কারসাজিতে চড়া চিনির বাজার এক সপ্তাহের ব্যবধানে কেজিতে দাম বেড়েছে ৪-৬ টাকা

ক্রাইমবার্তা রিপোট :  পবিত্র রমজান ঘিরে সক্রিয় হয়ে উঠেছে অদৃশ্য চিনির সিন্ডিকেট। সরকারের তরফ থেকে পর্যাপ্ত মজুদ আছে বলা হলেও খুচরা বাজারে চিনির দাম বাড়ছে। গত এক সপ্তাহের ব্যবধানে কেজিপ্রতি দাম বেড়েছে ৪-৬ টাকা। এ দাম বৃদ্ধির সঠিক ব্যাখ্যা নেই কারও কাছে। উৎপাদক, পাইকারি ও খুচরা বিক্রেতারা- শুধু একে অন্যকে দোষারোপ করছেন। উৎপাদকরা বলছেন, সরবরাহে ঘাটতি নেই। পাইকারি বিক্রেতারা বলছেন, কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে মিল মালিকরা দাম বাড়াচ্ছেন। আর খুচরা বিক্রেতারা বলছেন, পাইকারি বাজারে দাম বেড়ে যাওয়ায় খুচরা বাজারে চিনির দাম বেড়েছে।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন সংস্থা বাংলাদেশ ট্যারিফ কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, চাহিদার চেয়ে অনেক বেশি চিনি আমদানি হয়েছে। দেশে এখন চিনির পর্যাপ্ত মজুদ আছে। আন্তর্জাতিক বাজারে চিনির দাম স্বাভাবিক রয়েছে। এখন বাজারে চিনির দাম বৃদ্ধির কারণ নেই।

অথচ রাজধানীর খুচরা বাজার ঘুরে দেখা গেছে, এক সপ্তাহের ব্যবধানে বাজারভেদে কেজিপ্রতি চিনির দাম বেড়েছে ৪-৬ টাকা। সাদা চিনি ৬০-৬২ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। গত সপ্তাহে এ চিনি বিক্রি হয়েছে ৫৬-৫৮ টাকায়। আর সরকারি সংস্থা ট্রেডিং কর্পোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) ট্রাকে চিনি বিক্রি হচ্ছে ৫৫ টাকায়। চিনি কর্পোরেশনের আখের চিনি বিক্রি হচ্ছে ৬০ টাকায়।

খুচরা ব্যবসায়ীরা বলছেন, হুট করে পাইকারি বাজারে প্রতি বস্তা চিনির (প্রতি বস্তা ৫০ কেজি) দাম ২০০ টাকা বেড়েছে। বেশি দাম দিয়ে চিনি আনতে হচ্ছে বিধায় বেশি দামে বিক্রি করছি। হঠাৎ করে রোজার আগে অন্য বছরের মতো এবারও পাইকারিতে দাম বাড়িয়ে দেয়ায় খুচরা বাজারে চিনির দাম বাড়ছে। খুচরা ব্যবসায়ীরা কেজিতে ২-৩ টাকার বেশি লাভ করেন না। তবে পাইকারি ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, মিল মালিকরা চিনির কৃত্রিম সংকট তৈরি করছেন। চাহিদা অনুযায়ী চিনি পাওয়া যাচ্ছে না। মিল গেটে ৭-১০ দিন ধরে ট্রাক বসে থেকেও চিনি পাচ্ছে না। আগে কেনা চিনির (ডিও) ট্রাকে চিনি না দিয়ে বাড়তি লাভের আশায় নগদে চিনি বিক্রি করছেন মিল মালিকরা। বাজারে ১০ ট্রাক চিনির চাহিদা থাকলেও আসছে মাত্র ২-৩ ট্রাক। এর ফলে বাজারে চিনির চাহিদায় ব্যাঘাত ঘটছে। আবার ট্রাক বসিয়ে রেখে পাইকারদের বাড়তি ভাড়া দিতে হচ্ছে। এ ভাড়াও চিনির দামের সঙ্গে যুক্ত করা হচ্ছে, বিধায় চিনির দাম বাড়ছে।

চিনির দাম বাড়ার পেছনে বাংলাদেশ চিনি ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি আলহাজ শের মোহাম্মদ দুষছেন মিল মালিকদের। তিনি বলেন, মিল মালিকরা চাহিদা অনুযায়ী চিনি ডেলিভারি দিচ্ছে না। বিশেষ সুবিধাভোগীদের কাছে বিক্রি করছে। এ নিয়ে প্রতিবারই কথা বলা হয়; কিন্তু কোনো লাভ হয় না। পাইকারি ব্যবসায়ীরা কেজিপ্রতি ৫০ পয়সা লাভে চিনি বিক্রি করেন। তিনি মনে করেন, চিনি শিল্প কর্পোরেশনের কাছে চিনি মজুদ আছে। ওই চিনি বাজারে ছাড়লে চিনির দাম কমবে।

সিটি গ্রুপ, মেঘনা গ্রুপ, আবদুল মোনেম গ্রুপ ও দেশবন্ধু গ্রুপ- এ ৪টি প্রতিষ্ঠান দেশের চিনির বাজায় নিয়ন্ত্রণ করে। পাইকারি ব্যবসায়ীদের কৃত্রিম সংকটের অভিযোগ অস্বীকার করে সিটি গ্রুপের ব্যবস্থাপক বিশ্বজিৎ সাহা বলেন, এবার চিনির ঘাটতি নেই। পর্যাপ্ত সরবরাহ আছে; ৫০ টাকা দরে প্রতিদিন মিল থেকে ৩ হাজার ৮০০ টন চিনি সরবরাহ করা হচ্ছে। চাহিদা বাড়লে সরবরাহ বাড়ানো হবে।

এদিকে চিনি-পেঁয়াজের দাম বৃদ্ধির পেছনে অসাধু সিন্ডিকেট দায়ী উল্লেখ করে বৃহস্পতিবার ডিআরইউতে এক সংবাদ সম্মেলনে কনজ্যুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি গোলাম রহমান বলেন, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও ব্যবসায়ীসহ সংশ্লিষ্টরা সবাই বলছেন মজুদ পর্যাপ্ত। দাম বাড়ার সম্ভাবনা নেই। তাহলে হঠাৎ করে চিনি-পেঁয়াজের দাম কেন বাড়ছে। এর মূল কারণ সিন্ডিকেট। কিছু অসাধু ব্যবসায়ী কৃত্রিম সংকট তৈরি করে বাজারকে অস্থির করছে। অন্যদিকে যানজট, জাহাজজট, চাঁদাবাজিসহ নানা অব্যবস্থাপনার কারণে এসব পণ্যের দাম বাড়ছে। সরকারের উচিত বাজার মনিটনিং করা। একইসঙ্গে যারা অনৈতিকভাবে দাম বাড়াচ্ছে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া।

যদিও চিনির বাজারের অস্থিরতা মোকাবেলায় মাঠে নেমেছে চিনি ও খাদ্য শিল্প কর্পোরেশন। রাষ্ট্রায়ত্ত এ প্রতিষ্ঠানটি ২৫টি স্পটে ৬০ টাকা দরে আখের চিনি বিক্রি শুরু করেছে। আর টিসিবি ট্রাকে করে ৫৫ টাকায় চিনি বিক্রি করছে।

চিনি ও খাদ্য শিল্প কর্পোরেশনের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান একেএম দেলোয়ার হোসেন বলেন, সরকারি গুদামে ৯০ হাজার টন চিনি মজুদ আছে। গত ২ রমজানে ৬০ টাকায় চিনি বিক্রি হয়েছে, এবারও ওই দামে বিক্রি হবে। ইতিমধ্যেই ১৫টি ট্রাক রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ স্পটে চিনি বিক্রি করছে। আরও ১০টি ট্রাক ভাড়া করা হয়েছে। এগুলো চিনি সরবরাহে দেয়া হবে।

Please follow and like us:
Facebook Comments