লবণক্ষতার কারণে সাতক্ষীরায় রোরো ধানের উৎপাদন নিয়ে সংশয় : লবণসহিষ্ঞু ধানের নতুন জাত উদ্ভাবন হলেও সাড়া ফেলেনি চাষীদের মাঝে

আবু সাইদ বিশ্বাস, সাতক্ষীরা: লবণাক্ত ও জলাবদ্ধতার সাথে যুদ্ধ করে সাতক্ষীরায় বোরো পরিচর্যায় ব্যস্ত সময় পার করছে বোরো চাষীরা। উপকূলীয় এ অঞ্চলে ফসলি জমিতে দিন দিন লবণাক্ততা বেড়ে যাওয়ায় চরম ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছেন এখানকার কৃষকরা। বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিজ্ঞানীরা দেশের উপকূলীয় জেলা সাতক্ষীরায় লবণসহিষ্ঞু ধানের নতুন জাত উদ্ভাবন করলেও চাষীদেও মাঝে তেমন সাড়া ফেলেনি।
বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইন্সটিটিউট সাতক্ষীরা এর বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা জানান, বেশ কয়েকটি লবণসহিষ্ণু ধানের জাত উদ্ভাবন করেছে তারা। এর মধ্যেই ব্রি ধান ৪০’, ব্রি ধান ৪১’, ব্রি ধান ৪৭’, ব্রি ধান ৫৩’ ও ‘ব্র্রি ধান ৫৪ নামের ৪টি জাতের লবণসহিষ্ণু ধান বীজ উদ্ভাবন করে কৃষকদের জন্য অবমুক্ত করা হয়েছে। অপরদিকে পরমাণু কৃষি গবেষণা ইন্সটিটিউট ‘বিনা ৭’ ও ‘বিনা ৮’ নামের দু’টি লবণসহিষ্ণু জাতের ধান বীজ উদ্ভাবন করেছে। এসব ধান চারা অবস্থায় ১২-১৪ ডিএসমিটার এবং সারাজীবনকাল ৬ ডিএসমিটার লবণাক্ততা সহনশীল বলে বিশেষজ্ঞগণ জানিয়েছেন। লবণক্ষতার কারণে ধানের চারা রোপণ করার পর তা শুকিয়ে মরে যাচ্ছে বলে চাষীদের অভিযোগ।
জেলা কৃষি বিভাগ বলছে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে মৌসুমি বৃষ্টিপাত না হওয়াতে জেলার উপকূলীয় অঞ্চলের ফসলি জমির লবণাক্ততা বেড়ে এমন অবস্থার সৃষ্টি হচ্ছে। এতে করে জেলার দেবহাটা, আশাশুনি ও শ্যামনগর উপজেলাতে চলতি মৌসুমে বোরো উৎপাদন কিছুটা হ্রাস পেতে পারে।
লবণাক্ত ও জলাবদ্ধতার কারণে সাতক্ষীরায় প্রকৃত কৃষি জমি কমে গেছে। তারপরও গত বছরের তুলনায় চলতি বছর বোরো আবাদের লক্ষমাত্রা ছাড়িয়েছে। জলাবদ্ধ ও অনাবাদি জমিতে বোরো আবাদ করে জমির পরিমাণ বাড়ানো হয়েছে বলে দাবি করে কৃষি বিভাগ।
সাতক্ষীরা জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের দেয়া তথ্যানুযায়ী, চলতি মৌসুমে সাতক্ষীরার সাতটি উপজেলাতে বোরো চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৭৪ হাজার ৭৩৩ হেক্টর জমিতে। এরমধ্যে সাতক্ষীরা সদর উপজেলাতে ২৩ হাজার ৬০০ হেক্টর, কলারোয়ায় ১২ হাজার ৭৭১ হেক্টর, তালায় ১৮ হাজার ৭১৭ হেক্টর, দেবহাটায় ৫ হাজার ৮৬০ হেক্টর, কালিগঞ্জে ৫ হাজার ২৯০ হেক্টর, আশাশুনিতে ৬ হাজার ৪৬৫ এবং শ্যামনগরে ২ হাজার ৩০ হেক্টর। গত মৌসুমে জেলায় বোরো আবাদ হয়ে ছিল ৭৩ হাজার ৮৬২ হেক্টর জমিতে। জেলাতে রোরো আবাদ শেষ ।
এখন চলছে পরিচর্জা। আগাছা দমন, সেচ দেয়া,সার প্রয়োগ সহ পোকার আক্রমন থেকে রক্ষা পেতে কৃষকরা নানামুখি কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। তবে উৎপাদন খরচ বেশি হওয়াতে কৃষকরা অনেটা দুশ্চিন্তায়।
চলতি সপ্তাহে মাঠ পর্যায়ে সারের দাম কেজি প্রতি এক-থেকে দুই টাকা বৃদ্ধি পেয়েছে বলে প্রান্তীক কৃষকরা জানান। অন্যদিকে পাইকারী ব্যবসায়ীদের দাবী চলতি সপ্তাহে বস্তা প্রতি ৩০ থেকে ৪০ টাকা সারের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে। সরবরাহ কম থাকায় দাম বৃদ্ধি বলে সার ডিলারদের অভিযোগ।

বিঘা প্রতি ধানের উৎপাদন খরচ প্রায় ১৭/১৮ হাজার টাকা। বাজার মুল্যে কৃষকরা বিঘা প্রতি ধানের দাম পান ১৮/১৯ হাজার টাকা। বড় ধরণের ক্ষতির সম্মুখিন না হলে কিছুটা হলেও কৃষকরা ধান চাষ করে মুনাফার মুখ দেখবে এমন তথ্য দিলেন কয়েক জন কৃষক।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, ২০১৭-১৮ সালে বোরো আবাদ হয়ে ছিল ৭৩ হাজার ৮৬২ হেক্টর জমিতে। এর আগে ২০১৬-১৭ সালে আবাদ হয়েছিল ৭৪ হাজার ৪৩০ হেক্টর, ২০১৫-১৬ সালে ৭৩ হাজার ৩৪৫ হেক্টর, ২০১৪-১৬ সালে ৭৪ হাজার ২৮৫ হেক্টর, ২০১৩-১৪ সালে ৭৩ হাজার ৮৩০ হেক্টর, ২০১১-১২ সালে ৭৩ হাজার ৯৮৫ হেক্টর ও ২০১০-০৯ সালে ৭০ হাজার ২৬০ হেক্টর জমিতে।
সার,ডিজেল,বিদ্যুৎ সহ ওষুধের মূল্য বৃদ্ধ পাওয়াতে গত কয়েক বছর ধরে ধানের উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি পেয়েছে। কৃষকদের দাবী এভাবে কৃষি পণ্যের মূল্য বৃদ্ধি অব্যাহত থাকলে ধান চাষে তারা হারাবে।
সুরাত আলী(৫০),সাতক্ষীরা শহরের ৫নং ওয়ার্ডের মিয়াসাহেবের ডাঙ্গা গ্রামের কৃষক। তার সাথে কথা হয় এ প্রতিবেদকের। তিনি এবছর দুই বিঘা জমিতে বোরো ধানের আবাদ করেছে। ধানের বাড়ন ও ভাল। তার ক্ষেত যেন সবুজের সমারহ। কিন্তু তার দুঃখ ধানের উৎপাদন খরচ অনেক বেশি। তিনি জানান,বিঘা প্রতি তার উৎপাদন খরচ দাঁড়াবে ১৭ হাজার টাকা এর মধ্যে বিঘা প্রতি বীজতলা তৈরিতে খরচ হয়েছে ২ হাজার টাকা। ১০কেজি বীজ,সার পানি,পাতা উঠানো বাবদ এসব খরচ করতে হয়েছে তাকে। এর পর জমিতে তিন চাষ,নয়শ টাকা,রোপন এক হাজার টাকা,সার ওষধ দুই হাজার টাকা,আগাছা দমন,ওষধ স্প্রে তিনশ টাকা,ধান কাটা পনেরশ টাকা,বহন-ঝাড়া বারশ টাকা,জমির হারি ছয় হাজার টাকা,পানি সরবরাহের জন্যে তিন হাজার টাকা তাকে দিতে হবে। তার এক বিঘা জমিতে ১৮ মন ধান পাবে বলে তিনি আশা করছেন।
শহরের চালতে তলা এলাকার আজগর আলী(৬০)। সারা জীবণ ধরে কৃষি কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করে আসছে। কিন্তু ধানের উৎপাদন খরচ এত বেশি তিনি কখনো দেখিনি। তার অভিযোগ,ধানের ক্ষেতে বিভিন্ন ধরণের পোকার আক্রমণ দেখা যায়,কিন্তু সরকারী ভাবে কোন কৃষি কর্মকর্তার দেখা পায়নি। কোন পরামর্শ দেয়ার কোন লোক তার কাছে কখনো আসেনি।
সাতক্ষীরা জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক অরবিন্দু বিশ্বাস জানান, আবহাওয়াজনিত কারণে চলতি মৌসুমে জেলার কিছু কিছু এলাকাতে বোরো চাষে ক্ষতি হচ্ছে। তবে যে এলাকাতে বোরো বীজতলা বা চারা মরে যাচ্ছে সে সমস্ত এলাকার কৃষি কর্মকর্তারা কৃষকদের নানাভাবে পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছেন। এ সময় কৃষি জমির পরিমাণ কমে যাচ্ছে এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, জেলায় কৃষি ও কৃষি জমির পরিমাণ একদিকে কমলেও অন্যদিকে বাড়ছে। তার দাবী আবহাওয়া অনুক’লে থাকলে এবছর জেলাতে বোরো উৎপাদনের লক্ষ্য মাত্রা ছাড়িয়ে যাবে।

Facebook Comments
Please follow and like us: