মেসি বিশ্বকাপ জিতলেই শোধ হবে ফুটবলের ঋণ# নেইমারে স্বপ্ন, নেইমারে মুক্তি

ক্রাইমবার্তা রিপোট:বিশ্বকাপ ট্রফির পাশ দিয়ে ধীরে ধীরে এগিয়ে যাওয়ার পথে আড় চোখে তাকালেন। ‍বুকের ভেতর দলা পাকানো যন্ত্রণা মোচড় দিয়ে উঠলো হয়তো, ঘুরিয়ে নিলেন চোখ। যে ট্রফি উঠতে পারতো তার হাতে, তাকে নীরব দর্শক হয়ে দেখার কষ্ট লুকানোর বৃথা চেষ্টাই করলেন লিওনেল মেসি।

আগের বছর কোপা আমেরিকাতেও চেয়ে চেয়ে দেখেছিলেন ট্রফি। ছুঁয়ে দেখার সুযোগ হয়নি তার। বিশ্বকাপের পরের বছর ২০১৬ সালেও একই পরিণতি। আবারও কোপা আমেরিকায় ট্রফি দেখার ‘দর্শক’ বার্সেলোনা ফরোয়ার্ড। টানা তিন বছর ফাইনাল হারের হতাশায় ডুবে যাওয়া মেসি রাগে-দুঃখে অবসরের ঘোষণাই দিয়ে দিলেন আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে!

তাতে আর্জেন্টিনার ২০১৮ সালের বিশ্বকাপে খেলাটাও পড়ে যায় হুমকির মুখে। মেসি তা হতে দেননি। অবসর ভেঙে জাতীয় দলের জার্সি গায়ে ফিরে দুইবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়নদের তুলে নেন ফুটবল মহাযজ্ঞে। ইকুয়েডরের বিপক্ষে বাছাই পর্বের শেষ ম্যাচে জাদুকরী হ্যাটট্রিকে আবারও প্রমাণ করেন তিনি ছাড়া আর্জেন্টিনা সত্যি ‘অচল’।

অচলই তো। লাতিন আমেরিকা অঞ্চলের বাছাইয়ে মেসিকে ছাড়া একটি ম্যাচও জেতেনি আর্জেন্টিনা। অবসর ও তার নিষেধাজ্ঞার কারণেই আসলে বিশ্বকাপের মূল পর্ব নিশ্চিত করতে এতটা কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে আলবিসেলেস্তেদের। ব্রাজিল বিশ্বকাপের কথাই ধরা যাক। বার্সেলোনা ফরোয়ার্ডের পারফরম্যান্সেই গ্রুপ পর্ব পার হয় আর্জেন্টিনা, নকআউট পর্বের শুরুতেও মেসি জাদুতে টপকে যায় সুইজারল্যান্ড বাধা। কিন্তু সেমিফাইনালে নেদারল্যান্ডস বার্সেলোনা তারকাকে বোতলবন্দি করে রাখলে আর্জেন্টিনাও পারেনি ডাচদের গোলমুখ খুলতে। জার্মানির বিপক্ষে ফাইনালেও একই পরিণতি।

তবু সমালোচনার শিকার হতে হয়েছে নিজ দেশের মানুষের কাছে। টানা তিন ফাইনাল হারের পর মেসির পারফরম্যান্স নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। কিন্তু ওই মেসিতেই যখন আর্জেন্টিনা নিশ্চিত করে রাশিয়া বিশ্বকাপের মূল পর্ব, তখন আর্জেন্টাইনদের কাছে দিনের আলোর মতো স্পষ্ট হয়- ‘মেসি ছাড়া সম্ভব নয়’।

রাশিয়ায় এবার আর্জেন্টাইনদের স্বপ্নের পরিধিটা তাই আরও বড়। ১৯৮৬ সালের পর আবার ফুটবল উৎসবে ভাসতে চায় লাতিন আমেরিকার দেশটি। আর সেটা যে মেসিকে কেন্দ্র করে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। প্রত্যেকবারই আর্জেন্টিনা দল সাজায় মেসিকে কেন্দ্র করে, তবে এবার একটু বেশিই। কোচ হোর্হে সাম্পাওলি নিজেই জানিয়েছিলেন, মেসির সঙ্গে যোগাযোগ যাদের ভালো, তাদের নিয়েই তার পরিকল্পনা।

২০০৬ সালের জার্মানির আসর দিয়ে বিশ্বকাপে অভিষেক হওয়া মেসি এবার নামছেন চতুর্থ আসরে। আগের তিন আসরে ফর্মে থাকলেও বার্সেলোনা ফরোয়ার্ড খুশি ছিলেন না ফেডারেশনের দেখভালে। এবার এই সমস্যা নেই, বরং খেলোয়াড়দের যাবতীয় সুযোগ-সুবিধা দিয়েই রাশিয়ায় পাঠিয়েছে আর্জেন্টাইন ফুটবল অ্যাসোসিয়েশেন (এএফএ)।

‘সুখী’ মেসির সঙ্গে থাকছে তার দুর্দান্ত ফর্ম। বার্সেলোনার জার্সিতে লা লিগা ও কোপা দেল রে জিতে জাতীয় দলের বিশ্বকাপ মিশনে নামতে যাচ্ছেন তিনি। শিরোপা উদযাপনের পথে জিতেছেন ‘পিচিচি ট্রফি’ ও ‘ইউরোপিয়ান গোল্ডেন শু’। ইউরোপিয়ান ঘরোয়া ফুটবলে সর্বোচ্চ ৩৪ গোল তার। সব মিলিয়ে ৫৪ ম্যাচে করেছেন ৪৫ গোল। ক্লাব ফুটবলের ফর্মটা ইতিমধ্যে দেখিয়েছেন আর্জেন্টিনার জার্সিতে। বিশ্বকাপে নামার আগে হাইতির বিপক্ষে প্রীতি ম্যাচে হ্যাটট্রিক পূরণ করে প্রতিপক্ষদের সতর্কবার্তা পাঠিয়েছেন পাঁচবারের ব্যালন ডি’অর জয়ী।

ক্লাব ফুটবলে তার শিরোপার অভাব নেই। এক শিরোপাই আছে চার-পাঁচটি করে। ব্যক্তিগত সাফল্যেও ভরা ট্রফিকেস। নেই কেবল জাতীয় দলের কোনও শিরোপা। ২০০৮ সালে অলিম্পিকে সোনা জিতেছেন তাও অনূর্ধ্ব-২৩ দল হিসেবে। আর্জেন্টিনার জার্সিতে এই ব্যর্ততা তাকে আক্ষেপে পোড়ায় খুব, তাই যদি পারতেন ক্লাব কিংবা ব্যক্তিগত কোনও ট্রফি দিয়ে পাল্টে নিতেন বিশ্বকাপ!

মেসির এই আক্ষেপে হতাশার ঢেউ ওঠে ফুটবল মহাসাগরে। যে ঢেউয়ের গর্জনে শোনা যায়, সর্বকালের অন্যতম সেরা খেলোয়াড় বিশ্বকাপ না জেতায় ফুটবল নিজেই ঋণী! খেলাটির রথী-মহারথীরাও মানেন, মেসি বিশ্বকাপ জিতলে তবেই শোধ হবে ফুটবলের ঋণ।

আর্জেন্টিনার জার্সিতে:

ম্যাচ: ১২৪

গোল: ৬৪

বিশ্বকাপ ম্যাচ: ১৫

বিশ্বকাপ গোল: ৫

—–0————

৭-১। সংখ্যাটা দেখলে ব্রাজিলিয়ানরা হয়তো এখনও কেঁপে ওঠেন। এটা তো শুধু সংখ্যা নয়, তাদের কাছে স্বপ্নভঙ্গ, সীমাহীন যন্ত্রণা ও লজ্জার ‘টাইমলাইন’। জার্মানি বিপক্ষে ঘরের মাঠের বিশ্বকাপে ব্রাজিলের অসহায় আত্মসমর্পণের দৃশ্য হাসপাতালের বিছানায় যন্ত্রণায় কাতরে দেখেছিলেন নেইমার। যাকে ঘিরে ষষ্ঠ বিশ্বকাপ জিতে ইতিহাসের দায় শোধ করতে চেয়েছিলেন ব্রাজিলিয়ানরা, তিনি নিজেই ট্র্যাজেডির শিকার!

কলম্বিয়ার বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনালে চোটে পড়ে বিশ্বকাপ শেষ হয়ে যায় তার। দলের সেরা অস্ত্রকে হারিয়ে এলোমেলো ব্রাজিল বিশ্বকাপ ইতিহাসে সবচেয়ে বড় লজ্জার শিকার হয় ৭-১ গোলে বিধ্বস্ত হয়ে। লজ্জার সাগরে ডুবে যাওয়া সেলেসাওদের আবার টেনে তুলেছেন এই নেইমারই। তার পারফরম্যান্স ও আত্মবিশ্বাস সঙ্গী করে ঘুরে দাঁড়িয়েছে ব্রাজিল। এতটা দাপট দেখিয়ে যে সবার আগে রাশিয়া বিশ্বকাপের মূল পর্ব নিশ্চিত করে পাঁচবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়নরা।

প্রশ্নাতীতভাবে, এবারও ব্রাজিলের স্বপ্নের নায়ক নেইমার। প্যারিস সেন্ত জার্মেই ফরোয়ার্ডেই বুনেছিল তারা নতুন স্বপ্ন। কিন্তু সেখানে লাগে বিশাল ধাক্কা! রাশিয়ার প্রতিযোগিতা শুরুর প্রস্তুতির মাঝে অ্যাঙ্কেলের চোটে মাঠের বাইরে ছিটকে যান এই ফরোয়ার্ড। ফরাসি লিগ ওয়ানে অলিম্পিক মার্শেইয়ের বিপক্ষে পাওয়া চোট এতটা গুরুতর ছিল, ছুরি-কাচির নিচে যেতে হয় নেইমারকে। বিশ্বকাপে খেলতে পারবেন কিনা, এই সংশয়ও জন্মে প্রবলভাবে।

যদিও শঙ্কার মেঘ উড়িয়ে দিয়ে ফুটবল মহাযজ্ঞের আগমুহূর্তে ফিরেছেন তিনি শতভাগ ফিট হয়ে। নেইমার যে বিশ্বকাপের জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত, তার প্রমাণ মেলেছে ক্রোয়েশিয়া ও অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে প্রীতি ম্যাচে। চমৎকার পারফরম্যান্সে দুই ম্যাচেই লক্ষ্যভেদ করেছেন সাবেক বার্সেলোনা ফরোয়ার্ড। যাতে অনেকটা সময় মাঠের বাইরে থাকায় নেইমারের পারফরম্যান্স নিয়ে জন্মানো সংশয়ও মিলে গেছে দূর দিগন্তে।

২০১৪ সালে ঘরের মাঠের বিশ্বকাপের শেষ দৃশ্যটা হতাশার হলেও নেইমার শুরুটা করেছিলেন কিন্তু ব্রাজিলের স্বপ্নপূরণের নায়কের মতো করেই। ফুটবল মহাযজ্ঞের প্রথম তিন ম্যাচে ৪ গোল করে নকআউট পর্বে তুলেছিলেন সেলেসাওদের। চোট ও মিনেইরো ট্র্যাজেডিতে সব আশা শেষ হয়ে যাওয়া সাম্বার দেশের মানুষই রাশিয়ায় ‘হেক্সা’ জেতার স্বপ্নে বিভোর। চোট কাটিয়ে নেইমারের ফেরাটা তাদের আরও বেশি আত্মবিশ্বাসী করে তুলেছে।

লিওনেল মেসি ও ক্রিস্তিয়ানো রোনালদোর সঙ্গে সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত হয় এখন নেইমারের নাম। ট্রান্সফার মার্কেটে তিনি ‘হটকেক’। গত গ্রীষ্মের দলবদলে বার্সেলোনা ছেড়ে রেকর্ড ২২২ মিলিয়ন ইউরোতে ব্রাজিলিয়ান তারকা নাম লিখিয়েছেন পিএসজিতে। এক বছর না হতেই আবার শোনা যাচ্ছে প্যারিস ছেড়ে রিয়াল মাদ্রিদে যাচ্ছেন তিনি। নেইমারকে পেতে মাদ্রিদের ক্লাবটি নাকি ৩৫০ মিলিয়ন ইউরো ‍খরচ করতেও রাজি। ইউরোপে যে খেলোয়াড়কে নিয়ে ইউরোর ঝনঝনানি বাজাচ্ছে ক্লাবগুলো, তাকে ঘিরে ব্রাজিলের স্বপ্ন দেখাটা মোটেও বাড়াবাড়ি নয়।

ড্রিবলিং, গতি ও দুর্দান্ত শুটিংয়ে প্রতিপক্ষদের ঘায়েল করতে জুড়ি নেই নেইমারের। নিজে যেমন গোল করেন, তেমনি সতীর্থদের জন্যও তৈরি করেন গোলের সুযোগ। বিশ্বকাপে ব্রাজিলের এগিয়ে যাওয়ার পথটা লম্বা হবে তার পারফরম্যান্সের ওপরই। যেমনটা দেখা গেছে বিশ্বকাপ বাছাইয়ে। লাতিন আমেরিকা অঞ্চলের বাছাইয়ে খেলা ১৪ ম্যাচে করেছেন তিনি ৬ গোল। প্রয়োজনের সময় দলের জন্য গোল করে গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট এনে দেওয়ায় সবার আগে বিশ্বকাপের টিকিট পায় ব্রাজিল।

২০১৪ বিশ্বকাপে নেমেছিলেন অনভিজ্ঞ ও তরুণ নেইমার। এবার তিনি আগের চেয়ে অনেক বেশি পরিণত ও অভিজ্ঞ। আগের চেয়ে দায়িত্ব যেমন বেড়েছে, তেমনি প্রত্যাশার চাপও বেশি। প্রতিপক্ষের চেয়ে এই জায়গাতেই নেইমারের বড় পরীক্ষা।

ব্রাজিলের ‘হেক্সা’ মিশন পূরণ করতে এই পরীক্ষা উতরাতেই হবে নেইমারকে।

ব্রাজিলের জার্সিতে:

ম্যাচ: ৮৫

গোল: ৫৫

বিশ্বকাপ ম্যাচ: ৫

বিশ্বকাপ গোল: ৪

Please follow and like us:
Facebook Comments