শহরে ১০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত পানিশোধানাগার আজো চালু হয়নি* পৌরসভা ও জনস্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পাল্টা-পাল্টি দোষারোপ** নিন্ম মানের নির্মাণ সামগ্রী ব্যবহারের অভিযোগ

*পৌরসভা ও জনস্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পাল্টা-পাল্টি দোষারূপ
* নিন্ম মানের নির্মাণ সামগ্রী ব্যবহারের অভিযোগ
*ড্রেনেজ ভেঙ্গে ফেলেছে স্থানীয়রা
* রাস্তা-ঘাট খান খান
* পানির পাইপ ফেটে রাস্তা ব্যবহারের অনুপযোগী
* সুপেয় পানি বঞ্চিত হচ্ছে ২ লক্ষ মানুষ
* হুমকীর মুখে প্রধান মন্ত্রীর উদ্বোধনকৃত প্রকল্পটি
* জেলা প্রশাসনের কঠোর হুশিয়ারী

আবু  সাইদ বিশ্বাস: ব্যাপক অনিয়ম, দুর্নীতি ও পাল্টা-পাল্টি দোষারোপের কারণে বন্ধ আছে প্রায় ১০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিতব্য সাতক্ষীরা ভূ-গর্ভস্থ পানি শোধানাগার প্রকল্প। প্রায় দু’বছর আগে প্রকল্পটির কার্যক্রম শেষ হওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে তা সম্ভব হয়নি। ২০১৪ সালে ২ অক্টোবর শহরের ৫নং ওয়ার্ডে কুখরালিতে প্রকল্পটির উদ্বোধন করেন স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। প্রকল্পটি বাস্তবায়নের জন্য নি¤œমানের সামগ্রী ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। নকশা অননুযায়ী প্রকল্পের বেশিরভাগ কাজ না করারও অভিযোগ রয়েছে। পাইপ বসানোর নামে স্থানীয় রাস্তাঘাট কেটে চুরমার করে ফেলা হয়েছে। মাসের পর মাস রাস্তাগুলো ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। পানির পাইপ ফেঁটে রাস্তা-ঘাট কাদা কাদা হয়ে রয়েছে। অনিয়মের অভিযোগ তুলে নবনির্মতি ড্রেনেজগুলো ভেঙে ফেলেছে স্থানীয়রা। ফলে দুর্ভোগের যেন অন্ত নেই সংশ্লিষ্ট এলাকায়।
৩৫০ ঘন মিটার ক্ষমতা সম্পন্ন সুপেয় ভূ-গর্ভস্থ পানিশোধানাগার প্রকল্পটি চালু করতে না পারায় সাতক্ষীরা পৌরসভা ও স্থানীয় স্বাস্থ্য প্রকৌশলী অধিদপ্তর একে অপরকে দায়ি করছে। এতে জনদুর্ভোগ বাড়ছে। তছরুপ হতে চলেছে প্রায় ৯ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত প্রকল্পটি। এরই মধ্যে পাইপ বসানোসহ ড্রেনেজ ব্যবস্থা চালু করতে আরো এক কোটি টাকা প্রকল্পের কাজ চলছে।
প্রকল্পটি চালু হলে সাতক্ষীরা শহরের আড়াই লক্ষ মানুষ এর সুফল ভোগ করতে পারবে। বর্তমানে সাতক্ষীরা শহরে সুপেয় পানির চাহিদা রয়েছে ১ কোটি ৩০ লক্ষ লিটার। অন্যদিকে পৌরসভার নিজস্ব পানির লাইন থেকে সরবরাহ করা হয় ৬৫ লক্ষ লিটার। ফলে ঘাটতি থাকে প্রায় ৬৫ লক্ষ লিটার। নতুন ৩৫০ ঘন মিটার সম্পন্ন ভূ-পর্ভস্থ পানিশোধনাগারটি চালু হলে পৌরসভার চাহিদা মিটানো অনেকটা সম্ভব হবে। এ প্রকল্পটি চালু হলে পৌরসভার ৬০ হাজার পরিবার সুপেয় পানির সুবিধা ভোগ করতে পারবে বলে জেলা স্বাস্থ্য প্রকৌশল বিভাগ জানান।
গত ১১ এপ্রিল জেলা আইশৃঙ্খলা কমিটির সভায় পৌর মেয়র তাসকিন আহমেদ চিশতি অভিযোগ করে বলেন, পৌর এলাকায় সুপেয় পানির সংকট তীব্র। আমাদের যে পানির প্লান্ট আছে তা দিয়ে পৌর এলাকার মানুষকে পানির প্রয়োজন মেটানো সম্ভব না। সম্প্রতি একটি সুপেয় পানির প্রকল্পের কাজ পৌর এলাকার কুখরালীতে শুরু হয়েছে। কিন্তু ঠিকাদার সঠিকভাবে কাজ করছেন না বলে অভিযোগ করে তিনি বলেন, এটি বর্তমানে যেভাবে কাজ হচ্ছে তাতে প্রকল্পটি ২/৩ মাসের মধ্যে নষ্ট হয়ে যাবে।
৩০ বছর মেয়াদী প্রকল্পটির কাজ পান ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মের্সাস জিলানী ট্রের্ডাস। প্রতিষ্টানটির মালিক কাজী জিলানি হায়দার ঢাকার একজন প্রভাবশালী। তাই বেশির ভাগ কাজ অন্য ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান দিয়ে সাব কন্টাকে করিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। কোন রকমে দায়সারা ভাবে প্রকল্পটির কাজ শেষ করার চেষ্টা করা হয়েছে।
সুত্র যায়, সাতক্ষীরা শহরে সুপেয় পানির সরবরাহ নিশ্চিত করতে শহরের ৫নং ওয়ার্ডের কুকরালিতে ৭ কোটি ৯২ লক্ষ ৫৬ হাজার ৬০৭ টাকা ব্যয়ে একটি প্রকল্প হাতে নেয় জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর সাতক্ষীরা। টেন্ডারের পর প্রকল্পটির চুক্তি মুল্য দাড়ায় ৮ কোটি ৯৯ লক্ষ ৫৬ হাজার ৭৯৭ টাকা। টেন্ডার অনুযায়ী ২০১৪ সালের ২ অক্টোবর প্রকল্পটির কাজ শুরু হয়। ২৪ মাস মেয়াদী প্রকল্পটির কাজ শেষ হওয়ার কথা পহেলা অক্টোবর ২০১৬ সালে। ফলে মেয়াদ শেষ হওয়ার দুবছর পরও প্রকল্পটির কার্যক্রম শুরু হতে না পারায় নানা অভিযোগ উঠে বাস্তবায়নকারী প্রতিষ্ঠানটির দিকে।
পৌর মেয়র তাসকিন আহমেদ চিশতি জানান, ৩৫০ঘন মিটার ক্ষমতা সম্পন্ন সুপেয় ভূ-গর্ভস্থ পানিশোধানাগার প্রকল্পটি যেন তেনভাবে করা হচ্ছে। প্রকল্পটির মেয়াদ ৩০ বছর থাকলেও দুই-এক বছরের মধ্যে এটি নষ্ট হয়ে যাবে। ফলে সরকারের বিপুল অংকের অর্থ অপচয় হবে। বিষয়টির সুরাহ করতে সরকারের বিভিন্ন দপ্তরে চিঠি পাঠিয়েছেন সাতক্ষীরা পৌরমেয়র।
ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মের্সাস জিলানী ট্রের্ডাস প্রফাইটার কাজী জিলানি হায়দার জানান, তার বিরুদ্ধে পৌরসভার আনা অভিযোগ সমূহ মিথ্যা। প্রকল্পটি যথাযথ নিমানুযায়ী হয়েছে। নিদিষ্ট সময়ে কাজও শেষ হয়েছে। কিন্তু ড্রেনেজ ব্যবস্থা না থাকার কারণে ময়লা বা খারাপ পানি নিষ্কাশন করা সম্ভব হচ্ছে না। এছাড় গত দুই মাস আগে পানি নিষ্কাশনের জন্য একটি বরাদ্ধ পান তিনি। বরাদ্ধ অনুযায়ী ড্রেনেজ ব্যবস্থা করা হচ্ছিল। কিন্তু সেটির কাজ বন্ধ করে দিয়েছে সাতক্ষীরা পৌরসভা। তিনি যথা সময়ে প্রকল্পটির কাজ শেষ করে পৌরসভার কাছে হস্তান্তর করতে না পারার পিছনে সাতক্ষীরা জনস্বাস্থ্য অধিদপ্তরকে দুষলেন। তিনি জানান, সাতক্ষীরা জনস্বাস্থ্য অধিদপ্তর প্লান পাশ করতে দীর্ঘ সময় লাগিয়েছে।
এবিষয়ে সাতক্ষীরা জনস্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আমিনুল ইসলাম জানান, ৩৫০ঘন মিটার ক্ষমতা সম্পন্ন সুপেয় ভূ-গর্ভস্থ পানিশোধানাগার প্রকল্পটিতে ড্রেনেজ ব্যবস্থা ছিল না। ফলে সুফলভোগী সাতক্ষীরা পৌরসভা ড্রেনেজ ব্যবস্থা করার কথা। কিন্তু তারা তা করেনি। ফলে প্রকল্পটি হস্তান্তর করতে একটু বেশি সময় লাগছে। আগামি জুন-জুলাইয়ের মধ্যে প্রকল্পটি হস্তান্তর করা সম্ভব হবে বলে তিনি আশাবাদী।
এবিষয়ে সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ ইফতেখার হোসেন জানান, প্রকল্পটির নকশা ও প্লান অনুযায়ী জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর সাতক্ষীরা বাস্তবায়ন করবে। দ্রুত কাজ শেষ করে সুফল ভোগী সাতক্ষীরা পৌরসভার কাছে প্রকল্পটি হস্তান্তর করতে হবে। প্রকল্পে কোন ত্রুটি থাকলে যথাযথ তার সমাধান করা দরকার। অন্যদিকে সাতক্ষীরা পৌরসভা সুফলভোগী। তাদের উচিৎ প্রকল্পটি চালু করতে সহযোগীতা করা। প্রয়োজনে ড্রেনেজ ব্যবস্থা সংস্কার করা। অভিযোগ পাল্টা অভিযোগ না দিয়ে কিভাবে প্রকল্পটি চালুকরা যায় তার যথাযথ ব্যবস্থা নেয়।
তিনি আরে বলেন, সাতক্ষীরা পৌরসভা এবং জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর সাতক্ষীরা দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা না নিলে জণগণের ভোগান্তি বাড়বে। জনগণের ভোগান্তি বাড়ালে প্রধানমন্ত্রীর এ প্রকল্পটি অনিশ্চিত হয়ে পড়বে। প্রকল্পটি বাস্তবায়নে অনিয়ম পেলে জেলা প্রশাসন পয়োজনে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।

Please follow and like us:
Facebook Comments