সরকারি পাজেরো হাঁকান তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারী, মাসে তেলের বিল ২৯,২৫০

ক্রাইমর্বাতা রিপোট: তিনি ছিলেন তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারী। দুই বছর আগে অবসরও নিয়েছেন। অথচ হাঁকিয়ে বেড়াচ্ছিলেন সরকারি পাজেরো গাড়ি। এক দুই বছর না। টানা ১০ বছর ধরে তিনি ব্যক্তিগতভাবে এই গাড়ি ব্যবহার
করছেন। গাড়ির জ্বালানি হিসেবে নিয়েছেন লাখ লাখ টাকা। সর্বশেষ মাসে ৩০ হাজার টাকার বেশি জ্বালানি বিল উত্তোলন করা হয়েছে। নিয়মিত বেতন নিয়েছেন গাড়ির চালকও।

সরকারের যুগ্ম সচিব পদমর্যাদার কর্মকর্তাদের ব্যবহারের জন্য (ঢাকা মেট্রো-ঘ-১১-২৮২৭) গাড়িটি তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারী হয়ে তিনি কিভাবে এতদিন ব্যবহার করেছেন এই প্রশ্ন এখন মুখে মুখে। ঘটনায় তাজ্জব বনে গেছেন খোদ প্রশাসনের অনেকে। দুর্নীতি দমন কমিশনের অভিযোগ কেন্দ্রে আসা এক অভিযোগের ভিত্তিতে অভিযানে জব্দের পর এই গাড়ির রহস্য উন্মোচন হয়। জানা যায় গাড়িটি এতদিন ব্যবহার করেছেন আলাউদ্দিন মিয়া।

তিনি বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারী ছিলেন। পিডিবি সিবিএ’র সাবেক সাধারণ সম্পাদক। দুর্নীতি দমন কমিশন সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এত বড় অনিয়মের সঙ্গে যিনি জড়িত তার আর্থিক অনিয়মের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হবে। ইতিমধ্যে দুদকের তদন্তকারী দল তদন্তে নেমেছে।

দুর্নীতি দমন কমিশনের এক অভিযানে আলাউদ্দিনের ব্যবহার করা গাড়িটি এরই মধ্যে চালকসহ জব্দ করা হয়েছে। দুদকের এনফোর্সমেন্ট টিম গতকাল মতিঝিল এলাকা থেকে অভিযান চালিয়ে আটক করে। সহকারী পরিচালক সালাউদ্দিন আহমেদের নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের একটি টিম অভিযান পরিচালনা করে। এ সময় গাড়িচালক মো. আবুল হোসেন জনি এবং নিরাপত্তা প্রহরী মো. সামছু মিয়া ঘটনাস্থলে ছিলেন।

পরে বিকালে এক বিফ্রিংয়ে মহাপরিচালক (প্রশাসন) মুনীর চৌধুরী বিস্তারিত তুলে ধরেন। তিনি জানান, আলাউদ্দিন মিয়া ২০১৭ সালের আগস্টে অবসরে যান। তিনি তখন পিডিবির নকশা ও পরিদর্শন পরিদপ্তরের স্টেনো টাইপিস্ট পদে ছিলেন। গত আগস্টে তার অবসরোত্তর ছুটির সময়সীমাও শেষ হয়েছে। একটি অভিযোগের ভিত্তিতে ওই গাড়িটি উদ্ধার করা হয়। গাড়ি উদ্ধারের সময় এর চালক ছাড়া কেউ ছিলেন না। চালকের বক্তব্য রেকর্ড করে তাকে ছেড়ে দেয়া হয়। মুনীর চৌধুরী বলেন, গাড়িটি পিডিবির নামে বরাদ্দ থাকলেও ওই কর্মচারী কোনোভাবেই ব্যবহার করতে পারেন না। তিনি ২০১৭ সালে অবসরে গেছেন। আলাউদ্দীন ২০০৯ সাল থেকে গাড়িটি ব্যবহার করছেন জানিয়ে তিনি বলেন, গাড়িটির পেছনে প্রতি মাসে ৪৫০ লিটার তেল ব্যবহার হয়েছে। যার আর্থিক মূল্য ২৯ হাজার ২৫০ টাকা।

নয় বছরে তেল বাবদ ৩৫ লাখ টাকার বেশি অর্থ ব্যয় হয়েছে। এছাড়া এই সময়ে ৩৭ লাখ টাকা গাড়ির চালকের বেতন বাবদ ব্যয় হয়েছে। দুদকের আওতাভুক্ত এটি একটি ‘বড় অপরাধ’ হিসেবে মন্তব্য করে তিনি বলেন, তৃতীয় শ্রেণির একজন কর্মচারীর নামে গাড়িটি কীভাবে বরাদ্দ দেয়া হলো, এর সঙ্গে পিডিবি বা অন্য কোনো অফিসের যারা জড়িত তা অনুসন্ধানের মাধ্যমে বেরিয়ে আসবে। তখন সেই অনুসন্ধানের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেয়া হবে। এ ঘটনায় মামলা করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে উল্লেখ করে মুনীর চৌধুরী বলেন, আমরা অনুসন্ধান করবো, ওই কর্মচারীর সম্পদও খতিয়ে দেখা হবে। অনুসন্ধানের জন্য গাড়িটি দুদকে আনা হয়েছে। অপর এক প্রশ্নের জবাবে মুনীর চৌধুরী বলেন, অভিযোগ পেলে পরিবহনপুলের এরূপ অপব্যবহার হচ্ছে কি না তা খতিয়ে দেখা হবে।

এদিকে অনুসন্ধানে আরো জানা যায়, যে গাড়িটি দুদক জব্দ করেছে সেটি আলাউদ্দিন মিয়া ও তার পরিবারের সদস্যরা গতকাল জব্দের আগে পর্যন্ত ব্যবহার করেছেন। তার এখতিয়ার না থাকলেও সিবিএ নেতা হওয়ার দাপটে আলাউদ্দিন মিয়া গাড়িটি ব্যবহার করতেন জানিয়েছেন পিডিবির কর্মচারীরা। জানা গেছে, তৃতীয় শ্রেণির এই কর্মচারী ব্যবহার করলেও গাড়িটির লগবইয়ে সই করতেন সিবিএ’র দপ্তর সম্পাদক নূরে আলম ফেরদৌস। পিডিবি’র একটি চক্র এ ধরনের অনিয়মে জড়িত বলে তদন্তকারীদের ধারণা। মাজ।

Facebook Comments
Please follow and like us: