মদিনার মতো একটি মানবিক রাষ্ট্র গড়তে চাই: ইমরান খান

ক্রাইমবার্তা  ডেস্করিপোট:মহানবী হযরত মুহাম্মদ (স)-এর মদিনার নগর রাষ্ট্রের অনুকরণে দুর্নীতিমুক্ত, মানবিক দেশ গড়ার ঘোষণা দিয়েছেন পাকিস্তানের হবু প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান।

জাতির উদ্দেশে দেয়া ভাষণে তিনি বলেন, ‘খুব সংক্ষেপে আপনাদেরকে বলতে চাই কেমন পাকিস্তান আমি দেখতে চাই। মনে রাখবেন, নবী মুহাম্মদ (স) হলেন আমার অনুপ্রেরণা। মদিনার নগর রাষ্ট্রটিকে তিনি যেমন মানবিকতার ওপর প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন, যা পৃথিবীর ইতিহাসে মানবিকতার ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত প্রথম রাষ্ট্র। এটিই আমার অনুপ্রেরণা। পাকিস্তান তেমনই একটি মানবিক রাষ্ট্র হওয়া উচিত, যেখানে আমরা আমাদের মধ্যকার দুর্বল মানুষদের দায়িত্ব গ্রহণ করবো। এখানে দুর্বলরা ক্ষুধায় মারা যাচ্ছে। আমি সর্বাত্মক চেষ্টা করবো যাতে আমার সরকারের নীতি দুর্বল মানুষদের, শ্রমিক মানুষদের, কৃষকদের ভাগ্য পরিবর্তনে প্রণীত হয়। তারা সারাটা বছর ধরে কাজ করেন, কিন্তু তাদের হক পান না।’

আবেগঘন ভাষণে তার আসন্ন সরকারের বিভিন্ন নীতি ও পরিকল্পনা নিয়েও কথা বলেছেন পাকিস্তানের বিশ্বকাপজয়ী অধিনায়ক ইমরান খান।

বক্তব্যের শুরুতে তিনি বলেন, “২২ বছর আগে আমি রাজনীতিতে প্রবেশ করেছিলাম। আমি রাজনীতিতে এসেছিলাম কারণ আমার স্বপ্ন ছিল এমন এক পাকিস্তান তৈরি করার যেমনটি চেয়েছিলেন আমাদের নেতার মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ। এই নির্বাচনটি পাকিস্তানের ইতিহাসে স্বরণীয় এক নির্বাচন। এই নির্বাচনে বহু মানুষ জীবন দিয়েছেন। সন্ত্রাসবাদী হামলা হয়েছে। এসব উপেক্ষা করে মানুষ ভোট দিয়েছে। টিভিতে দেখেছি বৃদ্ধ নারী-পুরুষরা লাইনে দাঁড়িয়ে আছেন। তাদের সবাইকে ধন্যবাদ জানাতে চাই। সবেচেয়ে বেশি ধন্যবাদ বেলুচিস্তানের মানুষদের প্রতি। সবচেয়ে বেশি কষ্ট করে তাদেরকে ভোট দিতে হয়েছে। আমি আল্লাহর কাছে কৃতজ্ঞ আমরা সফল হয়েছে এবং মানুষের ভোট পেয়েছি।”

ইমরান খান বলেন, “আমাদের ৪৫ শতাংশ শিশুর শারিরীক বৃদ্ধি পর্যাপ্ত হয় না। ওদের শরীর ও ব্রেইন যথেষ্ট পরিমাণ বৃদ্ধি পায় না। অনেক দেশে আড়াই কোটি মানুষও বাস করে না। অথচ আমাদের দেশে আড়াই কোটি শিশু স্কুলে যেতে পারে না। আমার চেষ্টা থাকবে এই মানুষগুলোর জন্য কিছু করা। এ কারণে আমাদের সরকারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নীতি হবে মানবসম্পদের উন্নয়ন। আমি চাই পুরো দেশ মিলে আমরা এভাবে ভাববো। আমি চাই পাকিস্তানের সবাই ঐক্যবদ্ধ হবে। নির্বাচনের আগে আমার বিরুদ্ধে অনেক কিছু বলা হয়েছে। এত খারাপ কথা অন্য কারো বিরুদ্ধে বলা হয়নি। কিন্তু এসবই আমি ভুলে গেছি। তারাও আমার সঙ্গে আছেন। ব্যক্তির চেয়ে আমার লক্ষ্য অনেক গুণ বড়।”

প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন তিনি ব্যবহার না করে তিনি সেটিকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বানাবেন বলেও ঘোষণা দেন পাকিস্তানের কিংবদন্তি এ ক্রিকেটার।

তিনি বলেন, করের টাকা নষ্ট করে প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনে থাকব না আমি। আমার সরকার হবে মিতব্যয়ী। সরকারি অনেক বাসভবনকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করা হবে।

পিটিআই প্রধান বলেন, প্রধানমন্ত্রীর বাড়ি হবে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আর গভর্নর বাড়ি হবে পর্যটন স্থান।

পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ে তার ভাষণে বলেন, ‘বিশ্বে এখন যদি এমন একটি দেশ থাকে যেটিতে শান্তি দরকার তাহলে সেটি হচ্ছে পাকিস্তান। আর এই শান্তির জন্য প্রতিবেশিদের সঙ্গে ভাল সম্পর্কের বিকল্প নেই।’

চীন, ইরান, সৌদি আরব, যুক্তরাষ্ট্র ইত্যাদি দেশের সাথে ভাল সম্পর্ক কিভাবে আরও জোরদার করা যায় সে বিষয়ে বলার পর ভারতের বিষয়েও কথা বলেছেন ইমরান খান। তিনি বলেন, আমি মনে করি ভারতের সাথে যদি আমাদের ভাল সম্পর্ক থাকে তাহলে তাহলে তা সবার জন্য ভালো হবে। আমাদের বাণিজ্যিক সম্পর্ক বৃদ্ধি দরকার। যত বাণিজ্য বাড়ানো যাবে ততই উভয়পক্ষ লাভবান হবো। কাশ্মীর একটা সমস্যা রয়েছে। গত ৩০ বছর ধরে কাশ্মীরের মানুষজন ভুক্তভোগী হয়ে আসছে।

তিনি আরও বলেন, ‘এই সমস্যা সমাধানে পাকিস্তান এবং ভারতের নেতাদেরকে এক টেবিলে বসতে হবে। অন্য কোনো উপায়ে তো সমাধান হবে না। যদি ভারত প্রস্তুত থাকে তাহলে সম্পর্ক উন্নয়নে আমরাও প্রস্তুত। ভারত যদি এক পা আগায়, আমরা এজন্য দুই পা আগাবো। আমি দায়িত্ব নিয়ে বলছি, যদি আমরা উভয় দেশ বন্ধুত্বে সম্পর্ক স্থাপন করতে পারি তাহলে হবে উপমহাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় ঘটনা।’

ইমরান তার সরকারের ভবিষ্যত পরিকল্পনা নিয়ে আরও বলেন, ‘আমরা একটা উদাহরণ তৈরি করতে চাই। কিভাবে জবাবদিহিতা করতে হয়। আমি শপথ করছি, আমার সরকার কোন রাজনৈতিক প্রতিহিংসায় জড়াবে না। আমার সকল নীতি হবে দুর্বলতা কাটিয়ে দেশকে শক্তিশালী অবস্থানে নিয়ে যাওয়া।’

তিনি চীনের সাথে সম্পর্ক উন্নয়ন হবে বলে জানান, আমরা প্রতিবেশি দেশের সাথে আমাদের সম্পর্কের উন্নয়ন চাই। চীন থেকে দারিদ্র বিমোচনের উপায়টা শিখতে চাই।

আফগানিস্তানের সাথে সম্পর্ক নিয়ে ইমরান বলেন, আমরা আমাদের প্রতিবেশি দেশের সাথে শান্তিপূর্ণ সম্পর্ক চাই। আমেরিকার সাথে সম্পর্ক নিয়ে পিটিআই প্রধান বলেন, আমরা আমেরিকার সাথে সমঝোতামূলক সহযোগিতাপূর্ন সম্পর্ক চাই।

প্রসঙ্গত, বুধবার অনুষ্ঠিত পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদের ২৭২ আসনের মধ্যে শুক্রবার সন্ধ্যা সাড়ে সাতটা পর্যন্ত পাকিস্তানি সংবাদমাধ্যম ডন নিউজের অনলাইন সংস্করণ নির্বাচন কমিশনের (ইসিপি) বরাত দিয়ে ২৬৮টি আসনের ফল প্রকাশ করেছে।

ইসিপির ঘোষিত ফল অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত ইমরান খানের দল পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ (পিটিআই) দল ১১৭ আসনে জয়ী হয়েছে। কারাবন্দী নওয়াজ শরিফের গড়া দল পাকিস্তান মুসলিম লিগ (এন) পেয়েছে ৬৩টি আসন। আর বিলওয়াল ভুট্টো জারদারির পাকিস্তান পিপলস পার্টি (পিপিপি) জয়ী হয়েছে ৪৩টি আসনে।

এছাড়া মুত্তাহিদা মজলিশ আমল (এমএমএ) পেয়েছে ১১টি আসন, গ্র্যান্ড ডেমোক্রেটিক অ্যালায়েন্স (জিডিএ) দুটি ও মুত্তাহিদা কওমি আন্দোলন-পাকিস্তান (এমকিউএম-পি) ছয়টি আসনে জয়ী হয়েছে।

পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদের মোট ৩৪২ আসনের মধ্যে ২৭২ আসনে সরাসরি নির্বাচন হয়। বাকি ৭০টি আসন নারী ও সংখ্যালঘুদের জন্য সংরক্ষিত। নানা জটিলতার কারণে গত বুধবার অনুষ্ঠিত নির্বাচনে দুটি আসনের ভোট হয়নি।

নিয়ম অনুযায়ী, কোনো দলকে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে হলে ২৭২ আসনের মধ্যে ১৩৭ আসনে জিততে হবে। এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ আসন পাওয়া পিটিআইয়ের সংগ্রহ ১১৭টি আসন। এটা নিশ্চিত যে এক সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে প্রধানমন্ত্রী হতে পাচ্ছেন না ইমরান। ফলে কোয়ালিশন সরকার বা আসন ভাগাভাগি করেই সরকার গঠন করতে হবে।

Facebook Comments
Please follow and like us: