সাতক্ষীরায় পাটের আবাদের লক্ষ্য মাত্র অর্জন হয়নি *বিএডিসি’র বীজ এর পরিবর্তে ভারতীয় বীজের চাহিদা বেড়েছে

আবু সাইদ বিশ্বাসঃসাতক্ষীরা: সাতক্ষীরা: চলতি মৌসুমে সাতক্ষীরায় ১২ হাজার ২৩০ ঘেক্টর জমিতে পাটের আবাদের লক্ষ্য মাত্রা নির্ধরণ করা হয়েছে। তবে, সময় মত প্রয়োজনীয় বৃষ্টিপাত না হওয়ায় অধিক তাপমাত্রার কারণে বেশির ভাগ ক্ষেতে পাটের চারা গজাতে পরিনি। ফলে এখন পর্যন্ত পাটের আবাদ হয়েছে ১০ হাজার ৭০৫ হেক্টর জমিতে। এতে উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সংশয় দেখা দিয়েছে। জেলা কৃষি বিভাগের দাবী আবাদের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে এখনো সময় রয়েছে। তবে কৃষকরা বলছে জ্যৈষ্ঠ মাস থেকে সাতক্ষীরাতে আর পাটের নতুন আবাদ করা হয়না। যদিও কৃষি বিভাগ পাট উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে দৃশ্যমান নানা সমস্যা সমাধানে কৃষকদের পরামর্শ অব্যাহত রেখেছেন।

চলতি মৌসুমের প্রথম দিকে পানি সেচ দিয়ে চাষ শুরু হলেও বৈশাখের শেষ সপ্তাহের কম বেশী বৃষ্টি হয়েছে। ফলে চাষীদের পাট চাষে সুবিধা হয়েছে। বোরো ধান কাটার পর অনেকে জমি চাষ করে পাট বীজ বুনেছেন। বাজারের পাট ও বীজ ব্যবসায়ীদের সাথে কথা আলাপকালে তারা জানান, বিদেশে পাট ও পাটজাত দ্রব্যের চাহিদা আগের চেয়ে অনেক বেড়ে গেছে। গতবার পাটের দাম বেশী পাওয়ায় কৃৃষকদের মধ্যে পাট চাষে আগ্রহ বেড়েছে। তারা আরো জানান, সার, বীজ ও কীটনাশকের সঙ্কট না হলে সাতক্ষীরাতে পটের উৎপাদন ভাল হবে। তবে অধিকাংশ কৃষক বিএডিসি’র বীজ বপন না করে ভারতের বঙ্কিম ও মহারাষ্ট্র্র বীজ বপন করেছেন। তারা ভারতের বীজের ওপর বেশি আস্থাশীল বলে জানান। তবে ধান কাটার পর পরই পাট ক্ষেতে আগাছা পরিষ্কার করার শ্রমিক পাওয়া মুশকিল হয়ে পড়েছে। অনেক ক্ষেত্রে নারী শ্রমিক দিয়ে পাট ক্ষেত পরিচর্যা করছেন পুরুষদের পাশাপাশি।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর জানিয়েছে, চলতি মৌসুমে জেলার ১২ হাজার ২৩০ হেক্টর জমিতে এক লাখ ৩৭ হাজার ৬২৪ বেল পাট উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
এর মধ্যে সদর উপজেলার চার হাজার ৮৫৫ হেক্টর জমিতে ৫৪ হাজার ৬৩৩ বেল, কলারোয়া উপজেলার চার হাজার ০৫ হেক্টর জমিতে ৪৫ হাজার ৬৮ বেল, তালা উপজেলার তিন হাজার ১৫ হেক্টর জমিতে ৩৩ হাজার ৯২৮ বেল, দেবহাটা উপজেলার ৯০ হেক্টর জমিতে এক হাজার ১৩ বেল, কালিগঞ্জ উপজেলার ১৭০ হেক্টর জমিতে এক হাজার ৯১৩ বেল, আশাশুনি উপজেলার ৯০ হেক্টর জমিতে এক হাজার ১৩ বেল ও শ্যামনগর উপজেলার পাঁচ হেক্টর জমিতে ৫৬ বেল পাট উৎপাদানের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।

তবে গতকাল শনিবার পর্যন্ত জেলাতে আবাদ হয়েছে ১০ হাজার ৭০৫ হেক্টর জমিতে। এর মধ্যে সদর উপজেলার চার হাজার ২৩০ হেক্টর জমিতে,কলারোয়া উপজেলার চার হাজার হেক্টর জমিতে, তালা উপজেলার তিন হাজার ১০ হেক্টর জমিতে, দেবহাটা উপজেলার ৮৫ হেক্টর জমিতে, কালিগঞ্জ উপজেলার ১৭০ হেক্টর জমিতে,আশাশুনি উপজেলার ৯০ হেক্টর জমিতে ও শ্যামনগর উপজেলায় এখন পর্যন্ত কোন পাটের আবাদ হয়নি।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রমতে ২০১৬-১৭ খরিপ -১ এ জেলাতে ১১ হাজার ৬৩০ হেক্টর জমিতে এক লাখ ২৭ হাজার ৯৩০ বেল পাট উৎপাদন হয়েছিল। যার মধ্যে সদর উপজেলার চার হাজার ৭৮০ হেক্টর জমিতে ৫২ হাজার ৫৮০ বেল, কলারোয়া উপজেলার তিন হাজার ৯০ হেক্টর জমিতে ৩৩ হাজার ৯৯০ বেল, তালা উপজেলার তিন হাজার ৩৫০ হেক্টর জমিতে ৩৬ হাজার ৮৫০ বেল, দেবহাটা উপজেলার ১০৪ হেক্টর জমিতে এক হাজার ১৪০ বেল, কালিগঞ্জ উপজেলার ১৮৫ হেক্টর জমিতে দুই হাজার ৩৫ বেল, আশাশুনি উপজেলার ১২০ হেক্টর জমিতে এক হাজার ৩২০ বেল ও শ্যামনগর উপজেলার এক হেক্টর জমিতে ১১ বেল পাট উৎপাদানের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। আর এসব জমির অধিকাংশতেই আবাদ করা হয়েছে তোষা জাতের পাট।

সূত্রমতে ২০১৫-১৬ খরিপ -১ এ সাতক্ষীরা জেলার ছয় উপজেলায় পাটের উৎপাদন ছিল ১ লাখ ১৮ হাজার ৫৮ বেল । যার মধ্যে সাতক্ষীরা সদরে ৫০ হাজার ৫৫৫ বেল, কলারোয়ায় ৩০ হাজার ৭১২, তালায় ৩৩ হাজার ৯২৫, দেবহাটায় ৯৪০, কালীগঞ্জে ৮২০, আশাশুনিতে ১ হাজার ৫০ ও শ্যামনগরে ৫৫ বেল পাট উৎপাদনের লক্ষ্য ধরা হয়েছে।
অন্যদিকে ২০১৪-১৫ খরিপ -১ এ জেলায় পাটের মোট উৎপাদন ছিল ১ লাখ ১৬ হাজার ৪৪০ বেল। সে অনুয়ায়ী, সাতক্ষীরায় পাটের আবাদ হয় ১০ হাজার ৫৮৪ হেক্টর জমিতে। এর মধ্যে সাতক্ষীরা সদরে ৪ হাজার ৫৭৫ হেক্টর, কলারোয়ায় ২ হাজার ৭৮০, তালায় ৩ হাজার ৭০, দেবহাটায় ৮৫, কালীগঞ্জে ৭৪, আশাশুনিতে ৯৫ এবং শ্যামনগরে ৫ হেক্টর পরিমাণ জমিতে পাট উৎপাদন করা হচ্ছে।
২০১৩-১৪ খরিপ-১ এ সাতক্ষীরায় ১ লাখ ১৬ হাজার ৪২৪ বেল পাট উৎপাদন হয়।
এরমধ্যে সাতক্ষীরা সদরে ৪৯ হাজার ১০১ বেল, কলারোয়ায় ৩২ হাজার ৪৫০ বেল, তালায় ৩২ হাজার ২৩০ বেল, দেবহাটায় ৮৮০ বেল, কালিগঞ্জে ৯৯০ বেল ও আশাশুনিতে লক্ষ্যমাত্রা ১ হাজার ১০০ বেল।

দেশি পাটের পূর্ণাঙ্গ জীবন রহস্য আবিষ্কার, পাটপণ্যের দ্বিগুণ রপ্তানি বৃদ্ধি পণ্যের মোড়কে পাটের ব্যাগ বাধ্যতামূলকসহ ব্যবহারে বহুমাত্রিকতা এলেও প্রতিবছর সারাদেশে কমছে পাট চাষ। কমছে চাষের জমিও। উৎপাদন খরচের সঙ্গে বাজার মূল্যের অসমতার কারণে কৃষক নিরাশ। চাহিদা অনুযায়ী দাম না পেয়ে কৃষক বছরের পর বছর ঠকেই যাচ্ছেন। কিন্তু সাতক্ষীরাতে পাটের আবাদ বৃদ্ধি পেয়েছে। বাস্তবে পাটের আবাদ না বাড়লেও খাতা কলমে বেড়েছে সাতক্ষীরাতে পাটের আবাদ।

এ ব্যাপারে জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক কাজী আব্দুল মান্নান বলেন, সাতক্ষীরায় খুব ভাল মানের পাট উৎপাদন হয়। এ বছর বৃষ্টি কম হওয়ায় কিছু সমস্যা দেখা দিয়েছে। তবে, কৃষকদের করণীয় সম্পর্কে নিয়মিত পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। আশা করছি, আবাদ ও উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যাবে।

Facebook Comments
Please follow and like us: