সাতক্ষীরা এল্লারচর মৎস্য প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের যাত্রা শুরু* উন্মাচন হল মৎস্য বিভাগের নতুন দ্বার*জনবল সংকটের কারণে মুখ থুবড়ে পড়ার আশঙ্কা

আবু সাইদ বিশ্বাসঃ সাড়ে চার কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এল্লারচর মৎস্য প্রশিক্ষণ কেন্দ্র জেলার মৎস্য বিভাগের নতুন দ্বার উন্মোচন করেছে। চলতি বছরের মার্চে শুরু হওয়া কেন্দ্রটি মৎস্য চাষীদের মাঝে এনে দিয়েছে বৈপ্লবিক পরিবর্তন। প্রতি দিন চাষীরা প্রশিক্ষণ নিয়ে আধুনিক ও বিজ্ঞান সম্মত পদ্ধতিতে মৎস্য চাষ শুরু করেছে । গলদা, বাগদা ও কাঁকড়ার উপর তিন দিনের প্রশিক্ষণ নিয়ে মৎস্য চাষে ব্যাপক সফলতার মুখ দেখছে এ খাতে সংশ্লিষ্টরা। সরকার বিনা মূল্যে মৎস্য চাষীদের প্রশিক্ষণ দিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু জনবল সংকটের কারণে প্রশিক্ষণ কেন্দ্রটি তার স্বাভাবিক কার্যক্রম চালিয়ে চাষীদের প্রশিক্ষণ দিতে হিমশীম খাচ্ছে। কেন্দ্রটির জনবল সংকট কাটিয়ে উঠতে পারলে সাতক্ষীরায় মৎস্য খাতে নব দিবগন্তের উন্মোচন হবে আশা প্রতিষ্ঠানটির উদ্ধোতন বৈজ্ঞানিক কর্মকতা নাজমুল হুদার। পাশা-পাশি সরকারও এখান থেকে বিপুল পরিমাণে অর্থ জাতীয় রাজস্ব খাতকে সমৃদ্ধ করতে পারবে।
সূত্র জানায়, ১৯৮৩ সালে দেড়শ বিঘা (৫০ একর) জমির উপর প্রতিষ্ঠিত হয় এল্লারচর চিংড়ি চাষ প্রদর্শণী খামার। সাতক্ষীরা শহরের ৫ নং ওয়ার্ডের দক্ষিণ পার্শ্বে এবং ৬ নং ওয়ার্ডের দক্ষিণ পূর্ব পার্শ্বে এটি অবস্থিত। শুরু থেকে কিশোর গলদা তৈরি ও বাগদার চাষ করা হয় এখান থেকে। পরবর্তিতে কাঁকড়ার চাষ শুরু করে প্রতিষ্ঠানটি। বর্তমানে সাদা মাছের পাশা পাশি ভেটকিরও পোণা পালন করা হয়।

বর্তমান সরকার সাতক্ষীরা জেলাতে মৎস্য বিপ্লব ঘটাতে এল্লারচর চিংড়ি চাষ প্রদর্শণী খামারকে মৎস্য প্রশিক্ষণ করার উদ্যোগ নেই। এরই অংশ সাড়ে ৪ কোটি টাকা প্রকল্প ব্যয়ে প্রায় দেড় বছর সময়ে মৎস্য প্রশিক্ষণ কেন্দ্র গড়ে তোলা হয়। কেন্দ্রটি উদ্দেশ্য হল সাতক্ষীরা সহ যে কোন জেলার মৎস্য বিভাগে কর্মরত চাষী,কর্মী,কর্মকর্তা সহ এখাতে সংশ্লিষ্ট যে কোন ব্যক্তিকে প্রশিক্ষণ দেয়া। প্রশিক্ষক পেলে প্রতিদিন ২২৫ জনকে বিভিন্ন প্রযুক্তিতে পশিক্ষণ দেয়া সম্ভব হবে।

মুকুল ইসলাম। এসএসসি পাশ করে এল্লারচর মৎস্য প্রশিক্ষণ কেন্দ্র থেকে প্রশিক্ষণ নিচ্ছে। সে দেবহাটা সুবর্ণবাদ গ্রামের রুহুল আমিন মোড়লের ছেলে। পেষায় এক জন কাঁকড়া চাষী। এখান থেকে প্রশিক্ষণ নেয়ার ফলে তার ঘেরে কাঁকড়ার উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে কয়েক গুন বলে তার আশা।

মনিকা রাণি। দেবহাটার নোড়ারচক এলাকার কানাই লাল মন্ডলের স্ত্রী। তিনি স্থানীয় মহিলা সমিতির সভানেত্রী। তার নের্তত্বে ৫৫ জন খাঁচায় কাঁকড়া চাষ করে। সরকার তাদেরকে ১৫০টি খাঁচা দিয়েছে কাঁকড়া চাষের জন্যে। এল্লারচর মৎস্য প্রশিক্ষণ কেন্দ্র থেকে তিনি দিন ব্যাপি কাঁকড়া প্রশিক্ষণ নিয়ে সে খুব আনন্দিত। এবার নতুন ভাবে কাঁকড়া চাষে সফলতা পাবে আশা তার।

মানিক চন্দ্র বাছাড়। দেবহাটার বদরতলা এলাকার একজন কাঁকড়া চাষী। ২২ শতক জমিতে সে কাঁকড়া চাষ করছে। একশ খাঁচা নিয়ে চল শুরু করে বর্তমানে তার ঘেরে ১৫শ খাঁচা। এবছর সে কাঁকড়া বিক্রি করে লক্ষাধীক টাকা লাভ ও করেছে। তিনি জানালেন এল্লারচর মৎস্য প্রশিক্ষণ কেন্দ্র থেকে আগেই প্রশিক্ষণ নিতে পারলে আরো বেশি লাভের মুখ দেখতে পারতাম। এমন বক্তব্য আরো অনেকের।

চিংড়ি চাষ প্রদর্শনী খামার এল্লারচর,সাতক্ষীরা থেকে প্রতিবছর সরকার বিপুল পরিমানে রাজস্ব আয় করে থাকে। জেলা মৎস্য অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, ২০১৮ সালে এল্লারচর চিংড়ি চাষ প্রদর্শনী খামার থেকে ১৩ লক্ষ ৪৯ হাজার টাকা, ২০১৭ সালে ১৩ লক্ষ ৮ হাজার টাকা, ২০১৬ সালে ১২ লক্ষ ৬০ হাজার টাকা এবং ২০১৫ সালে ৮ লক্ষ ৪৮ হাজার টাকার রাজস্ব অর্জন করে। যদিও এরাজস্ব অর্জনের পিছুনে সরকার সিংহভাগ খরচ করে। ২০১৭ সালে ১৩ লক্ষ ৮ হাজার টাকা রাজস্ব আদায়ে সরকার খরচ বহন করে ৮ লক্ষ টাকা।

জেলা মৎস্য অধিদপ্তর জানায়,জেলাতে নিবন্ধিত জেলে আছে ৪৯ হাজার ২৩ জন এবং মৎস্যচাষী আছে ৭৬ হাজার ৩৯৪ জন। এসব জেলে,চাষী ও নতুন নতুন মৎস্য খামারিদের প্রশিক্ষণের আওয়তায় আনতে পারলে এখাত একটি লাভ জনক শিল্পে পরিণত হবে। পাশা পাশি লাক্ষ বেকারের কর্মসংস্থানের সূর্যোগ সৃষ্টি হবে। মৎস্য বিশ্লেষকদের ধারণা, এল্লারচর মৎস্য প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে জনবল বৃদ্ধি করতে পারলে লক্ষাধীক ব্যক্তিকে মৎস্য প্রশিক্ষণের আওয়তায় আসবে এবং নতুন কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হবে।

এল্লারচর মৎস্য প্রশিক্ষণ কেন্দ্রটিকে বর্তমানে ১০টি পদ রয়েছে। কিন্তু ৮ পদেই কোন জনবল নেই। এক জন সিনিয়র বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও একজন জুনিয়র বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা দিয়ে চলছে প্রতিষ্ঠানটি। পদ শূন্য রয়েছে একজন দক্ষ ফিশারম্যান,এক জন নাইট গার্ড,৪ জন গার্ড, একজন এমএলএস ও একজন ড্রাইভার। এমনকি যে দুজন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা আছে তাদেরও পর্যাপ্ত সুযোগ সুবিধা নেই। নেই কোন যাতা য়াতের বাহন। যদিও একটি প্রাইভেট থাকার কথা রয়েছে।

প্রতিষ্ঠানটির বর্তমান পরিচালক সিনিয়র বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মো: নাজমুল হুদা জানালেন, জনবল সংকট কাটিয়ে উঠতে পারলে এল্লারচর মৎস্য প্রশিক্ষণ কেন্দ্রটি দক্ষিণাঞ্চলের একটি মডেল মৎস্য প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে রূপান্তর হবে।

জেলা মৎস্য কর্মকর্তা শহিদুল ইসলাম সরদার জানালেন,এল্লারচর মৎস্য প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে দ্রুত জনবল নিয়োগের ব্যাপারে সরকারের উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। আশা করি দ্রুত সমস্যার সমাধান হবে। –আবু সাইদ বিশ্বাসঃসাতক্ষীরা

Please follow and like us:
Facebook Comments