লোকশান মাথায় নিয়ে সাতক্ষীরায় ১১ হাজার ৬৩৮ গলদা চিংড়ি ঘের প্রস্তুত *রেণু ও মৎস্য খাবারের দাম কমানোর দাবী চাষীদের

আবু সাইদ বিশ্বাস: সাতক্ষীরায় গলদা চিংড়ি চাষে ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়েছে চাষীরা। ইরি ধান উঠার সাথে সাথে ঘেরে ভেড়ি বাঁধ সংস্কার,কাদা তুলা,চুন ও সার প্রয়োগ সহ নানা মুখি কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে গলদা চাষীরা। এছাড়া পুকুর ও ডোবা গুলোতে গলদা ছাড়ার প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে। গত কয়েক দিনে বৃষ্টিপাতের পর চিংড়ি চাষীরা রেণু সংগ্রহ শুরু করেছে। প্রতি দিন সাতক্ষীরা জেলা শহরে বিপুল পরিমাণে গলদা রেণু কেনা বেচা হচ্ছে। ভাইরাসের আক্রান্ত থেকে মুক্তি পেতে চাষীরা জেলা মৎস্য বিভাগের কাছে প্রতিনিয়ত প্ররামর্শ নিয়ে চলেছে। গত কয়েক বছরে সাতক্ষীরায় গলদা চিংড়ির উৎপাদন বেড়েছে। কিন্তু দাম কম থাকায় হতাশ ঘের ব্যবসায়ীরা। রেণু ও খাদ্যের দাম কমানোর দাবী তাদের। আন্তজার্তিক বাজারের গলদার চাহিদা বাড়লে চাষীরা ন্যর্য মূল পাবে বলে আশাবাদী সংশ্লিষ্টরা।
মাছ চাষের জন্য দেশজুড়ে সুনাম সাতক্ষীরার। তাছাড়া সাতক্ষীরায় উৎপাদিত চিংড়ি বিদেশে রফতানি হওয়ায় এর কদর বেড়েছে। তবে বর্তমানে বিশ্ববাজারে সাতক্ষীরার মাছ রফতানি না হওয়ায় এর বিরূপ প্রভাব পড়েছে ঘের ব্যবসায়ীদের উপর।
এর পরও চলতি মৌসুমে জেলার ৭ টি উপজেলার ৯ হাজার ৩৯৮ হেক্টর জমিতে বাণিজ্যিকভাবে গলদা চিংড়ি চাষ করার উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে বলে সাতক্ষীরা জেলা মৎস্য অধিদপ্তর সূত্রে জানায়। এর মধ্যে সাতক্ষীরা সদর ৩ হাজার ৪১৩ হেক্টর, তালায় ৩ হাজার ৯৭৮ হেক্টর,কলারোয়াতে ৬৩১ হেক্টও, দেবহাটায় ৩৬৮ হেক্টর, আশাশুনিতে ৮২৫ হেক্টর, কালীগঞ্জ ৭২ হেক্টর ও শ্যামনগর উপজেলায় ১১১ হেক্টর জমিতে চিংড়ি চাষ করা হয়েছে।
জেলা মৎস্য অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ৯ হাজার ৩৯৮হেক্টর,২০১৫-১৬ অর্থবছরে ৯ হাজার ৩৮৮ হেক্টর,২০১৪-১৫ অর্থবছরে ৯ হাজার ৩৮৬ হেক্টর, ২০১৩-১৪ অর্থবছরে ৯ হাজার ১২০ হেক্টর, ২০১২-১৩ অর্থবছরে ১০ হাজার ১১২ হেক্টর, ২০১১-১২ অর্থবছরে ৭ হাজার ৬৬৪ হেক্টর ২০১০-১১ অর্থবছরে ৭ হাজার ২৬৮ হেক্টর, ২০০৯-১০অর্থবছরে ৭ হাজার ২৪১ হেক্টর ও ২০০৮-০৯ অর্থবছরে ৬ হাজার ৯৮৫ হেক্টর জমিতে বাগদা গলদা চিংড়ি চাষ করা হয়ে ছিল ।
জেলার বেশি গলদা চিংড়ি উৎপাদন হয়,সাতক্ষীরা সদর ও তালা উপজেলাতে। জেলাতে রেজিস্ট্রেশন প্রাপ্ত জেলের সংখ্যা ৪৯ হাজার ২৩ জন এবং মৎস্যচাষী ৭৬ হাজার ৩৯৪ জন।
সাতক্ষীরা জেলা মৎস্য অধিদপ্তর তথ্য মতে জেলাতে ১১ হাজার ৬৩৮ টি রেজিস্ট্রেশন প্রাপ্ত গলদা চিংড়ি ঘের রয়েছে। এর মধ্যে সদরে ৩ হাজার ১০৫ ৫৮টি , তালাতে ৬ হাজার ৪৫০ টি, কলারোয়াতে ৪৭৫টি, দেবহাটাতে ৫১৫ টি, কালিগঞ্জে ১২৫ টি, আশাশুনিতে ৮১০ টি এবং শ্যামনগরে ২০৫ টি গলদা চিংড়ি ঘের রয়েছে।
এসব বাগদা চিংড়ি ঘেরে চলতি বছরে উপাদনের লক্ষ্য মাত্রা ধরা হয়েছে ৬ হাজার ১০৬ মে.টন। এর মধ্যে সাতক্ষীরা সদরে ২২৫৩ মে.টন, তালাতে ২৬৮৬ মে.টন, কলারোয়াতে ৪৩৫ মে.টন, দেবহাটাতে ২০১ মে.টন, কালিগঞ্জে ৩৬ মে.টন, আশাশুনিতে ৪৪৫ মে.টন এবং শ্যামনগরে ৫০ মে.টন। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে উৎপাদন হয়েছিল ৬ হাজার ১০৬মে:টন। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ৬ হাজার ৩৪ মে:টন,২০১৪-১৫ অর্থবছরে ৫ হাজার ৮১৮মে:টন, ২০১৩-১৪ অর্থবছরে ৪ হাজার ৫২৭ মে:টন, ২০১২-১৩ অর্থবছরে ৪ হাজার ৬৮৬ মে:টন, ২০১১-১২ অর্থবছরে ৩ হাজার ৮৩২ মে:টন, ২০১০-১১ অর্থবছরে ৩ হাজার ১৯২ মে:টন, ২০০৯-১০অর্থবছরে ২ হাজার ৯৯৭ হক্টরমে:টন গলদা চিংড়ি উৎপাদন হয়েছিল।
সাতক্ষীরা জেলা মৎস্য অধিদপ্তর সূত্র মতে, জেলাতে ১০.৫০ কোটি পোনার চাহিদা রয়েছে। সরকারী হ্যাচারী রয়েছে মাত্র একটি। বেশির ভাগ পোনা জেলার বাইরে থেকে সরবরাহ করতে হয়।
চিংড়ি বিদেশে রফতানি না হওয়ায় এর মূল কারণ হিসেবে দুষছেন ব্যবসায়ীরা। তবে মৎস্য কর্মকর্তারা বলছেন. চাষিদের হতাশ হওয়ার কিছু নেই। দাম পূর্বের অবস্থায় ফিরবে।
সাতক্ষীরার বিনেরপোতা বাজারের মাছের আড়তদার রাম প্রসাদ সরকার জানান, মাছের বাজার খুব খারাপ। চিংড়ি দিক থেকে গত কয়েক বছর থেকে প্রতি কেজিতে ৪০০ থেকে ৬০০ টাকা কম। এ নিয়ে ব্যবসায়ীরা অনেক ক্ষতিগ্রস্ত।
বিদেশি বায়াররা মুখ ফিরিয়ে নেয়ায় এমন অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে উল্লেখ করে শহরের সুলতানপুর এলাকার ঘের ব্যবসায়ী ফয়সাল মোজাফফার রচি জানান, ইন্টারন্যাশনাল চাহিদা কম হওয়ার কারণে চিংড়ি রফতানি কমেছে। তাছাড়া কিছু অসাধু ব্যাবসায়ীর কারণে বর্তমানে বায়াররা মুখ ফিরিয়ে নেয়ায় এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। সরকারিভাবে তদারকি বাড়ানোর দাবি চাষীদের।
জেলা চিংড়ি চাষি সমিতির সভাপতি ডাক্তার আবুল কালাম বাবলা জানান, মিঠা পানিতে গলদা চাষে চাষীরা আগ্রহী হচ্ছে। বিশেষ করে সাতক্ষীরা সদর ও তালাতে বাগদার চাষ বাড়ছে। সরকারী সহযোগীতা ও তদারকি বৃদ্ধি পেলে এখান থেকে সরকার বিপুল পরিমাণে রাজস্ব আদায় করতে পারবে।
তবে হতাশ না হওয়ার কথা জানিয়ে জেলা মৎস্য কর্মকর্তা শহিদুল ইসলাম জানান, বর্তমানে অধিকাংশ ঘের এখন শুকানো হচ্ছে। তাই মাছের প্রাচার্র্য একটু বেশি। যেহেতু এটা পচনশীল দ্রব্য্য আর এখানে মাছ সংক্ষণের কোনো ব্যবস্থা নেই সেজন্য সাময়িকভাবে দাম কিছুটা কমেছে। এতে চাষিদের হতাশ হওয়ার কোনো কারণ নেই। এই দাম পর্যায়ক্রমে আবার ঠিক হয়ে যাবে। এছাড়া জেলাতে নতুন করে মিঠা পানিতে গলদা চিংড়ি চাষে চাষীরা ঝুকে পড়ছে। জেলা মৎস্য বিভাগের পক্ষ থেকে চাষীদের সার্বক্ষণিক তদারকি করা হচ্ছে।

Facebook Comments
Please follow and like us: