মঞ্জুরের ব্যবসা বন্ধ খালেকের রমরমা প্রধান দুই প্রার্থীর স্ত্রীই সম্পদশালী * পাঁচ মেয়র প্রার্থীর দু’জন স্বশিক্ষিত, বাকি তিনজন স্নাতক * মঞ্জুসহ দুই প্রার্থীর বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগে মামলা

ক্রাই্মবার্তা ডেস্করিপোট:  খুলনা সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে পাঁচ মেয়র প্রার্থীই পেশায় ব্যবসায়ী। এদের মধ্যে বিএনপি প্রার্থী নজরুল ইসলাম মঞ্জুর ব্যবসা বর্তমানে বন্ধ। বাড়ি ভাড়ার আয়ে চলছেন তিনি। অপরদিকে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ প্রার্থী তালুকদার আবদুল খালেকের ব্যবসা রমরমা অবস্থা। তার মাছের ঘের, শেয়ারসহ অন্য ব্যবসা আছে।

সবমিলিয়ে ব্যবসায় বিনিয়োগ আছে কয়েক কোটি টাকা। আওয়ামী লীগ ও বিএনপি প্রার্থীর স্ত্রীদের নামে রয়েছে অনেক সম্পদ। বাকি তিন প্রার্থী সাধারণ ব্যবসায় জড়িত। সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে মনোনয়নপত্রের সঙ্গে দেয়া হলফনামায় প্রার্থীরা এসব তথ্য দিয়েছেন। হলফনামা পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, পাঁচ মেয়র প্রার্থীর দু’জনই স্বশিক্ষিত বাকি তিনজন স্নাতক পাস। বিএনপির মঞ্জুসহ দুই প্রার্থীর বিরুদ্ধে ছয়টি মামলা আছে। এর মধ্যে মঞ্জুর বিরুদ্ধেই চারটি। বাকিদের বিরুদ্ধে কোনো মামলা নেই।

এ প্রসঙ্গে খুলনা সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের রিটার্নিং কর্মকর্তা মো. ইউনুচ আলী যুগান্তরকে বলেন, ১৫ ও ১৬ এপ্রিল মেয়র, সংরক্ষিত নারী কাউন্সিলর ও সাধারণ কাউন্সিলরদের মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই হবে। ওই সময়ে সরকারের বিভিন্ন সংস্থা, প্রার্থীদের সমর্থক ও সাধারণ মানুষ উপস্থিত থাকবেন। হলফনামায় দেয়া তথ্য সম্পর্কে কেউ অভিযোগ-আপত্তি তুললে তা খতিয়ে দেখা হবে।

সংসদ, সিটি কর্পোরেশন ও স্থানীয় সরকারের অন্যান্য প্রতিষ্ঠানে নির্বাচনের ক্ষেত্রে ব্যবসায়িদের আধিপত্য বাড়ছে বলে মনে করছেন সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার। তিনি বলেন, রাজনীতি এখন ব্যবসায়ীদের করায়ত্ত। সংসদে তাদের প্রাধান্য রয়েছে। খুলনা সিটি কর্পোরেশনেও একই চিত্র দেখা গেল। এখানেও মেয়র পদে প্রার্থীদের সবাই ব্যবসায়ী। প্রার্থীদের অঢেল টাকা থাকলে তা ভোটের মাঠে প্রভাব ফেলে। টাকার বিনিময়ে ভোট কেনার প্রবণতা দেখা দেয়।

তবে যোগ্যতার দিক দিয়ে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি দুই দলের প্রার্থীই ভালো বলেও মন্তব্য করেন তিনি। ৩১ মার্চ গাজীপুর ও খুলনা সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। ১৫ মে এ দুই সিটি কর্পোরেশনে ভোট হবে। গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনে মেয়র পদে ১০ জন ও খুলনায় মেয়র পদে ৫ জন মনোনয়নপত্র দাখিল করেছেন। খুনার প্রার্থীরা হলেন- আওয়ামী লীগের তালুকদার আবদুল খালেক, বিএনপির নজরুল ইসলাম মঞ্জু, জাতীয় পার্টির এসএম শফিকুর রহমান (মুশফিক), সিপিবির মিজানুর রহমান বাবু এবং ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলনের মাওলানা মো. মুজ্জাম্মিল হক।

তালুকদার আবদুল খালেক : হলফনামায় দেখা গেছে, তালুকদার আবদুল খালেকের নিজের নামে স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদের আর্থিক মূল্য ৭ কোটি টাকার বেশি। অপরদিকে স্ত্রীর নামে স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদের পরিমাণ ৪ কোটি টাকার বেশি। খালেকের নিজের নামে নগদ প্রায় ১০ লাখ টাকা, তিনটি ব্যাংকে ২ কোটি ৪২ লাখ টাকা, শেয়ার ২ কোটি টাকা, সঞ্চয়পত্র, এফডিআর আছে ১৮ লাখ টাকার, মাছের ঘেরে বিনিয়োগ ১ কোটি ৩৬ লাখ টাকা।

এছাড়াও তার রয়েছে দুটি গাড়ি, পৈতৃক সূত্রে পাওয়া ২৩ বিঘা জমি ও বাড়ি। আর সাবেক মেয়র তালুকদার আবদুল খালেকের স্ত্রীর নামে নগদ অর্থ দেখিয়েছেন ২ কোটি ১৫ লাখ টাকা, ব্যাংকে রয়েছে ২০ লাখ টাকা, সঞ্চয়পত্র রয়েছে ৪৫ লাখ টাকার এবং এফডিআর রয়েছে ১৬ লাখ ৯৪ হাজার টাকার। এছাড়া গাড়ি, অলঙ্কার ও বাড়ি রয়েছে তার নামে।

তালুকদার আবদুল খালেকের বার্ষিক আয় ৪১ লাখ ৭৫ হাজার টাকা। অপরদিকে স্ত্রীর বার্ষিক আয় সাড়ে ১১ লাখ টাকা। সাবেক এ মেয়র তালুকদার আবদুল খালেকের শিক্ষাগত যোগ্যতা বিএ পাস। বর্তমানে তার বিরুদ্ধে কোনো মামলা নেই। অতীতে ৪টি হত্যাসহ ৯টি মামলা ছিল। ওইসব মামলায় অব্যাহতি ও খালাস পেয়েছেন তিনি।

নজরুল ইসলাম মঞ্জু : হলফনামায় নিজের দুর্দিনের চিত্র তুলে ধরেছেন বিএনপির মেয়র প্রার্থী নজরুল ইসলাম মঞ্জু। তার বিরুদ্ধে বর্তমানে চারটি মামলা চলছে। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে এসব মামলা করা হয়েছে। এর আগে ২০০১, ২০০৬ ও ২০০৮ সালে তার বিরুদ্ধে তিনটি মামলা হয়েছিল। ওইসব মামলা থেকে মুক্তি পেয়েছেন তিনি। মঞ্জুর পেশা ব্যবসা হলেও তা বন্ধ রয়েছে বলে হলফনামায় উল্লেখ করেছেন।

এ বিষয়ে নজরুল ইসলাম মঞ্জু বলেন, আমার বিরুদ্ধে যেসব মামলা রয়েছে তা রাজনৈতিক ও হয়রানিমূলক। গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের দাবিতে যাতে মাঠে নামতে না পারি সেজন্য আওয়ামী লীগ সরকার এসব মামলা করেছে। এছাড়া আমার ব্যবসাও বন্ধ করে দিয়েছে।

হলফনামায় তিনি আয়ের উৎস হিসেবে বার্ষিক বাড়ি ভাড়া ২ লাখ ৪৩ হাজার টাকা দেখিয়েছেন। তার নিজের নামে তিন লাখ টাকা রয়েছে। বিদেশি মুদ্রা রয়েছে ৮৯০টি; তবে মুদ্রার নাম উল্লেখ করেননি। নিজের একটি গাড়ি ও আসবাবপত্র রয়েছে। অপরদিকে তার স্ত্রীর নামে নগদ ২ লাখ টাকা ও ১৭ হাজার ৪৫৪.৩২ বিদেশি মুদ্রা রয়েছে; যেগুলোর নাম উল্লেখ করেননি। স্থাবর সম্পদের মধ্যে রয়েছে .০১৪ একর কৃষি জমি ও স্ত্রীর নামে রয়েছে .০৬৫০ একর জমি। ব্যাংকে মঞ্জুর নামে দায়-দেনা রয়েছে ৩ লাখ ৮৫ হাজার ২৭১ টাকা।

এসএম শফিকুর রহমানের (মুশফিক) : হলফনামায় বার্ষিক আয় ২ লাখ ৪৫ হাজার ৪৫০ টাকা দেখিয়েছেন এসএম শফিকুর রহমান (মুশফিক)। তার নগদ সম্পদ ১ লাখ ৫৪ হাজার ৪৫০ টাকা ও বাসার আসবাবপত্র। তার স্ত্রীর নামে কোনো আয় ও সম্পদ নেই। তবে ৫ ভরি স্বর্ণ রয়েছে। তার বিরুদ্ধে ১৯৯৫ সালে হওয়া একটি হত্যা মামলা ও ২০১৭ সালে অন্য অভিযোগে একটি মামলা রয়েছে। দুটি মামলায় তিনি জামিনে রয়েছেন। হত্যা মামলা উচ্চ আদালতের রায়ে স্থগিত রয়েছে। নিজেকে তিনি স্বশিক্ষিত দাবি করেছেন।

মিজানুর রহমান বাবু : এ মেয়র প্রার্থীও স্বশিক্ষিত। তার বিরুদ্ধে বর্তমানে কোনো মামলা নেই। অতীতেও মামলা ছিল না। পেশায় তিনি ব্যবসায়ী। তার নগদ ২ লাখ টাকা, ১০ হাজার টাকার প্রাইজবন্ড ও আসবাবপত্র রয়েছে। তার নামে সোশস্যাল ইসলামী ব্যাংক, ডুমুরিয়া শাখায় ৪০ লাখ টাকা ঋণ রয়েছে।

মো. মুজ্জাম্মিল হক : এ মেয়র প্রার্থী ফাজিল দেওবন্দ পাস। তিনি যৌথ মূলধনী ব্যবসায়ী। তার বিরুদ্ধে বর্তমানে কোনো মামলা নেই। অতীতেও মামলা ছিল না। তার বার্ষিক আয় ২ লাখ ১৫ হাজার টাকা। এছাড়া নগদ এক লাখ টাকা ও আসবাব পত্র রয়েছে। তার স্ত্রীর নামে কোনো সম্পদ নেই। তবে ব্যবহার্য ১৭ ভরি স্বর্ণ রয়েছে।যুগান্তর।

Please follow and like us:
Facebook Comments