সাতক্ষীরায় বাগদা চিংড়ি উৎপাদনে লক্ষ্য মাত্রা অর্জনে সংশয়* অর্ধলক্ষাধিক চাষী সর্বস্বান্ত

আবু সাইদ বিশ্বাস:সাতক্ষীরা: জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব,প্রচন্ড গরম ও উপযুক্ত রেণুর কারণে সাতক্ষীরা জেলায় অর্ধলক্ষাধিক বাগদা চিংড়ি মাছের ঘেরে ভাইরাস দেখা দিয়েছে। এতে বাগদা চিংড়ি মাছ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সংশয় দেখা দিয়েছে। প্রতিদিন ভাইরাস আক্রান্ত ঘের সমূহে বিপুল পরিমাণে বাগদা চিংড়ি মাছ মারা যাচ্ছে । মৌসুমের শুরুতে এবার মারাত্মক ভাইরাসের সংক্রমণ দেখা দেয়ায় হাজার হাজার ঘের মালিক সর্বস্বান্ত ও নিঃস্ব হতে বসেছে। যে সব প্রান্তিরক চাষি ব্যাংক ঋণ, জমি হারিসহ ধারদেনা করে ঘেরে বিনিয়োগ করেছিলেন তাদের এখন পথে বসার উপক্রম হয়েছে। তবে আধৃুনিক পদ্ধতিতে চাষকরলে রোগ ব্যাধি কম হবে বলে জেলা মৎস্য কর্মকর্তার দাবী।
সাতক্ষীরা জেলা মৎস্য অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে জেলার ৬টি উপজেলার ৬৬ হাজার ৯০০ হেক্টর জমিতে বাণিজ্যিকভাবে বাগদা চিংড়ি চাষ করা হয়েছে। এর মধ্যে সাতক্ষীরা সদর ৪ হাজার ৬৫ হেক্টর, তালায় ৩ হাজার ৩৮ হেক্টর, দেবহাটায় ৮হাজার ৮৯৩ হেক্টর, আশাশুনিতে ১৭ হাজার ৪০৩ হেক্টর, কালীগঞ্জ ১৫ হাজার ৯৯৩ হেক্টর ও শ্যামনগর উপজেলায় ১৭ হাজার ৫০৮ হেক্টর জমিতে চিংড়ি চাষ করা হয়েছে।
জেলা মৎস্য অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ৬৬ হাজার ৮৯০ হেক্টর,২০১৪-১৫ অর্থবছরে ৬৬ হাজার ৭৯৫ হেক্টর, ২০১৩-১৪ অর্থবছরে ৬৬ হাজার ৭৩৫ হেক্টর, ২০১২-১৩ অর্থবছরে ৫৯ হাজার ৯৪৫ হেক্টর, ২০১১-১২ অর্থবছওে ৬০ হাজার ৩৪৮ হেক্টর ২০১০-১১ অর্থবছরে ৫৮হাজার ৫৩৩ হেক্টর, ২০০৯-১০অর্থবছরে ৫৫ হাজার ৫০৫ হেক্টর ও ২০০৮-০৯ অর্থবছরে ৫৪ হাজার ৪৮৬ হেক্টর জমিতে বাগদা চিংড়ি চাষ করা হয়ে ছিল ।

জেলার বেশি চিংড়ি উৎপাদন হয় ,শ্যামনগর ,কালীগঞ্জ ও আশাশুনি উপজেলায়। এ তিন উপজেলার অধিকাংশ মানুষ চিংড়ির ওপর নির্ভরশিল। কিন্তু চলতি মৌসুমে যে হারে চিংড়ি মারা যাচ্ছে ঘেরে তাতে অনেকের পথে বসার উপক্রম হয়েছে। আশাশুনি উপজেলার বল্লবপুর গ্রামের আব্দুল কুদ্দুস মোড়ল জানান, চলতি মৌসুমের শুরুতে তার ঘেরে বিপুল পরিমাণে বাগদা চিংড়ি মারা যাচ্ছে। কালিগঞ্জ উপজেলার নলতা গ্রামের ঘের ব্যবসায়ী মঞ্জুর আলম পলাশ জানান, গত বছর চিংড়ি মাছ করে লাভ হওয়ায় এবার দুইটি ঘের থেকে বাড়িয়ে জমি লিজ নিয়ে ৪টি ঘের করেছেন। কিন্তু এ মৌসুমে প্রতিদিন মাছ মারা যাচ্ছে। বিনিয়োগকৃত টাকার সিকি ভাগও উঠবে না বলে আশংকা প্রকাশ করেন তিনি। শ্যামনগরের মুন্সিগঞ্জ এলাকার দাতনিখালির আব্দুস সাত্তার জানান,তার সবকটি ঘেরে ভাইরাস লেগে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। এসব বাগদা বেচে আসল উঠবে কিনা তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।
জেলাতে রেজিস্ট্রেশন প্রাপ্ত জেলের সংখ্যা ৪৯ হাজার ২৩ জন এবং মৎস্যচাষী ৭৬ হাজার ৩৯৪ জন।
সাতক্ষীরা জেলা মৎস্য অধিদপ্তর তথ্য মতে জেলাতে ৫৫ হাজার ১২২ টি রেজিস্ট্রেশন প্রাপ্ত বাগদা চিংড়ি ঘের রয়েছে। এর মধ্যে সদরে ২ হাজার ১০৫টি , তালাতে ১ হাজার ২৯৫ টি, দেবহাটাতে ৭ হাজার ৪৬৯টি, কালিগঞ্জে ১৪ হাজার ৬১৪ টি, আশাশুনিতে ১৩ হাজার ২৩৬ টি এবং শ্যামনগরে ১৬ হাজার ৪০৩ টি বাগদা চিংড়ি ঘের রয়েছে।
এসব বাগদা চিংড়ি ঘেরে চলতি বছরে উপাদনের লক্ষ্য মাত্রা ধরা হয়েছে ২৭ হাজার ৫শ মে.টন। এর মধ্যে সাতক্ষীরা সদরে ১৫৪০ মে.টন, তালাতে সদরে ১৩৫৫ মে.টন,দেবহাটাতে ৩৫১৪ মে.টন, কালিগঞ্জে ৬০১০ মে.টন, আশাশুনিতে ৮২৪৫ মে.টন এবং শ্যামনগরে ৬৮৩৬ মে.টন। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে উৎপাদন হয়েছিল ২৬ হাজার ৪৮৫ মে:টন। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ২৫ হাজার ৩৫৪ মে:টন,২০১৪-১৫ অর্থবছরে ২০ হাজার ৬৮০মে:টন, ২০১৩-১৪ অর্থবছরে ৬৬ হাজার ৭৩৫ হেক্টর, ২০১২-১৩ অর্থবছরে ৫৯ হাজার ৯৪৫ হেক্টর, ২০১১-১২ অর্থবছওে ৬০ হাজার ৩৪৮ হেক্টর ২০১০-১১ অর্থবছরে ৫৮হাজার ৫৩৩ হেক্টর, ২০০৯-১০অর্থবছরে ৫৫ হাজার ৫০৫ হেক্টর ও ২০০৮-০৯ অর্থবছরে ৫৪ হাজার ৪৮৬ হেক্টর জমিতে বাগদা চিংড়ি চাষ করা হয়ে ছিল ।
সাতক্ষীরা জেলা মৎস্য অধিদপ্তর সূত্র মতে, জেলাতে হেক্টর প্রতি পি এল মজুদ ৫০ হাজারটি যা ৩৩৪ কোটি পোনার চাহিদা রয়েছে। বেশির ভাগ পোনা জেলার বাইরে থেকে সরবরাহ করতে হয়। ফলে বাগদার এসব পোণা অনেকটা ভাইরাস যুক্ত বলে চাষীরা জানান। জেলাতে ১৮২টি বাগদা পোনার নার্সারী রয়েছে। হ্যাচারী রয়েছে ৯টি যেখান থেকে উৎপাদিত নপ্লি নার্সিং করে পিএল করা হয় ৮০ কোটি। যা জেলার চাহিদার তুলনায় অনেক কম।
জেলা চিংড়ি চাষি সমিতির সভাপতি ডাক্তার আবুল কালাম বাবলা জানান, এবার মৌসুমের শুরুতেই ভাইরাস ও হিটস্ট্রোকে অধিকাংশ ঘেরে চিংড়ি মাছ মারা যাচ্ছে। তিনি বলেন, উপকূলীয় শ্যামনগর উপজেলার কামালকাটি ও খুঁটিকাটা এলাকায় চলতি মৌসুমে তিনি দেড় হাজার বিঘা জমিতে বাগদা চিংড়ি চাষ করেছেন। তিনি বলেন, গত কয়েক বছরে চিংড়ি ঘেরে এমন মড়ক (ভাইরাস) লাগতে দেখা যায়নি। ভাইরাসের পাশাপাশি এবার হিটস্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে সবচেয়ে বেশি চিংড়ি মারা যাচ্ছে। তাপমাত্রা বৃদ্ধির জন্য ঘেরে পানি ধরে রাখা সম্ভব হচ্ছে না। পর্যাপ্ত পানি না থাকায় মড়ক লাগার পাশাপাশি হিটস্ট্রোকে আক্রান্ত হচ্ছে চিংড়ি।
জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো: শহীদুল ইসলাম জানান, আধুনিক পদ্ধতিতে বাগদা চিংড়ি চাষে আমরা মৎস্য চাষীদের পরামর্শ দিচ্ছি। ভাইরাস প্রতিরোধে নানা মুখি পদক্ষেপ গ্রহণ করেছি।

Facebook Comments
Please follow and like us: