মহাকাশে বাংলাদেশ#কোন দেশের কত স্যাটেলাইট

বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ উৎক্ষেপণের পর দেশবাসীর উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী- জাতির পিতার স্বপ্ন বাস্তবায়নে আরেক ধাপ এগিয়ে গেলাম। আমরা এখন স্যাটেলাইট ক্লাবের গর্বিত সদস্য

ক্রাইমবার্তা ডেস্ক রিপোট:  বাংলাদেশ মহাকাশ জয় করেছে। শুক্রবার রাত ২টা ১৪ মিনিটে দেশের প্রথম কৃত্রিম উপগ্রহ ‘বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১’ বহনকারী রকেট ফ্যালকন-৯ সফলভাবে উৎক্ষেপণ করা

হয়েছে। উৎক্ষেপণের ৮ মিনিটের মধ্যে স্যাটেলাইটটি মহাকাশে পৌঁছে যায়। ‘বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১’ মহাকাশে পৌঁছে দিয়ে মাত্র ৩ মিনিট পরই রকেট ফ্যালকন-৯ ভূপৃষ্ঠে

ফিরে আসে। ৩৩ মিনিটে ‘বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১’ নিজস্ব কক্ষপথে পৌঁছে যায়। এরপর থেকে স্যাটেলাইটটি নিজ থেকেই কাজ শুরু করবে। উৎক্ষেপণের পরপর স্পেসএক্সের

ওয়েবসাইট ও উৎক্ষেপণস্থলে রাখা বড় পর্দায় বাংলাদেশ ও বঙ্গবন্ধু এবং বাংলাদেশের সাফল্য নিয়ে সেখানে প্রামাণ্য চিত্র দেখানো হয়। এর মাধ্যমে পুনর্ব্যবহারযোগ্য

রকেটের সফল উৎক্ষেপণ করল স্পেসএক্স। ‘বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১’-এর সফল উৎক্ষেপণ উপলক্ষে জনগণকে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। উৎক্ষেপণের পরপরই জাতির উদ্দেশে দেয়া ভাষণে

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, এর মাধ্যমে আমরা স্যাটেলাইট ক্লাবের গর্বিত সদস্য হলাম। প্রবেশ করলাম এক নতুন যুগে। তিনি বলেন, জাতির জনকের স্বপ্ন বাস্তবায়নে

আরেক ধাপ এগিয়ে গেলাম ‘বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১’ উৎক্ষেপণের মাধ্যমে। কক্ষপথ বাংলাদেশকে ভাড়া দেয়ায় তিনি রাশিয়াকে ধন্যবাদ জানান। তিনি ‘বঙ্গবন্ধু

স্যাটেলাইট-১’-এর শুভ উৎক্ষেপণ ঘোষণা করেন। এদিকে, উৎক্ষেপণের পর কেনেডি স্পেস সেন্টারে সজীব ওয়াজেদ জয় উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দেন। এ

সময় তিনি বলেন, তরুণদের জন্য এটি একটি দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। টেলিভিশনে রকেটের উৎক্ষেপণের সরাসরি সম্প্রচার দেখে উৎফুল্ল হয়ে ওঠেন বাংলাদেশের মানুষসহ

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বসবাসকারী বাঙালিরা। অনেকে বিজয় উল্লাসে ফেটে পড়েন। কারিগরি জটিলতায় প্রথম চেষ্টা আটকে যাওয়ার পর দ্বিতীয় দিনে ফ্লোরিডার কেনেডি স্পেস

সেন্টার থেকে রকেটটি উৎক্ষেপণ করায় ‘বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১’-এর মহাকাশ যাত্রা শুরু হয়েছে। দুটি পর্যায়ে এ উৎক্ষেপণ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে। প্রথম পর্যায়টি সম্পন্ন হতে

সময় লাগবে ১০ দিন এবং দ্বিতীয় পর্যায়ে লাগবে ২০ দিনের মতো। বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ উৎক্ষেপণের মধ্য দিয়ে ৫৭তম দেশ হিসেবে স্যাটেলাইটের মালিক দেশগুলোর

অভিজাত ক্লাবে যুক্ত হবে বাংলাদেশ। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে এ স্যাটেলাইটের মাধ্যমে ইন্টারনেট ও টেলিযোগাযোগ সেবার সম্প্রসারণ করা সম্ভব হবে। দুর্যোগ পরিস্থিতি

মোকাবেলা ও ব্যবস্থাপনায় নতুন মাত্রা যোগ হবে। এর আগে বৃহস্পতিবার রাতে স্যাটেলাইটটি বহনকারী রকেট ‘ফ্যালকন-৯’ উৎক্ষেপণের জন্য পুরোদস্তুর প্রস্তুত ছিল। এটির ইঞ্জিনও চালু করা হয়েছিল। সর্বশেষ উৎক্ষেপণের

ক্ষণগণনা (কাউন্টডাউন) শুরু হয়। কিন্তু শেষ মিনিটে এসে থমকে যায় সেকেন্ডের কাঁটা। রকেটের যাত্রা (স্টার্টআপ মোড) শুরু হওয়ার মাত্র ৪২ সেকেন্ড আগে তা বন্ধ হয়ে

যায়। লঞ্চিং গ্রাউন্ডে কারিগরি ত্রুটি ধরা পড়লে উৎক্ষেপণ স্থগিত হয়ে যায়। এ সময় জানানো হয়, এখন আর উড়ছে না বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১। বাংলাদেশ সময় শুক্রবার রাত

২টা ১৪ মিনিটে স্যাটেলাইটটি উৎক্ষেপণের নতুন সময় নির্ধারণ করা হয়। উৎক্ষেপণের দায়িত্বে থাকা মার্কিন বেসরকারি মহাকাশ গবেষণা সংস্থা স্পেসএক্স ‘বঙ্গবন্ধু-১ স্যাটেলাইট’-এর উৎক্ষেপণের জন্য প্রথমবার সম্ভাব্য সময় ঠিক করেছিল

বৃহস্পতিবার রাত ২টা ১২ মিনিট থেকে ৪টা ২২ মিনিট। পরে রাত ৩টা ৪৭ মিনিটে চূড়ান্ত সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু ওই দিন সবকিছু ঠিকঠাক থাকার পরও শেষ

মুহূর্তে এসে যাত্রা আটকে যায়। স্যাটেলাইট বহনকারী রকেট ফ্যালকনের ইঞ্জিনগুলো সব সচল হলেও এবং চারদিক দিয়ে ধোঁয়া বের হতে শুরু করলেও শেষ মিনিটে এসে

এর পুরো প্রক্রিয়া থেমে যায়। ফলে ‘বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১’ এর মহাকাশ মিশন আটকে যায়। এ ঘটনার পর রাত ৪টা ১০ মিনিটে স্পেসএক্স কর্তৃপক্ষ উৎক্ষেপণ ১ দিনের

জন্য স্থগিত করেন। বৃহস্পতিবার স্পেসএক্স এক টুইট বার্তায় জানায়, শেষ মিনিটে কিছু কারিগরি সমস্যার কারণে উৎক্ষেপণ স্থগিত রাখা হয়েছে। রকেট ও স্যাটেলাইট ভালো

অবস্থায় আছে। শুক্রবার নির্ধারিত সময়ে উৎক্ষেপণের প্রস্তুতি ফের শুরু হবে। সাধারণত স্যাটেলাইট মহাকাশে পাঠানোর ক্ষেত্রে সব সময়ই একটি অতিরিক্ত দিন হাতে রাখা হয়। কারণ প্রথম দিন কোনো সমস্যা হলে যাতে দ্বিতীয় দিনটি কাজে লাগানো

যায়। আগে থেকেই স্পেসএক্স জানিয়ে রেখেছিল, দ্বিতীয় দিনটি শুক্রবার (ব্যাকআপ ডে)। এদিকে স্পেসএক্সের ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে, শুক্রবার না হলে শনিবার আবার

উৎক্ষেপণের চেষ্টা করা হবে। শনিবার স্থানীয় সময় বিকাল ৪টা ১৫ মিনিট আর বাংলাদেশ সময় রাত ২টা ১৫ মিনিটে উৎক্ষেপণের সময় নির্ধারণ করা হয়েছে। শুক্রবার ছাত্রলীগের জাতীয় কাউন্সিলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, শুক্রবার না হলে আরেকটা সময় স্পেসএক্স দেবে। তিনি বলেন, রকেট উৎক্ষেপণ হবে, ইনশাআল্লাহ।

এ নিয়ে দুশ্চিন্তার কিছু নেই। উৎক্ষেপণ দেখতে বৃহস্পতিবার কেনেডি স্পেস সেন্টারে ছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছেলে ও তার তথ্য প্রযুক্তিবিষয়ক উপদেষ্টা সজীব

ওয়াজেদ জয়। ফেসবুক পোস্টে জয় লিখেছেন, রকেট উৎক্ষেপণের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের ঝুঁকি নেয়া হয় না। এ ধরনের বিলম্ব খুবই স্বাভাবিক। উৎক্ষেপণের শেষ মিনিট

পুরোপুরি নিয়ন্ত্রিত হয় কম্পিউটারের মাধ্যমে। কম্পিউটারের হিসাবে কোনো কিছু স্বাভাবিকের বাইরে ধরা পড়লে তা উৎক্ষেপণ কার্যক্রম স্থগিত করে দেয়। এজন্য তিনি উদ্বিগ্ন

না হওয়ার জন্য দেশবাসীকে প্রতি আহ্বান জানান। যুক্তরাষ্ট্রের অরল্যান্ডের স্থানীয় একটি হোটেলে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) চেয়ারম্যান ড. শাহজাহান মাহমুদ বলেছেন, স্যাটেলাইট বহনকারী

রকেটের উৎক্ষেপণে মানুষের কোনো হাত থাকে না। কম্পিউটার স্বয়ংক্রিয়ভাবে সবকিছু পরীক্ষা করে কোনো সমস্যা পেলে তা স্থগিত করে দেয়। ‘বঙ্গবন্ধু-১ স্যাটেলাইট’-এর

উৎক্ষেপণেও কম্পিউটার স্বয়ংক্রিয়ভাবে তাই করেছে। তিনি আরও বলেন, ভালো খবর হল- এখানে দায়িত্বরত ব্যক্তি বলেছেন, স্যাটেলাইট ও রকেট ঠিক আছে, সেখানে

কোনো সমস্যা নেই। গ্রাউন্ড সিস্টেমে হয়তো সামান্য ত্রুটি দেখা দিতে পারে। সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের উত্তরে ড. মাহমুদ আরও বলেন, এটা নতুন কোনো ঘটনা নয়। এর

আগে ছয়বারের মাথায় রকেট উৎক্ষেপণের ঘটনা ঘটেছে। স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের জন্য শুক্রবার রাত তারিখ নির্ধারণ করেছে স্পেসএক্স। আশা করি এবার সফলভাবে

উৎক্ষেপণ হবে। কেনেডি স্পেস সেন্টারের দুটি স্থান থেকে দর্শনার্থীদের জন্য স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ সরাসরি দেখার ব্যবস্থা ছিল। এর একটি স্থান অ্যাপোলো বা স্যাটার্ন-৫ সেন্টার,

উৎক্ষেপণস্থল থেকে যার দূরত্ব ৬ দশমিক ২৭ কিলোমিটার। এছাড়া কেনেডি স্পেস সেন্টারের মূল দর্শনার্থী ভবন (মেইন ভিজিটর কমপ্লেক্স) থেকেও স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ

দেখার ব্যবস্থা ছিল। উৎক্ষেপণস্থল থেকে এটির দূরত্ব ১২ কিলোমিটার। উৎক্ষেপণ উপলক্ষে শুক্রবারও কেনেডি স্পেস সেন্টারে ছিল বাংলাদেশের ৩০ সদস্যের প্রতিনিধি দল।

আগ্রহ নিয়েই অপেক্ষায় ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী বাংলাদেশিরাও। উৎক্ষেপণ উপলক্ষে আগের দিন যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগ আয়োজন করে নানা অনুষ্ঠান। ফ্রান্সের মহাকাশ সংস্থা থ্যালেস অ্যালেনিয়া স্পেস বঙ্গবন্ধু-১ স্যাটেলাইটের মূল অবকাঠামো তৈরি করেছে। এটি উৎক্ষেপণের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায় ৩০ মার্চ পাঠানো

হয়। মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা স্পেসএক্সের রকেটে স্যাটেলাইটটি মহাকাশে পাঠানোর জন্য সেখানে পাঠানো হয়। স্যাটেলাইটটি তৈরি এবং উৎক্ষেপণের কাজটি বিদেশ

হলেও এটি নিয়ন্ত্রণ থাকবে বাংলাদেশের হাতে। এজন্য গাজীপুরের জয়দেবপুরে তৈরি গ্রাউন্ড কন্ট্রোল স্টেশন (ভূমি থেকে নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা) স্যাটেলাইট নিয়ন্ত্রণের মূল কেন্দ্র

হিসেবে কাজ করবে। আর বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করা হবে রাঙ্গামাটির বেতবুনিয়া গ্রাউন্ড স্টেশন। স্পেসএক্সের যে মহাকাশযানে (রকেট) করে স্যাটেলাইটটি কক্ষপথে যাবে। দুটি পর্যায়ে এ উৎক্ষেপণপ্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে। প্রথম পর্যায়টি সম্পন্ন হতে সময় লাগবে ১০ দিন

এবং দ্বিতীয় পর্যায়ে লাগবে ২০ দিনের মতো। এটির অবস্থান হবে ১১৯ দশমিক ১ ডিগ্রি পূর্ব দ্রাঘিমাংশে। এই কক্ষপথ থেকে বাংলাদেশ ছাড়াও সার্কভুক্ত সব দেশ,

ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন, মিয়ানমার, তাজিকিস্তান, কিরগিজস্তান, উজবেকিস্তান, তুর্কমিনিস্তান ও কাজাখস্তানের কিছু অংশ এই স্যাটেলাইটের আওতায় আসবে। স্যাটেলাইটভিত্তিক টেলিভিশন সেবা ডিটিএইচ (ডিরেক্ট টু হোম) ও জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কাজেও এ স্যাটেলাইটকে কাজে লাগানো যাবে। দেশের প্রথম এ

স্যাটেলাইট তৈরিতে খরচ ধরা হয় ২ হাজার ৯৬৭ কোটি টাকা। এর মধ্যে ১ হাজার ৩১৫ কোটি টাকা বাংলাদেশ সরকার ও বাকি ১ হাজার ৬৫২ কোটি টাকা ঋণ হিসেবে

নেয়া হয়েছে। এ ঋণ দিয়েছে বহুজাতিক ব্যাংক এইচএসবিসি। তবে শেষ পর্যন্ত প্রকল্পটি বাস্তবায়নে খরচ হয়েছে ২ হাজার ৭৬৫ কোটি টাকা। টিএসসিতে উৎসব : বঙ্গবন্ধু-১ স্যাটেলাইট সফলভাবে উৎক্ষেপণের পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসিতে উল্লাসে ফেটে পড়েন শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। বিশ্ববিদ্যালয়ের সব হল

থেকে টিএসসিতে শিক্ষার্থীরা জড়ো হন। সেখানে বড় পর্দায় উৎক্ষেপণ দৃশ্য উপভোগ করেন তারা। এ সময় সেখানে উৎসবের আমেজ তৈরি হয়। শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা জানান, বাংলাদেশ নতুন যুগে প্রবেশ করেছে। বিশ্বের বুকে বাংলাদেশের অবস্থান নতুনভাবে সৃষ্টি হল। এ ঐতিহাসিক অর্জনের সাক্ষী হতে পেরে আমরা

গর্বিত। ঢাকা বিশবিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জামান তাৎক্ষণিক মিডিয়ায় কথা বলেন। তিনি প্রতিক্রিয়ায় বলেন, ৫৭তম রাষ্ট্র হিসেবে মহাকাশে স্থান করে নিল

বাংলাদেশ। এ মাহেন্দ্রক্ষণের জন্য পুরো জাতি অপেক্ষায় ছিল। মহাকাশে বাংলাদেশ নিজেদের অবস্থান করে নেয়ার মাধ্যমে বাঙালি জাতি বিশ্বের বুকে শক্ত অবস্থান করে নিল।

এটা জাতির উত্থানের বড় পরিমাপক। স্বাধীনতার পরে এটা বাংলাদেশের মহাবিজায়। এর মাধ্যমে বাংলাদেশের সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবস্থান যে শক্তিশালী হয়েছে তা

প্রমাণিত হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সভাপতি ড. এএসএম মাকসুদ কামাল বলেন, বঙ্গবন্ধু-১ স্যাটেলাইট একটি মাইলফলক। এর মাধ্যমে আমরা যেমন মহাকাশে এগিয়ে

গেলাম, তেমনি মহাকাশের তথ্য-উপাত্ত পেতে বিশ্বের বুকে নিজেদের অবস্থান জানান দিলাম।

-০–

কোন দেশের কত স্যাটেলাইট

স্যাটেলাইট ক্লাবে পা রাখতে যাচ্ছে বাংলাদেশ।  আধুনিক বিজ্ঞানের অন্যতম আবিষ্কার স্যাটেলাইট বা কৃত্রিম উপগ্রহ। তথ্য ও যোগাযোগ ব্যবস্থায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছে এই স্যাটেলাইট। বিশ্বের ৫৭তম দেশ হিসেবে স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের পদক্ষেপ নিয়েছে বাংলাদেশ। প্রায় তিন হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে বাংলাদেশের বঙ্গবন্ধু-১ স্যাটেলাইট প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হয়েছে।

১৯৫৭ সালে প্রথম মহাকাশে স্পুটনিক-১ নামে স্যাটেলাইট প্রেরণ করে তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন। এরপর অনেক দেশ তাদের অনুসরণ করে মহাকাশে স্যাটেলাইট প্রেরণ করেছে। বর্তমানে কক্ষপথে দু্ই হাজার দুইশোটির বেশি স্যাটেলাইট রয়েছে

স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ ও এর গতিবিধি নিয়ে কাজ করে এন২ওয়াইও.কম ওয়েবসাইটের তথ্য মতে, সাবেক সোভিয়েত রাশিয়া ভূক্ত দেশগুলোর সম্মিলিত স্যাটেলাইট সংখ্যা ১৫০৪টি, যুক্তরাষ্ট্রের ১৬১৬টি, চীনের ২৯৮টি, জাপানের ১৭২টি, ফ্রান্সের ৬৮টি, ভারতের ৮৮টি, তুরস্কের ১৪টি, পাকিস্তানের ৩টি, সৌদি আরবের ১৩টি, দক্ষিণ কোরিয়ার ২৪টি, স্পেনের ২৩টি, ব্রিটেনের ৪২টি। এছাড়া বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার অনেকগুলো স্যাটেলাইট বর্তমানে কক্ষপথে অবস্থান করছে।

বঙ্গবন্ধু-১ স্যাটেলাইটটির ওজন সাড়ে সাড়ে তিন হাজার কেজিরও বেশি। আর্থ স্টেশন থেকে ৩৫ হাজার ৭৮৬ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে স্যাটেলাইটটির কক্ষপথে যেতে সময় লাগবে ৮-১১ দিন। আর পুরোপুরি কাজের জন্য প্রস্তুত হবে ৩ মাসের মধ্যে।

বাংলাদেশ স্যাটেলাইট: বাণিজ্যিকভাবে কতটা সফল হবে?
মহাকাশে উৎক্ষেপণের অপেক্ষায় রয়েছে বাংলাদেশের বঙ্গবন্ধু-১ স্যাটেলাইট। এই স্যাটেলাইট তৈরি এবং উৎক্ষেপণের পুরো প্রক্রিয়ায় প্রায় তিন হাজার কোটি টাকা খরচ করেছে বাংলাদেশ সরকার। বাংলাদেশ সরকার বিষয়টি ন্যাশনাল প্রাইড বা জাতীয় গৌরবের অংশ হিসেবেই দেখছে। যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা থেকে যখন এই স্যাটেলাইট মহাকাশের দিকে ছুটবে তখন সে মুহূর্তটি উদযাপন করার জন্য সরকারের দিক থেকে নানা আয়োজন করা হয়েছে।

এর আগে পৃথিবীর ৫৬টি দেশ মহাকাশে স্যাটেলাইট পাঠিয়েছে।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এই স্যাটেলাইট থেকে বাণিজ্যিকভাবে লাভবান হবার সম্ভাবনা কতটা? কী কাজে লাগবে এই স্যাটেলাইট? প্রযুক্তির সাথে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কয়েকটি ক্ষেত্রে এই স্যাটেলাইট কাজে লাগতে পারে।

প্রত্যন্ত এলাকায় টেলিযোগাযোগ এবং ইন্টারনেট সেবা বিস্তৃত করা,

যারা ভি-স্যাট ব্যবহার করে তথ্য আদান-প্রদান করছেন তাদের কাজে

বাংলাদেশের টেলিভিশন চ্যানেলগুলোর সম্প্রচারের জন্য, এবং

ডিটিএইচ সেবা অর্থাৎ বর্তমানে কেবল টিভির যে সংযোগ আছে সেটির মান উন্নয়ন করা

ইন্টারনেট ব্যবসার সাথে জড়িত সিরাজুল হায়দার বলছেন, “সবচেয়ে বেশি সুবিধা হবে কেবল টিভির ক্ষেত্রে। ট্রিপল প্লে- অর্থাৎ ডিশ, ইন্টারনেট ও কলিং- এ তিনটি সেবা একসাথে ডিটিএইচ এর মাধ্যমে পাওয়া যাবে। এতে করে প্রত্যন্ত এলাকায় এই সুবিধা ছড়িয়ে দেয়া সম্ভব হবে।”

ধারণা করা হচ্ছে, বাংলাদেশের টেলিভিশন চ্যানেলগুলো বঙ্গবন্ধু-১ স্যাটেলাইটের একটি বড় গ্রাহক হবে।

বেসরকারি টেলিভিশন মালিকদের সংগঠন বা অ্যাটকোর সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট এবং একাত্তর টিভি’র ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোজাম্মেল হক বলেন, বর্তমানে বাংলাদেশের টিভি চ্যানেলগুলো অ্যাপস্টার সেভেন নামের একটি বিদেশি স্যাটেলাইট ব্যবহার করছে।

তিনি বলেন, বিদেশি স্যাটেলাইট ভাড়া বাবদ বাংলাদেশের প্রতিটি টেলিভিশন স্টেশন মাসে ২৪ হাজার ডলার খরচ করে। সেই হিসেবে বাংলাদেশের সবগুলো টেলিভিশন চ্যানেলের বিদেশি স্যাটেলাইট ভাড়া বাবদ প্রতি মাসে মোট খরচের পরিমাণ প্রায় ১৫ লাখ ডলার।

 বাংলাদেশের টিভি চ্যানেলগুলো কি এ স্যাটেলাইট ভাড়া নেবে?

“আমরা অবশ্যই নেব। যেমন ধরুন, ভাড়া বাড়িতে থাকলাম। কিন্তু বাড়িটা কখনো আমার হলো না। কিন্তু বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটে ভাড়া দিলে সেটি থেকে বাংলাদেশের আয় হবে,” বলছিলেন মোজাম্মেল হক।

বাংলাদেশের টেলিকম খাতের একজন বিশেষজ্ঞ আবু সাইয়িদ খান বলেন, বাংলাদেশ এবং আন্তর্জাতিক বাজার লক্ষ্য করে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটে বিনিয়োগ করা হয়েছে।

এই স্যাটেলাইটের জন্য যে টাকা খরচ হয়েছে, আগামী সাত বছরের মধ্যে সে খরচ উঠে আসবে বলে মনে করে বাংলাদেশ সরকার। মি: খান মনে করেন, “যদি পেশাদারিত্বের সাথে পরিচালনা করা হয়, তাহলে এ বিনিয়োগ উঠে আসা কষ্টকর ব্যাপার নয়।”

চ্যালেঞ্জ কোথায়?

বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটে দুটো চ্যালেঞ্জ আছে। প্রথমত; এর অবস্থান এবং দ্বিতীয়ত; এর দূরত্ব।  বাংলাদেশের টিভি চ্যানেলগুলো বর্তমানে অ্যাপস্টার নামে যে স্যাটেলাইট ব্যবহার করছে সেটি বাংলাদেশের উপরে ৯০ ডিগ্রিতে অবস্থান করছে। অ্যাপস্টার সেভেনের মাধ্যমে একদিকে দুবাই এবং অন্যদিকে মালয়েশিয়া পর্যন্ত সম্প্রচারের সুবিধা পাওয়া যাচ্ছে।

মোজাম্মেল হক বলেন, বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের অবস্থান হবে ইন্দোনেশিয়ার উপর ১১৯ ডিগ্রিতে এবং বাংলাদেশ থেকে ৪৫ ডিগ্রি অ্যাঙ্গেলে এই স্যাটেলাইট থাকবে। ফলে এই স্যাটেলাইটের মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্য পর্যন্ত সরাসরি পৌঁছনো সম্ভব হবে না। আরেকটি স্যাটেলাইটের মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যে পৌঁছাতে হবে।

কিন্তু তারপরেও এ বিষয়টিকে খুব বড় কোন সমস্যা হিসেবে দেখছেন না মি: হক।

“এটা আমাদের মাথার উপরে হলে একদিকে আমরা দুবাই এবং অন্যদিকে মালয়েশিয়া পর্যন্ত চলে যেতে পারতাম।”

কিন্তু সিগন্যাল যথেষ্ট ভালো হলে এটি কোন সমস্যা নয় বলে মি: হক মনে করেন। তিনি বলেন, টেলিভিশন চ্যানেলগুলো বঙ্গবন্ধু-১ স্যাটেলাইট তিনমাস পরীক্ষামূলক-ভাবে ব্যবহার করতে পারবে।

সম্প্রচার মানের দিক থেকে সন্তুষ্ট হলেই তারা এই স্যাটেলাইট পাকাপাকিভাবে ব্যবহার করবেন বলে উল্লেখ করেন তিনি।

স্যাটেলাইট কোন পজিশনে থাকবে সেটির জন্য আইটিইউ (ইন্টারন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন ইউনিয়ন) থেকে বরাদ্দ নিতে হয়।

“কিন্তু আমাদের মাথার উপরের জায়গাটা নিয়ে তদানীন্তন সরকারগুলো আইটিইউকে বারবার তাগাদা দেয়া সত্ত্বেও বাংলাদেশের জন্য বরাদ্দ করা জায়গা কী হবে কোন সরকার ২০০৮-১০ এর আগ পর্যন্ত সেটি নিয়ে চিন্তাও করেনি। সেজন্য আমাদের উপরে জায়গা আমরা পাইনি,” বলছিলেন মি: হক।

বঙ্গবন্ধু-১ স্যাটেলাইটে মোট ৪০টি ট্রান্সপন্ডারের মধ্যে অর্ধেক বিভিন্ন দেশের কাছে ভাড়া দেবার পরিকল্পনা আছে। বাকি অর্ধেক অর্থাৎ ২০টি ট্রান্সপন্ডার ব্যবহার করবে বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠানগুলো।

এর মধ্যে ১২টি ট্রান্সপন্ডার বরাদ্দ রয়েছে ডিটিএইচ (ডাইরেক্ট টু হোম) কোম্পানির জন্য। কিন্তু সে দুটি কোম্পানি যদি এ স্যাটেলাইট ভাড়া না নেয়, তাহলে এটির অর্ধেক অব্যবহৃত থেকে যাবে বলে উল্লেখ করেন মি: হক।

তিনি বলছেন, ডিটিএইচ কোম্পানিগুলোর বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট ভাড়া নেবার সম্ভাবনা আপাতত দেখা যাচ্ছে না।

সীমাবদ্ধতা কোথায়?

টেলিকম বিশেষজ্ঞ আবু সাইয়িদ খান মনে করেন, স্যাটেলাইট পরিচালনার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সীমাবদ্ধতা একটাই। সেটা হচ্ছে পরিচালনা কার্যক্রম।

তিনি মনে করেন, এখানে প্রযুক্তি কোন বিষয় নয়। বরং প্রযুক্তির উপর ভিত্তি করে ব্যবসা পরিচালনা করাটাই হচ্ছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। প্রযুক্তিগত দিক থেকে কোনই আশংকা নেই।

পরিচালনা যদি ঠিক মতো হয় তাহলে সাফল্য ‘অবধারিত’ বলে মনে করেন সাইয়িদ খান।

উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, “বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স বোয়িং এবং এয়ারবাসের প্রযুক্তি ব্যবহার করে। সে প্রযুক্তি এমিরেটস বা সিঙ্গাপুর এয়ারলাইন্স তারাও ব্যবহার করে। অতএব এখানে প্রযুক্তি কোন বিষয় নয়। এখানে ব্যবসা পরিচালনার ধরণটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।”

তিনি বলেন, বাংলাদেশের স্যাটেলাইট ব্যবহার করে বিদেশি কোম্পানিগুলো যদি লাভের সম্ভাবনা দেখতে পায় তাহলে তারা অবশ্যই সিটে ভাড়া নেবে।

Please follow and like us:
Facebook Comments