একতরফা জাতীয় বাজেট পেশ আজ -ভোটার তুষ্টিই মূল লক্ষ্য

ক্রাইমবার্তা ডেস্করিপোট: জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে ভোটার তুষ্টিকেই মূল লক্ষ্য ধরে আজ ২০১৮-১৯ অর্থবছরের বাজেট ঘোষণা করতে যাচ্ছেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। এ বাজেটের সম্ভাব্য আকার হচ্ছে ৪ লাখ ৬৪ হাজার ৫৭৩ কোটি টাকা। নির্বাচনী বছর হওয়ায় এবারের বাজেট সরকার ও সব শ্রেণীর মানুষের জন্য বেশ গুরুত্বপূর্ণ।

কারণ একদিকে ভোট, অন্যদিকে নানা প্রতিশ্রুতিসমৃদ্ধ এই বাজেট বাস্তবায়নে চ্যালেঞ্জের বিষয়টি মাথায় রেখেই চূড়ান্ত করা হয়েছে। যদিও বাজেট বাস্তবায়নে পুরো সময় পাচ্ছে না বর্তমান সরকার। কারণ আগামী ডিসেম্বরেই নির্বাচন হওয়ার কথা।

এ নির্বাচন সামনে রেখে সরকার কোনো ধরনের ঝুঁকি নিচ্ছে না। তাই অন্যান্যবারের মতো নতুন নতুন কর চাপিয়ে ভোটারদের অসন্তুষ্ট করার মতো তেমন কোনো ঘোষণা এবার থাকছে না।

বিশ্বব্যাংক ২০১৮-১৯ অর্থবছরে মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) প্রবৃদ্ধির হার ৬ দশমিক ৭ থাকবে বলে অনুমান করছে। সেখানে অর্থমন্ত্রী আজ জিডিপির প্রবৃদ্ধি ৭ দশমিক ৮ শতাংশ ধরে বাজেট উপস্থাপন করবেন। অর্থাৎ তিনি আর্থিক প্রবৃদ্ধির নিুমুখী প্রবণাতাকে মানতে রাজি নন। যদিও উচ্চ প্রবৃদ্ধি অর্জনে রয়েছে নানা প্রতিবন্ধকতা। এগুলো সমাধানে নানা দিকনির্দেশনা অর্থমন্ত্রীর বাজেট বক্তৃতায় থাকবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

জানা গেছে, আগামী বাজেটে ব্যয়ের আকার নির্ধারণ করা হয়েছে ৪ লাখ ৬৪ হাজার ৫৭৩ কোটি টাকা। অনুদান ছাড়া আয়ের লক্ষ্য ধরা হয়েছে ৩ লাখ ৩৯ হাজার ২৮০ কোটি টাকা। ফলে এ বাজেটে ঘাটতি থাকছে ১ লাখ ২৫ হাজার ২৯৩ কোটি টাকা, যা ডিজিপির ৪ দশমিক ৯ শতাংশের সমান। অন্যদিকে অনুদানসহ মোট আয়ের লক্ষ্য ধরা হয়েছে ৩ লাখ ৪৩ হাজার ৩৩১ কোটি টাকা। এতে ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়াচ্ছে ১ লাখ ২১ হাজার ২৪২ কোটি টাকা।

অর্থমন্ত্রী আজ যে বাজেট পেশ করছেন, সেখানে মোট রাজস্ব আয় ও ব্যয়ের হিসাব পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, ব্যয় সংকোচন নীতি থেকে বেরিয়ে আসতে পারেনি সরকার। ২০১৮-১৯ সালে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কর খাতে আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ২ লাখ ৯৬ হাজার ২০১ কোটি টাকা, এনবিআর-বহির্ভূত কর খাতের আয় ৯ হাজার ৭২৭ কোটি টাকা এবং কর ব্যতীত রাজস্ব আয় ৩৩ হাজার ৩৫২ কোটি টাকা। এ বিপুল অঙ্কের রাজস্ব সংগ্রহের জন্য সরকারকে জিডিপির বৃদ্ধির হার বাড়াতে হবে। সরকারের অনুমান অনুযায়ী আগামী আর্থিক বছরে ডিজিপির আকার ধরা হয়েছে ২৫ লাখ ৩৭ হাজার ৮৪৯ কোটি টাকা। অবশ্য এটি চলতি জিডিপির তুলনায় ২ লাখ ৯৯ হাজার ৩৫১ কোটি টাকা বেশি।

বাজেটে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) আকার ধরা হয়েছে ১ লাখ ৭৩ হাজার কোটি টাকা। এছাড়া সরকারের পরিচালনা ব্যয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ২ লাখ ৮২ হাজার ৪১৫ কোটি টাকা। আর অভ্যন্তরীণ সুদ পরিশোধে ব্যয় হবে ৪৮ হাজার ৩৭৭ কোটি টাকা এবং বৈদেশিক ঋণের সুদ পরিশোধে ব্যয় হবে ২ হাজার ৯৬৩ কোটি টাকা।

এবারের বাজেটে ঘাটতি পূরণ করতে ব্যাংকিং খাত থেকে সরকার ঋণ গ্রহণ করবে ৪২ হাজার ২৯ কোটি টাকা। সঞ্চয়পত্র থেকে ঋণ নেবে ২৬ হাজার ১৯৭ কোটি টাকা।

নতুন বাজেটে কৃষকের বিষয়টি বেশ গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। চলতি বছরের তুলনায় কৃষিতে ৩ হাজার কোটি টাকা বেশি ভর্তুকি দেয়ার প্রস্তাব করা হচ্ছে। এতে কৃষিতে মোট ৯ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি থাকছে। এছাড়া এলএনজি আমদানি ও চাকরিজীবীদের গৃহনির্মাণ ঋণসহ বেশ কিছু খাত নতুন করে ভর্তুকির আওতায় আসছে। বিশেষ করে আগামী বছর থেকে ভর্তুকি দেয়া হবে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডকে (পিডিবি)। অথচ চলতি অর্থবছর পর্যন্ত এ সংস্থাকে সরকার সহায়তা দিয়েছে ঋণ হিসেবে। পাশাপাশি সামনের বছরগুলোতে বাস্তবায়ন কার্যক্রম অব্যাহত রাখা হবে কয়লা, গ্যাস, তাপবিদ্যুৎ ও নবায়নযোগ্য জ্বালানিনির্ভর দীর্ঘমেয়াদি বিদ্যুৎ প্লান্টের। সে হিসাব করেই আসন্ন বাজেটে ৩১ হাজার ৭০০ কোটি টাকা বরাদ্দ থাকছে ভর্তুকি ও প্রণোদনা খাতে।

নির্বাচনের আগে সরকারি চাকরিজীবীসহ ভোটার টানার চেষ্টা করা হবে বাজেটে। সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য পহেলা জুলাই থেকে কার্যকর হবে গৃহনির্মাণ ঋণ কর্মসূচি। এ ঋণ কর্মসূচি বাস্তবায়নসহ তাদের (চাকরিজীবী) বছরে ৫ শতাংশ হারে ইনক্রিমেন্ট ধরে বেতন-ভাতা খাতে দেয়া হচ্ছে ৬৬ হাজার ২২৪ কোটি টাকা। পাশাপাশি বেসরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নতুন বাজেটে থাকছে সার্বজনীন পেনশন ব্যবস্থার রূপ রেখা।

জানা গেছে, ভোটে বিষয়টি বিবেচনায় রেখে ২০১৮-১৯ অর্থবছরের বাজেটে প্রায় ১১ লাখ দরিদ্র মানুষকে নতুন করে সামাজিক সুরক্ষার আওতায় আনা হচ্ছে। এর ফলে এ কর্মসূচির আওতায় উপকারভোগীর মোট সংখ্যা দাঁড়াচ্ছে ৮৬ লাখ। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, মাতৃত্বকালীন ভাতা ৫০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৮০০ টাকা করা হচ্ছে। পাশাপাশি কর্মজীবী ল্যাকটেটিং মায়ের (শিশুকে বুকের দুধ খাওয়ান এমন মা) ভাতা ৫০০ টাকা থেকে বেড়ে দাঁড়াবে ৮০০ টাকা। এ দুটি ভাতা প্রাপ্যতার মেয়াদ ২ বছর থেকে বৃদ্ধি করে ৩ বছরে নেয়ার প্রস্তাব করা হচ্ছে।

সূত্র জানায়, বাজেটে সামাজিক সুরক্ষার আওতায় ক্যান্সার, কিডনি, স্ট্রোক, প্যারালাইজড ও জন্মগত হৃদরোগীদের আর্থিক সহায়তা কর্মসূচির জন্য ৫০ কোটি টাকা থেকে বাড়িয়ে ৭৫ কোটি টাকা দেয়ার প্রস্তাব করা হবে। এছাড়া দু’লাখ জীবিত মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য বিশেষ সম্মাননা ভাতা চালুর ঘোষণা আসছে। ‘বিজয় দিবস ভাতা’ নামে এটি কার্যকর করা হবে। প্রত্যেক মুক্তিযোদ্ধা বছরে ৫ হাজার টাকা হারে অতিরিক্ত এ ভাতে পাবেন।

ভোটার তুষ্ট করতে নতুন করে আরও এক হাজার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে এমপিওভুক্তি (সরকারি বেতনের অংশ) করা হচ্ছে। এছাড়া জাতীয় বাজেটে প্রথমবারের মতো অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে রোহিঙ্গারা। তাদের পুনর্বাসনের জন্য একটি প্রকল্প ইতিমধ্যে একনেকে অনুমোদন পেয়েছে। রোহিঙ্গাদের বাড়িঘরসহ অবকাঠামো তৈরিতে বাজেটে ৪০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখার প্রস্তাব করা হচ্ছে বলে জানায় সংশ্লিষ্ট সূত্র।

ছয়টি খাতকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে প্রণয়ন করা হচ্ছে আগামী ২০১৮-১৯ অর্থবছরের বাজেট। সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে মানবসম্পদ উন্নয়ন খাত। বিদ্যুৎ জ্বালানিসহ ভৌত অবকাঠামো এবং কৃষি, পল্লী উন্নয়ন ও কর্মসংস্থানও রয়েছে। পাশাপাশি সরকার সেবাদানে তথ্য প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো ও ডিজিটাল বাংলাদেশ বাস্তবায়নও থাকছে এ তালিকায়। অগ্রাধিকারে আরও থাকছে জলবায়ু মোকাবেলায় সক্ষমতা অর্জন এবং বহির্বিশ্বের অর্থনৈতিক সুযোগ ব্যবহার, রেমিটেন্স বৃদ্ধি ও পণ্যের নতুন বাজার সৃষ্টি। সরকারের শেষ বাজেট এসব বিষয়কে প্রাধান্য দিয়েই প্রণয়ন করা হচ্ছে। বিশেষ অগ্রাধিকারের কারণে বরাদ্দ বাড়ানো হয়েছে এসব খাতে।

তবে ব্যক্তিশ্রেণী আয়ের সীমা বাড়ানো হবে বলে এতদিন ঢাক-ঢোল পেটানো হয়েছে। কিন্তু জানা গেছে, এ ধরনের কোনো পদক্ষেপ নেই বাজেটে। তবে সবাইকে সন্তুষ্ট করতে আসন্ন বাজেটে সাধারণ মানুষের ওপর নতুন কোনো করের বোঝা চাপছে না। নতুন করে করারোপ না করলেও কর্পোরেট করের কিছু পরিবর্তন আনা হচ্ছে। মাঝামাঝি স্তরে কর্পোরেট কর হার কিছুটা কমানো হবে। আর নিু ও উচ্চস্লাবের (২৫, ৪২ দশমিক ৫ ও ৪৫ শতাংশ) কর্পোরেট কর অপরিবর্তিত থাকছে। মোবাইল ও তামাকসহ কিছু ব্যতিক্রম কোম্পানি ছাড়া সর্বোচ্চ কর্পোরেট কর ৩৭ দশমিক ৫ শতাংশ করা হচ্ছে। তবে মোবাইল ও তামাক কোম্পানির জন্য দু’টি রেট রাখা হয়েছে, তা হচ্ছে ৪২.৫ ও ৪৫ শতাংশ। ৩৭.৫ শতাংশের নিচেরগুলোতে কোনো পরিবর্তন করা হয়নি।

এছাড়া ভ্যাট কাঠামোতে আসছে বড় পরিবর্তন। ৯ স্তর থেকে কমিয়ে ৫ স্তরের ভ্যাট করা হচ্ছে। এসব স্তর হবে যথাক্রমে- ২, ৫, ৮, ১২ ও ১৫। এছাড়া কালো টাকা সাদা করার কোনো বিশেষ সুযোগ থাকছে না।

বাজেটে রাজস্ব আয়ের প্রধান খাত তামাকের ওপর কর বাড়ানো হচ্ছে। নিুস্তরের সিগারেটের মূল্য ২৭ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৩৫ টাকা করা হচ্ছে। এ সিগারেটের প্যাকেটে সম্পূরক শুল্ক ৬৫ শতাংশ আরোপের প্রস্তাব করা হয়েছে। এছাড়া উচ্চস্তরের সিগারেটের দাম ৭০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৭৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। ফিলটার যুক্ত দশ শলাকার বিড়ির প্যাকেটের দাম ৬ টাকা থেকে ৭ টাকা এবং ২০ শলাকারের দাম ১২ টাকা বাড়িয়ে ১৫ টাকা করা হয়েছে। এছাড়া দশ গ্রাম ওজনের জর্দা ও গুলের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ২৫ টাকা।

এছাড়া আমদানিতে অগ্রিম ভ্যাট বা এটিভি বাড়ানো হচ্ছে। ফলে আমদানিনির্ভর পণ্য মূল্য বাড়বে। ভ্যাট ও শুল্ক খাতে বেশকিছু পরিবর্তনের ঘোষণা থাকবে।

স্থানীয় শিল্পের সুরক্ষা ও প্রসারের স্বার্থে শুল্ক ও অন্যান্য বিষয়ে বেশকিছু উদ্যোগ থাকবে। একই সঙ্গে স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত হয়, এমন পণ্যের আমদানিকেও নিরুৎসাহিত করার উদ্যোগ থাকছে। কিছু বিলাসজাত দ্রব্য আমদানি নিরুৎসাহিত করার ঘোষণাও থাকছে। এর ফলে স্থানীয় শিল্প প্রসারের সুযোগ থাকবে বলে আশা করছেন অর্থমন্ত্রী।

সূত্রমতে, মোটরসাইকেল, কম্পিউটার ও মোবাইল ফোন উৎপাদনে ভ্যাট (মূল্য সংযোজন কর) অব্যাহতি দেয়ার পাশাপাশি কিছু শিল্পের যন্ত্রাংশ আমদানিতে শুল্কের ক্ষেত্রেও ছাড় দেয়া হতে পারে। ফলে দেশে এ ধরনের শিল্পের সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি হতে পারে। হাইব্রিড গাড়িতে সুবিধা অপরিবর্তিত থাকলেও রিকন্ডিশন্ড গাড়ির অবচয় সুবিধা কমছে।

এছাড়া এবারের বাজেটে ভ্যাট আরোপ করা হয়েছে ই-কমার্স সেবায়। বিলাস দ্রব্য হিসেবে হেলিকপ্টার সেবায় ২০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক (এসডি) আরোপ হতে পারে। ভ্যাট আদায় বাড়াতে হিসাবের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে ইসিআরের বদলে ইলেকট্রনিক ফিসক্যাল ডিভাইস (ইএফডি) ব্যবহার বাধ্যতামূলক করার ঘোষণাও থাকছে।

এদিকে জনগণের করের টাকা দিয়ে সরকারি মালিকানাধীন ব্যাংকগুলোকে বাঁচিয়ে রাখার বিষয়ে দীর্ঘদিন ধরে সরকারের কড়া সমালোচনা হচ্ছে। এরপরও মূলধন ঘাটতি মেটাতে এ খাতে বরাদ্দ দেয়া হচ্ছে এক হাজার ৫০০ কোটি টাকা। এছাড়া পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) খাতে বরাদ্দ রাখা হচ্ছে ২ হাজার কোটি টাকা।

 

আসন্ন ২০১৮-১৯ অর্থবছরের বাজেটে শুধু ব্যাংকিং খাতের কর্পোরেট কর কমানো হচ্ছে। এতে তারল্য সংকটে ভুগতে থাকা ব্যাংকগুলোর কিছুটা হলেও স্বস্তি পাবে। মূলত বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ বাড়াতে ও সুদ হার কমাতে সরকার এ উদ্যোগ নিতে যাচ্ছে।

পাশাপাশি ব্যক্তিশ্রেণীর করমুক্ত আয়ের সীমা বাড়ানো হচ্ছে না, আড়াই লাখ টাকা বলবৎ রাখা হয়েছে। মূল্য সংযোজন কর (মূসক বা ভ্যাট) খাতে স্তর কমিয়ে ৯টির পরিবর্তে ৫টি করা হচ্ছে। নতুন খাত হিসেবে মোবাইল উৎপাদনকে অব্যাহতি দেয়া হচ্ছে।

এছাড়া হেলিকপ্টার সেবার ওপর সম্পূরক শুল্ক আরোপ, মদ-বিয়ারের সম্পূরক শুল্ক বৃদ্ধি, জর্দা-গুলের মূল্য নির্ধারণ করে দেয়া হচ্ছে। আমদানি পর্যায়ে অগ্রিম ট্রেড ভ্যাট ৪ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৫ শতাংশ করা হচ্ছে, এতে ৬ হাজার ৪৯৩ পণ্য আমদানির খরচ বাড়বে। শুল্ক খাতে নতুন নতুন খাতে সম্পূরক শুল্ক আরোপ করা হচ্ছে। আজ জাতীয় সংসদে উত্থাপিত বাজেটে অর্থমন্ত্রী এসব বিষয়ে বক্তব্য রাখবেন।

অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, শুরুতে সব খাতে কর্পোরেট কর কমানোর সিদ্ধান্ত থাকলেও রাজস্ব আয়ের কথা বিবেচনায় নিয়ে পরবর্তীকালে শুধু ব্যাংকিং খাতে কর্পোরেট কর কমানোর বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী, অর্থমন্ত্রী ও এনবিআর ঐকমত্যে পৌঁছায়।

কারণ ব্যাংকিং খাতের তারল্য সংকট মোকাবেলায় নানা উদ্যোগ নেয়া হলেও সুফল আসেনি। নগদ জমার হার (সিআরআর) হ্রাস, বেসরকারি ব্যাংকে সরকারি তহবিল জমার সীমা বৃদ্ধি, রেপোর সুদ হার হ্রাস করা হলেও টাকার সংকটে ব্যাংকগুলো ঋণ দিতে পারছে না। উল্টো পুরনো ঋণের সুদ হার বাড়িয়ে উদ্যোক্তাদের চিঠি দিচ্ছে।

এ কারণে ব্যাংকের কর্পোরেট কর কমানো সমাধান হিসেবে ভাবা হচ্ছে। তাই পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কর্পোরেট কর ৪০ শতাংশ থেকে কমিয়ে সাড়ে ৩৭ শতাংশ এবং তালিকাবহির্ভূত কোম্পানির সাড়ে ৪২ শতাংশ থেকে ৪০ শতাংশ করা হচ্ছে। একই সঙ্গে ব্যক্তিশ্রেণীর করমুক্ত আয়ের সীমা বাড়ানোর কথা থাকলেও সেটি শেষ পর্যন্ত করা হয়নি। কারণ করমুক্ত আয়সীমা বাড়ানো হলে বিশাল অঙ্কের জনগণ করের আওতার বাইরে চলে যাবে।

ভ্যাটের ৫ স্তর : বর্তমানে ২২টি সেবার ওপর ৯ স্তরে সংকুচিত ভিত্তিমূল্যে দেড় থেকে ১৫ শতাংশ হারে ভ্যাট আদায় করা হয়। এটিকে ৫টিতে নামিয়ে আনা হচ্ছে। ১.৫, ২.৫, ৩, ৪, ৪.৫, ৫, ৬, ৭.৫, ১০- এ ৯টি স্তরের পরিবর্তে ২, ৪.৫, ৫, ৭, ১০ শতাংশের নতুন স্তর করা হচ্ছে। এতে সংকুচিত ভিত্তিমূল্যের সুবিধা ভোগ বেশ কয়েকটি সেবার ব্যয় বাড়বে।

এ তালিকায় আছে আসবাবপত্র, তৈরি পোশাক, তথ্যপ্রযুক্তি নির্ভর সেবা, পরিবহন ঠিকাদার, পণ্যের নিলাম এবং নতুন করে ই-কমার্স ব্যবসার ওপর ৫ শতাংশ ভ্যাট আরোপ করা হয়েছে। ফলে অনলাইন থেকে কেনাকাটায় পণ্যের দাম বাড়বে।

এছাড়া ব্যবসা পর্যায়ে ভ্যাট ৪ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৫ শতাংশ করা হয়েছে। এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত সুপারশপ খাত। বর্তমানে সুপারশপের কেনাকাটায় ৪ শতাংশ ভ্যাট আদায় করা হয়। প্রস্তাবিত বাজেট পাস হলে সেটি বেড়ে ৫ শতাংশ হবে। পাশাপাশি যারা ব্যবসা পর্যায়ে ৪ শতাংশ ভ্যাট দেন, তাদের বেশি কর দিতে হবে।

অন্যদিকে আমদানি পর্যায়ে অগ্রিম ট্রেড ভ্যাটও (এটিভি) ৪ শতাংশ থেকে ৫ শতাংশ করা হয়েছে। এতে বাণিজ্যিক আমদানিকারকদের পণ্য আমদানিতে অতিরিক্ত অর্থ গুনতে হবে। এর প্রভাব পড়বে স্থানীয় পর্যায়ে স্বল্পপরিসরে পণ্য উৎপাদনে জড়িত থাকা ব্যবসায়ীদের ওপর, যারা বাণিজ্যিক আমদানিকারকদের কাছ থেকে কাঁচামাল কিনে থাকেন। বর্তমানে ৬ হাজার ৪৯৩ আইটেমের পণ্য আমদানিতে এটিভি আরোপিত আছে।

দাম বাড়বে-কমবে যেসব পণ্যের : গ্রিন টি, টমেটো কেচাস, টমেটো সস, শেভিং ব্লেড, শেভিং জেল, চশমার ফ্রেম, সানগ্লাস, লুবব্লেন্ডিং ওয়েল, স্ক্র্যাপ, সিগারেট পেপার, সানস্ক্রিন, সিরামিক বাথটব, জিকুজি, শাওয়ার, শাওয়ার ট্রে, নারিকেল, কাজু বাদাম, ক্যালেন্ডার, ছাপানো ছবি (পোস্টার), জার্সি, শীতের কার্টিগান, কাশ্মীরি শাল, যানবাহনের লিফ স্প্রিং, চুলের ক্রিম, শরীরের পশম ওশানের সামগ্রী, সিআর কয়েল, জিপি শিট, সিআই শিট, বিভিন্ন ধরনের পেপারের দাম বাড়বে।

এছাড়া হাতে তৈরি রুটি-বিস্কুট, কেক, প্লাস্টিকের চপ্পল, কৃষি জমি রেজিস্ট্রেশন খরচ কমবে।

এর পাশাপাশি আবাসন খাতের জন্য বাজেটে নতুন আকর্ষণ থাকছে। ছোট ফ্ল্যাট কেনায় ভ্যাট বাড়ানো হয়েছে। ১১শ’ বর্গফুট পর্যন্ত ফ্ল্যাট রেজিস্ট্রেশনে আগে দেড় শতাংশ ভ্যাট দিতে হতো, সেখানে আসন্ন বাজেটে ২ শতাংশ করা হচ্ছে। এছাড়া পুরনো ফ্ল্যাট রেজিস্ট্রেশনে নতুন করে ২ শতাংশ ভ্যাট আরোপ করা হয়েছে।

আমদানি শুল্ক : শুল্ক খাতে খুব পরিবর্তন আসছে না। স্থানীয় শিল্পকে সুরক্ষা দিতে সম্পূরক শুল্ক বহাল রাখা হবে। নতুন নতুন পণ্য যেমন কফি, চকোলেট, নারিকেল, কাজুবাদাম, গ্রিন টি, ক্যালেন্ডার, ছবি, জার্সি, শীতের পোশাকের ওপর সম্পূরক শুল্ক বাড়ানো হয়েছে। পাশাপাশি আমদানি পর্যায়ে ন্যূনতম মূল্য সংশোধন করা হচ্ছে। যুগান্তর।

Please follow and like us:
Facebook Comments