গাজীপুরে মহানগর জামায়াতের আমীর সহ ৪৫ নেতাকর্মী গ্রেফতারে বিএনপিতে হঠাৎ আতঙ্ক:১৫টি পেট্রোল বোমা, চারটি ককটেল ও জিহাদি বই উদ্ধারের দাবি পুলিশ সুপারের

ক্রাইমবার্তা ডেস্করিপোট:  গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনকে ঘিরে হঠাৎ করেই বিএনপি প্রার্থী হাসান উদ্দিন সরকারের কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। হাসান সরকারকে সমর্থন জানিয়ে মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করে নেওয়ার চার দিন পর শুক্রবার গ্রেফতার হন গাজীপুর মহানগর জামায়াতের আমির এস এম সানাউল্লাহ। মহানগর উন্নয়ন ফোরাম নামে একটি সংগঠনের ব্যানারে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে তিনি মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছিলেন। পরে ২০ দলীয় জোটের সিদ্ধান্তে বিএনপির প্রার্থী হাসান সরকারকে সমর্থন জানিয়ে ২৩ এপ্রিল তিনি মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করে নেন। এর চার দিন পর সানাউল্লাহ ও জামায়াতের মহানগর শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের সভাপতি আজাহারুল ইসলামসহ দলের ৪৫ নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করে পুলিশ।

অন্যদিকে, আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থী জাহাঙ্গীর আলম ও তার কর্মী-সমর্থকরা ফুরফুরে মেজাজে গণসংযোগ করছেন। জাহাঙ্গীরের মঞ্চে এসে মনোনয়নবঞ্চিত মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি আজমত উল্লা খান নৌকা প্রতীকের জন্য ভোট প্রার্থনা শুরুর পর থেকে দলীয় নেতাকর্মীরা অনেকটা উজ্জীবিত। আওয়ামী লীগের প্রবীণ নেতা আজমত উল্লার মান ভাঙিয়ে জাহাঙ্গীরও অনেকটা চাপমুক্ত।

মহানগরীর পুবাইল এলাকার ‘স্বপ্নচূড়া রিসোর্ট’ থেকে শুক্রবার জামায়াত-শিবিরের ৪৫ নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করে পুলিশ। এ সময় ১৫টি পেট্রোল বোমা, চারটি ককটেল ও জিহাদি বই উদ্ধারের দাবি করছে পুলিশ। গ্রেফতারকৃতদের মধ্যে মহানগর জামায়াতের আমির এস এম সানাউল্লাহও রয়েছেন। তিনি মহানগর উন্নয়ন পরিষদের ব্যানারে নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছিলেন। তফসিল ঘোষণার পর তিনি বিভিন্ন স্থানে একাধিক সভা ও জনসংযোগ করেছেন। কিন্তু পুলিশ তখন তাকে কিংবা জামায়াতের কোনো নেতাকর্মীকে গ্রেফতার বা হয়রানি করেছে- এমন খবর পাওয়া যায়নি। ২২ এপ্রিল বিএনপি প্রার্থীকে সমর্থন দিয়ে পরদিন মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করে নেন সানাউল্লাহ। এর চার দিন পর সানাউল্লাহ, জামায়াতের শ্রমিক সংগঠন বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশন গাজীপুর মহানগরের সভাপতি মাওলানা আজাহারুল ইসলাম মোল্লাহ, জেলা শাখার সভাপতি মো. মুজাহিদুল ইসলাম ও জেলা ছাত্রশিবিরের সাবেক সভাপতি আশরাফ আলী কাজলসহ ৪৫ নেতাকর্মী গ্রেফতার হন।

গাজীপুর জেলা পুলিশ সুপার মুহাম্মদ হারুন অর রশীদ তার কার্যালয়ে শুক্রবার দুপুরে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, পুবাইল এলাকায় স্বপ্নচূড়া নামে একটি রিসোর্টে নাশকতার পরিকল্পনা নিয়ে মিটিং করছিল জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মীরা। গোপন সংবাদের ভিত্তিতে ওই রিসোর্টে অভিযান চালিয়ে এস এম সানাউল্লাহসহ জামায়ত-শিবিরের ৪৫ নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করা হয়। তাদের কাছ থেকে ১৫টি পেট্রোল বোমা ও চারটি ককটেলও উদ্ধার করা হয়েছে বলে জানান পুলিশ সুপার।


এ ঘটনাকে জেলা বিএনপির সভাপতি ফজলুল হক মিলন মিথ্যা কল্পকাহিনী বানিয়ে নির্বাচনকে প্রভাবিত করার অপচেষ্টা বলে অভিযোগ করেছেন। তিনি বলেন, সুষ্ঠু নির্বাচনকে বাধাগ্রস্ত করতে গ্রেফতার করা হচ্ছে নেতাকর্মীদের। জনগণ যেন ভোট দিতে আসতে না পারে, সে জন্যই এসব করা হচ্ছে। তিনি এ ধরনের কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকা এবং নেতাকর্মীদের দ্রুত মুক্তির দাবি জানান।

২০ দলীয় জোটের প্রার্থী হাসান উদ্দিন সরকার ওই ঘটনার নিন্দা ও ক্ষোভ জানিয়ে বলেন, ধানের শীষের নির্বাচনী প্রচারসভা থেকে গ্রেফতার করা উদ্দেশ্যমূলক। এই গ্রেফতার সিটি নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করবে। এ ঘটনায় ভোটারদের মনে আতঙ্ক সৃষ্টি এবং নির্বাচনী পরিবেশ বিনষ্ট হবে। তিনি দ্রুত তাদের মুক্তি দিয়ে ধানের শীষের পক্ষে পুনরায় প্রচারকাজে সুযোগ দেওয়ার আহ্বান জানান।

জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মীদের গ্রেফতারের খবরে বিএনপির নেতাকর্মী ও সমর্থকদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। গাজীপুরে বিএনপির শত শত নেতাকর্মীর নামে বিভিন্ন থানায় মামলা রয়েছে। তাদের অনেকে জামিনে রয়েছেন। অনেকের বিরুদ্ধে রয়েছে গ্রেফতারি পরোয়ানা। নির্বাচন উপলক্ষে তারা ধানের শীষের পক্ষে কাজ করতে মাঠে নেমেছেন। যে কোনো সময় গ্রেফতারের ভয়ে তারা অনেকটা সতর্ক অবস্থানে রয়েছেন। গতকাল ধানের শীষের প্রচার-প্রচারণায় বিভিন্ন স্থানে নেতাকর্মীদের মধ্যে আতঙ্ক ভাব লক্ষ্য করা গেছে। যাদের নামে মামলা রয়েছে, তারা জনসংযোগ ও প্রচারণায় নিজেদের অনেকটা আড়াল করার চেষ্টা করেছেন।

এদিকে, শুক্রবার বিকেলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান চান্দনা চৌরাস্তায় নির্বাচনী কার্যালয়ে স্থানীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন। এ সময় তিনি বলেন, সিটি নির্বাচনে বিএনপি নেতাকর্মী ও সমর্থকদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়াতেই পুলিশ ২০ দলীয় জোটের শরিক দল জামায়াতের নেতাকর্মীদের গ্রেফতার করেছে।

এদিকে, নৌকা প্রতীকের জাহাঙ্গীর আলমের পক্ষে বৃহস্পতিবার থেকে আওয়ামী লীগের মহানগর সভাপতি আজমত উল্লা খান প্রচারে নামলেও তার অনুসারীরা কেউ এখনও মাঠে নামেননি। এ নিয়ে দলের স্থানীয় নেতারা দুতিয়ালি করছেন। স্থানীয় কর্মীদের মান ভাঙিয়ে নৌকা প্রতীকের পক্ষে প্রচারে ঐক্যবদ্ধ হয়ে পূর্ণ শক্তিতে কাজ করতে চান তারা। আজ-কালের মধ্যে অভিমান, বিভেদ দূর করে সবাইকে নিয়ে একসঙ্গে মাঠে নামা সম্ভব হবে বলে মনে করছেন আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতারা। এ বিষয়ে গাজীপুর জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মুহাম্মদ ইকবাল হোসেন সবুজ সমকালকে বলেন, ঐক্যবদ্ধ আওয়ামী লীগের সামনে কোনো কিছুই দাঁড়াতে পারবে না। নেতাকর্মীরা ঐক্যবদ্ধ হয়ে প্রচারণা চালাচ্ছে এবং গাজীপুর সিটিতে নৌকার বিজয় সুনিশ্চিত।

Please follow and like us:
Facebook Comments