নতুন দলগঠনের দু’বছরের মাথায় প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিলেন ড. মাহাথির মোহাম্মদ

ক্রাইমবার্তারিপোট:   দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশ মালয়েশিয়ার সপ্তম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিলেন ৯২ বছর বয়সী ড. মাহাথির মোহাম্মদ। শপথের পরই পাকাতান হারাপানের (পিএইচ) চেয়ারম্যান মাহাথির আনুষ্ঠানিকভাবে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

গতকাল বৃহ¯পতিবার স্থানীয় সময় রাত ৯টা ৫৭টায় দেশটির রাজপ্রাসাদ ‘ইস্তানা নেগারা’য় শপথগ্রহণ করেন তিনি। মাহাথিরকে শপথ বাক্য পাঠ করান দেশটির রাজা ইয়াং দি-পারতুয়ান অগং সুলতান মুহাম্মদ (পঞ্চম)। এ সময় ড. মাহাথিরের স্ত্রী তুন ড. সিতি হাসমাসহ জোটের অন্যান্য নেতা ও কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। শপথ নেয়ার ফলে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি বয়সী প্রধানমন্ত্রী হলেন ড. মাহাথির মোহাম্মদ।

এদিকে বৃহস্পতিবার এক সাংবাদিক সম্মেলনে মাহাথির জানান, ডেপুটি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ড. ওয়ান আজিজাহকে মনোনীত করা হয়েছে।

পাকাতান হারাপান জোটের নেতৃত্বে গড়া কোয়ালিশন সরকারে পাত্রি ওয়ারিসান সাবাহসহ কয়েকজন স্বতন্ত্র এমপিও সমর্থন দিয়েছেন বলে জানিয়েছে স্থানীয় সংবাদমাধ্যম। এর আগে তিনি ১৯৮১ সাল থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত টানা ২২ বছর শাসন করেন মালয়েশিয়া।

গত বুধবার মালয়েশিয়ার ১৪তম সাধারণ নির্বাচনে মাহাথির মোহাম্মদ ক্ষমতাসীন জোট বারিসান ন্যাশনালকে (বিএন) বিপুল ব্যবধানে পরাজিত করেন। এক সময় এই জোটের হয়ে তিনি ২২ বছর কঠোর হাতে মালয়েশিয়া শাসন করেন।

নির্বাচন কমিশনের আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষিত ফলাফলে মাহাথিরের জোট দেশটির সংসদের ২২২টি আসনের মধ্যে পেয়েছে ১১৫টি আসন। যেখানে সরকার গঠন করতে ১১২টি আসনের প্রয়োজন। বিপরীতে বিএন জোট পেয়েছে ৭৯টির মতো আসন।

ড. মাহাথির ক্ষমতায় থাকালে দেশটিতে অর্থনৈতিক উন্নয়নের জোয়ার সৃষ্টি করেন, যা দিয়ে মালয়েশীয়দের মনে জায়গা করে নেন তিনি। তাই হয়তো আবারও প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তাকেই চাইছিলেন মালয়রা।

বারাসান ন্যাশনাল জোট থেকেই ২২ বছর প্রধানমন্ত্রী ছিলেন মাহাথির। ২০০৩ সালে তিনি অবসরে গেলে ওই জোটের প্রধানমন্ত্রী হন তারই রাজনৈতিক শিষ্য নাজিব তুন রাজাক। কিন্তু ওই জোটের ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগে বিরোধীদের নিয়ে মাহাথিরের নেতৃত্বে গড়ে তোলা হয় নতুন জোট পাকাতান হারাপান। এই জোটে যোগ দেন মাহাথিরের একসময়ের বিরোধীরাও। এরমধ্যে রয়েছেন মাহাথিরের একসময়ের ঘনিষ্ঠ এবং পরে ঘোরতর শক্র আনোয়ার ইব্রাহিমও।

মাহাথির মোহাম্মদের ১৪টি বিরল রেকর্ড

বিশ্বের সবচেয়ে বেশি বয়সী প্রধানমন্ত্রী পাচ্ছে মালয়েশিয়া

মালয়েশিয়ার ১৪তম সাধারণ নির্বাচনে বিশাল জয় পেয়েছেন মাহাথির মোহাম্মদ। দীর্ঘদিন পর রাজনীতিতে ফিরলেন ৯২ বছর বয়সী এই সাবেক প্রধানমন্ত্রী। গত বুধবার স্থানীয় সময় রাত ১টা ১০ মিনিটে প্রধান নির্বাচন কমিশনার দাতুক সেরি মোহাম্মদ হাশিম আব্দুল্লাহ সাইদ নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণা করেন।

নির্বাচনে ২২২ আসনের মধ্যে মাহাথির মোহাম্মদের দল পাকাতান হারাপান ১২১ আসনে এবং দেশটির ক্ষমতাসীন প্রধানমন্ত্রী নাজিব রাজাকের বারিসান ন্যাশনাল (বিএন) ৭৯ আসনে জয় পেয়েছে।

নির্বাচনে মাহাথিরের জয়ের পর তিনিই হতে যাচ্ছেন বিশ্বের সবচেয়ে বেশি বয়সী প্রধানমন্ত্রী। মাহাথির মোহাম্মদ সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাজিব রাজাকের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করেছিলেন। কিন্তু নাজিবের দুর্নীতির কারণে অবসর থেকে আবারও রাজনীতিতে ফিরে এসেছেন মাহাথির। দ্য স্টার, টাইমস ম্যাগাজিন, সিএনডিসি, দ্য গার্ডিয়ান, বিবিসি।

নির্বাচনে মাহাথিরের জয় নিশ্চিতের পর পরই তার সমর্থকরা রাস্তায় নেমে উল্লাসে মেতে ওঠে। ফলাফল ঘোষণার আগে এক বিবৃতিতে মাহাথির জানান তিনি জনগণের রায় মেনে নেবেন।

১৯৫৭ সালে দেশটিতে স্বাধীনতার পর থেকেই ক্ষমতায় থাকা তার সাবেক দল বারিসান ন্যাশনাল কোয়ালিশন এই প্রথমবারের মতো হারলো। এর আগে এই দল থেকেই নির্বাচিত হয়েছেন তিনি। কিন্তু এবার ওই দলের হয়ে নাজিব রাজাক তার প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন।

১৯৫৭ সালে ব্রিটেনের কাছ থেকে স্বাধীনতা পাওয়ার পর থেকেই দেশটিতে ক্ষমতায় রয়েছে বোরিসান ন্যাশনাল অ্যালায়েন্স। কিন্তু দুর্নীতি এবং স্বজনপ্রীতিসহ নানা অভিযোগে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তাদের জনপ্রিয়তা কমেছে।

২০১৩ সালেও বিরোধীরা অনেক ভোট পেয়েছিল, কিন্তু সরকার গঠনের জন্য পর্যাপ্ত আসন পায়নি। তখনকার বিরোধী নেতা আনোয়ার ইব্রাহিমের বিরুদ্ধে সমকামিতার অভিযোগ এনে তাকে কারাগারে পাঠানো হয়। ইব্রাহিমের দাবি ছিল, এটি রাজনৈতিক হয়রানিমুলক মামলা।

২০১৬ সালে বোরিসান অ্যালায়েন্স ত্যাগ করে আলাদা দল গঠন করেন মাহাথির মোহাম্মদ। পরে তিনি বিরোধীদের নিয়ে জোট গঠন করেন।

এক সাংবাদিক সম্মেলনে মাহাথির বলেন, হ্যাঁ, হ্যাঁ, আমি এখনও বেঁচে আছি। তিনি বলেন, তার দল প্রতিশোধ নিতে চায় না, তারা শুধুমাত্র আইনের শাসন পুনর্বহাল করতে চায়।

মাহাথির মোহাম্মদের ১৪টি বিরল রেকর্ড

ইতিহাস সৃষ্টি করে মালয়েশিয়ার ক্ষমতায় ফিরলেন ড. মাহাথির বিন মোহাম্মদ। নির্বাচন কমিশন পাকাতান হারাপানকে বিজয়ী ঘোষণার পরই দেশটির রাজা সুলতান মোহাম্মদ জোটের প্রধান মাহাথির মোহাম্মদকে সরকার গঠনের আমন্ত্রণ জানিয়েছেন।  মাহাথির মোহাম্মদের ১৪টি বিরল রেকর্ড হচ্ছে-

এক. ১৯৫৭ সালে স্বাধীনতা অর্জনের দীর্ঘ ৬১ বছরে এবারই প্রথম ক্ষমতার পালাবদল হলো মালয়েশিয়ায়, যা প্রত্যক্ষ করলো মালয়েশিয়ার জনগণ।

দুই. ৯২ বছরের বর্ষীয়ান এই রাজনীতিক হতে চলেছেন বিশ্বের সবচেয়ে বেশি বয়সী প্রধানমন্ত্রী।

তিন. ১৯৮১ সাল থেকে ২২ বছর প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করে ২০০৩ সালে স্বেচ্ছায় ক্ষমতা ছাড়েন। ১৫ বছর পর আবার দেশের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার বিরল রেকর্ড।

চার. বিদায়ী প্রধানমন্ত্রী নাজিব রাজাক এক সময় ছিলেন মাহাথির মোহাম্মদেরই শিষ্য। শিষ্যের দুর্নীতি আর স্বজনপ্রীতির কারণে ক্ষুব্ধ হয়ে অবসর জীবন থেকে আবার রাজনীতিতে সক্রিয় হন।

পাঁচ. ক্ষমতাসীন দলকে পরাজিত করে বিরোধী দল থেকে প্রধানমন্ত্রী হওয়া মাহাথিরের চমক।

ছয়. নিজের দল বোরিসান অ্যালায়েন্স ত্যাগ করে আলাদা দল গঠন করে বিরোধীদের নিয়ে জোট গঠন করে নির্বাচিত হওয়ার রেকর্ড।

সাত. সরকারি চাকুরিজীবী থেকে  নিজেই একটি প্রাইভেট ক্লিনিক খুলেন। চিকিৎসক হিসেবে জনপ্রিয়তা ও গণ সম্পৃক্ততা থেেেকই প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন। এমন রেকর্ড দেখা যায়  না।

আট. দেশের সকল মুসলিমদের জন্য ধর্মীয় শিক্ষা বাধ্যতামূলক করেন তিনি।

নয়. মালয়েশিয়ানদের শিক্ষার ৯৫ শতাংশ খরচ সরকার বহনের নীতি চালু করেন মাহাথির।

দশ. ১৯৯২ সালে নিজ দেশের সবাইকে কর্মসংস্থান দিয়েছেন। একজনও বেকার ছিল না। আরো ৮ লক্ষ বিদেশী শ্রমিক নিয়োগ দেয় মালয়েশিয়া।

এগার. সরকারি কর্মীরা যেন ঠিক সময়ে অফিসে আসেন তার জন্য প্রথমবারের মতো চালু করেন ফ্লো-চার্ট।

বার. তিনি কর্মীদের যা করতে বলেছেন তা নিজে করেও দেখিয়েছেন। অবাস্তব বলেননি বা কাল্পনিক নির্দেশনা দেননি।

তের. টাইম ম্যাগাজিন একবার তার অফিসে আসার সময় রেকর্ড করেছিল। পরপর পাঁচ দিন তার অফিসে প্রবেশের সময় ছিল সকাল ৭:৫৭, ৭:৫৬, ৭:৫৭, ৭:৫৯, ৭:৫৭

চৌদ্দ. পাল্টে যায় মালয়েশিয়ার রাজনৈতিক মানচিত্র। নির্বাচিত হয়েই আনোয়ার ইব্রাহীমের জুন মাসে মুক্তির কথা বলে তিনি প্রতিশ্রুতি পূরণের নজির সৃষ্টি করেন।

উপ-প্রধানমন্ত্রী হচ্ছেন আনোয়ার ইব্রাহিমের সহধর্মিণী আজিজাহ

বিজয়ী জোটের পরিকল্পনা অনুযায়ী ড. মাহাথির মোহাম্মদ মালয়েশিয়ার নতুন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেবেন। আর উপ-প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নেবেন পিকেআর দলের প্রধান ডা. আজিজাহ। এই নারী রাজনীতিক হলেন মাহাথিরের এক সময়ে সহযোগী ও সাবেক উপ-প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের সহধর্মিণী।

আনোয়ার ইব্রাহীমের নির্বাচনে লড়াইয়ে বাধা আসার কারণে, অবধারিতভাবেই তার স্ত্রী দলের হাল ধরেন। ২০১৮ সালের আসন্ন নির্বাচনকে কেন্দ্র করে আনোয়ার পতœী ওয়ান আজিজাহ বেশ ভালোভাবেই তার দল ও জোটকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন।

একবার ওয়ান আজিজাহকে জিজ্ঞাস করা হয়েছিল, কেন তারা সেই লোকের সাথে হাত মিলিয়ে কাজ করছেন, যেই লোক আনোয়ারকে সমকামিতার অপবাদ দিয়ে জেল খাটিয়েছে? তিনি কি প্রকারান্তরে শয়তানের সাথেই হাত মেলান নাই?

উত্তরে আনোয়ার পতœী বলেছিলেন- ‘উই হ্যাভটু গো বিয়ন্ড দ্যাট’ অর্থাৎ ব্যক্তি রেষারেষির ঊর্ধ্বে ওঠার কথা। ঘৃণার বৃত্ত থেকে বেরিয়ে দেশের জন্য চিন্তা করার কথা। তিনি বলেছিলেন- ‘মাহাথিরকে আমরা ডাকি নাই, বরং সে আমাদের কাছে এসেছে’। তিনি মাহাথিরের দেয়া অপবাদের প্রসঙ্গে বলেছিলেন, ‘এটা শয়তানের সাথে জোট নয়। যদি আনোয়ার নিজে তাকে (মাহাথিরকে) ক্ষমা করতে পারেন, যেটা বলা হয়, মানুষকে ক্ষমা করা হল ঐশ্বরিক ব্যাপার’।

আজিজাহকে বলা হয়েছিল, আপনি যোগ্য নেত্রী, সফলতার সাথে বিভিন্ন আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছেন। আনোয়ারের অনুপস্থিতিতে তার দলকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। শ্রুতি আছে যে, যদি আপনার দল জিতে তাহলে আপনি অন্তর্র্বতীকালীন প্রধানমন্ত্রী হবেন এবং আনোয়ার জেল থেকে বের হলে তার হাতে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব তুলে দেবেন। কেন আপনি এটা করছেন, বিজয়ের নেতৃত্ব আপনি দিচ্ছেন। বিজয়টা আপনার। অনেক ইয়াং মেয়েরা হয়তো ভাবছে এটা অযৌক্তিক যে, আপনার সফলতা ও যোগ্যতার ফসল আপনার স্বামী নিয়ে নিচ্ছেন? আপনি কেন প্রক্সি দিচ্ছেন?

জবাবে ওয়ান আজিজাহ বলেছিলেন- প্রাইম মিনিস্টার তিনিই হবেন যাকে জনগণ চাইবে। তবে আমি সততার সাথে বলতে চাই, এটাই প্ল্যান যে সাজা থেকে মুক্তি পেলে আনোয়ার দায়িত্ব নেবেন। একাজ করতে আমার কোনো আপত্তি নাই। কারণ আনোয়ার আমার চেয়ে ভালো লিডার। তার আমলাতান্ত্রিক যোগ্যতা আমার চেয়ে বেশি। একজন মুসলিম হিসেবে আমাকে অবশ্যই কুরআনের আইনকে শ্রদ্ধা করতে হবে, স্বীকার করতে হবে।

মালয়েশিয়ার ক্ষমতার রাজনীতিতে প্রধানত দুইটা জোটের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়। একটি হল বারিসান ন্যাশনাল (ইঘ), যেটি আমনো (টগঘঙ) নামক একটি দলের নেতৃত্বে গঠিত জোট। এ জোটে তেরটি দল রয়েছে। এই দলটি গত কয়েক যুগ ধরে ক্ষমতায় রয়েছে। জোটের আওতায় মাহাথির মুহাম্মদ দেশের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন দীর্ঘকাল। আনোয়ার ইব্রাহীম ছিলেন তাঁর ডেপুটি প্রাইম মিনিস্টার।

পরে আনোয়ারের সাথে মাহাথিরের দ্বন্দ্বের জের ধরে, আনোয়ারকে তার পদ ও দল থেকে পদত্যাগ করতে বাধ্য করা হয় এবং আনোয়ারকে সমকামিতার অভিযোগে কারাদ-ও দেওয়া হয়। তিনি পরবর্তীতে এই মামলার শাস্তি থেকে অব্যাহতি পান। কিন্তু বিদায়ী প্রধানমন্ত্রী নাজিব তুন রাজ্জাক এমন এক মুহূর্তে আনোয়ারকে আবারও নতুন সমকামিতার মামলায় জেলে পাঠান, যখন আনোয়ারের দল বিরোধী শক্তি হিসেবে বেশ শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠছিল।

ফলাফল মেনে নিয়েছেন নাজিব

মালয়েশিয়ায় নির্বাচনে পরাজয় মেনে নিয়েছেন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নাজিব রাজাক। বৃহস্পতিবার সকালে এক ভাষণে তিনি বলেন, নির্বাচনে কোনও কারচুপি হয়নি এবং তিনি জনতার রায় মেনে নিয়েছেন। মার্কিন সংবাদমাধ্যমের এক প্রতিবেদন থেকে এই তথ্য জানা গেছে।

নির্বাচনে কোনও একক দল জয়লাভ করেনি উল্লেখ করে নাজিব বলেন, মালয়েশীয় রাজার সিদ্ধান্ত যে তিনি কাকে প্রধানমন্ত্রী করবেন। তিনি বলেন, দেশে যদি কোনও পরিবর্তন আসে তবে তিনি অবশ্যই মেনে নেবেন।

বিশ্বের সবেচেয়ে বয়স্ক নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বৃহস্পতিবার শপথ নিতে যাচ্ছেন মাহাথির মোহাম্মদ। এই জয়ের মধ্য দিয়ে ১৫ বছর আগে প্রধানমন্ত্রীত্ব ছেড়ে দেওয়া মাহাথিরের রাজকীয় প্রত্যাবর্তন ঘটতে যাচ্ছে। নির্বাচনে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নাজিব রাজাকের জোটকে হারিয়ে আবারও প্রধানমন্ত্রীর আসনে বসছেন সবচেয়ে বেশি সময় দেশটিতে ক্ষমতায় থাকা মাহাথির।

মালয়েশিয়ার সাধারণ নির্বাচনে মাহাথির মোহাম্মদের নেতৃত্বাধীন জোট পাকাতান হারাপান বিজয়ী হয়েছে। ২২২টি আসনের মধ্যে ১১৫টি আসনে তাদের প্রার্থীর জয়ী হওয়ার তথ্য নিশ্চিত করেছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম। সরকার গঠনের জন্য ১১২টি আসনে জয় পাওয়ার দরকার ছিল তাদের।

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম জানায়, সাধারণত রাত ১১টায় নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণা করার কথা থাকলেও রাত তিনটার আগ পর্যন্ত কিছু জানা যায়নি। অভিযোগ ওঠে, ক্ষমতা কাজে লাগিয়ে নাজিব হয়তো ফল বিলম্বিত করতে চেয়েছেন। একই সঙ্গে দোদুল্যমান আসনগুলোতে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করারও অভিযোগ ওঠেছে।

তবে নির্বাচন কমিশন আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছে, ১১২টির বেশি আসনে জয় পেয়ে সরকার গঠন করতে যাচ্ছে পাকাতান হারপান। মালয়েশীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেয়ার কথা ছিল পাকাতান হারাপান জোটের চেয়ারম্যান মাহাথিরের। একই সঙ্গে সরকারের দায়িত্ব নেবে জোটটি।

সাংবাদিক সম্মেলন রসিকতায় মাতালেন মাহাথির

বুধবারের নির্বাচনে ক্ষমতাসীনদের জোটকে হারিয়ে জয়লাভ করলেও মাহাথির মোহাম্মদের নেতৃত্বাধীন জোটের নতুন সরকার গঠনে কিছুটা বিলম্ব হতে পারে। একই সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তার শপথ গ্রহণও পিছিয়ে যেতে পারে। তবে এতে থামেনি মাহাতিরের রসবোধ। গতকাল বৃহস্পতিবার এক  সংবাদসম্মেলনে সাংবাদিকদের গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের জবাবও ছিল রসিকতাপূর্ণ।

শপথ গ্রহণের বিলম্বের কারণ জানতে চাইলে মাহাথির জানান, সবকিছুতেই দেরি হচ্ছে। উদাহরণ হিসেবে বলেন, ভোরে আমার খুব ঘুম পাচ্ছিল। দেরি করে ঘুম ভেঙেছে আমার। অনেক মানুষই দেরি করে ঘুম থেকে উঠেছেন। মাহাথিরের এমন জবাবে উপস্থিত সাংবাদিক ও নেতাকর্মীদের মধ্যে হাসিররোল পড়ে যায়।

মালয়েশিয়ার রাজা তাকে পছন্দ করেন না বলেই কি দেরি হচ্ছে– এমন প্রশ্নের জবাবে মাহাথির বলেন, আমাকে অপছন্দ করার বিষয়ে জানি না আমি। আমি খুব ভালো মানুষ। সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের সমর্থন রয়েছে আমার প্রতি। সংবিধান এটাই বলে। আমি আপনাকে পছন্দ করি, আমি আপনাকে পছন্দ করি না, আমি তোমাকে ভালোবাসি–সংবিধানে এসব নেই।

সংবাদ সম্মেলনের শেষ দিকে সরকার গঠনের ঘোষণাপত্র সাংবাদিকদের দেখাচ্ছিলেন মাহাথির। এই ঘোষণাপত্রটি রাজপ্রাসাদে পাঠানো হবে। এক সাংবাদিক ঘোষণাপত্রটি সুন্দর করে প্রদর্শনের আহ্বান জানান। কারণ মাহাথিরের মুখ ভালোভাবে ছবিতে আসছিল না। তখন তিনি ওই সাংবাদিকের উদ্দেশে বলেন, আমি ভাবছিলাম আপনি হয়ত কাগজটাই পত্রিকায় দেখাতে চান, আমার মুখ না। আমি এখন আপনাকে বলতে চাই যে, আমার মুখ এখন আর নিষিদ্ধ না। আমার মুখ কেটে বাদ দিতে হবে না আমাদেরা। আপনি জানেন তো, আমি সরকারের বিরুদ্ধে কিছু বলছি না। আসলে, এই মুহূর্তে দেশে কোনও সরকারই নেই।

মাহাথির বলেন, কেউ যদি দাবি করেন তিনি সরকারকে পরামর্শ দিচ্ছে তাহলে আজেবাজে বলছেন। আমি শুনেছি, অ্যাটর্নি জেনারেল সরকার পরামর্শ দেওয়ার দাবি করেছেন। বাজে কথা।

এর আগে বৃহস্পতিবার ভোর ৩টায় আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত নেতাকর্মীরা ‘মাহাথির দীর্ঘজীবী হোন’ বলে স্লোগান দিচ্ছিলেন। এসময় তিনি মজা করে বলে, ‘আমি এখনও জীবিত’।

আধুনিক ও সমৃদ্ধ মালয়েশিয়া গড়ে উঠেছে মাহাথির মোহাম্মদের হাত ধরেই। যে দলের হয়ে ২২ বছর ক্ষমতায় ছিলেন মাহাথিরসেই দলেরই প্রার্থী নাজিব রাজাককে হারিয়ে পুনরায় নির্বাচিত হয়েছেন তিনি। এখন সরকার গঠন করলে তিনিই হবেন বিশ্বের সবচেয়ে বয়স্ক নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী। অবশ্য তার নির্বাচনি জোটের সঙ্গে চুক্তি অনুযায়ী তিনি মাত্র দুই বছর ক্ষমতায় থাকতে পারবেন।

Facebook Comments
Please follow and like us: