রাস্তায় লুটিয়ে পড়ে। এ সময় ওর শরীর থেকে প্রচুর রক্তক্ষরণ হয় এবং অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের ফলে হাসপাতালে নেয়ার পথে শংকু সমজদার মারা যায়। শংকু সমজদারের মৃত্যু সংবাদ চারদিকে ছড়িয়ে পড়লে অগ্নিস্ফুলিঙ্গের মতো জ্বলে ওঠে গোটা রংপুর শহর। মিছিলে অংশগ্রহণকারী ছাত্র-জনতা প্রচণ্ড বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। উত্তেজিত জনতা শহরের মূল বাণিজ্যিক এলাকার বেশ কয়েকটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে অগ্নিসংযোগ করে। সেদিন শংকু ছাড়াও আবুল কালাম আজাদ এবং ওমর আলী নামে আরও দু’জন যুবক অবাঙালিদের গুলিতে শহীদ হন। শংকুর মৃত্যুর ঘটনা দিয়েই শুরু হয়ে যায় রংপুরের মুক্তিযুদ্ধের পর্ব। মুক্তিযুদ্ধে রংপুরের প্রথম শহীদ শংকু সমজদার ছিল এক বিধবা মায়ের সন্তান এবং ওদের বাসা রংপুর শহরের গুপ্তপাড়ায়। উল্লেখ্য, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তার ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণে ১ মার্চ থেকে সেদিন পর্যন্ত যে ক’জন মানুষ আত্মাহুতি দিয়েছিলেন তাদের কথা স্মরণ করে তিনি ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা, রাজশাহী জেলার পাশাপাশি রংপুর জেলার নামও উল্লেখ করেছিলেন।

বিনা উস্কানিতে মিছিলে গুলিবর্ষণের ঘটনার জের পরদিনও অব্যাহত থাকে। ৪ মার্চ বিক্ষুব্ধ জনতা আরও মারমুখো হয়ে ওঠে। এদিন শহরের কয়েকটি জায়গায় বাঙালি ও বিহারিদের মধ্যে ব্যাপক সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে এবং এর উত্তেজনা শহরময় ছড়িয়ে পড়ে। বাঙালি-বিহারি সংঘর্ষের এই উত্তাপ রংপুর সেনানিবাসের অভ্যন্তরেও প্রবেশ করে। বাঙালি সৈনিকদের প্রতি অবাঙালি সৈনিকদের আচরণের মধ্য দিয়ে তা প্রকাশ পেতে শুরু করে। অতঃপর শহরের উত্তেজনা পরিস্থিতি বিবেচনা করে সাধারণ সৈনিকদের সেনানিবাসের বাইরে যাওয়ার ব্যাপারে কড়াকড়ি আরোপ করা হয়।

৫ মার্চ ১৪ পদাতিক ডিভিশনের জিওসি মেজর জেনারেল খাদেম হোসেন রাজা রংপুর সেনানিবাস সফরে আসেন। মূল এজেন্ডা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আসন্ন ৭ মার্চের জনসভা। মেজর জেনারেল খাদেম হেলিকপ্টার থেকে নেমে সরাসরি ২৩ পদাতিক ব্রিগেড সদর দফতরে চলে যান। সেখানে রংপুর-সৈয়দপুর সেনানিবাসের সব ইউনিটের অবাঙালি অধিনায়করা আগে থেকেই জিওসি’র আসার অপেক্ষায় ছিলেন। ৭ মার্চের জনসভা থেকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব বাঙালিদের উদ্দেশে পরবর্তী কী কর্মসূচির ঘোষণা দেন সে বিষয়ে আলোচনা হয় এবং বঙ্গবন্ধুর ঘোষণার পরিপ্রেক্ষিতে সেনাবাহিনীর কী ভূমিকা হবে সে ব্যাপারে প্রয়োজনীয় নির্দেশও দেন। রুদ্ধদ্বার বৈঠক শেষে খাদেম অফিসার্স মেসে উপস্থিত বাঙালি ও অবাঙালি অফিসারদের উদ্দেশে বিরাজমান অচলাবস্থার বর্ণনা দেন এবং এজন্য রাজনৈতিক নেতাদের গালাগাল করে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সবাইকে সতর্ক থাকার নির্দেশ দিয়ে আবার হেলিকপ্টারযোগে ঢাকার পথে বিদায় নেন।

জিওসির সফরের পর রংপুর সেনানিবাসের নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও জোরদার করা হয়। বিশেষ করে ৭ মার্চের জনসভাকে কেন্দ্র করেই এই সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। সেনানিবাসের প্রতিটি এমপি চেকপোস্টে লাইট মেশিনগান বসিয়ে সেটিকে একটি দুর্ভেদ্য দুর্গে পরিণত করা হয়। ৭ মার্চ উল্লেখ করার মতো আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি না হলেও যতই দিন গড়াচ্ছিল সেনানিবাসের অভ্যন্তরের পরিস্থিতি ততই নাজুক হচ্ছিল। বিশেষ করে ৩ মার্চে শংকুর মৃত্যুর ঘটনার পর থেকে রংপুরের রাজনৈতিক পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটে। এ অবস্থায় সেনানিবাসে তাজা রসদ সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। তাজা রসদ বলতে মাছ-মাংস, শাকসবজি, ফলমূলকে বোঝায়, যা প্রতিটি ইউনিটের নিত্যদিনের খাবারের মেন্যু অনুযায়ী প্রয়োজন পড়ে। সরবরাহ বন্ধের কারণে খাদ্য সংকট প্রকট আকার ধারণ করে। অবস্থা এমন পর্যায়ে পৌঁছে যে, অফিসার এবং সৈনিকদের শুধু ডাল ও রুটি খাওয়া ছাড়া অন্য কোনো উপায় ছিল না। অবশেষে খাদ্য পরিস্থিতি মোকাবেলায় চিরকালের প্রথা ভেঙে সৈনিক ও অফিসারদের জন্য একই মেন্যু চালু করা হয়।

এ অবস্থা অবাঙালি অফিসাররা কিছুতেই মেনে নিতে পারছিল না। পরিস্থিতি আরও খারাপ হলে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়, যে কোনো উপায়ে বাইরে থেকে তাজা খাদ্য সংগ্রহ করে আনতে হবে। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী একটি জিপ নিয়ে ২৪ মার্চ সকালে ২৯ ক্যাভালরি রেজিমেন্টের পাঞ্জাবি অফিসার লেফটেন্যান্ট আব্বাসের নেতৃত্বে ৪-৫ জনের একটি দল সেনানিবাসের নিকটবর্তী দামোদরপুর গ্রামে পৌঁছে। সেনানিবাসের খাদ্য সংগ্রহের দলটি দামোদর গ্রামে পৌঁছলে মুহূর্তে এ সংবাদ চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। ফলে গ্রামের বিক্ষুব্ধ লোকজন জিপের কাছে সমবেত হতে থাকে এবং জিপটিকে দ্রুত ঘিরে ফেলে। ঘটনার আকস্মিকতায় লেফটেন্যান্ট আব্বাস ও তার দল হতবিহ্বল হয়ে পড়ে। এমতাবস্তায় শাহেদ আলী নামের এক যুবক কালক্ষেপণ না করে এক লাফে জিপের বনেটে উঠে পড়ে এবং এক ঝটকায় জিপের ওপর স্থাপিত মেশিনগানটি ছিনিয়ে নিয়ে দ্রুত তার হাতের খাপ্পর (বল্লমের মতো এক ধরনের দেশি অস্ত্র) দিয়ে লেফটেন্যান্ট আব্বাসকে আঘাত করে। খাপ্পরের আঘাতে আব্বাস মারাত্মকভাবে আহত হয়ে মাটিতে পড়ে যায়। এ সুযোগে শাহেদ আলীর সঙ্গী রফিক, সালাম ও বাদশা তাদের হাতের দা-কুড়াল ও চাপাতি দিয়ে আব্বাসের সৈনিকদের কুপিয়ে জখম করে এবং জিপে আগুন ধরিয়ে দেয়। খাদ্য সংগ্রহকারী দলের ওপর আক্রমণের খবরটি দ্রুত চারদিকে ছড়িয়ে পড়লে প্রতিবাদী বাঙালিদের ভেতর ব্যাপক আলোড়নের সৃষ্টি হয়। অপরদিকে এই সংবাদ সেনানিবাসে পৌঁছলে একটি উদ্ধারকারী দল এসে আহত সবাইকে উদ্ধার করে নিয়ে যায়। লেফটেন্যান্ট আব্বাসের জখম এত গভীর ছিল যে, হাসপাতালে নেয়ার পর সে মারা যায়। এ ঘটনায় রংপুরবাসী খুশি হলেও সেনানিবাস কর্তৃপক্ষ সহজভাবে তা গ্রহণ করতে পারেনি। ২৯ ক্যাভালরির অধিনায়ক লে. কর্নেল সগীর তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখিয়ে আব্বাসের মৃত্যুর প্রতিশোধ নেয়ার প্রতিশ্রুতি দেন তার অধীনস্থ অফিসার এবং জওয়ানদের। উল্লেখ্য, ঘটনার পর লে. কর্নেল সগীর রাজনৈতিক নেতাদের রেজিমেন্ট সদর দফতরে ডেকে আব্বাস ও তার দলের সদস্যদের কাছ থেকে ছিনিয়ে নেয়া অস্ত্রগুলো ফিরিয়ে দিতে বললে নেতৃবৃন্দ অস্ত্রগুলো ফিরিয়ে দেয়ার ব্যবস্থা করেন।

লেফটেন্যান্ট আব্বাসের মৃত্যুর ঘটনার পর সেনানিবাসের নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও দৃঢ় করা হয়। গুরুত্বপূর্ণ পোস্টে অতিরিক্ত সৈন্য মোতায়েন ছাড়াও ২৯ ক্যাভালরি রেজিমেন্টের কয়েকটি ট্যাঙ্ক সেনানিবাসের নিরাপত্তা বেষ্টনী বরাবর স্থাপন করা হয়; এর মধ্যে দুটো ট্যাঙ্ক দক্ষিণ দিকের গ্রামগুলো লক্ষ্য করে মোতায়েন করা হয়। মোতায়েনকৃত ট্যাঙ্কগুলোতে কোনো বাঙালি সৈনিক রাখা হয়নি। একইভাবে রেজিমেন্টের সিগন্যাল সেন্টারে অর্থাৎ যেখান থেকে টেলিফোন কিংবা ওয়্যারলেসের মাধ্যমে যোগাযোগ করা হয়, সেখান থেকেও বাঙালি অপারেটরদের সরিয়ে অবাঙালিদের বসানো হয়। এভাবে সেনানিবাসের বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ জায়গাগুলো বাঙালিশূন্য করা হল।

৩ মার্চের ঘটনার পর রংপুর শহরে অবাঙালিদের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে অগ্নিসংযোগ, সেনানিবাসে তাজা রসদ সরবরাহ বন্ধ এবং ২৪ মার্চ লেফটেন্যান্ট আব্বাসের মৃত্যু রংপুর সেনা কর্তৃপক্ষকে বাঙালিদের বিরুদ্ধে আরও বেশি প্রতিশোধপরায়ণ করে তোলে। ফলে ২৫ মার্চ ভয়াল রাত্রিতে দখলদার বাহিনী তারই আক্রোশ মেটায়। ২৫ মার্চ রাত ১২টা থেকে রংপুর শহরে অনির্দিষ্টকালের জন্য কার্ফু জারি করা হয়। মেশিনগান সজ্জিত ছোট ছোট সেনা দল জিপে চড়ে কার্ফু ডিউটির নামে দ্রুত শহরের অলিগলিতে ছড়িয়ে পড়ে এবং রাতের নীরবতাকে প্রকম্পিত করে প্রচণ্ড গুলিবর্ষণ শুরু করে। রংপুরের আকাশে তখন ট্রেসার বুলেটের আগুনের ফুলকি, বাতাসে বারুদের গন্ধ। আকস্মিক গুলিবর্ষণে সাধারণ মানুষ দিশেহারা ও আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়ে। ভীতসন্ত্রস্ত মানুষ সেনানিবাস সংলগ্ন ভগী, ধাপ, বখতিয়ারপুর, নিসবেতগঞ্জ, পানবাড়ী ও পীরজাবাদের বাড়িঘর খালি করে নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যায়। ২৬ ও ২৭ তারিখের মধ্যে গ্রামগুলো সব জনশূন্য হয়ে পড়ে।

উদ্ভূত পরিস্থিতিতে আওয়ামী লীগের নেতৃবৃন্দ সর্বদলীয় সংগ্রাম কমিটির অন্য সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন এবং পরিস্থিতি পর্যালোচনা ও পরবর্তী পদক্ষেপ সম্পর্কে আলোচনার জন্য গোপনে মিলিত হন। ইতিমধ্যে সেনানিবাসের এক বাঙালি সদস্যের কাছ থেকে একটি গোপন বার্তা তাদের হস্তগত হয়। বার্তায় সেনা সদস্যটি জানান যে, ‘২৫ মার্চের পর বিভিন্ন অপারেশনে পাকিস্তানি সৈনিকরা প্রায়ই সেনানিবাসের বাইরে অবস্থান করছে; এই সুযোগে বিপুলসংখ্যক বাঙালি সমবেত করে সম্মিলিতভাবে সেনানিবাস আক্রমণ করলে বাঙালি সৈনিক ও অফিসার সবাই অস্ত্রহাতে জনতার কাতারে শামিল হয়ে সেনানিবাস দখল করে নিতে পারবে।’

রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ সময় অপচয় না করে ২৮ মার্চ সেনানিবাস ঘেরাও অভিযানের পরিকল্পনা করে। এই ঐতিহাসিক অভিযানে তৎকালীন নির্বাচিত সংসদ সদস্য এবং আওয়ামী লীগ নেতা সিদ্দিক হোসেন, নিসবেতগঞ্জ আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ আমজাদ হোসেন, অ্যাডভোকেট গনি মিয়া, দর্শনা ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান জাবেদ আলী, শ্যামপুর স্কুলের শিক্ষক ও বদরগঞ্জের আওয়ামী লীগ নেতা মজিবর রহমান মাস্টার, রংপুর কৃষক সমিতির সম্পাদক ছয়ের উদ্দিন, রানীপুকুরের আলতাফ মাস্টার, পাগলাপীর গ্রামের আজিজার রহমান ও মুস্তাফিজুর রহমান অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। এ অভিযানে সাঁওতাল এবং ওরাঁও সম্প্রদায়ের মানুষদেরও শামিল করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।

ঘেরাও অভিযানের জন্য হাতে বেশি সময় নেই, দ্রুত সব প্রস্তুতি শেষ করতে হবে। বিপুল মানুষের সমাবেশ প্রয়োজন। সেনানিবাস আক্রমণে আশপাশের গ্রাম ছাড়াও অন্যান্য এলাকার মানুষকেও সম্পৃক্ত করতে হবে। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী শেখ আমজাদ মাঠ পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করেন। এছাড়া অভিযান পরিচালনার জন্য এলাকাভিত্তিক নেতা নির্বাচন করে নিজ নিজ এলাকার মানুষকে সংগঠিত করে এই অভিযানে অংশগ্রহণের দায়িত্ব বণ্টন করে দেয়া হয়। স্থানীয় উপজাতীয়দের এই অভিযানে অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার জন্য রানীপুকুরের পার্শ্ববর্তী বলদিপুকুর গ্রামে ওরাঁও সম্প্রদায় এবং লোহানী পাড়ায় সাঁওতাল সম্প্র্রদায়ের নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। শ্যামপুর স্কুলের মজিবর মাস্টার তার ছাত্রদের নিয়ে বদরগঞ্জ, মধুপুর, পদাগঞ্জ, মাহিনপুর ও নাগেরহাটে সেনানিবাস আক্রমণের পক্ষে ব্যাপক গণসংযোগ করেন। তিনি লোহানী পাড়ায় সাঁওতাল সম্প্রদায়ের মানুষের সঙ্গে দেখা করে এই অভিযানে অংশগ্রহণের জন্য উদ্বুদ্ধ করেন এবং বলেন- ‘আমরা খবর পেয়েছি যে, ক্যান্টনমেন্ট আক্রমণ করলে ক্যান্টনমেন্টের ভিতরে অবস্থিত সব বাঙালি সৈনিক ভাইয়েরা তাদের হাতিয়ার নিয়ে আমাদের সঙ্গে যোগ দেবেন। আমরা ২৮ মার্চ বেলা ২টা থেকে ৩টার মধ্যে ক্যান্টনমেন্ট আক্রমণ করব, আপনারা আপনাদের তীর-ধনুক, বল্লম-দা যার যা কিছু আছে তাই নিয়ে হাজির থাকবেন।’

সাঁওতাল নেতা জয়রাম সরেণ ও সরদার লালরাম সরেণ তাদের সম্প্রদায়ের মানুষদের নিয়ে এই ঘেরাও অভিযানে অংশগ্রহণে বিশেষ আগ্রহ প্রকাশ করেন। শুধু আগ্রহ প্রকাশ করে বসে থাকেননি, অভিযানে অংশগ্রহণের জন্য তারা সাঁওতাল সম্প্রদায়ের তরুণদের নিয়ে নতুন করে অধিক সংখ্যক তীর-ধনুক ও বল্লম তৈরি করেন এবং এ অভিযান সফল করার জন্য সম্প্রদায়ের সদস্যদের প্রশিক্ষণ শুরু করে দেন।

২৭ মার্চ রাতে ঘেরাও অভিযানের চূড়ান্ত সমন্বয়ের জন্য অভিযানের অন্যতম সংগঠক নেছার উকিলের ইঞ্জিনিয়ার পাড়ার মুন্না ভিলায় একটি গোপন মিটিং ডাকা হয়। মিটিংয়ে স্থানীয় নেতাদের নিজ নিজ এলাকা থেকে ব্যাপক মানুষের সমাগম নিশ্চিত করে তাদের নেতৃত্বে সবাইকে নিয়ে সেনানিবাস অভিমুখে একযোগে যাত্রা শুরু করার জন্য অনুরোধ করা হয়। কিন্তু গোপন মিটিংটি আর গোপন থাকল না। ইঞ্জিনিয়ারপাড়ায় বসবাস করে এমন দু’জন ব্যক্তি কাজের প্রয়োজনে সেনানিবাসে যাতায়াত করে; তাদের মাধ্যমে ঘেরাও অভিযানের তথ্যটি দ্রুত সেনা কর্তৃপক্ষের কাছে পৌঁছে যায়।

২৮ মার্চ ১৯৭১ রোববার। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন এলাকার বিক্ষুব্ধ মানুষ সেনানিবাসের আশপাশে সমবেত হতে থাকে। লোক সমাগমে পার্শ্ববর্তী গ্রামগুলোতে যেন সাজসাজ রব পড়ে যায়। মিঠাপুকুর, গঙ্গাচড়া, বুড়িহাট, রানীপুকুর, শ্যামপুর, বলদীপুকুর, তামহাট, পাঠিচড়া, তারাগঞ্জ, সাহেবগঞ্জ, পানবাড়ী এবং অন্যান্য এলাকা থেকে মানুষ বাঁশের লাঠি, দা-কুড়াল, বল্লম, তীর-ধনুক হাতে সেনানিবাসকে চারিদিক থেকে ঘিরে দীপ্ত পদক্ষেপে এগিয়ে চলে। সবার মুখে গগনবিদারী স্লোগান : ‘এস ভাই অস্ত্র ধর….ক্যান্টনমেন্ট দখল কর।’

অগ্নিঝরা এই স্লোগানে চারদিক প্রকম্পিত। কৃষক-শ্রমিক-ছাত্র-জনতার পদভারে সে এক অভূতপূর্ব দৃশ্যের অবতারণা হয়। ঘেরাও অভিযানের প্রধানতম সংগঠক ও অংশগ্রহণকারী নেতা শেখ আমজাদ হোসেন এই অভিযানে তার অভিজ্ঞতা এভাবে বর্ণনা করেন : ‘২৮ মার্চ অপরাহ্নে আমি ক্যান্টনমেন্টের নিকটবর্তী নিসবেতগঞ্জ ঘাঘট ব্রিজের কাছে রাস্তার মোড়ে এসে দাঁড়ালাম। লোক সমাগম হবে কিনা ভেবে দুরু দুরু করে বুক কাঁপছিল। নিজেকে নিজে প্রশ্ন করি- আশানুরূপ লোক সমাগম হবে তো এই অভিযানে? হঠাৎ দেখি পশ্চিম দিক থেকে হাজার হাজার মানুষ মিছিল করে আসছে। সবার হাতে লাঠিসোটা, ছোরা, তীর-বল্লম, দা-কুড়াল। মিছিলের সম্মুখে কমরেড ছয়ের উদ্দীন। তারপরই এলো মজিবর মাস্টারের নেতৃত্বে এক বিশাল মিছিল। বুকের ভেতর যেন একটু একটু করে বল ফিরে পেতে শুরু করলাম। একের পর এক মিছিল এসে সমবেত হতে লাগল ক্যান্টনমেন্টের আশপাশে। বলদিপুকুর থেকে অ্যাডভোকেট গনি মিয়ার নেতৃত্বে ওরাঁও সম্প্রদায়, লোহানীপাড়া থেকে জয়রাম সরেণ ও সরদার লালরাম সরেণের নেতৃত্বে সাঁওতাল বাহিনী তীর-ধনুক বল্লম নিয়ে এদিকেই ধেয়ে আসছে। পাগলাপীরের মানুষ লাহিড়ীর হাট হয়ে আসছে। তাদের সঙ্গে যোগ হয়েছে বলরাম ও আবদুস কুদ্দুস বাহিনীর লোকজন। রানীপুকুর, রুপসী বালার হাট, গোপালপুর, শ্যামপুর, গঙ্গাচড়া থেকে আনুমানিক ৩০ থেকে ৩৫ হাজার মানুষ ক্যান্টনমেন্টের দিকে আসছে। চারদিকে সে কী উন্মাদনা! রক্তচক্ষু অগ্রাহ্য করে দৃঢ় পদক্ষেপে সবাই এগিয়ে চলেছে ক্যান্টনমেন্টের দিকে।’

২৭ মার্চ পর্যন্ত অপ্রত্যাশিত এই অভিযান সম্পর্কে কোনো ধারণাই ছিল না পাক সেনাদের। তবে সেদিন রাতে হঠাৎ অনির্ধারতি সোর্স মারফত অভিযানের খবরটি জেনে যায় লে. কর্নেল সগীর। জানার পর এ অভিযান মোকাবেলায় যে পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয় তা কিছু বিশ্বস্ত পাঞ্জাবি অফিসার ছাড়া অন্য সবার কাছে গোপন রাখা হয়। বাঙালি অফিসার বিশিষ্ট মুক্তিযাদ্ধা মেজর নাসির উদ্দিন (অব.) তখন সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট হিসেবে লে. কর্নেল সগীরের অধীন ২৯ ক্যাভালরি রেজিমেন্টে কর্মরত ছিলেন। তিনি প্রায় আড়াই মাস বন্দি থেকে ২৮ জুন রংপুর সেনানিবাস থেকে বেরিয়ে ৩ নম্বর সেক্টরে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিয়েছিলেন। ২৮ মার্চ রংপুর সেনানিবাস ঘেরাও অভিযান তিনি সেনানিবাসের অভ্যন্তরে থেকে প্রত্যক্ষ করেন। মেজর নাসির তার অভিজ্ঞতার আলোকে ঐতিহাসিক ঘেরাও অভিযান ও অভিযান-উত্তর ঘটনা বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন, ‘দক্ষিণ দিকে মুখ করে তাকিয়ে যে শিহরণ জাগানো প্রতিবাদী মানুষের অগ্রযাত্রা আমি দেখেছি তা পৃথিবীর আর কোথাও কেউ দেখেছে বলে জানা নেই। সে দৃশ্য চমকে দেয়ার মতো। দক্ষিণ দিক থেকে হাজার হাজার মানুষ সারি বেঁধে এগিয়ে আসছে সেনাছাউনির দিকে। তাদের সবার চোখে ছিল অগ্নিশিখা আর হাতে ছিল দা-কাঁচি, তীর-ধনুক, বর্শা, বল্লমের মতো অতি সাধারণ সব অস্ত্র।’

অভিযানে অংশগ্রহণকারী বিক্ষুব্ধ মানুষের ঢল যখন ক্রমশই সেনানিবাসের দিকে ধাবমান, তখন সগীর তার পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি স্বয়ংক্রিয় ব্রাউনিং মেশিনগান সজ্জিত ১০টি সামরিক জিপ অগ্রসরমান মানুষের দিকে তাক করে লাগানোর আদেশ দিলেন। অপরদিকে বাঁধভাঙা মানুষের জোয়ার নিসবেতগঞ্জ পেরিয়ে বালার খাইল এলাকা অতিক্রম করে বর্তমান সেনানিবাস বাজারের কাছে পৌঁছামাত্র মেশিনগানের গুলিবর্ষণ শুরু হয়ে যায়। অবিশ্বাস্য বৃষ্টির মতো গুলিবর্ষণের মুখে ঝাঁকে ঝাঁকে মানুষ মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। একটানা গুলির গর্জন এবং আহত মানুষের আর্তচিৎকার মিলেমিশে আশপাশের পরিবেশকে ভারি করে তোলে। মাত্র পাঁচ মিনিটের গুলিবর্ষণে আনুমানিক ৫০০ থেকে ৬০০ মানুষ মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। দেখতে দেখতে সেনানিবাসের দক্ষিণের সবুজ মাঠ যেন কারবালা প্রান্তরে রূপান্তরিত হল। শত শত আহত মানুষের আর্তনাদ চারপাশের দৃশ্যাবলীকে আরও মর্মান্তিক করে তুলল। এরকম বিরূপ পরিস্থিতির জন্য কেউই প্রস্তুত ছিল না। এমতাবস্থায় জনতা ছত্রভঙ্গ হয়ে গেলে শেখ আমজাদ ও মজিবর মাস্টার ঘাঘট নদী পার হয়ে পানবাড়ী গ্রামের দিকে নিরাপদ স্থানে চলে গেলেন।

নারকীয় এই হত্যাকাণ্ডের পর সগীর তাচ্ছিল্যের স্বরে পাশে দাঁড়ানো সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট নাসিরকে উদ্দেশ করে বলে ওঠে : ‘কী দেখলে তো বাড়ন্ত বাঙালিদের কেমন শিক্ষাটি দেয়া হল? বেঈমানগুলো সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে গিয়েছিল। শিক্ষাটি সে রকমই দেয়া হল।’ বাকরুদ্ধ নাসির অসহায় দৃষ্টিতে কিংকর্তব্যবিমূঢ়ের মতো দাঁড়িয়ে রইলেন।

অভিযানে অংশগ্রহণকারী মানুষদের হত্যা করা যত না মর্মান্তিক ছিল, হত্যাকাণ্ডের পর আহত ও নিহত বাঙালিদের সঙ্গে সগীর এবং তার সহচরদের আচরণ ছিল আরও নিষ্ঠুর ও দুঃসহ, যেন মধ্যযুগীয় বর্বরতাকেও হার মানায়। মাঠজুড়ে পড়ে থাকা আহত মানুষের গোঙানি ও আর্তনাদ তাদের বিরক্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। পাঞ্জাবি সৈনিকরা বেয়োনেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে আহত মানুষের কণ্ঠ চিরতরে স্তব্ধ করে দিতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। পাঞ্জাবি এক সৈনিক মাটিতে পড়ে থাকা একজন আহত বাঙালির মুখ তার বুটের তলায় পিষিয়ে দিতে চেষ্টা করে ব্যর্থ হলে তাৎক্ষণিক তার হাতের অস্ত্রে লাগানো বেয়োনেটটি জোরে বসিয়ে দেয় আহত বাঙালির বুকের ভেতর। অন্যদিকে পাকিস্তানি ক্যাপ্টেন শারাফাত রাস্তার কালভার্টের নিচে লুকিয়ে থাকা এক বৃদ্ধের শার্টের কলার ধরে হাতের পিস্তলের ৮টি গুলিই খরচ করল তার শরীরে। সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট নাসির নিজেকে সংযত রাখতে না পেরে আহত ব্যক্তিদের এমন নির্মমভাবে হত্যা করা হচ্ছে কেন জিজ্ঞেস করতেই ক্যাপ্টেন শারাফাত উল্লাস প্রকাশ করে বলে ওঠে : ‘ওরা লেফটেন্যান্ট আব্বাসের হত্যাকারী; ওদের হত্যা করায় কোনো পাপ নেই।’

ইতিমধ্যে সগীর মাঠে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা লাশগুলো ট্রাকে করে সেনানিবাসের অভ্যন্তরে নিয়ে আসার নির্দেশ দিলেন। নির্দেশ শোনামাত্র তার সন্নিকটে দাঁড়িয়ে থাকা আরেক পাঞ্জাবি অফিসার সাজেদ- ট্রাক মাঠের কাছাকাছি নেয়া সম্ভব হবে না জানিয়ে লাশগুলোকে মাঠে গর্ত করে পুঁতে ফেলতে অথবা আগুনে পুড়িয়ে ফেলার পরামর্শ দেয়। সাজেদের পরামর্শ সগীরের মনঃপূত হল। দেরি না করে পেট্রল ঢেলে লাশগুলো পুড়িয়ে ফেলার আদেশ দিয়ে সগীর স্থান ত্যাগ করে চলে যায়।

সেদিন যেন সূর্য আর ডোবে না। স্বাভাবিক সূর্যাস্তের সময় যেন দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হতে থাকে। কসাই সগীরের আদেশ পাওয়া মাত্র আনুমানিক ৬০০ স্বাধীনতাপ্রিয় বাঙালির মরদেহ পেট্রল ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয়া হয়। মুহূর্তে দাউ দাউ করে আগুনের লেলিহান শিখা চারদিক আলোকিত করে জ্বলে ওঠে। জ্বলজ্বলে আগুনে চোখের পলকে ঝলসে গেল কৃষক, মজুর, মধ্যবিত্ত ও ছাত্র-যুবক। ওদের একটাই পরিচয়- ওরা বাঙালি। আগুনের এই আলোর শিখা যেন সূর্যের আলোর মতোই উজ্জ্বল ঊর্ধ্বগামী, যেন উদিত সূর্যের আলোয় সিক্ত আমাদের প্রাণপ্রিয় স্বাধীনতা।

বাঁশের লাঠি, তীর-ধনুক, দা-কুড়াল হাতে আধুনিক অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত সেনানিবাস আক্রমণের দুঃসাহসিক ঘটনা বোধকরি পৃথিবীর ইতিহাসে আর ঘটেনি। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে মুক্তিপাগল রংপুরের সংগ্রামী মানুষ এমন সাহসিক অভিযানের মাধ্যমে এক অনন্য ইতিহাস সৃষ্টি করেছে। তাদের এই নিঃস্বার্থ আত্মত্যাগ প্রতিটি বাঙালিকে করেছে গৌরবান্বিত। বীরত্বের এই গৌরবগাথা প্রতিটি বাঙালির মননে চির জাগরূক হয়ে থাকবে। কিন্তু দুর্ভাগ্য স্বাধীনতা যুদ্ধের এমন গৌরবোজ্জ্বল ঘটনা আমাদের অনেকেরই জানা নেই। পরিকল্পনা অনুযায়ী ১৯৭১ সালের ২৮ মার্চের রংপুর সেনানিবাস ঘেরাও অভিযান যদি সফল হতো, তাহলে হয়তো বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস অন্যভাবে লেখা হতো।

একেএম শামসুদ্দিন : ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অবসরপ্রাপ্ত)

Facebook Comments
Please follow and like us: