আওয়ামী লীগের টার্গেট অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন

ক্রাইমবার্তা রিপোট:   সরকারি দল আওয়ামী লীগের টার্গেট এবার অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ বিশ্বও চায় আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক হোক। ৫ জানুয়ারির বিতর্ক ঘুচিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে গ্রহণযোগ্যতা পেতেই মূলত এ কৌশল কাজে লাগানো হচ্ছে। তারই অংশ হিসেবে আসন্ন নির্বাচনে সর্বোচ্চ সংখ্যক নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণের বিষয়ে ইতিবাচক মনোভাব দেখাচ্ছে আওয়ামী লীগ। এর পাশাপাশি নির্বাচন গ্রহণযোগ্যতা পেতে ও প্রাণবন্ত করতে ছোট ছোট অনিবন্ধিত রাজনৈতিক দলকে কিছু প্রণোদনা দিয়ে অংশীদার করতে চায় ক্ষমতাসীনেরাÑ নীতিনির্ধারণী পর্যায় সূত্রে এমন আভাস পাওয়া গেছে।
সূত্রে জানা গেছে, ক্ষমতাসীন জোট ও জোটের বাইরে ৩৬টি নিবন্ধিত দল নিয়ে কাজ করছে সরকার। ছোট ছোট অনিবন্ধিত দলের সাথেও বিভিন্ন মাধ্যমে আলাপ-আলোচনা চলছে। তবে বিএনপির বিষয়ে কোনো ছাড় দেবে না ক্ষমতাসীনেরা। এমনকি আগামী নির্বাচনে বিএনপির সংলাপ বা নির্বাচনকালীন সরকারের দাবির বিষয়ে সরকারের তরফ থেকে কোনো ইতিবাচক মনোভাব দেখানো হবে না।
গত ৫ জুলাই সংসদ ভবনে আ’লীগের সংসদীয় দলের বৈঠকে এমপিদের উদ্দেশে আওয়ামী লীগ প্রধান ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, আগামী নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হবে। এতে সব রাজনৈতিক দল অংশ নেবে। এ বিষয়টি মাথায় রেখে সেভাবে নির্বাচনের প্রস্তুতি নিতে হবে।

আ’লীগের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একাধিক নেতার মতে, ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের আগে বিএনপিকে বিভিন্নভাবে প্রস্তাব দেয়া হয়েছিল। নির্বাচনকালীন সরকারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মতো বড় মন্ত্রণালয় দেয়ারও আশ্বাস দেয়া হয়েছিল। এমনকি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সংলাপের বিষয়ে ইতিবাচক ছিলেন বলেই কোকোর মৃত্যুর খবর শুনে সমবেদনা জানানোর জন্য খালেদা জিয়ার গুলশানের বাসায় গিয়েছিলেন। কিন্তু বিএনপি নেত্রী কী করলেন! দরজা বন্ধ করে দিলেন। প্রধানমন্ত্রীকে ঘরে ঢুকতে দিলেন না। তখন থেকেই মূলত সংলাপের দরজা বন্ধ হয়ে গেছে। এর আগেও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা খালেদা জিয়াকে ফোন করে কোনো সাড়া পাননি। উল্টো শেখ হাসিনাকে অপমানিত হতে হয়েছে। ফলে আগামী নির্বাচনে বিএনপিকে আনুষ্ঠানিকভাবে সংলাপের জন্য ডাকার প্রশ্নই আসে না। বিএনপি ছাড়াও অনেক নিবন্ধিত ও অনিবন্ধিত রাজনৈতিক দল আছে। ওই দলগুলো নির্বাচনে এলেই অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের কোটা পূরণ হবে। ওই নির্বাচন বিদেশী বন্ধুদের কাছেও গ্রহণযোগ্যতা পাবে।

দলটির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের নেতারা মনে করেন, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপিকে আনতেই হবে বা বিএনপির নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে হবে বিষয়টি এ রকম নয়। গত নির্বাচনে ১৫৩ জন এমপি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়ার ফলে বিএনপি আন্তর্জাতিক বিশ্বকে দেখাতে পেরেছিল। এবার আ’লীগ ওই ফাঁদে পা দেবে না। এবার অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন উপহার দেয়ার জন্য সরকার কাজ করছে। বিএনপি অংশগ্রহণ না করলেও নিবন্ধিত অন্য অনেক দল আছে যারা নির্বাচনে এলে গ্রহণযোগ্যতা পাবে। সবার কাছে নির্বাচন গ্রহণযোগ্যতা পেতে বিএনপির অংশগ্রহণ কোনো ফ্যাক্টর নয়। অধিকসংখ্যক নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল নির্বাচনে অংশগ্রহণ করাটাই বড় কথা।

এ প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছেন, ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচন হয়েছে নিয়ম অনুযায়ী। এখন আগামী নির্বাচনে বিএনপি না এলে সময় ও স্রোত তো অপেক্ষা করবে না। সংবিধান ও গণতন্ত্র কারো জন্য অপেক্ষা করবে না। ৫ জানুয়ারির ভুলের পুনরাবৃত্তি হলে ভুলের মাশুল বিএনপিকেই দিতে হবে। তিনি বলেন, আগামী নির্বাচনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতার ফাঁদে ফেলার খোয়াব দেখে লাভ নেই। বিএনপি না এলেও তারা ছাড়া বাকি সব নিবন্ধিত দলই আসবে। নিবন্ধিত দল তো আরো ৩৬টি আছে। কোনো অসুবিধা আছে?

আ’লীগ ও সরকারের সূত্রগুলো জানায়, আদালতে সাজা হওয়ায় বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া আগামী জাতীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারবেন না বলে মনে করছে আ’লীগ। আর খালেদা জিয়া নির্বাচনে অংশ নিতে না পারলে বিএনপিও নির্বাচনে আসার সম্ভাবনা ক্ষীণ। সে জন্য বিতর্ক এড়াতে নিবন্ধিত ছোটখাটো রাজনৈতিক দলগুলোকে নির্বাচনমুখী করা হবে। এ ক্ষেত্রে দলগুলোকে বিভিন্ন ধরনের প্রণোদনাসহ যা যা করার তার সবই করবে সরকার। বিএনপি অংশ না নিলে মহাজোট থেকে বের করে দিয়ে নির্বাচনে প্রধান বিরোধী দল হিসেবে স্থান দেয়া হবে জাতীয় পার্টিকে। আর ১৪ দলীয় জোটের কলেবর না বাড়িয়ে সমমনা সব রাজনৈতিক দলকে আলাদা নির্বাচনের পরামর্শ দেয়া হবে। প্রত্যেক দলকে সুবিধামতো আসনে নির্বাচন করার মতো পরিবেশ তৈরি করে দেয়া হবে।

এর আগে ২০১৪ সালে অনুষ্ঠিত সর্বশেষ জাতীয় নির্বাচনটি নবম জাতীয় সংসদের প্রধান বিরোধী দল বিএনপিসহ বেশির ভাগ দলই বর্জন করে এবং শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আ’লীগ ও স্বতন্ত্রসহ মাত্র ১৭টি দল নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে। এ ছাড়া নির্বাচনে ৩০০ আসনের মধ্যে ১৫৩টি আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় প্রার্থীরা বিজয়ী হওয়ায় নির্বাচন নিয়ে চরম বিতর্কের সৃষ্টি হয়।

সরকারি হিসাব মতে, ৫ জানুয়ারির ওই নির্বাচনে দেশের মোট ৯,১৯,৬৫,৯৭৭ ভোটারের মধ্যে মাত্র ৪,৩৯,৩৮,৯৩৮ জন ভোটার ভোট দেয়ার সুযোগ পান। বেসরকারি অনেক সংস্থার মতে, নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী ভোটারের সংখ্যা একেবারেই কম। দেশের তৎকালীন প্রধান বিরোধী জোটের বর্জনের মুখে অনুষ্ঠিত একতরফা ওই নির্বাচন নিয়ে দেশ-বিদেশে ব্যাপক প্রশ্ন ও সমালোচনার মধ্যে পড়ে ক্ষমতাসীন আ’লীগ। সব রাজনৈতিক দলকে নিয়ে একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের চাপের মুখে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ওই নির্বাচনকে নিয়ম রক্ষার নির্বাচন হিসেবে আখ্যা দিয়ে খুব শিগগিরই আরেকটি নির্বাচন অনুষ্ঠানের ঘোষণা দেন। তবে সেই নির্বাচন আয়োজনে আর কোনো উদ্যোগ নেয়া হয়নি।

বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া বর্তমানে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলার রায়ে কারাগারে রয়েছেন। এ ছাড়া তার বিরুদ্ধে নাশকতার একাধিক মামলা রয়েছে। কোনো মামলায় জামিন হলে অন্য একটি মামলায় তাকে পুনরায় গ্রেফতার দেখানো হচ্ছে। এভাবে আগামী নির্বাচন পর্যন্ত সময় পার করতে চায় সরকার। ফলে নির্বাচনের আগে তার কারামুক্তি নিয়ে কেউ কিছু বলতে পারছেন না। ফলে তিনি আগামী নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন কি না তা একেবারেই অনিশ্চিত।

এ দিকে খালেদা জিয়াবিহীন নির্বাচন কোনোভাবেই হতে দেয়া হবে না বলে হুঁশিয়ার করছেন বিএনপির নেতারা। তাকে জেলে রেখে বিএনপি নির্বাচনে যাবে না বলেও সাফ জানিয়ে দিয়েছেন তারা। আ’লীগের সম্পাদকমণ্ডলীর একাধিক নেতা বলেন, উদ্ভূত পরিস্থিতিতে বিএনপি এবারো নির্বাচনে আসবে বলে মনে হয় না। আর তারা না এলে আ’লীগ আদর্শিক জোট ১৪ দলের সাথে মিলে নির্বাচন করবে। অন্য দিকে নির্বাচনী জোট থেকে জাতীয় পার্টিকে বের করে দিয়ে আলাদা নির্বাচন করা হবে। এ ছাড়া নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধিত ছোটখাটো সব রাজনৈতিক দলকে নির্বাচনে নিয়ে আসা হবে। কাউকে বিএনপির অভাব বুঝতে দেয়া হবে না। পাশাপাশি ভোটের হার বাড়ানোর ওপর এবার বিশেষ নজর দেয়া হবে।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে আ’লীগের অন্যতম মুখপাত্র ড. হাছান মাহমুদ এমপি নয়া দিগন্তকে বলেন, আমরা চাই বিএনপি নির্বাচনে অংশগ্রহণ করুক। গত নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করে যে ভুল করেছে এবার হয়তো সে ভুল বিএনপি করবে না। তবে বিএনপি নির্বাচনে না এলেও নির্বাচনে অংশ নেয়ার মতো অনেক রাজনৈতিক দল আছে।
এ প্রসঙ্গে আ’লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য লে. কর্নেল (অব:) মুহাম্মদ ফারুক খান  বলেন, আমরা বিশ্বাস করতে চাই, বিএনপি আগামী জাতীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবে। কারণ তারা একটি প্রতিনিধিত্বশীল রাজনৈতিক দল। তারা এ দেশের কিছু জনগণেরও প্রতিনিধিত্ব করে। তিনি বলেন, যদি বিএনপি নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করে তাহলেও নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক হবে। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনেও বেশ কয়েকটি রাজনৈতিক দল অংশ নিয়েছিল। বিশ্বের অন্যান্য দেশে দু-তিনটি রাজনৈতিক দল নির্বাচনে অংশ নিলেই নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক হয়। তাই আমি মনে করি, বিএনপি নির্বাচনে না এলেও নির্বাচনে কোনো প্রভাব পড়বে ন।

আ’লীগের প্রবীণ রাজনীতিবিদ ও বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের ভাইস চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট ইউসুফ হোসেন হুমায়ুন  বলেন, বিএনপি অংশগ্রহণ করবে কি করবে না এটা তাদের নিজস্ব ব্যাপার। তাদের নির্বাচনে আনার দায়িত্ব সরকারের না। নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করবে নির্বাচন কমিশন। এই নির্বাচন কমিশনের অধীনে যে নির্বাচন হবে তাতে আ’লীগ অংশ নেবে। আমরা চাইবো, বিএনপির নেতৃত্বাধীন যে জোট আছে তারা আগামী নির্বাচনে আসুক। বিএনপির দাবি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, তারা নির্বাচনকালীন সহায়ক সরকারের দাবি করেছে। আজ পর্যন্ত বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সেই সহায়ক সরকারের ব্যাখ্যা দিতে পারেননি। এখন বলছেন খালেদা জিয়াকে মুক্তি না দিলে তারা নির্বাচনে যাবেন না। খালেদা জিয়াকে মুক্তি দেয়ার এখতিয়ার আছে সর্বোচ্চ আদালতের। এখানে তো সরকারের কিছু করার নেই।নয়া দিগন্ত

Facebook Comments
Please follow and like us: