ভোট ডাকাতি, জাল ভোট ও সন্ত্রাস-অনিয়মের অভিযোগে খুলনার ফল প্রত্যাখ্যান: সিইসির পদত্যাগ দাবি বিএনপির: # জামায়াতেরও ফলবয়কট

ক্রাইমবার্তা রিপোট :  ভোট ডাকাতি, জাল ভোট ও সন্ত্রাস-অনিয়মের অভিযোগে খুলনা সিটি করপোরেশন নির্বাচনের ফলাফল প্রত্যাখ্যান করেছে বিএনপি। সেই সাথে সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানে ব্যর্থতার জন্য সিইসির পদত্যাগ চেয়েছে দলটি।
এছাড়া কারাবন্দি দলের চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার কিছু হলে সরকার রেহাই পাবে না বলে হুঁশিয়ার করা হয়েছে।
আজ বুধবার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে রাজধানীর নয়া পল্টনস্থ দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে এ কথা জানান দলটির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী।

# আবারো প্রমাণিত হলো এই সরকার ও ইসির অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়
স্টাফ রিপোর্টার : খুলনা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে বাহ্যিক পরিবেশ অনেকটাই শান্তিপূর্ণ ছিল। কিন্তু এ নির্বাচনে নীরব জালিয়াতির মহোৎসব ঘটেছে। বিএনপির প্রার্থী ও এজেন্টদের গণগ্রেফতার, হয়রানি, হুমকি ধমকি ছিল অব্যাহত। আর গতকাল ভোটের দিন বিএনপির প্রার্থীর এজেন্টদের কেন্দ্রে ঢুকতে না দিয়ে জাল ভোটের মহোৎসবের মাধ্যমে সরকারদলীয় প্রার্থীকে বিপুল ভোটে বিজয় দেখানো হয়েছে। জাল ভোটের কারণে কেন্দ্রে ব্যালট ফুরিয়ে গেছে। ভোটাররা ব্যালট পেপার পায়নি। বাবার সাথে গিয়ে দ্বিতীয় শ্রেণীর শিশুও নৌকা মার্কায় ভোট দিয়েছে। এ নির্বাচনকে নির্বাচন কমিশন চমৎকার ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। তবে জাতীয় পরিচয়পত্র না থাকায় কয়েকজন এজেন্টকে কেন্দ্রে ঢুকতে না দেয়ার বিষয়টি স্বীকার করেছে নির্বাচন কমিশন। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, খুলনা সিটি নির্বাচনে বর্তমান সরকারের অধীনে অতীতের জালিয়াতির ভোটেরই পুনরাবৃত্তি ঘটেছে। শুধু কেন্দ্রের বাইরে শান্তিপূর্ণ পরিবেশের কিছুটা উন্নতি হয়েছে। আর এ জন্য ভোটের আগের দিনগুলোতে বিরোধী প্রার্থীর নেতাকর্মীদের গ্রেফতার ও হুমকি ধমকির কৌশল অবলম্বন করেছে। এসব অভিযোগ আগে থেকে আসলে নির্বাচন কমিশন নীরব ভূমিকা পালন করেছে। খুলনা সিটির আইন-শৃংখলা বাহিনীকে নিয়ন্ত্রণে নিয়ে সুষ্ঠু নির্বাচনে ইসির সক্ষমতা নিয়ে বিএনপি যে প্রশ্ন তুলেছিল তা গতকালের নির্বাচনে প্রমাণিত হয়েছে। বর্তমান সরকারের অধীনে এ পর্যন্ত যত নির্বাচন হয়েছে কোনটিই সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হয়নি। বর্তমান নির্বাচন কমিশনের অধীনে অনুষ্ঠিত খুলনা সিটির নির্বাচনেও সেই পুরনো চিত্রই ফুটে উঠেছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বর্তমান সরকার ও এই ইসির অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়, এটা আবারো প্রমাণিত হয়েছে।
গতকাল মঙ্গলবার নির্বাচনী মাঠ থেকে প্রতিবেদকদের পাঠানো প্রতিবেদনে জানা গেছে, নির্বাচনের আগেই বিএনপির বিভিন্ন এজেন্ট ও প্রার্থীদের হুমকি ধমকি দেয়া হয়েছে। এ জন্য এজেন্টরা প্রাণভয়ে কেন্দ্রে যায়নি। এমন কী অনেকে বাসা বাড়ি ছেড়েও পালিয়ে গেছে। আবার অনেক কেন্দ্রে বিএনপির এজেন্টদের ঢুকতে দেয়া হয়নি। বিভিন্ন কেন্দ্র থেকে বিএনপির এজেন্টদের জোরপূর্বক ভয়ভীতি দেখিয়ে বের করে দেয়া হয়েছে। আর এ সুযোগে জাল ভোটের মহোৎসব করেছে ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীরা। সকাল থেকে এ ধরনের ঘটনা ঘটতে থাকায় বেলা ১২টার দিকে এক কেন্দ্রে গিয়ে ভোটাররা ভোট দেয়ার জন্য ব্যালট পেপার পায়নি। ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীরা তাদের প্রার্থী বিজয়ী হচ্ছে তা নিশ্চিত হয়েই অভিনন্দন জানানোর জন্য আগে থেকেই পোস্টার ব্যানার ছাপিয়েছে। নির্বাচনে সেনাবাহিনী মোতায়েনের দাবি জানিয়েছিল বিএনপি। কিন্তু নির্বাচন কমিশন সেখানে সেনা মোতায়েন করেনি। এ জন্যই জালিয়াতি ও কারচুপির সুযোগ পেয়েছে। বিএনপির পক্ষ থেকে খুলনা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে পুলিশের গণগ্রেফতার ও হয়রানি বন্ধ করার জন্য ইসির কাছে বার বার দাবি জানিয়েছিল। এ জন্য খুলনা পুলিশ কমিশনারকে প্রত্যাহারের দাবিও জানিয়েছিল। কিন্তু ইসি তা আমলে নেয়নি। অবশেষে হাইকোর্টে রিট করার পর ভোটের আগের দিন অন্যায় গ্রেফতারের বিরুদ্ধে রুল জারি করা হয়েছিল।
বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, বর্তমান সরকারের অধীনে অতীতে বেশকিছু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। উপজেলা ও সিটি কপোরেশনসহ স্থানীয় সকল নির্বাচনেই একই চিত্র দেখা গেছে। অতীতের নির্বাচন কমিশন চেষ্টা করেও কারচুপি ঠেকাতে পারেনি। আর বর্তমান কমিশনের পদক্ষেপে তারা আরো সুযোগ পেয়েছে।
মাঠ থেকে পাঠানো প্রতিবেদকদের প্রতিবেদনে জানা গেছে, নির্বাচনে বিভিন্ন কেন্দ্রে বিএনপির মেয়র প্রার্থীর এজেন্টদের বের করে দেয়া, হুমকি-ধামকি ও ক্যাম্প ভাঙচুরের অভিযোগ পাওয়া গেছে। স্থগিত হওয়া ভোট কেন্দ্র দুটি হলো- ২০২ নং ইকবাল নগর সরকারি মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয় ভোট কেন্দ্রের একটি বুথ এবং খুলনা মহানগরীর ৩১নং ওয়ার্ড কাউন্সিলরের কার্যালয় ভোট কেন্দ্র।
জেলা নির্বাচন অফিসার আনিসুর রহমান জানান, ২০২নং ইকবাল নগর সরকারি মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয় ভোট কেন্দ্রের ৭০৭নং বুথে যুবলীগ, ছাত্রলীগসহ ক্ষমতাসীন দলের ৫০-৬০ জন লোক প্রিজাইডিং অফিসার খলিলুর রহমানের কাছ থেকে ব্যালট পেপার ছিনতাই করে প্রকাশ্যে ব্যালটে সিল মারার অভিযোগে সেই কেন্দ্রের ভোটগ্রহণ স্থগিত করা হয়েছে।
এ ছাড়াও খুলনা মহানগরীর ৩১নং ওয়ার্ড কাউন্সিলরের কার্যালয় ভোট কেন্দ্রের প্রিজাইডিং অফিসার মোহাম্মদ আমির হোসেন জানান, দুপুর ১২টার দিকে ৮-১০ জনের একদল দুষ্কৃতিকারী কেন্দ্রে প্রবেশ করে ব্যালট পেপার ছিনতাই করে কাউন্সিলর প্রার্থী মহানগর ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক এস এম আসাদুজ্জামান রাসেলের পক্ষে ঝুড়ি মার্কায় সিল মারে। এ ঘটনায় ভোট গ্রহণ তাৎক্ষণিক স্থগিত করা হয়। পরে দুপুর ২টা ১৫ মিনিটে ভোট কেন্দ্রে ভোট গ্রহণ পুরোপুরি স্থগিত করা হয়।
এদিকে ২২নং ওয়ার্ডের বিএনপিসমর্থিত কাউন্সিলর প্রার্থী মাহবুব কায়সারের এজেন্ট আলী আকবরকে মারধর করার অভিযোগ পাওয়া গেছে। মাহবুব কায়সার ২২নং ওয়ার্ডের বর্তমান কাউন্সিলর।
৩০নং ওয়ার্ডের রূপসা স্কুল কেন্দ্রে ধানের শীষের এজেন্ট সেলিম কাজীকে মারধর করা হয়। এ ছাড়া নগরীর বেশ কয়েকটি কেন্দ্রে ধানের শীষের এজেন্টদের ঢুকতে দেয়া হয়নি। ভাঙচুর করা হয়েছে ৩১নং ওয়ার্ডের হাজী আব্দুল মালেক ইসলামিয়া দাখিল মাদরাসার সামনের নির্বাচনী ক্যাম্পও।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, গতকাল মঙ্গলবার সকাল ৭টা ৪৫ মিনিটে মহানগরীর জিলা স্কুল কেন্দ্রে আলী আকবরকে মারধর করে আওয়ামী লীগ সমর্থিত কাউন্সিলর প্রার্থী আবুল কালাম আজাদ বিকুর সমর্থকরা। পরে তাকে উদ্ধার করে খুলনা সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
কাউন্সিলর প্রার্থী মাহমুব কায়সার বলেন, আমার এজেন্ট আলী আকবর সকাল ৭টা ৪৫ মিনিটে জিলা স্কুল কেন্দ্রে ঢুকতে গেলে আওয়ামী লীগ সমর্থিত কাউন্সিলর প্রার্থী আবুল কালাম আজাদ বিকুর লোকজন তাকে মারধর করে। কেন্দ্রে ঢুকতে দেয়নি। তাকে উদ্ধার করে খুলনা সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখান থেকে আলী আকবরকে অপহরণ করা হয়েছে বলে আশঙ্কা করছেন তিনি।
খুলনা সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হুমায়ুন কবীর বলেন, বিষয়টি আমি শুনেছি। বিষয়টি দেখছি।
অপরদিকে ২২নং ওয়ার্ডে আওয়ামী লীগ সমর্থিত কাউন্সিলর প্রার্থী আবুল কালাম আজাদ বিকুর ছোট ভাই কাজী বেলায়েত হোসেন নতুন বাজার হাজী আবু হানিফ কেরাতুল কোরআন নূরানী মাদরাসা কেন্দ্রে ধানের শীষের কোনো এজেন্ট ঢুকতে দেননি। খুলনা জিলা স্কুল কেন্দ্রের আটটি বুথেও ক্ষমতাসীন দলের লোকজন ধানের শীষের কোনো এজেন্টকে ঢুকতে দেয়নি। তবে এ কেন্দ্রের ৬নং বুথে ধানের শীষের এজেন্ট সিরাজুল ইসলাম লিটন মেয়র প্রার্থী নজরুল ইসলাম মঞ্জুর উপস্থিতিতে সকাল ১০টায় কেন্দ্রে ঢুকতে সক্ষম হন।
লিটন অভিযোগ করেন, তিনি সকাল সাড়ে ৭টায় কেন্দ্রে ঢোকার চেষ্টা করলে ক্ষমতাসীন দলের লোকজন তাকে বাধা দেয়। এ কারণে তিনি ঢুকতে পারেননি।
খালিশপুর ১১নং ওয়ার্ডের জামিয়াহ ত্বৈয়্যেবাহ নূরানী তালিমুল কোরআন মাদরাসা কেন্দ্র থেকে সহোদর সিরাজকে কুপিয়ে আহত এবং আলমকে মারধর করা হয়। তাদের খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। এ ছাড়া এ ওয়ার্ডে জামিয়া ইসলামিয়া আশরাফুল উলুম বয়স্ক মাদরাসা কেন্দ্র থেকে স্বতন্ত্র কাউন্সিলর প্রার্থী জামান মোল্লা জেলিনের এজেন্ট আসাদ ও হাবিবকে সকালেই কেন্দ্র থেকে বের করে দেয়া হয়।
রূপসা বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রের প্রিজাইডিং অফিসার ইবনুর রহমান জানান, দুপুর ১২টার দিকে ছাত্রলীগ পরিচয়ে ২০-২৫ জন যুবক কেন্দ্রে প্রবেশ করে দখলের চেষ্টা করে। তারা কেন্দ্রের ২ থেকে ৫নং বুথে ব্যালট পেপার ছিনতাই করে ব্যালট বাক্সে ঢোকানোর চেষ্টা করে।
এ ঘটনায় প্রিজাইডিং অফিসার তাৎক্ষণিক র‌্যাব, বিজিবি ও ম্যাজিস্ট্রেটকে খবর দেন। তারা আসলে যুবকরা পালিয়ে যায়।
ইবনুর রহমান জানান, এ ঘটনায় এক ঘণ্টা ভোটগ্রহণ স্থগিত ছিল। পরে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে ভোটগ্রহণ পুনরায় শুরু হয়।
নগরীর ২৫ নম্বর ওয়ার্ডের নুরানি বহুমুখী মাদ্রাসা কেন্দ্রে অনেক জাল ভোট পড়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। সেখানে স্থানীয় নৌকা–সমর্থিত প্রভাবশালী ব্যক্তি নির্বাচন কমিশনের পর্যবেক্ষণ দলের এক সদস্যকে অপদস্থ করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
কেন্দ্রটিতে দুপুর ১২টার দিকে সরেজমিনে দেখা যায়, এক ব্যক্তি তাঁর দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়ুয়া ছেলেকে নিয়ে ভোটকেন্দ্র থেকে বের হচ্ছেন। বাবা-ছেলের দুজনের হাতের আঙুলে ভোট দেওয়ার সময় লাগানো অমোচনীয় কালি দেখে এই প্রতিবেদক তাঁদের অনুসরণ করেন। একপর্যায়ে ভোট দেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে ওই ব্যক্তি বলেন, ‘আমার ছেলেও ভোট দিয়েছে।’
দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়ুয়া ছেলেটি বলে, ‘নৌকায় ভোট দিয়েছি। টিপু আঙ্কেলকে ভোট দিয়েছি (আওয়ামী লীগের স্থানীয় ওয়ার্ড কাউন্সিলর প্রার্থী আলী আকবর টিপু, প্রতীক ঠেলাগাড়ি)।
দুপুর ১২টার পর নগরের ১১ নম্বর ওয়ার্ডে প্লাটিনাম উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে গিয়ে আওয়ামী লীগের মনোনীত ওয়ার্ড কাউন্সিলর প্রার্থী আবদুল ওয়াদুদের সঙ্গে বিদ্রোহী দুই প্রার্থীর মধ্যে হাঙ্গামা দেখা যায়। একপর্যায়ে সিবিএ সভাপতি কাওসার আলী মৃধাকে পুলিশ মারধর করে। এ ঘটনায় কিছু সময় ওই কেন্দ্রে ভোট বন্ধ থাকে। বেলা একটার পর আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী তালুকদার আবদুল খালেক সেখানে যান। তিনি ওই কেন্দ্র পরিদর্শন করেন এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলেন।
তালুকদার আবদুল খালেক কেন্দ্র থেকে বেরিয়ে আসার পরপরই প্লাটিনাম উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয়ের দক্ষিণ অংশে কর্তব্যরত প্রিসাইডিং কর্মকর্তা শেখ আবু মো. মুশফেকুল মোর্শেদের উপস্থিতিতে দুটি বুথে আট-দশ জন নৌকা–সমর্থিত কর্মীকে জাল ভোট দিতে দেখা যায়। কয়েকজন সাংবাদিক জানালা দিয়ে এ দৃশ্য দেখলে ওই প্রিসাইডিং কর্মকর্তা সাংবাদিকদের সরিয়ে দিয়ে বলেন, ‘আমাদের কিছু রেসট্রিকশন আছে।’
কেন্দ্রটির অধিকাংশ বুথেই ধানের শীষের পোলিং এজেন্ট ছিল না। আওয়ামী লীগ–সমর্থিত কর্মীরা বেলা সোয়া একটার দিকে প্লাটিনাম উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয়ের উত্তর অংশ থেকে ধানের শীষের পোলিং এজেন্ট শিল্পী নামের এক নারীকে হুমকি-ধমকি দিয়ে তাড়িয়ে দেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
এ বিষয়ে প্রিসাইডিং কর্মকর্তা সুমন সরকার বলেন, ‘আমি শুনেছি পোলিং এজেন্ট চলে গেছেন।’
বেলা দুইটার দিকে খুলনা পিটিআই কেন্দ্রে সরেজমিনে দেখা যায়, সাদিয়া পারভীন নামের একজন ভোটার ভোট দিতে গিয়ে তিনি ভোট দিতে পারেননি। তিনি নগরীর ২৭ নম্বর ওয়ার্ডের পূর্ব বানিয়া খামার এলাকার বাসিন্দা। তাঁর ভোট দেওয়ার কথা ছিল, খুলনা পিটিআই কেন্দ্রের পরীক্ষণ ভবনে।
সাদিয়া পারভীন বলেন, ‘আমি ভোট দিতে গেলে ওনারা বলেন, “ভোট হয়ে গেছে। অন্যখানে যান।”’
এ ধরনের নির্বাচনকেও ‘চমৎকার’ ও ‘সুন্দর’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। তিনটি কেন্দ্রে অনিয়ম-জালভোট ছাড়া বাকি ২৮৬টি কেন্দ্রে শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর পরিবেশে ভোট হয়েছে বলে জানিয়েছেন নির্বাচন কমিশন সচিব হেলালুদ্দীন আহমদ।
তিনি বলেন, শুরু থেকেই বিএনপি এই ভোটে নানা কারচুপির অভিযোগ করে আসছে। ভোট ডাকাতি হচ্ছে বলেও দলটির পক্ষ থেকে কয়েক দফা অভিযোগ করা হয়েছে। চারটি কেন্দ্রে জালভোটের প্রমাণ পেয়ে ইসি ভোটগ্রহণ বন্ধ করে দেয়।
ইসি সচিব বলেন, ‘শান্তিপূর্ণ নির্বাচন হয়েছে। আমরা ভোট পরিস্থিতি নানাভাবে পর্যবেক্ষণ করেছি। চমৎকার ও সুন্দর এবং উৎসবমুখর পরিবেশে খুলনায় নির্বাচন হয়েছে।’
বিএনপির অভিযোগ পেয়ে ইসি কর্মকর্তাদের মাধ্যমে মাঠ পর্যায়ে খতিয়ে দেখা হয়েছে বলে জানান হেলালুদ্দীন।
জাতীয় নির্বাচনের আগে খুলনার এমন ভোট জনমনে আস্থা কিংবা শঙ্কা বাড়বে কি না জানতে চাইলে ইসি সচিব বলেন, ‘এই মুহূর্তে এ নিয়ে মন্তব্য করবো না। সবার নজর খুলনার দিকে। এটা একটা স্থানীয় নির্বাচন। তাতে যতটুকু হয়েছে তাতে নির্বাচন কমিশন সন্তুষ্ট। বেশ কয়েকটি কেন্দ্রে জালভোট, ভাঙচুর ও নানা অভিযোগ থাকলেও স্থগিত তিন কেন্দ্র ছাড়া অন্য কেন্দ্রে তা হয় নি বলে দাবি করেন তিনি।
এদিকে নির্বাচন কমিশনার শাহাদাত হোসেন চৌধুরী পোলিং এজেন্টদের ঢুকতে না দেয়ার অভিযোগ সর্ম্পকে বলেন, যে পোলিং এজেন্টদের ঢুকতে দেওয়া হয়নি, তারা পরিচয়পত্র দেখাতে পারেনি বলে তাদের ঢুকতে দেওয়া হয়নি। আর বের করে দেওয়া হয়েছে এমন সুনির্দিষ্ট অভিযোগ আমাদের কাছে নেই।’
শাহাদাত হোসেন চৌধুরী আরো বলেন, ‘বিএনপির অভিযোগ সুনির্দিষ্ট নয়। এজেন্টদের বের করে দেওয়া হয়েছে- এমন তথ্য আমাদের কাছে নেই। আর যাদের ঢুকতে দেওয়া হয়নি তারা তাদের পরিচয়পপত্র দেখাতে পারেনি। তারা এজেন্ট কি না সেটাও দেখার বিষয়। পরিচয়পত্র না থাকলে কাউকেই ঢুকতে দেওয়া হয় না।’ দুই একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছাড়া সুষ্ঠুভাবে ভোট গ্রহণ হয়েছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
শাহাদাত হোসেন চৌধুরী বলেন, ‘একটি কেন্দ্র বন্ধ হয়েছে। এটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা। ইসির মনিটরিং সেল থেকে জানা যায়, ২২২ নম্বর কেন্দ্রে ভোটগ্রহণ বন্ধ রয়েছে।’
এদিকে, এক সংবাদ সম্মেলনে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী অভিযোগ তুলেছেন যে, মাত্র একটি কেন্দ্র থেকে নয়, ৪০টি কেন্দ্র থেকে বিএনপি প্রার্থীদের এজেন্টদের বের করে দেওয়া হয়েছে। অনেক কেন্দ্রে এজেন্টদের ঢুকতে দেওয়া হচ্ছে না বলেও তিনি অভিযোগ করেন।
রিজভী বলেন, ‘খুলনা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ২৮৯টি ভোটকেন্দ্রের মধ্যে ৪০টি কেন্দ্র থেকে বিএনপি প্রার্থীর এজেন্টদের বের করে দিয়েছে সরকারদলীয় প্রার্থীর সমর্থকরা। এসব কেন্দ্রে ভোটারদেরও ভোট দিতে দেওয়া হচ্ছে না। বিভিন্ন কেন্দ্রে বিএনপির পোলিং এজেন্টদের বের করে দিয়ে এসব কেন্দ্রে সরকারদলীয় প্রার্থীর সমর্থকরা জাল ভোট দিচ্ছে।’
তবে খুলনায় নির্বাচন সুষ্ঠু হচ্ছে বলেই দাবি করেছেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। তিনি বলেছেন, ‘খুলনায় সুষ্ঠু ভোট হচ্ছে বলেই খবর পাচ্ছি। এখানে জয়ের ব্যাপারে আমরা আশাবাদী। ফলাফল যা-ই হোক না কেন, আওয়ামী লীগ তা মেনে নেবে। আমি বিএনপিকেও একই আহ্বান জানাব।

 

–0——

বর্তমান সরকার ও আজ্ঞাবহ পুতুল নির্বাচন কমিশনের অধীনে কোনো নির্বাচনই অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষভাবে করা সম্ভব নয় -ডা. শফিকুর রহমান

খুলনা সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচনে ব্যাপক সন্ত্রাস, পোলিং এজেন্টদের ভোট কেন্দ্র থেকে জোরপূর্বক বের করে দেয়া, ব্যাপক জাল ভোট প্রদান, কেন্দ্র দখল, ভোট গ্রহণকারী কর্মকর্তা ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সামনে প্রকাশ্যে সরকারি দলের প্রতীকে সিল মারার মহোৎসব, ভোটারদের ভয়-ভীতি প্রদর্শনসহ নানা অনিয়ম ও বিশৃঙ্খলার মধ্য দিয়ে পরিকল্পিতভাবে নির্বাচনের নামে প্রহসন করার ঘটনার নিন্দা জানিয়ে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল ডা. শফিকুর রহমান বলেন, খুলনা সিটি কর্পোরেশনের প্রহসনমূলক সাজানো নির্বাচনের ঘটনার দ্বারা আবারও প্রমাণিত হল যে, বর্তমান সরকার এবং তার আজ্ঞাবহ পুতুল নির্বাচন কমিশনের অধীনে জাতীয় নির্বাচনসহ কোনো নির্বাচনই অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষভাবে অনুষ্ঠিত করা সম্ভব নয়। খুলনা সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচনে ব্যাপক সন্ত্রাস, পোলিং এজেন্টদের ভোট কেন্দ্র থেকে জোর করে বের করে দেয়া, জাল ভোট প্রদান, কেন্দ্র দখল, ভোট গ্রহণকারী কর্মকর্তা এবং আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সামনে প্রকাশ্যে সরকারি দলের প্রতীকে সিল মারা, ভোটারদের ভয়-ভীতি প্রদর্শনসহ নানা অনিয়ম ও বিশৃঙ্খলার ঘটনায় তিনি গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন।

গতকাল মঙ্গলবার দেয়া বিবৃতিতে তিনি বলেন, বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা গিয়েছে যে, খুলনা সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচনে ২৮৯টি ভোট কেন্দ্রের মধ্যে শতকরা ৮০ ভাগ ভোট কেন্দ্র থেকেই বিরোধী দলের প্রার্থীর এজেন্টদের বের করে দেয়া হয়েছে। খুলনা জেলা স্কুল কেন্দ্রের একাডেমিক ভবন-১ ও ২ সহ বিভিন্ন ভোট কেন্দ্রে বিরোধী দলের পোলিং এজেন্টদের ঢুকতেই দেয়া হয়নি। তাদেরকে ভোট কেন্দ্রের বাইরে থেকে আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসীরা ভোট কেন্দ্রে ঢুকতে বাধা দিয়েছে। বহু এলাকায় ১৪ মে দিবাগত রাতে আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসীরা ভোটারদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে তাদের ভোট কেন্দ্রে না যাওয়ার হুমকি দিয়েছে।
তিনি বলেন, খুলনা সিটি কর্পোরেশনের ৩০ নাম্বার ওয়ার্ডের রূপসা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভোট কেন্দ্রে বিরোধী দলের প্রার্থীর পোলিং এজেন্ট সেলিম কাজীকে আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসীরা পিটিয়ে আহত করেছে। অনেক ভোট কেন্দ্রে বিরোধী দলের নির্বাচনী ক্যাম্প ভাংচুর করা হয়েছে। অনেক ভোট কেন্দ্রেই নির্বাচনী কর্মকর্তা ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সামনে প্রকাশ্যে সরকারি দলের প্রতীকে সিল মারা হয়েছে। কোন কোন ভোট কেন্দ্রে দেখা গিয়েছে যে, ভোটাররা ভোট প্রদান করার পূর্বেই তাদের ভোট আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসীরা দিয়ে ফেলেছে এবং ভোটারদের বলেছে, ‘আপনারা কষ্ট করে ভোট কেন্দ্রে এলেন কেন?’
তিনি আরো বলেন, কোন কোন ভোট কেন্দ্র থেকে ভোটার নারী-পুরুষকে ধাক্কা মেরে ধমক দিয়ে বের করে দেয়া হয়েছে। রূপসা সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভোট কেন্দ্র থেকে বিরোধী দলের এজেন্টদের বের করে দিয়ে সকাল ১০টার মধ্যে সরকারী দলের প্রতীকে সিল মেরে বাক্স ভর্তি করে দেয়া হয়েছে। সেখানে সাংবাদিকগণ গেলে পুলিশ বলেছে যে, ‘সিল মারতে এত সময় লাগে নাকি।’ পুলিশের সামনেই একজন যুবক বলে যে, ‘টার্গেট ১২শ’ ভোট, আধা ঘণ্টা তো লাগবেই।’ একজন প্রত্যক্ষদর্শী জানিয়েছে যে, একটা ভোট কেন্দ্রে সকাল ১০টার মধ্যেই তিনশত ভোট কাস্ট হয়ে গিয়েছে। বেলা ২টা পর্যন্ত এত বিশৃঙ্খলার পরেও মাত্র তিনটি কেন্দ্রে গোলযোগের কারণে ভোট গ্রহণ স্থগিত রাখার খবর পাওয়া গিয়েছে। সরকারি প্রশাসন ও নির্বাচনী কর্মকর্তাদের সহযোগিতায় খুলনা সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচনে প্রায় শতকরা ৮০ ভাগ ভোট কেন্দ্রই আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসীরা দখল করে সরকারি দলের প্রতীকে সিল মারার মহোৎসব করেছে।
উপরোল্লিখিত ঘটনা থেকেই বুঝা যাচ্ছে যে, খুলনা সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হয়নি। এই নির্বাচন বাতিল করে পুনরায় অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষভাবে নির্বাচন অনুষ্ঠিত করার জন্য তিনি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানান।

Please follow and like us:
Facebook Comments