নূতনের বার্তা নিয়ে এল হে বৈশাখ। খোশ আমদেদ ১৪২৫ বঙ্গাব্দ

সামছুল আরেফীন: “তোরা সব জয়ধ্বনি কর/ঐ নূতনের কেতন ওড়ে কালবোশেখীর ঝড়/তোরা সব জয়ধ্বনি কর।” কবি কাজী নজরুল ইসলামের কবিতার মতোই নূতনের কেতন ওড়াতে বৈশাখ আমাদের মাঝে আবারো ফিরে এলো। প্রতি বছরই নূতনের বার্তা নিয়ে আমাদের মাঝে ফিরে আসে বৈশাখ। খোশ আমদেদ ১৪২৫ বঙ্গাব্দ। নববর্ষ উৎসব শুধু আমাদের দেশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। সারা বিশ্বময় বাংলাভাষী মানুষের উৎসব বৈশাখ। এবারও বাংলা নববর্ষ বরণে নানা আয়োজন করা হয়েছে।
পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে আজ সরকারি ছুটি। জাতীয় সংবাদপত্রগুলো বাংলা নববর্ষের বিশেষ দিক তুলে ধরে ক্রোড়পত্র বের করেছে। সরকারি ও বেসরকারি টিভি চ্যানেলে নববর্ষকে ঘিরে বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানমালা প্রচার করা হবে।
রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে বর্ষবরণে বর্ণাঢ্য আয়োজনের ঘনঘটা। অনাকাংক্ষিত পরিস্থিতি এড়াতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। এবারও পহেলা বৈশাখের মূল আকর্ষণ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউটের তথাকথিত ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’। ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্য স্বীকৃতির পর এ শোভাযাত্রা নিয়ে সরকারের বাড়াবাড়িতে ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে। দেশের বরেণ্য হাক্কানী আলেম ও পীর-মাশায়েখগণ সহ ইসলামপন্থী রাজনৈতিক সংগঠনগুলো হিন্দুয়ানী এ শোভাযাত্রা বন্ধের দাবিতে সোচ্চার হয়ে উঠেছেন।
এদিকে বাংলা নববর্ষ উপলক্ষে প্রেসিডেন্ট মো. আব্দুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া এবং বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর ভারপ্রাপ্ত আমীর মাওলানা আ.ন.ম শামসুল ইসলাসসহ জাতীয় নেতৃবৃন্দ পৃথক পৃথক শুভেচ্ছা বাণী দিয়েছেন।
মুসলিম ঐতিহ্যের হিজরি সনকে ভিত্তি করেই বাংলা সনের উৎপত্তি হয়েছে। মুঘল সম্রাট আকবর বাংলার কৃষকদের সুুুবিধার্থে এবং তার সিংহাসন আরোহনের বছরকে স্মরণীয় রাখতে সভাজ্যোতিষী আমীর ফতেউল্লাহ সিরাজীর (দৈবে দশমরতœ) পরামর্শে হিজরি ৯৬৩ সনকে বাংলা ৯৬৩ সন ধরে বাংলা সন গণনার নির্দেশ দেন। অধিকন্তু পারস্যের (ইরানের) নববর্ষ উদযাপনের অনুষ্ঠান ‘নওরোজ’ এর আদলে বাংলা নববর্ষ উদযাপনের সূচনাও করেন। তার আনুকূল্যে ও পৃষ্ঠপোষকতায় জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে বাংলা নববর্ষ উদযাপিত হতো। ‘নওরোজ’ অনুষ্ঠানের অন্যতম প্রধান অনুষঙ্গ ‘মিনা বাজার’। আর এ মিনা বাজারের আদলে বাংলা নববর্ষ উৎসবে যোগ হয়েছে ‘বৈশাখী মেলার’।
বরাবরের মতো এবারো রাজধানীর রমনা পার্ক ও আশপাশ এলাকা বর্ষবরণ উৎসবের প্রাণকেন্দ্র। বর্ষবরণের সকল প্রস্তুুতি গতকালই সম্পন্ন হয়েছে। পহেলা বৈশাখে যাতে কোনো রকম অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটে সে লক্ষ্যে রমনা বটমূল ছাড়াও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি এলাকা, চারুকলা ইনস্টিটিউট, শাহবাগ, শিশুপার্ক, সোহরাওয়ার্দী উদ্যান, মৎস্যভবন, বাংলা একাডেমি, হাইকোর্ট এলাকাসহ রমনা পার্কের চারপাশে পথে পথে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী অবস্থান নিয়ে নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করবে। গোয়েন্দা কার্যক্রম শুরু হয়েছে কয়দিন আগে থেকেই। বিপুলসংখ্যক পুলিশ-র‌্যাবের পাশাপাশি বটমূলের চারপাশে থাকবে ক্লোজ-সার্কিট ক্যামেরা এবং বিস্ফোরক শনাক্ত করার অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি। রাজধানীতে যানবাহন ও পথচারী চলাচলে বিধি-নিষেধ আরোপ করেছে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)। নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশ ও র‌্যাবের পাশাপাশি গোয়েন্দা সংস্থা ও তাদের আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে যৌথভাবে কাজ করছে সব সংস্থা। সার্বিক নিরাপত্তা ও নজরদারি নিশ্চিত করতে বসানো হয়েছে কন্ট্রোল রুম, অবজারভেশন পোস্ট ও চেক পোস্ট। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের পাশাপাশি থাকছে গোয়েন্দা দলের সদস্য, বোমা ডিসপোজাল টিম ও মেডিক্যাল টিম।
হতাশা মুছে প্রাণের ছোয়া: কবি গোলাম মোস্তফা নববর্ষের আগমনকে আশীর্বাদ হিসেবে দেখেছেন। তিনি বৈশাখকে তেজদীপ্ত টগবগে ঘোড়ার দৌড়ানোর সাথে তুলনা করেছেন। নববর্ষ সব হতাশাকে মুছে ফেলে নিয়ে আসে প্রাণের জোয়ার। ‘নববর্ষের আশীর্বাদ’ কবিতায় তিনি বলেছেন, ওই এলোরে ওই এলো/নতুন বর্ষ ওই এলো/তরুণ তপন ওঠলোরে/ধ্বস্ত তিমির ছুটলোরে/নওরোজের এই উৎসবে/ওঠ জেগে আজ ওঠ সবে/সুপ্তি ভাঙো চোখ খোলো/দুঃখ হতাশ শোক ভোলো/চাও কেন আর পশ্চাতে/চাইলে হবে পসতাতে/হও আজিকে অগ্রসর/নূতন আশা ব্যগ্রতর…।
এখানে ‘মুহূর্তের কবিতায়’ অন্তর্ভুক্ত কবি ফররুখ আহমদের ‘বৈশাখী’ কবিতায় তুলে ধরেছেন বৈশাখের চিত্র। কবি লিখছেন, বৈশাখের মরা মাঠ পড়ে থাকে নিস্পন্দ যখন/নি®প্রাণ, যখন ঘাস বিবর্ণ, নি®প্রভ ময়দান,/যোজন যোজন পথ ধূলি-রুক্ষ, প্রান্তর, বিরান;/শুকনো খড়কুটো নিয়ে ঘূর্ণী ওঠে মৃত্যুর মতন;/সে আসে তখনি। তখনি তো ঘিরে ফেলে উপবন,/বন;Ñচোখের পলকে, মুছে ফেলে ঘুমন্ত নিখিল/সে আসে বিপুল বেগে। কণ্ঠে তার সুরে ইস্রাফিল/বজ্রস্বরে কথা কয়, জানে না সে গম্ভীর বন্ধন।/মানে না সে আহাজারি বিশুষ্ক মাঠের, মানে না সে/পথের হাজার বাধা, অরণ্যের ক্লান্ত আর্তস্বর,/বিদ্যুৎ চমকে তার সাড়া জাগে সমস্ত আকাশে,/জেগে ওঠে বজ্র রবে এক সাথে নির্জিত প্রান্তর,/দিক দিগন্তের পথে চলে যায় নিমেষে খবর;/ধ্বংসের আহ্বান নিয়ে অনিবার্য সে আসে সে আসে।
উৎসব অনুসঙ্গ কতটা প্রাসঙ্গিক: পহেলা বৈশাখ বা বাংলা নববর্ষের বিষয়টি নিশ্চয়ই আমাদের দেশজ সংস্কৃতির অংশ, কিন্তু এখন এটাকে উদযাপনে এখন এমন কিছু চাপিয়ে দেয়া হয়, যা আমাদের দেশীয় সংস্কৃতির সাথে মিলে না।
সাম্প্রতিককালে আধুনিক ও শিক্ষিত মধ্যবিত্ত তরুণ প্রজন্ম শহুরে পরিসরে পহেলা বৈশাখকে প্রধানত উদযাপন করে মূলত হিন্দু পুরাণ ও সনাতন ধর্মানুসারে বর্ণিত গণেশ দেবতার মূর্তি এবং শক্তি ও মঙ্গলের প্রতীক বিভিন্ন দেবদেবীর বাহনের মূর্তি নিয়ে যেমন- কার্তিকের বাহন ময়ূর, স্বরস্বতীর বাহন হাঁস, লক্ষ্মীর বাহন পেঁচা এবং আরো বিভিন্ন রাক্ষস-খোক্ষস ও জীবজন্তুর বিশাল বিশাল মূর্তি নিয়ে মঙ্গল শোভাযাত্রা করা হয়। এটা কখনই এদেশের সংখ্যাগরিষ্ট মানুষের সংস্কৃতি হতে পারে না।
দাবী করা হয়, বাংলা নববর্ষের মঙ্গল শোভাযাত্রা নাকি হাজার বছরের ঐতিহ্য। কিন্তু ইতিহাস বলে ভিন্ন কথা। অনুসন্ধানে জানা যায়, আধুনিক নববর্ষ প্রথম উদযাপন হয় ১৯১৭ সালে। প্রথম মহাযুদ্ধে বৃটিশদের বিজয় কামনা করে সে বছর পহেলা বৈশাখে হোম কীর্তন ও পূজার ব্যবস্থা করা হয়। এরপর ১৯৩৮ সালেও অনুরূপ কর্মকান্ডের উল্লেখ পাওযা যায়। পরবর্তী সময়ে ১৯৬৭ সনের আগে ঘটা করে পহেলা বৈশাখ পালনের রীতি তেমন একটা জনপ্রিয় হয়নি।
বিগত ১৯৮৯-৯০ সালের দিকে প্রথম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগের উদ্যোগে মঙ্গলশোভাযাত্রার মাধ্যমে ব্যাপক ঢোলবাদ্যে বাংলা নববর্ষ উদযাপন শুরু হয়। অথচ অতীতে এতটা আড়ম্বরপূর্ণ ও ঘটা করে বাংলা নববর্ষ উদযাপিত হয়নি, বরং তখন এই উৎসবের দিনে পুরো বছরের দেনা-পাওনার হিসাব, শুল্ক পরিশোধ ও খাজনা আদায় করাই ছিল মূল উদ্দেশ্য। হিন্দু মহাজন ও জমিদাররা নিজেদের প্রজাদের মিষ্টি খাইয়ে আপ্যায়ন করতেন-যা ‘পুণ্যাহ’ নামক একটি অনুষ্ঠান ছিল। অথচ এখন এসবের চেয়েও আরো অনেক কিছু উৎসবের সাথে যুক্ত হয়েছে, যা আবহমানকাল থেকে ছিল না। এখন পান্তা-ইলিশকে বর্ষবরণ অনুষ্ঠানের আবশ্যিক অনুসঙ্গ করে ফেলা হয়েছে। যেখানে গরিব-দুখীদের নিত্যই পান্তাভাত খেয়ে বেঁচে থাকতে হয়, সেখানে সচ্ছল মধ্যবিত্তদের একদিনের জন্য পান্তাভাত খেয়ে ‘বাঙালি’ হওয়া কীভাবে সার্বজনীনতার পরিচায়ক হয় বুঝে আসেনা। অধ্যাপক যতীন সরকার বলেছেন, ‘পান্তা-ইলিশ’কে বৈশাখের উপলক্ষ্য করা বানোয়াট ও ভন্ডামির অংশ। তবে গত বছর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আহ্বানের পর আনুষ্ঠানিকভাবে ‘পান্তা-ইলিশ’ খাওয়ার প্রবণতা কমেছে।
বিশ্বায়নের ফলে আধুনিক যুগের বাংলা নববর্ষ উদযাপনের মনোহরি চাকচিক্য বাড়লেও আন্তরিকতার অভাব যথেষ্ট। এখন উৎসবগুলোকে বাণিজ্যিকিকরণের কারনে প্রাণের ছোয়া পাওয়া যায় না। আধুনিক যুগের শহুরে মানুষদের প্রাণহীন জমকালো বর্ষবরণের কৃত্রিমতায় নিবিড় পল্লীর প্রীতিপূর্ণ ছোট ছোট উৎসব ঢাকা পরে যায়। শিল্পপতি, বড় চাকুরিজীবী ও টাকাওয়ালাদের উৎসবের তান্ডবতায় বাঙালি কৃষকদের নববর্ষ উৎসব পিষ্ট হয়। অথচ বাংলা নববর্ষের সূচনাই হয়েছে বাঙালি কৃষকের সংস্কৃতিকে ভিত্তি করে। নির্দিষ্ট সময়ে কৃষকের কাছ থেকে জমিদারের খাজনা আদায়ের সুবিধার্থে বাংলা সনের প্রবর্তন করা হয়েছে। অর্থাৎ বাংলা নববর্ষের মূলে কৃষক ও কৃষি। তাই বাংলা নববর্ষ উৎসব সব বাঙালির হলেও আমেজটা কৃষকের একটু বেশি।
নববর্ষ উদযাপনকে বিভ্রান্তি থেকে মুক্ত করতে নতুন প্রজন্মকে শেকড় সন্ধানী হতে হবে। আর আমাদের জাতীয় সংস্কৃতিকে দৃঢ়ভাবে আঁকড়িয়ে ধরতে হবে। তাহলেই বাংলা নববর্ষ উদযাপন সার্থক হবে।

Please follow and like us:
Facebook Comments