আতঙ্কে কোটা আন্দোলনের চার শীর্ষ নেতা# দৈনিক ইত্তেফাক এর দুঃখ প্রকাশ

বিবিসি:  গোয়েন্দা পুলিশ সোমবার ঢাকা মেডিকেল কলেজের সামনে থেকে হাত ও চোখ বেঁধে যে তিনজনকে – রাশেদ খান, ফারুক হাসান এবং নুরুল হক নুরু – উঠিয়ে নিয়ে গিয়েছিল, তারা সবাই সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের যুগ্ম আহবায়ক।

সংগঠনের আহবায়ক হাসান আল মামুন বিবিসিকে বলেছেন, গোয়েন্দা পুলিশের উপস্থিতি বুঝে তিনি সময়মতো সরে পড়েছিলেন।

মূলত এরা চারজনই এই আন্দোলন নিয়ে গণমাধ্যমে কথা বলেন, সমাবেশে বক্তৃতা করেন।

ছাড়া পাওয়ার পর নুরুল হক কণ্ঠে উদ্বেগ নিয়ে বিবিসিকে বলেন, “ঘুম হারাম হয়ে যাচ্ছে। আমরা জীবনের আশঙ্কা করছি, প্রশাসনের কাছে নিরাপত্তা চাইছি… ।”

তিনি বলেন, “আমাদের আটকের খবর দ্রুত মিডিয়া ও সোশ্যাল মিডিয়ায় চলে আসায় পুলিশ আমাদের আজ ছেড়ে দিয়েছে, কিন্তু তারা আমাদের সহজে ছাড়বে বলে মনে হয় না।”

সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ শোনা গেছে আন্দোলনের আরেক যুগ্ম আহবায়ক রাশেদ খানের কণ্ঠে। তিনি জানান, ঝিনাইদহের গ্রাম থেকে তার কাঠমিস্ত্রি বাবাকেও পুলিশ ডেকে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে।

একটি দৈনিক পত্রিকায় খবর বেরিয়েছে – রাশেদ খান ও তার পরিবার জামায়াত-শিবিরের রাজনীতির সাথে সংশ্লিষ্ট।

আন্দোলনের অন্য তিন শীর্ষ নেতার অতীতের রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা নিয়েও লেখা হয়েছে ওই খবরে।

ঘন্টাখানেক আটক রাখার সময় পুলিশ অবশ্য এই ছাত্রদের রাজনীতি নিয়ে কোনো কথা জিজ্ঞেস করেনি।

তবে কোটা-সংস্কার আন্দোলনের এই নেতাদের ধারণা- সরকার ইচ্ছাকৃতভাবে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার ইস্যু তুলে তাদেরকে বিতর্কিত করতে চাইছে।

রাশেদ খান বিবিসি বাংলাকে বলেন, তিনি বা তার পরিবার কখনই কোনো রাজনীতির সাথে ছিলেন না।

“দু মাস ধরে আন্দোলনে নেতৃত্ব দিচ্ছি, পুলিশ, এনএসআই, ডিজিএফআই আমাদের নিয়ে তদন্ত করে কিছু পায়নি, বলেছে সব ঠিক আছে…এখন হঠাৎ করে আমাদের সব জামাত-শিবির বানানো হচ্ছে।”

“আমাকে মেরে ফেলে ফেলুক, কিন্তু আমার পরিবার পর্যন্ত নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে।”

জানা গেছে যে ফারুক হাসান, নুরুল হক এবং হাসান আল মামুন – এরা তিনজনই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের রাজনীতির সাথে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত। তারপরও আতঙ্কে পড়ে গেছেন তারা সবাই।

নুরুল হক বিবিসিকে বলেন, ফেসবুকে একটি অ্যাকাউন্টের যে সব পোস্টিং-এর কথা উল্লেখ করে রাশেদ খানকে শিবিরের রাজনীতির সাথে যুক্ত করার চেষ্টা হচ্ছে, সেটি ভুয়া অ্যাকাউন্ট।

বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, “বিভিন্ন ভুয়া খবর ছড়িয়ে যারা সাধারণ ছাত্রদের উত্তেজিত করেছে, ভিসির বাড়িতে হামলা চালিয়েছে, তাদেরকে আমরা নজরদারিতে নিয়ে আসছি।”

মন্ত্রী বলেন, আন্দোলনের সাথে সাধারণ যেসব ছাত্র-ছাত্রী ছিলেন তাদের বিরুদ্ধে কোনো ধরণের ব্যবস্থা নেয়া হয়নি।

আন্দোলনের নেতাদের সোমবারের আটকের ঘটনা সম্পর্কে তিনি বলেন, পুলিশ হয়তো জিজ্ঞাসাবাদ করেতে চেয়েছে।

“নিশ্চিত না হয়ে পুলিশ কিছু করবে না” – বলেন তিনি।

তোপের মুখে ইত্তেফাক

চার শীর্ষ নেতার রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা নিয়ে বিতর্কিত খবরটি ছাপা হয়েছিল ঢাকার দৈনিক ইত্তেফাকে।

ক্যাম্পাসে এবং বিভিন্ন ছাত্রাবাসে দৈনিক ইত্তেফাকের কপি পোড়ানো হয়েছে। ছাত্রদের মিছিলে স্লোগান তোলা হয়েছে।

পরপরই দৈনিক ইত্তেফাক তাদের অনলাইন সংস্করণ থেকে খবরটি প্রত্যাহার করে নেয়, এবং দুঃখ প্রকাশ করে।

পরে দৈনিকের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক তাসমিমা হোসেন বিবিসিকে বলেন, এটা নিয়ে নতুন করে আন্দোলন অশান্তি যাতে না হয়, সে জন্যই তারা খবরটি প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নেন।

“সত্যতা না থাকলে সেটা দুঃখজনক… তবে সে সময় সন্দেহ ছিল যে এই আন্দোলনকে অন্য দিকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে কিনা। অনেকেই বলেছেন, জঙ্গি বা মৌলবাদীদের সাথে সংশ্লিষ্টতা থাকতে পারে।”

“যা রটে তা কিছুটা তো বটেই। তবে খবরটি কতটা ঠিক তা যাচাই করে দেখতে হবে…আমাদের রিপোর্টারের কাছে কিছু তো ছিলই, তবে আরও যাচাই করতে হবে।”

 

কোটা সংস্কার আন্দোলনের ৩ নেতাকে তুলে নেয়ার ঘটনায় ফের উত্তাল ঢাবি

 কোটা সংস্কার আন্দোলনের তিন নেতাকে তুলে ডিবি পুলিশ তুলে নেয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে ফের উত্তাল হয়ে উঠেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) ক্যাম্পাস।

সোমবার দুপুরে তিন নেতাকে তুলে নেয়ার খবর ছড়িয়ে পড়লে তাদের ছেড়ে দেয়া হয়। এর পর বিকেল ৪টায় ঢাবির টিএসসিতে জড়ো হন কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনকারী বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের হাজার হাজার নেতাকর্মী। পরে তারা নেতাদের তুলে নেয়ার ঘটনার প্রতিবাদে ক্যাম্পাস বিক্ষোভ শুরু করেন।

 

চোখ বেঁধে তুলে নেয়া হয়, নিরাপত্তা ঝুঁকিতে আন্দোলনকারীরা

: চোখ বেঁধে ডিবি কার্যালয়ে তুলে নেয়ার ঘটনার পর নিরাপত্তা ঝুঁকিতে রয়েছে বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের নেতারা। আজ সোমবার ডিবি কার্যালয় থেকে ফিরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় লাইব্রেরির সামনে সংবাদ সম্মেলনে একথা জানান তারা। সংবাদ সম্মেলনে ডিবি কার্যালয় থেকে ফিরে আসা পরিষদের যুগ্ম আহ্বায়ক নুরুল হক নুর, রাশেদ খান ও ফারুক ৩ জনই বক্তব্য রাখেন। এ সময় সরকারের কাছে নিরাপত্তা দেয়ার দাবি জানান তারা।

রাশেদ খান বলেন, আমার বাবার কোনো দোষ নাই। তাকে ছেড়ে দেয়া হোক। কষ্ট করে লেখাপড়ার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠিয়েছেন। তাকে আটক করাটা যথেষ্ট কষ্টকর। এখন আমার বাবার কাছ থেকে জোরপূর্বক স্বীকারোক্তি আদায়ের চেষ্টা চলছে। নুরুল হক নুর বলেন, গুলিস্তানে নেয়ার পর গামছা কিনে চোখ বাঁধা হয়। মাথায় হেলমেট পড়ানো হয় আমাদের। এরপর ডিবি অফিসে নেয়া হয়।
ডিবি পুলিশ বলেছে, তোমাদের ওপর হামলার আশঙ্কা ছিল। সেজন্য নিয়ে আসা হয়েছে। একটা ভিডিও দেখানোর কথা বলেন তারা যদিও কোনো ভিডিও দেখানো হয়নি। ছেড়ে দেয়ার সময় বলা হয়. ডাকলে আবার যেতে হবে ডিবি অফিসে। নুর দাবি করে বলেন, ‘এটি একটি অপহরণ। মিডিয়া না জানলে হয়তো ফিরে আসতাম কিনা সন্দেহ।’

সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের অপর নেতা ফারুক হাসান বলেন, আমাদের ওপর হামলা হবে বলে নিয়ে আসা হয়। ডিবি কার্যালয়ে পানি খেতে চাইলে দেয়া হয়নি। নিজেদের নিরাপত্তার পাশাপাশি পরিবারের সদস্যদেরও নিরাপত্তা দাবি করছি। তিনি বলেন, নিরাপত্তা ইস্যু থাকতেই পারে। সরকার ডাকলেই কিন্তু যেতাম। বলে কয়ে নিয়ে গেলে তো আমরা পালাতাম না। অবশ্যই যেতাম। এভাবে না নিয়ে গেলেই পারতো। কোটা সংস্কারের আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থীসহ বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের নেতাদের নিরাপত্তার দাবিতে সংবাদ সম্মেলন শেষে প্রতিবাদ মিছিল বের হয়।

এর আগে রাজধানীর চাঁনখারপুল এলাকা থেকে বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের এই ৩ নেতাকে একটি মাইক্রোবাসে তুলে নেয় সাদা পোশাকের পুলিশ। এর কিছুক্ষণ পর তাদের ছেড়ে দেয়া হয়। এ বিষয়ে গণমাধ্যমের কাছে প্রথমে জিজ্ঞাসাবাদের কথা অস্বীকার করলেও পরবর্তীতে ডিবির যুগ্ম কমিশনার আব্দুল বাতেন বলেন, ‘তাদের আটক বা গ্রেফতার করা হয়নি। কিছু তথ্য জানতে তাদের সহযোগিতা চাওয়া হয়েছিল। তারা চলে গেছে।’

Please follow and like us:
Facebook Comments