আওয়ামী লীগ চাপা দিতে পারছে না তাদের নির্বাচনী অপকৌশল

সরদার আবদুর রহমান : খুলনা-গাজীপুর নির্বাচনে ভোট কারচুপির নয়া স্টাইল প্রয়োগে বেজায় উদ্বুদ্ধ হয়েছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। তবে নানাভাবে এর পক্ষে প্রচারণা চালালেও তাদের এই নির্বাচনী ‘অপকৌশল’ চাপা দিয়ে রাখা যাচ্ছে না। এনিয়ে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মহলের প্রকাশিত প্রতিক্রিয়ায় বিপদে সরকারি মহল। এদিকে নির্বাচনে এমন ‘অনৈতিক’ কর্মকা-কে বৈধতা দিতে এর পক্ষে সাফাই গেয়ে চলেছেন সরকারি দলের নেতা ও ইসি-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
দেশে সর্বশেষ অনুষ্ঠিত খুলনা-গাজীপুর নির্বাচনে কৌশলের নামে যে ‘অপকৌশল’ প্রয়োগ করা হয়েছে তা অতীতেও ছিলো। তবে তার একমাত্র ব্যবহার ছিলো না। অনুসন্ধানী রিপোর্ট এবং বিভিন্ন সংস্থার তদন্তে জানা যায়, এই দু’টি নির্বাচনে প্রধানত দু’টি প্রক্রিয়া নেয়া হয়। এক. কেন্দ্রগুলোকে নানাভাবে প্রতিপক্ষের এজেন্টশুন্য করে রাখা এবং দুই. বুথ ফাঁকা করে দিয়ে ব্যালটে সিল মেরে পরে বাক্সে ভরা। বিশেষ করে গাজীপুরের নির্বাচনে এই দু’টি ‘অপকর্ম’ সুচারুরূপে সম্পন্ন করা হয় বলে অভিযোগ উঠে। নির্বাচন কর্তৃপক্ষের কাছে এসব বিষয়ে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ করার মতোও কোন সুযোগ রাখা হয়নি। খুলনায় অন্যসব ‘অপকৌশল’ ছাড়াও বাড়ি থেকে ব্যাপকহারে আটক করার মাধ্যমে নির্বাচনী মাঠ প্রতিপক্ষশূন্য রাখার ব্যবস্থা করা হয়। আর গাজীপুর সিটি নির্বাচনে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারীদের একাংশকে ব্যবহার করে বিরোধী এজেন্টদের এলাকা ছাড়া করার ব্যবস্থা নেয়া হয় এবং এই সুযোগে নির্বাচনসংশ্লিষ্ট একটি অংশকে ব্যবহার করে ব্যালট পেপারে একতরফা সিল মেরে বাক্স ভর্তি করা হয় বলে অভিযোগ উঠে। বিএনপির অভিযোগ, এই ভোট কার্যক্রমে সরকারি যন্ত্রকে পুরোদমে ব্যবহার করা হয়েছে দলীয় প্রার্থীর বিজয় নিশ্চিত করতে। এবিষয়গুলো বিভিন্নভাবে প্রকাশিত হয়েছে পরবর্তী পর্যবেক্ষণ ও প্রতিক্রিয়ায়।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়া : গত ২৬ জুন অনুষ্ঠিত গাজীপুরের নির্বাচন নিয়ে বাংলাদেশের বিভিন্ন উন্নয়ন ও অগ্রগতিমূলক প্রক্রিয়ার অন্যতম বৃহৎ অংশীদার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রকাশিত উদ্বেগ ছিলো সবচেয়ে আলোচিত। ২৮ জুন বাংলাদেশে নিযুক্ত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত মার্শা স্টিফেনস ব্লুম বার্নিকাট এই প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করেন। এসংক্রান্ত প্রকাশিত বিভিন্ন রিপোর্টে উল্লেখ করা হয় : রাষ্ট্রদূত বার্নিকাট বলেন, খুলনার মতো গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে ব্যাটল বাক্স ছিনতাই ও পোলিং এজেন্টদের ভয়ভীতি দেখানোর অভিযোগ রয়েছে। গাজীপুরের এ নির্বাচন নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বেগের কথাও জানিয়েছেন তিনি। জাতীয় প্রেসক্লাবে ডিপ্লোম্যাটিক সাংবাদিক অ্যাসোসিয়েশনের (ডিক্যাব) এক মতবিনিময় সভায় তার দেশের উদ্বেগের কথা জানান বার্নিকাট। তিনি বলেন, গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে ব্যালট পেপার চুরি, ভুয়া ভোট প্রদান, শতাধিক পোলিং এজেন্টকে বের করে দেয়া ও গ্রেফতারসহ বিভিন্ন অভিযোগ রয়েছে। সিটি নির্বাচন এমন হলে জাতীয় নির্বাচনেও তার প্রভাব পড়বে বলে মন্তব্য করেন তিনি। বার্নিকাট বলেন, গণতান্ত্রিক দেশে সুষ্ঠু নির্বাচন খুবই প্রয়োজন, তবে সেটি শুধু ভোটের দিন নয়, এর কার্যক্রম অনেক আগে থেকেই শুরু করতে হবে। জনগণ যাতে তার পছন্দের মানুষকে ভোট দিতে পারে সে বিষয়টি নিশ্চিত করার আহ্বান জানান তিনি। অনুষ্ঠানে মার্শা বার্নিকাট বলেন, বাংলাদেশ সরকার একটি অবাধ, সুষ্ঠু, অংশগ্রহণমূলক ও বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন আয়োজনে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ, যে নির্বাচনে জনগণের মতামতের প্রতিফলন ঘটবে। আমরা দেখতে চাই, সরকার তার অঙ্গীকার পূরণ করবে।’ এসংক্রান্ত রিপোর্টে আরো উল্লেখ করা হয়, গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে অভিযোগ আছে, এজেন্টদের কেন্দ্রছাড়া করার ক্ষেত্রে নেয়া হয়েছে অভিনব কৌশল। আর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের একটি অংশকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। কয়েকজন প্রত্যক্ষদর্শী বলেন, মূলত বিএনপির মেয়র প্রার্থীর এজেন্টদের কেন্দ্রছাড়া করার পরই বিভিন্ন কেন্দ্রে ব্যালটে সিল মেরে বাক্সভর্তি করার ঘটনাগুলো ঘটেছে। এতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও নির্বাচন-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের একটা অংশের বড় ভূমিকা ছিল।
ইলেকশন ওয়ার্কিং গ্রুপ : গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে অর্ধেকের কাছাকাছি ভোটকেন্দ্রে অনিয়মের ঘটনা ঘটেছে বলে দাবি করে নির্বাচন পর্যবেক্ষক সংস্থা ইলেকশন ওয়ার্কিং গ্রুপ (ইডব্লিউজি)। ২৮ জুন এক সাংবাদিক সম্মেলনে সংস্থাটির পরিচালক ড. মো. আব্দুল আলীম গাজীপুর সিটি নির্বাচন নিয়ে প্রাথমিক প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলেন, তাদের পর্যবেক্ষকৃত কেন্দ্রগুলোর মধ্যে ৪৬.৫ শতাংশ কেন্দ্রে বিভিন্ন অনিয়মের ঘটনা ঘটে। আব্দুল আলিম বলেন, ইডব্লিউজি যেসব ভোটকেন্দ্র পর্যবেক্ষণ করেছে সেগুলোর ৪৬ দশমিক ৫ শতাংশ কেন্দ্রে  নির্বাচনী অনিয়মের ঘটনা ঘটেছে। তিনি আরো বলেন, ১২৯টি নির্বাচনী কেন্দ্র পর্যবেক্ষণ করে দ্বৈবচয়নের মাধ্যমে এসব অনিয়ম বের করা হয়। পর্যবেক্ষণকৃত এসব  ভোট কেন্দ্রে ভোট দেয়ার হার ৬১.৯ শতাংশ। এর মধ্যে অনিয়মের ঘটনা আছে ১৫৯টি। এসব অনিয়মের বেশিরভাগই হয়েছে দুপুরে। এসব অনিয়মের মধ্যে রয়েছে, জোর করে ব্যালট পেপারে সিল মারা, ভোট কেন্দ্রের ৪০০ গজ ব্যাসার্ধের ভেতরে নির্বাচনী প্রচারণা চালানো এবং ভোট কেন্দ্রের ভেতরে অননুমোদিত ব্যক্তির অবস্থান।
বিবিসি’র খুলনা পর্যবেক্ষণ : খুলনা সিটি নির্বাচন নিয়ে বিবিসি’র পর্যবেক্ষণে বলা হয় – সাধারণ মানুষের অভিযোগ, অনেকে ওপেন জালভোট দিয়েছে, অনেকে ভোট দিতে এসে ফিরে গেছে, ভোট দিতে পারেনি। বিএনপির প্রার্থীর অভিযোগ, ৪০টি কেন্দ্রে তাদের এজেন্টদের ঢুকতে দেয়া হয়নি। কোথাও ভয়-ভীতি দেখিয়ে এবং কোথাও মারধর করে বের করে দেয়া হয়েছে। এমন অভিযোগও পাওয়া যায় যে আওয়ামী লীগের কর্মীরা দেখানোর জন্য ধানের শীষের ব্যাজ পরে বিএনপির প্রার্থীর এজেন্ট সেজে বসে আছে। কিছু কেন্দ্র ঘুরে দেখা গেছে, বিএনপির এজেন্টরা সত্যিই অনুপস্থিত। আর অন্যদিকে, সব কেন্দ্রে এবং কেন্দ্রের বাইরে নৌকা মার্কার ব্যাজপরা কর্মীদের ব্যাপক উপস্থিতি। ভোটকেন্দ্রগুলো কার্যত নৌকার কর্মীদের টহল এবং নিয়ন্ত্রণে ছিল বলেই মনে হয়। পরিচয় গোপন রেখে কয়েকজন জানান, কিছু কেন্দ্রে দলবেঁধে ঢুকে ২০-২৫ মিনিটের মধ্যে  ভোট কাটার ঘটনা ঘটেছে। প্রকাশ্যে কোনো দাঙ্গা হাঙামা না বাঁধিয়ে সুকৌশলে কাজ হয়েছে। ব্যালট বাক্স থেকে বের করে গণনার সময় দেখা গেছে কিছু ব্যালটের পেছনে সিল এবং স্বাক্ষর আছে। কিছু ব্যালটের  পেছনে সিলমোহর আছে কিন্তু স্বাক্ষর নেই। আবার কিছু সিল স্বাক্ষর কিছুই নেই। নির্বাচনী কর্মকর্তারা ভোট গণনার এক পর্যায়ে স্বাক্ষরবিহীন ব্যালট প্রিজাইডিং অফিসারকে দেখালে তিনি তা অবৈধ ঘোষণা করেন। পরক্ষণেই একইরকম একগাদা ব্যালট তার হাতে দেয়া হলে তিনি অপ্রস্তুত হয়ে পড়েন। ওই সবগুলো ব্যালটই ছিল নৌকা মার্কায় দেয়া ভোট। পরে ভোটকেন্দ্রে অবস্থানরত পুলিশের সঙ্গে পরামর্শ করে প্রিজাইডিং অফিসার ব্যালটে স্বাক্ষরবিহীন ভোট বৈধ হিসেবে গণনার নির্দেশ দেন। এরপর আর ব্যালটে স্বাক্ষর আছে কিনা সেটি খতিয়ে দেখা হয়নি। এ ব্যাপারে রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আইনত এসব ভোট বাতিল হওয়ার কথা। কিন্তু স্বাক্ষরবিহীন সব ব্যালটকে বৈধ ধরে নিয়েই গণনা হয়েছে ১৮৬ নম্বর কেন্দ্রে। ওই কেন্দ্রে নৌকা মার্কা পেয়েছে ১১৫৬ ভোট আর ধানের শীষ পেয়েছে ১৩৩ ভোট। ওই কেন্দ্রে বিএনপি প্রার্থীর কোনো এজেন্ট উপস্থিত ছিল না। কেন্দ্রের গণনা শেষে ফলাফল নির্ধারণ হওয়ার পর প্রিজাইডিং অফিসারের কাছে বিষয়টি জানতে চাইলে তিনি মন্তব্য না করেই দ্রুত বেরিয়ে যান। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন বলেন, ‘হুমকি দিয়েছে যে, কথা না শুনলে একজনও বাড়িতে ফিরতে পারবে না।’ তার ভাষায় “এরে নির্বাচন কয় না।”
সুজন’র পর্যবেক্ষণ : খুলনা মডেলে গাজীপুরেও ‘নিয়ন্ত্রিত নির্বাচন’ হয়েছে বলে মন্তব্য করে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)। আগামী জাতীয় নির্বাচনেও একই মডেল বাস্তবায়ন করা হতে পারে বলে সংগঠনটি আশংকা প্রকাশ করে। গত ৫ জুলাই এক সাংবাদিক সম্মেলনে সুজন জানায়, খুলনার মতো গাজীপুরেও আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহায়তায় প্রধান প্রতিপক্ষকে মাঠছাড়া করা হয়েছে। বিএনপি প্রার্থীর পোলিং এজেন্টদের দায়িত্ব পালনে বাধা দেয়া হয়েছে। নির্বাচনের দিন সাময়িকভাবে কেন্দ্র দখল করে জালভোট প্রদান, ভোটকেন্দ্রে এবং এর আশেপাশে ভীতিকর ও বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির সৃষ্টি এবং ভোট প্রদানে বাধা দানের ঘটনা ঘটেছে। খুলনার মতো গাজীপুরের নির্বাচনেও বহু অনিয়ম ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হয়রানি ও বাড়াবাড়ির অভিযোগ উত্থাপন করা হয়েছে, যা সম্পর্কে নির্বাচন কমিশন ছিল নির্বিকার।
বিএনপির প্রত্যাখ্যান : খুলনার মতো গাজীপুরের নির্বাচনের ফলাফল ‘ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান’ করে বিএনপি। বেসরকারি ফলাফল ঘোষণার পর ২৭ জুন সাংবাদিক সম্মেলনে এই প্রতিক্রিয়া জানান বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি  বলেন, গাজীপুরে নির্বাচনের নামে শুধু একটি তামাশা হয়েছে। ভোট ডাকাতির নতুন নতুন কৌশল আবিষ্কার করে তা প্রয়োগ করেছে। আমরা গাজীপুর সিটি নির্বাচনের ফলাফল ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করছি। আমরা এই নির্বাচনের ফলাফল বাতিল করে পুনরায় নির্বাচন অনুষ্ঠানের দাবি জানাচ্ছি। জনগণকে এই ভোট ডাকাতির বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়ার আহ্বান জানাচ্ছি। মির্জা আলমগীর অভিযোগ করে বলেন, খুলনায় নতুন কৌশলে ভোট ডাকাতি করে তারই ধারাবাহিকতায় গাজীপুরে এই নির্বাচন হয়েছে। আওয়ামী লীগ সম্পূর্ণভাবে গণবিচ্ছিন্ন হয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, প্রশাসন ও নির্বাচন কমিশনকে ব্যবহার করে নির্বাচনের ফলাফল নিজেদের পক্ষে নিয়েছে। জনগণ তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেনি। তিনি বলেন, নির্বাচন কমিশনের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় সরকার গাজীপুরের আমাদের বিজয় ছিনিয়ে নিয়েছে। তারা রাষ্ট্রযন্ত্রকে ব্যবহার করেছে। গণমাধ্যমকে হুমকি দিয়ে সত্য প্রকাশ থেকে বিরত রাখার চেষ্টা করেছে। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতা কুক্ষিগত করার জন্য স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও নির্লজ্জভাবে একের পর এক নির্বাচনে ভোটডাকাতি করে সকল নির্বাচনী ব্যবস্থাকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করছে। স্থায়ী কমিটির সদস্য আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, এটা পরিষ্কার হয়ে গেছে- সরকার একটি নির্বাচনী প্রকল্প করেছে, তার অংশ হিসেবে খুলনায় যা ঘটিয়েছিল, গাজীপুরেও তারা একই কাজ করেছে। নীল নকশার অংশ হিসেবে পুলিশের একটি অংশ যারা দলীয় পুলিশ, নির্বাচন কমিশন সকলে মিলে একের পর এক নির্বাচনকে কব্জা করছে তারা।  গণতন্ত্র ফিরে পেতে হলে এই নির্বাচনী প্রকল্পকে ভেঙে দিতে হবে। আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী অপর এক অনুষ্ঠানে প্রতিক্রিয়া জানিয়ে অভিযোগ করেন, ‘আওয়ামী লীগ নয়, গাজীপুরের নির্বাচন করেছে পুলিশ। তাদের সহযোগী ছিল নির্বাচন কমিশন।’ তিনি বলেন, ‘আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের এখন নির্বাচন করতে হয় না। তাদের কাজ করে দেয় ডিবি, পুলিশ এবং অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একটি অংশ। গাজীপুর ও খুলনা নির্বাচন আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা করেনি। এগুলো করেছে পুলিশ, ডিবি। আর নির্বাচন কমিশন তাদের সহযোগিতা করেছে।’
উদ্বুদ্ধ সরকারি মহল : খুলনা ও গাজীপুরের নির্বাচনের প্রক্রিয়া নিয়ে যতই বিরূপ ও বিরুদ্ধ প্রতিক্রিয়া থাকুক- এর প্রতি আমল দিতে রাজি নয় সরকারি মহল। বরং এই প্রক্রিয়ায় নিজেদের পক্ষে বিজয় নিতে সক্ষম হওয়ায় একেই তারা মোক্ষম কৌশল ভাবছে। তাদের মতে, এই প্রক্রিয়ায় নির্বাচন ভবিষ্যতে আরো বিজয়ী হওয়ার পথ দেখাবে। গত ৩০ জুন প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি বলেন, ‘গাজীপুরের এই বিজয় দলকে ভবিষ্যতে বিজয়ী হবার পথ দেখাবে।’ গাজীপুর সিটির নবনির্বাচিত মেয়র অ্যাডভোকেট জাহাঙ্গীর আলম নির্বাচিত কমিশনার এবং স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাদের নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করাকালে তিনি বলেন, ‘গাজীপুরের জয়ে এটাই প্রমাণ হয়েছে আওয়ামী লীগ যদি ঐক্যবদ্ধ থাকে, যদি কোন কিছু অর্জন করার জন্য দৃঢ় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয় তখন কেউ তাকে বাধা দিয়ে থামিয়ে রাখতে পারে না।’
যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি ক্ষোভ : সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূতের বক্তব্যের পর একের পর এক সমালোচনা করে চলেছেন সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার তথ্য ও যোগাযোগ-প্রযুক্তি বিষয়ক উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয় বলেছেন, বাংলাদেশে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাস বিএনপির মুখপাত্রে পরিণত হয়েছে। গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে অনিয়মের অভিযোগে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত মার্শা বার্নিকাটের উদ্বেগ প্রকাশের প্রেক্ষাপটে জয় তার ফেসবুকে দেয়া এক স্ট্যাটাসে এ কথা বলেন। সজীব ওয়াজেদ জয় তাঁর পোস্টে লিখেছেন, ‘বাংলাদেশে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাস অনেকটা বিএনপি’র মুখপাত্রে পরিণত হয়েছে। সম্প্রতি গাজীপুরে অনুষ্ঠিত সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন নিয়ে বিএনপি’র মন্তব্যগুলোই তারা পুনরাবৃত্তি করছে এবং অনিয়মের কথা বলছে। অথচ নির্বাচনে বিএনপি’র সহিংসতা চালানোর চেষ্টা নিয়ে কিছুই বলছে না।’ গাজীপুর সিটি নির্বাচন নিয়ে মার্কিন রাষ্ট্রদূতের এভাবে কথা বলা উচিত হয়নি বলে মন্তব্য করেন বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ। গত ১ জুলাই সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, ‘মার্কিন রাষ্ট্রদূতের বক্তব্য অনভিপ্রেত। একটা  দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয় নিয়ে আরেকটা  দেশের রাষ্ট্রদূতের কথা বলা সমীচিন নয়। এটা দৃষ্টিকটূ হয়েছে বলে মনে করি।’ যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূতের বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘উভয় দেশের জনগণের মাঝে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয় এমন মন্তব্য থেকে সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। তাহলে বিদ্যমান বন্ধুত্বের সম্পর্ক ঠিক থাকবে।’ এছাড়া খোদ নির্বাচন কমিশনের একজন সদস্যও এনিয়ে প্রতিক্রিয়া দেখান। খুলনা ও গাজীপুর সিটি নির্বাচনের পর মার্কিন রাষ্ট্রদূতের বক্তব্যকে ‘শিষ্টাচার বহির্ভূত’ বলে মন্তব্য করেন নির্বাচন কমিশনার (ইসি) রফিকুল ইসলাম। গত ৩০ জুন রাজশাহীতে সিটি নির্বাচন উপলক্ষে আয়োজিত এক কর্মশালা শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, গণতন্ত্রের ফেরিওয়ালা যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনের সুষ্ঠুতা নিয়ে প্রশ্ন আছে। সিনেট কমিটি নির্বাচন নিয়ে তদন্ত করছে। সুতরাং রাষ্ট্রদূত এ দেশের নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারেন না। ‘শিষ্টাচার বহির্ভূত’ এ মন্তব্য কাম্য নয়।
এটা যুক্তরাষ্ট্রেরই বক্তব্য : সম্প্রতি অনুষ্ঠিত দু’টি সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন নিয়ে বাংলাদেশে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত মার্শিয়া ব্লুুম বার্নিকাট যে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন, এটি রাষ্ট্রদূত বার্নিকাটের নিজস্ব মন্তব্য নয়- বরং এই মন্তব্যের মাধ্যমে তিনি বাংলাদেশ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রণালয় স্টেট্ ডিপার্টমেন্টের অবস্থানকেই তুলে ধরেছেন’ বলে ৬ জুলাই  মন্তব্য করে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর। বিদেশে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূতরা নিজেদের ব্যক্তি মতামত নয়, বরং মার্কিন সরকারের অবস্থান তুলে ধরেন। উল্লেখ্য, গত সপ্তাহের শেষ কর্মদিবস বৃহস্পতিবার এক অনুষ্ঠানে মার্কিন রাষ্ট্রদূত মার্শা বার্নিকাট বলেছিলেন, গাজীপুর সিটি নির্বাচনে অনিয়মের খবরে যুক্তরাষ্ট্র উদ্বিগ্ন। খুলনা সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে অনিয়ম ও কারচুপির অভিযোগ ওঠার পর এ নির্বাচন নিয়েও একই ধরনের অভিযোগ ওঠায় উদ্বেগ বেড়েছে। স্টেট্ ডিপার্টমেন্টের মুখপাত্র নলেন জনসন এক লিখিত বিবৃতিতে বলেন, রাষ্ট্রদূত বার্নিকাট কেবলমাত্র এবং একমাত্র একটি একক এন্টিটির পক্ষে কথা বলেন, সেই একক এনটিটি হচ্ছে মার্কিন সরকার। মুখপাত্র বলেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের সংবিধান কর্তৃক বাংলাদেশের মানুষকে প্রদত্ত অধিকার অনুযায়ী একটি ন্যায্য, স্বচ্ছ ও অহিংস গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার পক্ষে ধারাবাহিকভাবে সমর্থন জানিয়ছেন। ‘মার্কিন সরকার কোনো প্রার্থী বা দলকে সমর্থন করে না’ উল্লেখ করে লিখিত বিবৃতিতে মুখপাত্র আরো বলেন, গণতান্ত্রিক নীতি ও আদর্শগুলোই আমাদের মিত্রদের সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী জোট এবং অংশীদারিত্বের ভিত্তি গঠন করে এবং আমাদের মিত্র গণতন্ত্রগুলো যেন চ্যাম্পিয়ন হতে পারে সে প্রচেষ্টা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র অব্যাহতভাবে চালিয়ে যাবে।’dailysangram

Please follow and like us:
Facebook Comments