ইবাদাত বন্দেগীর মধ্য দিয়ে অতিবাহিত হচ্ছে পবিত্র মাহে রমযানের চতুর্থ দিন

ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের অন্যতম হলো রোযা। মানুষের আতিœক উন্নতি সাধনের জন্য আল্লাহ রোযা ফরজ করেছেন। এ রোযার মাধমে মানুষ তাকওয়ার প্রশিক্ষণ গ্রহণ করবে। রমযান মাসে তাই তাকওয়া অর্জনের সুন্দর পরিবেশ তৈরি হয়। এ মাসে প্রত্যেক সৎকর্মের ফলাফলও অনেক বেশি। আর রোযাদার বান্দাহ আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয়। রোযাদারের মুখের গন্ধ আল্লাহর কাছে মেশকের গন্ধের চেয়েও প্রিয়। এ সম্পর্কে সিহাহ সিত্তার অন্যতম গ্রন্থ ইবনে মাজা’তে  হযরত আবু হুরায়রা (রাঃ) বর্ণনা করেছেন, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এরশাদ করেছেন, “বনী আদমের প্রতিটি নেক আমলের সওয়াব দশগুণ হতে সাতশত গুণ পর্যন্ত বর্ধিত করা হয়। আল্লাহ তায়ালা বলেন, বান্দা একমাত্র আমার সন্তুষ্টির জন্যই রোযা রাখে, তাই আমি নিজেই এর পুরস্কার দিবো। বান্দাহ একমাত্র আমার সন্তুষ্টির অনে¦ষায় কাম-ভাব পূরণ ও খাওয়া-দাওয়া পরিহার করে। রোযাদারের জন্য দুটি আনন্দ রয়েছে, একটি আনন্দ হলো ইফতারের সময়, দ্বিতীয় আনন্দ হলো তার প্রভুর সাথে সাক্ষাতের সময়। রোযাদারের মুখের গন্ধ আল্লাহ তায়ালার নিকট মিশক আম্বরের চেয়ে অতীব উৎকৃষ্ট।”
রাসূলে মাকবুল (সাঃ) বলেছেন, রমযানকে তাওরাতে ‘হাত্ব’ অর্থাৎ পাপ মোচনকারী বলা হয়েছে। আর বাইবেলে  একে বলা হয়েছে ‘ত্বাব’ অর্থাৎ পবিত্রকারী। এ মাসে সিয়াম পালনকারী পাপমুক্ত ও পবিত্র হয়ে যায় বলে ‘হাত্ব’ ও ‘ত্বাব’ বলা হয়। আর সিয়াম সাধনার মাধ্যমেই আল্লাহর সাথে বান্দার নৈকট্য লাভের সুযোগ লাভ হয় বলে ‘যবুর’ -এ রমযান কে ‘কুররাত’ বা নৈকট্য বলা হয়েছে। আল কুরআনে একে বলা হয়েছে ‘রমাদান’। এটি ‘রমদ’ শব্দ মূল থেকে নির্গত। এর এক অর্থ দগ্ধ করা। কৃচ্ছ্রতার দহনে মুমিনের দেহমন পবিত্র হয় বলে এ নাম দেয়া হয়েছে। এর আরেকটি অর্থ ‘রহমত’। হেমন্তকালের প্রথমে যে বৃষ্টি হয়, তাতে ফসল ফলনের বিশেষ রহমত থাকে। তাই আরবগণ সিয়ামের এ মাসকে রহমতের মাস বা রমাদান বলে।
সিয়াম আবার পবিত্র ওষুধ। আধ্যাত্মিক সাধনায় উন্নতির জন্য এ যাবত এমন সাধক পাওয়া যায়নি, যিনি সিয়াম-সাধনার সাহায্য গ্রহণ করেননি। আল্লামা ইকবাল বলেছেন, ‘সিয়াম-সাধনায় আধ্যাতিœক পথের আলো দেখা যায়। তিনি এক নাগাড়ে ষাট দিন পর্যন্ত সিয়াম পালন করে সাধনায় নিয়োজিত থাকতেন এবং এ সময় রাতে কেবল একবার মাত্র সামান্য আহার্য বা দুধ খেতেন। দুনিয়ার বড় বড় সাধকের জীবনী এ ধরনের বহু ঘটনাপূর্ণ।
ইসলামের পাঁচটি মূল ভিত্তির দুটো সালাত ও সিয়াম হলো হক্কুল্লাহ। আর যাকাত ও সাদাকাহ প্রদান এবং হজ্বব্রত পালন-এ দুটো হলো হক্কুল ইবাদ। বাকি একটি অর্থাৎ ঈমান। আর সালাত, সিয়াম, যাকাত ও হজ্ব এ চারটি হলো ঈমানের পরিপূরক ও পরিপোষক। তার মানে বান্দা প্রথমে বিশ্বাস করবে, ঈমান আনবে তারপর বাকি চারটির অনুশীলন বা আমল করবে। সুতরাং ঈমান আনয়ন না করলে অন্যান্য কাজ করার আবশ্যক হয় না। আর যদি তাওহীদে ঈমান আনেন, মেনে নেন যে, আল্লাহ এক ও অদ্বিতীয় এবং তাঁর হুকুম-আহকাম, বিধি-বিধান অবশ্য পালনীয়, তাহলে হক্কুল্লাহ ও হক্কুল ইবাদে বিবৃত পালনীয় চারটি ‘আমলী’ বৈশিষ্ট্য আপনার জন্য অবশ্যকরণীয় হয়ে পড়ে। ঈমান আনার পর এ চারটিও ঈমানেরই অবিচ্ছেদ্য অংশরূপে পরিগণিত হয়। এগুলোকে আলাদা করে চিন্তা করা যায় না। এগুলোর প্রত্যেকটিই ঈমানের অঙ্গ, আবার প্রত্যেকটিই একটি অপরটির সহগামী ও সম্পূরক। আর সামগ্রিকভাবে এ পাঁচটি অংশ পালনের একমাত্র উদ্দেশ্য মুত্তাকী হওয়া। কেননা মুত্তাকী হওয়া, মুমিন, মুসলিম ও মুহসিন হওয়ার অন্যতম প্রধান শর্ত।
উপবাস ও ইন্দ্রিয় দমন যদি ব্যক্তিকে প্রকৃত মনুষ্যত্বে উন্নীত করতে না পারে তাহলে সে উপবাসে কোন লাভ নেই। সিয়াম-সাধনায় অনুতাপের আগুন নিজের অপকর্মকে দগ্ধ করবে। মনের মধ্যে অপরাধবোধ জাগ্রত করবে। নতশীরে আল্লাহর কাছে তাওবা করে অন্যায় কাজ থেকে ফিরে আসতে হবে। প্রতিবেশীর হক আদায় করার জন্য আগ্রহী হতে হবে।  আল্লার আদেশ নিষেধ মেনে চলার জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুতি নিতে হবে সিয়াম সাধনার মাধমে। তবেই এ সিয়াম সাধনা ইহ ও পরজীবনে কল্যাণ বয়ে আনবে।

Please follow and like us:
Facebook Comments