রহমত মাগফিরাত নাজাতের মাস রমযান

মিয়া হোসেন : একে একে অতিবাহিত হলো পবিত্র রমযানের রহমতের আট দিন। আজ নবম রমযান। এ রমযানে মহান রাব্বুল আলামীন মোমিন বান্দাদের জন্য সকল দিক দিয়ে সুযোগ সুবিধা দান করেছেন। এ মাসে ইবাদাতের সওয়াব যেমন বহুগুণ বৃদ্ধি করা হয়েছে, তেমনি এ মাসে দান সদকার সওয়াবও অধিক পরিমাণে বাড়ানো হয়েছে। এ মাসে একটি ফরজ ইবাদত করলে সত্তরটি ফরজ ইবাদাতের সওয়াব হয় আর এ মাসে একটি টাকা দান করলে সত্তর টাকা দান করার, কোনো কোনো ক্ষেত্রে হাজার টাকা দান করার সওয়াব হয় বলে হাদীসে উল্লেখ করা হয়েছে।
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি রমযান মাসে এক দিরহাম সাদকা দিবে, তা তার অন্য সময় হাজার দিরহাম দানের চেয়েও শ্রেষ্ঠ হবে। দান-খয়রাত, পরস্পর সমবেদনা ও সহানুভূতি এ মাসেই হক্কুল ইবাদতের প্রেরণা বাড়িয়ে দেয়। সিয়াম সাধনায় রিপুর বিনাশ সাধনের সঙ্গে সঙ্গে আল্লাহর নৈকট্য লাভের যে প্রতিশ্রুতি রয়েছে তা বিশ্ব মঙ্গলময়ের এক রহমত ছাড়া আর কিছুই নয়।
সূরা আল বাকারার ১৮৩ থেকে ১৮৭ নং আয়াতের মাধ্যমে রোযার পরিপূর্ণ বিধান বর্ণনা করা হয়েছে। আল্লাহ পাক একটি বিশেষ উদাহরণ উল্লেখসহ রোজা রাখা যে ফরজ, সে নির্দেশ দিয়েছেন। নির্দেশের সাথে এটাও উল্লেখ করেছেন যে, রোজা শুধুমাত্র তোমাদের প্রতি ফরজ করা হয়নি, তোমাদের পূর্ববর্তী উম্মাতগণের উপরও ফরজ করা হয়েছিল। এর দ্বারা একদিকে যেমন রোজার বিশেষ গুরুত্ব বুঝানো হয়েছে, তেমনি মুসলমানদেরকে এই মর্মে সান্ত¡নাও দেয়া হয়েছে যে, রোজা একটা কষ্টকর ইবাদত বটে, তবে তা শুধুমাত্র তোমাদের উপরই ফরজ করা হয়নি, তোমাদের পূর্ববর্তী উম্মতের উপরও ফরজ করা হয়েছিল। কেননা সাধারণত দেখা যায়, কোনো একটি কষ্টকর কাজ অনেকে মিলে করলে তা অনেকটা স্বাভাবিক ও সহজ মনে হয় (রুহুল মাআনী)। এ অংশের ব্যাখ্যায় আল্লামা আলুসী (র.) স্বীয় তাফসির গ্রন্থ রুহুল মা’আনীতে উল্লেখ করেছেন যে, এখানে তোমাদের পূর্ববর্তী বলে হজরত আদম (আ.) হতে শুরু করে হজরত ঈসা (আঃ)-এর যুগ পর্যন্ত সকল যুগের মানুষকে বোঝানো হয়েছে। এতে বোঝা যায় যে, নামাজের ইবাদত থেকে যেমন কোন শরীয়ত বা উম্মত বাদ ছিল না, তেমনি রোজাও সবার জন্য ফরয ছিল। তবে রোজার সময়সীমা, সংখ্যা ইত্যাদিতে পার্থক্য ছিল।
আল্লামা ইমামুদ্দীন ইবনে কাসীর (রঃ) বর্ণনা মতে, হযরত আদম (আঃ) চন্দ্র মাসের ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখ আল্লাহর নির্দেশে সিয়াম পালন করতেন। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) গৃহে বা সমাজে এই দিনগুলোতে সিয়াম পালন না করে থাকতেন না। হযরত মুয়াজ বিন জাবাল, ইবনে আব্বাস (রাঃ)-এর বর্ণনা মতে, মাসে তিনদিন রোজা রাখার বিধান হযরত নূহ (আঃ) এর যুগ হতে শুরু হয়ে নবী করিম (সাঃ)-এর আবির্ভাব পর্যন্ত বলবৎ ছিল। পরে আল্লাহ তায়ালা রমযানের রোজা ফরয করে ঐ বিধান রহিত করে দেন। অপর এক বর্ণনায় পাওয়া যায়, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, হযরত ইব্রাহীম (আঃ) সিয়াম পালন করেছেন। হযরত দাউদ (আঃ) এক দিন পর রোজা রাখতেন আরেকদিন ছেড়ে দিতেন। ঈসা (আঃ) এর জন্মের সময় কৌতুহলী জনতা তার মাতা মারইয়ামকে তার জন্ম সম্পর্কে প্রশ্ন করতে থাকলে উত্তরে তিনি বলেন, আমি দয়াময়ের (আল্লাহর) উদ্দেশ্যে মানতের সিয়াম রেখেছি। সুতরাং আজ আমি কিছুতেই কোন ব্যক্তির সঙ্গে বাক্যালাপ করবো না। (সূরা মারইয়াম ২৬)। মুগাফফাল ইবনে হানজালা (রাঃ) হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) ইরশাদ করেন, খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের ওপর রমযানের একমাস রোজা ফরজ করা হয়েছিল। পরবর্তীতে তাদের জনৈক বাদশার রোগমুক্তি ও সিংহাসনে সমাসীন হওয়ার প্রেক্ষিতে আরো বিশ দিন বৃদ্ধি করে পঞ্চাশের কোঠায় পৌঁছে যায়।

Facebook Comments
Please follow and like us: