দেশে এখন ভয়াবহ পরিস্থিতি দেখা দিয়েছে

স্টাফ রিপোর্টার : দেশে এখন ভয়াবহ পরিস্থিতি দেখা দিয়েছে উল্লেখ করে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, ‘বন্দুক যুদ্ধে’র নামে মিথ্যা কথা বলে সরকার একের পর এক বিচারবর্হিভুত’ হত্যা করছে। তিনি বলেন, এই সরকারকে কথায় কিছু করা যাবেনা। জাতীয় ঐক্য সৃষ্টির মধ্য দিয়ে একযোগে আন্দোলনের মাধ্যমে বিদায় করতে হবে। গতকাল সোমবার জাতীয় প্রেস ক্লাব মিলনায়তনে বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন (বিএফইউজে) ও ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন (ডিইউজে) এর যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত ইফতার মাহফিলে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
মির্জা ফখরুল বলেন, আপনারা লক্ষ্য করছেন গত কয়েকদিন ধরে যেভাবে মানুষ হত্যা করছে বিনা বিচারে। মাদক সেবনকারী বা মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে তারা (সরকার) আসলে কাদেরকে হত্যা করছে, তারা ভাবছেন আমরা কিছুই জানতে পারছি না। আমরা শুধু এটুকু জানছি, বিনা বিচারে বন্দুক যুদ্ধের নাম বলে মিথ্যা কথা বলে তাদেরকে হত্যা করা হচ্ছে। আমরা সবাই মাদকের বিরুদ্ধে। আমরা চাই যে, দেশ পুরোপুরিভাবে মাদকমুক্ত হোক। একই সঙ্গে আমরা দেশে ন্যায় বিচার, ন্যায়ের শাসন দেখতে চাই, আমরা ইনসাফ দেখতে চাই।
বর্তমান গণমাধ্যমে অবস্থা তুলে ধরে মির্জা ফখরুল বলেন, যেহারে আজকে গণমাধ্যমের ওপরে চাপ সৃষ্টি করছে, যেহারে আজকে সেন্সরশীপ করছে, যেহারে ভয়ভীতি দেখাচ্ছে। তাতে সত্য বেরিয়ে আসতে পারছে না। যারা সত্য কথা বলছেন তাদেরকে হুমকি দেয়া হচ্ছে, তাদেরকে বিভিন্নভাবে বিপদগ্রস্থ করা হচ্ছে। তিনি বলেন, এই সরকার সাগার রুনী হত্যার বিচার করেনি। এরা অনেকগুলো সংবাদপত্রও মিডিয়া বন্ধ কওে দিয়েছে। সাংবাদিক হত্যা করেছে। এখনো প্রতিনিয়ত সাংবাদিক নির্যাতন চলছে। তিনি বলেন, এই আওয়ামী লীগ ৪টি পত্রিকা রেখে সব কটি মিডিয়া বন্ধ করে দিয়েছিল। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান বহুদলীয় গণতন্ত্র চালু কওে বন্ধ মিডিয়া খুলে দিয়েছেন। তিনি বলেন, এরা জনগণকে ভয় পায়। তাই যখনই তাদেও বিুরদ্ধে কেউ ন্যায় কথা বলে তাদেও উপর নির্যাতন শুরু করে। মির্জা ফখরুল বলেন, আমরা শুনেছি- কয়েকদিন আগে খুলনা সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে যারা সত্য কথাগুলো বলেছিলেন, নিউজ করতে গিয়েছিলেন তাদের অনেকে চাকুরিচ্যুত করা হয়েছে। এর মাধ্যমে তারা পরোক্ষ হুমকি দিয় রাখছে। যারাই সরকারের বিরুদ্ধে যাবে তাদেও চাকরীচ্যুত করা হবে।
তিনি বলেন, এই সরকার দেশের সকল অর্জনকে ধ্বংস করে দিয়েছে। দেশের শিক্ষা ব্যভস্থা, অর্থনীতি, ব্যাংক সবগুলোকে এরা শেষ কওে দিয়ছে। এরা এখন সর্বত্র লুটপাটের মহোৎসবে মেতে উঠেছে। দেশে এখন ভয়াবহ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। এরা ১৯৭১ সালের স্বাধীনতার মূল চেতনাকে ধ্বংস করে দিয়েছে।
খালেদা জিয়াকে সরকার ‘বিভিন্ন কৌশলে’ কারাগারে আটকিয়ে রেখেছে অভিযোগ করে বিএনপি মহাসচিব বলেন, সরকার এজন্য এটা করছে যে তারা রাজনৈতিক দিক থেকে একেবারে দেউলিয়া হয়ে গেছে। জনগনের কাছে যেতে ভয় পায়, জনগণের সামনে আসতে ভয় পায়। যে কারণে আজকে তারা(সরকার) বিরোধী দলীয় নেত্রীকে এবং বিরোধী দলের নেতা-কর্মীদের গুম করে খুন করে আজকে দেশে একটা এমন ত্রাসের অবস্থা সৃষ্টি করেছে। যেটাকে ফ্যাসিবাদ বলা ছাড়া অন্য কিছু বলার উপায় নেই। আমরা বলতে চাই, দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে মুক্ত করেই একটা নিরপেক্ষ সরকার প্রতিষ্ঠা করে, নির্বাচন নির্বাচন কমিশনের পরিচালনায় সকল দলের অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হতে হবে। আসুন আজকে জাতীয় ঐক্য সৃষ্টি করার মধ্য দিয়ে সমাজের সকল পেশা ও শ্রেনির মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করে গণতন্ত্রকে প্রতিষ্ঠা করবার জন্যে আমরা সকলে একযোগে আন্দোলন করি- এটাই হোক আমাদের প্রত্যাশা।
বিএফইজের সভাপতি রুহুল আমিন গাজী স্বাগত বক্তব্য রাখেন। ইফতারে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ছাড়াও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমীর ও সাবেক এমপি অধ্যাপক মিয়া গোলাম পারোয়ার, ঢাকা মহানগর দক্ষিণের নায়েবে আমীল মঞ্জুরুল ইসলাম ভূইয়া, সহকারী সেক্রেটারি এডভোকেট হেলাল উদ্দিন, মহানগর উত্তরের সহকারী সেক্রেটারি লস্কর মো: তসলিম, মাহফুজুর রহমান, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমেদ, মির্জা আব্বাস, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, ভাইস চেয়ারম্যান চৌধুরী কামাল ইবনে ইউসুফ, বরকতউল্লাহ বুলু, সুপ্রিম কোর্ট বারের সভাপতি জয়নাল আবেদীন, নয়া দিগন্তের সম্পাদক আলমগীর মহিউদ্দিন, বিএফইউজের সাবেক সভাপতি শওকত মাহমুদ, জাতীয় প্রেস ক্লাবের সাবেক সভাপতি রিয়াজ উদ্দিন আহমেদ, বিএফইউজে’র মহাসচিব এম আবদুল্লাহ, ডিইউজের সভাপতি কাদের গনি চৌধুরী, সাধারণ সম্পাদক শহীদুল ইসলাম, ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সাবেক সভাপতি শাখাওয়াত হোসেন বাদশা, সাবেক সাধারণ সম্পাদক মুরসালিন নোমানী, জাতীয় প্রেস ক্লাবের যুগ্ম-সম্পাদক ইলিয়াস খান, লেবারপার্টির চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান ইরান, শিক্ষক কর্মচারী ঐক্যজোটের আহ্বায়ক অধ্যক্ষ সেলিম ভ’ইয়া, দিগন্ত টেলিভিশনের উপ-নির্বাহী পরিচালক মজিবুর রহমান মঞ্জু, ইসলামী ছাত্র শিবিরের কেন্দ্রীয় প্রচার সম্পাদক খালেদ মাহমুদ, ডিআরইউর প্রতিনিধি ও কার্যকমিটির কার্যনির্বাহী সদস্য মো. জাফর ইকবাল, এ এস এম কামালসহ ২০ দলীয় জোটের নেতৃবৃন্দ, পেশাজীবী নেতৃবৃন্দসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমের সাংবাদিকরা ইফতারে অংশ নেন।
স্বাগত বক্তব্যে রুহুল আমিন গাজী বলেন, এই সরকার খালেদা জিয়াকে বিভিন্ন কৌশলে কারাগারে আটক রেখেছে। ক্ষমতাসীনরা জানে, দেশের এখন সবচেয়ে জনপ্রিয় নেত্রী হচ্ছেন বেগম খালেদা জিয়া। তাই তাকে যেনতেন মামলায় কারাগারে রেখে আরেকটি প্রহসনের নির্বাচন করতে চায়। কিন্তু সরকারের এই স্বপ্ন কোনদিনই পুরণ হবেনা। দেশের সাংবাদিক সমাজ জনসাধারণকে সাথে নিয়ে দুর্বার আন্দোলন গড়ে তুলবে। তিনি বলেন, এই সরকার গণমাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করছে। তাদের হাতে অনেক সাংবাদিক খুন হয়েছে। সরকার অনেকগুলো মিডিয়া বন্ধ করে দিয়েছে। তিনি দেশের চলমান সংকট সমাধানে সবাইকে ঐক্যভদ্ধভাবে রাজপথে নেমে আসার আহ্বান জানান।
স্বেচ্ছাসেবক ফোরাম: এদিকে জাতীয় প্রেস ক্লাবের কনফারেন্স লাউঞ্জে ঢাকা মহানগর স্বেচ্ছাসেবক ফোরামের উদ্যোগে বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া ও স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি শফিউল বারী বাবুর মুক্তির দাবিতে এক প্রতিবাদ সমাবেশে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, দেশে চলমান বিচারবর্হিভুত হত্যাকান্ড ঘটনার পেছনে সরকারের ‘ভিন্ন ধরনের চক্রান্ত’ রয়েছে। তিনি বলেন, দেখুন না প্রতিদিন মানুষ হত্যা করা হচ্ছে। আমাদের প্রশ্ন হচ্ছে যে, যাদেরকে হত্যা করা হচ্ছে তাদের বিচার হচ্ছে না কেনো? কারা আজকে বাংলাদেশে একটা নতুন পরিবেশ সৃষ্টি করার জন্য, অন্য কোনো কিছু আগাম সৃষ্টি করার জন্য এটা করা হচ্ছে কিনা- এ নিয়ে আমরা উদ্বিগ্ন। এটাকে যদি শুধু আমরা মাদক বিরোধী অভিযান মনে করি তাহলে ভুল হবে। এর পেছনে ষড়যন্ত্র আছে, এর পেছনে নিশ্চয় আরো একটা ভিন্ন ধরনের চক্রান্ত রয়েছে। যা করে করে আজ পর্যন্ত আওয়ামী লীগ টিকে আছে।
শনিবার মাদবিরোধী অভিযানে বন্দুক যুদ্ধে নিহত কক্সবাজারের টেকনাফের পৌর কাউন্সিলর ও উপজেলা যুব লীগের সাবেক সভাপতি একরামুল হকের প্রসঙ্গ টেনে বিএনপি মহাসচিব বলেন, আজকের পত্রিকায় আছে দেখবেন, কক্সবাজারের একজন কাউন্সিলর যাকে হত্যা করা হয়েছে সেই এলাকার সমস্ত মানুষ বলেছে যে, পৌর মেয়র একজন নিরহ ভালো মানুষকে হত্যা করা হয়েছে। আপনারা দেখেছেন সে প্রধানমন্ত্রীর কাছে খোলা চিঠি দিয়েছেন যে তার আর্থিক স্বচ্ছলতা নেই। সে তিনবার নির্বাচিত হয়েছেন। কাদের ইঙ্গিতে এই হত্যা করা হয়েছে। কারা এই তালিকা তৈরি করেছে ?
সরকারের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, আপনার ঘরকে সুন্দর করে রেখে দিয়েছেন। আপনার ঘরে যারা মাদক সম্রাট হিসেবে পরিচিত, মাদক ব্যবসায়ী হিসেবে পরিচিত তাদের গায়ে আপনি ফুলের টোকাও দিচ্ছেন না। মির্জা ফখরুল বলেন, আওয়ামী লীগের কোনো গণভিত্তি নেই। প্রমাণিত এজন্য তাহলে তো দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে জেলে আটকিয়ে রাখতে হয় না। আপনি যদি এতোই জনপ্রিয় তাহলে তাকে বের করে নির্বাচন করুন। দেখা যাক কে জনপ্রিয়?
আমরা তো কখনো বলি না, আমাদেরকে ক্ষমতায় বসিয়ে দিতে হবে। আমরা বলি যে, একটি নির্বাচন দিন, যে নির্বাচনটা হবে একটা সুষ্ঠু, অবাধ ও সকলের কাছে গ্রহনযোগ্য, সবাই ভোট দিতে পারবে। গণতান্ত্রিক সমাজে নির্বাচন ছাড়া ক্ষমতা পরিবর্তনের কোনো পথ নেই। খালেদা জিয়াকে মুক্তি দিয়ে নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে অবশ্যই সরকারকে নির্বাচন দিতে হবে বলে মন্তব্য করেন বিএনপি মহাসচিব।
সরকারের জনগনের কাছে দায়বদ্ধতা নেই, যাদের কাছে দায়বদ্ধ তাদের কাছে বার বার ধর্ণা দিচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি বলেন, এই সরকার সম্পূর্ণভাবে একটা গণবিরোধী সরকার, জনবিচ্ছিন্ন সরকার। মানুষের সাথে এদের কোনো সম্পর্কই নাই। তাদের দায়বদ্ধতা নেই বলে তারা যা ইচ্ছা তাই করে বেড়াচ্ছে। তাদের দায়বদ্ধতা যেখানে আছে সেখানে বার বার তারা যাচ্ছে, বার বার ধর্ণা দিচ্ছে।আমি খুব অবাক হয়েছি। আনন্দবাজার পত্রিকাতে যে খবর বেরিয়েছে তা যদি সত্য হয় তাহলে একটা স্বাধীন দেশের প্রধানমন্ত্রী আরেকটি দেশে গিয়ে যখন বলেন, আসন্ন নির্বাচনে তাদের(ভারত) সহযোগিতা দরকার। তাহলে আমরা কী মনে করবো? আমরা কী মনে করব যে, এ দেশ স্বাধীন আছে? নাকী আমরা মনে করব যে, এই দেশটাকে একটা অঙ্গরাজ্য বানিয়ে ফেলা হচ্ছে। এ বিষয়গুলো আমাদের সকলকে অনুধাবণ করতে হবে। বর্তমান সরকারকে হটাতে সকলকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহবানও জানান বিএনপি মহাসচিব।
সংগঠনের সভাপতি ফখরুল ইসলাম রবিনের সভাপতিত্বে ও গাজী রেজওয়ান-উন হোসেন রিয়াদের পরিচালনায় সভায় বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল আউয়াল মিন্টু, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা কাউন্সিলের সদস্য মসিউর রহমান, যুগ্ম-মহাসচিব খায়রুল কবির খোকন, স্বেচ্ছাসেবক বিষয়ক সম্পাদক মীর সরফত আলী সপু, স্বেচ্ছাসেবক দলের মোস্তাফিজুর রহমান, গোলাম সারোয়ার, ইয়াসীন আলী, সাইফুল ইসলাম ফিরোজ প্রমুখ বক্তব্য রাখেন।

Please follow and like us:
Facebook Comments