নৈসর্গিক নিউজিল্যান্ডে উদ্যমী মুসলমান

দক্ষিন প্রশান্ত মহাসাগরের কয়েকটি দ্বীপ নিয়ে গঠিত একটি উন্নত দেশের নাম নিউজিল্যান্ড। এটি অস্ট্রেলিয়া থেকে পূর্ব-দক্ষিণে ১ হাজার মাইল দূরে অবস্থিত। যেহেতু দক্ষিণে এন্টার্কটিকা পর্যন্ত নিউজিল্যান্ডের পরে আর কোনো জনবসতি নেই, তাই দেশটিকে পৃথিবীর দক্ষিণপ্রান্তে সর্বশেষ দেশ বললে অত্যুক্তি হবে না।
২ লাখ ৬৭ হাজার ৭১০ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এ দেশটি পৃথিবীর ৭৫তম বড় দেশ। নিউজিল্যান্ডে বিভিন্ন জাতির বসবাস। ব্রিটিশ শাসন প্রতিষ্ঠার পর ইউরোপ, এশিয়া, মিডলইস্ট ও আফ্রিকাসহ নানা দেশের বহু মানুষ এখানে এসে বসতি স্থাপন করে। যার বর্তমান সংখ্যা ইউরোপিয়ান ৭১.২ শতাংশ, মাওরি ১৪.১ শতাংশ, এশিয়ান ১১.৩ শতাংশ, প্যাসিফিক ৭.৬ শতাংশ, মধ্যম পূর্ব লাতিন আমেরিকান, আফ্রিকান ১.১ শতাংশ, অন্যান্য ১.৬ শতাংশ অথবা বলা যায় ৫.৪ শতাংশ নাগরিকের পরিচয়ই অজ্ঞাত।

মুসলমানদের আগমন
নয়নাভিরাম সৌন্দর্যের দেশটিতে ইসলামের প্রচার ও প্রসার হয় মূলত অভিবাসীদের মাধ্যমে। সে সময় স্বর্ণ অনুসন্ধানকারী পেশার ১৫ জন চীনা মুসলমান জীবিকার অন্বেষণে পাড়ি জমিয়েছিলেন নিউজিল্যান্ডে। ওটাগোর ডানস্টানের স্বর্ণক্ষেত্রে তারা কাজ করতেন। পরে ১৯০০ সালের শুরুর দিকে গুজরাটের তিনটি মুসলিম পরিবার সেখানে বসতি স্থাপন করে। তারপর ১৯৬০ সাল পর্যন্ত পূর্ব ইউরোপ এবং ভারত থেকে আসা আরও কিছু অভিবাসী মুসলমান সেখানে বসবাস শুরু করেন স্থায়ীভাবে।
নিউজিল্যান্ড সরকারের হিসাব মতে, ১৯৫০ সালে নিউজিল্যান্ডে মুসলমান অধিবাসী ছিল মাত্র ১৫০ জন। ১৯৬০ সালে এ সংখ্যা উন্নীত হয় ২৬০-এ। অভিবাসী মুসলমানদের বড় আকারে বসতি স্থাপন শুরু হয় ১৯৭০ সালে। সে সময় ফিজি থেকে আসা ভারতীয় বংশোদ্ভূত মুসলমানরা নিউজিল্যান্ডে বসতি স্থাপন শুরু করে। তাদের অনুসরণ করে ১৯৯০ সালের মধ্যে যুদ্ধবিধ্বস্ত অনেক দেশের উদ্বাস্তু মুসলমান পাড়ি জমান নিউজিল্যান্ডে।
এরপর থেকেই নিউজিল্যান্ডে মুসলিম জনগোষ্ঠীর সংখ্যা ক্রমেই বাড়তে থাকে। বর্তমানে এ মুসলিম জনসংখ্যা প্রায় ১ লাখ। ধর্ম হিসেবে জনসংখ্যার শতকরা হার হচ্ছেÑ খ্রিস্টান ৪৪.৩ শতাংশ, হিন্দু ২.১ শতাংশ, বৌদ্ধ ১.৪ শতাংশ, খ্রিস্টান মাওরি ১.৩ শতাংশ, ইসলাম ১.১ শতাংশ, অন্যান্য ধর্ম ১.৪ শতাংশ, অজ্ঞাত পরিচয় ৮.২ শতাংশ।

ইসলামফোবিয়া দূরীকরণে
ওয়েকাতো মুসলিম অ্যাসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট ইসমাঈল গামাদিদ বলেন, এ দেশের অনেকের ধারণা, মসজিদে বোমা তৈরি করা হয়। খুশির খবর হলো, হ্যামিলটনে ইসলামের ব্যাপারে এ ধরনের ভুল চিত্র চিরদিনের জন্য পাল্টে গিয়েছে। কিন্তু তারা যখন মসজিদে আসে এবং তাদের দেখে তখন তারা বুঝতে পারে এটা খুবই স্বাভাবিক, যা ইসলামিক অ্যাওয়ারনেস উইকের ধারণার ফল। জনগণ এখানে আসতে পারে, তারা আমাদের সঙ্গে শেয়ার করতে পারে, খাওয়া-দাওয়া করতে পারে। অভিজ্ঞতা বিনিময় করতে পারে, যা আমাদের জন্য খুবই উপকারী হতে পারে। (সূত্র : অন ইসলাম ডটনেট)।
নিউজিল্যান্ডের মুসলিম জনগোষ্ঠী শান্ত স্বভাবের। তারা উগ্র নন। তারা চেষ্টা করছেন নিউজিল্যান্ডবাসীর মধ্যে ইসলামের বিশ্বাস, মূল্যবোধ, রীতিনীতি প্রভৃতি সম্পর্কে ইতিবাচক ধারণা দিতে। ইসলাম সম্পর্কে সঠিক ধারণা দেয়ার জন্য অন্য ধর্মাবলম্বীর সঙ্গেও তাদের যোগাযোগ অব্যাহত আছে। ইসলাম প্রচারে তারা যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নানা উদ্যোগ গ্রহণ করেন। আন্তঃধর্মীয় আলোচনা, ইসলামী সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, মেলা, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বিশেষ ডিনার এবং ইসলামী শিল্পকর্ম প্রদর্শনীর আয়োজন অন্য ধর্মাবলম্বীদের ওপর বেশ ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। তারা সংখ্যায় খুবই কম, কিন্তু তাদের ধর্মচর্চা এগিয়ে গেছে অনেক দূর। তাদের সংগঠনের উদ্যোগে নিউজিল্যান্ডে ইসলাম সম্পর্কিত ভুল ধারণা নিরসনে উন্মুক্ত মসজিদ নীতি গ্রহণ করা হয়েছে। ফলে হ্যামিলটনে ইসলামের ব্যাপারে ভুল ধারণার অবসান ঘটেছে। এরা সংখ্যায় কম হলেও ধর্ম পালন, খোদাভীতি ও ইসলাম প্রচার-প্রসারে বেশ আন্তরিক। মুসলমানদের সংগঠন ফেডারেশন অব ইসলামিক অ্যাসোসিয়েশন নিউজিল্যান্ডের (ঋওঅঘত) দায়িত্বশীলরা নিউজিল্যান্ডে হালাল গোশত প্রস্তুত ও বিপণনের কাজে আলেমদের সঙ্গে পরামর্শ করে কর্মপদ্ধতি নির্ধারণ করেন এবং নিয়মতান্ত্রিকভাবে তার তত্ত্বাবধান করেন। এককথায় বলতে গেলে, পরিপূর্ণ সঠিক ইসলামের ওপর চলার জন্য নিউজিল্যান্ড মুসলিমরা প্রাণপণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।

শিক্ষাদীক্ষার সুবিধা-অসুবিধা
মুসলমানরা পশ্চিমের যেসব দেশে সংখ্যালঘু সেখানে সবচেয়ে বড় সমস্যাটি হচ্ছে সন্তানদের শিক্ষাদীক্ষার সমস্যা। বিশাল এক চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে সেখানকার শিক্ষা কেন্দ্রগুলোতে মুসলিম সন্তানদের লেখাপড়া। যদিও মুসলিম মা-বাবারা নিজেদের সন্তানদের পশ্চিমা ধাঁচের স্কুলগুলোতে পড়াশোনা করানোর পাশাপাশি বিকালে মসজিদ সংলগ্ন মকতবেও পাঠিয়ে থাকেন। বিকালে ছেলেমেয়েরা সেসব মকতবে গিয়ে কোরআনে কারিমসহ প্রাথমিক ধর্ম শিক্ষা লাভ করছে। পাশাপাশি অনেক মসজিদ ও ইসলামী কেন্দ্রে ‘সানডে স্কুল’-এর ব্যবস্থা রয়েছে।
সেগুলোতে ছুটির দিন রোববার সকালেও শিশুদের দ্বীনি শিক্ষা দেয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। তারপরও বলার অপেক্ষা রাখে না যে, পশ্চিমা ধাঁচে পরিচালিত স্কুলে এ কচি ছেলেমেয়েদের বেশির ভাগ সময় কাটছে। সেখানকার পরিবেশের প্রভাব কি এক-দুই ঘণ্টায় ধুয়ে ফেলা যায়? তাই আধুনিক শিক্ষার জন্য নিজস্ব প্রতিষ্ঠান করা এবং সন্তানদের নিজেদের পরিবেশে শিক্ষাদানের ব্যবস্থা করা ছাড়া এ সমস্যার আর কোনো সমাধান খোলা নেই।
অকল্যান্ডের সাহসী উদ্যমী মুসলমানরা আল মদিনা স্কুল নামে একটি ইসলামী স্কুল প্রতিষ্ঠা করেছেন। সেখানে মুসলিম ছেলেমেয়েদের উচ্চমাধ্যমিক পর্যন্ত শিক্ষার ব্যবস্থা রয়েছে। প্রাথমিক পর্যায় পর্যন্ত সহশিক্ষা চালু আছে। তারপর থেকে ছেলেদের পৃথকভাবে এবং মেয়েদের পর্দার সঙ্গে শিক্ষাদানের ব্যবস্থা রয়েছে। খুশির বিষয় হচ্ছে, অন্যান্য শিক্ষা কেন্দ্রের তুলনায় এখানকার শিক্ষার্থীদের পাসের হার বেশি।
দেশটির রাজধানী ওয়েলিংটন, যার অবস্থান উত্তর দ্বীপের দক্ষিণে। এছাড়া আরও তিনটি বড় শহর রয়েছে। অকল্যান্ড, যা দেশটির সবচেয়ে বড় শহর, ক্রাইস্টচার্চ ও হ্যামিলটন। অকল্যান্ডে এক ডজনের মতো মসজিদ আছে। প্রতিটি মসজিদের সঙ্গেই শিশুদের হেফজ, নাজেরা ও প্রাথমিক দ্বীনি শিক্ষার ব্যবস্থা রয়েছে।

বাড়ি তৈরির বৈচিত্র্য
বিশ্ববিখ্যাত ইসলামী চিন্তাবিদ মুফতি তাকি উসমানি তার ভ্রমণবৃত্তান্ত ‘সফর দর সফর’ গ্রন্থে নিজ পর্যবেক্ষণ জানিয়ে লেখেন, নিউজিল্যান্ডের মুসলমানরা বাড়ি তৈরির বেলায় সুদ সংক্রান্ত বড় সমস্যায় পতিত হয়ে থাকেন। সাধারণত মানুষ সুদি ঋণের টাকায় বাড়ি কেনে। নিউজিল্যান্ডে এর ব্যাপক প্রচলন রয়েছে। তবে এখানকার মুসলমানদের সংগঠন ‘ফেডারেশন অব ইসলামিক অ্যাসোসিয়েশন অব নিউজিল্যান্ড’ যাকে ঋওঅঘত বলা হয়, এ সংগঠন একটি ইনভেস্টমেন্ট কোম্পানির সঙ্গে মিলে এমন একটি প্রোডাক্ট তৈরি করার চেষ্টা করছে, যার মাধ্যমে মুসলমানদের জন্য বিনা সুদে বাড়ি তৈরি করা সম্ভব হবে। এ লক্ষ্যে ঋওঅঘত নিউজিল্যান্ডের আলেমদের সমন্বয়ে একটি ‘ওলামা বোর্ড’ও গঠন করেছে। যাতে করে তাদের বিস্তারিত কর্মপদ্ধতি বাস্তবেই শরিয়াহসম্মত কিনা, সে ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়া যায়।
মাওলানা তাকি উসমানী সেখানকার তৈরি বাড়ি বেচাকেনার বিষয়ে আরও একটি বিচিত্র তথ্য দেন। তিনি লেখেন, ‘এখানে একটি বিস্ময়কর প্রযুক্তির প্রচলন ব্যাপক। তা হলো, নির্মিত ভবনগুলো এক জায়গা থেকে উঠিয়ে অন্য জায়গায় স্থানান্তর করা হয়। শহরের এ অংশেই আমাদের একটি কয়েক তলাবিশিষ্ট ভবন দেখানো হয়।
প্রথমে এটি সড়কের অপর প্রান্তে ছিল। সেখান থেকে তুলে এনে স্থাপন করা হয়েছে এখানে। অকল্যান্ডের এক জায়গায় এ ভবন স্থানান্তরের দৃশ্য স্বচক্ষে দেখলাম। এছাড়া সেখানে তৈরি বাড়ির মার্কেটও আছে। ক্রেতা তার পছন্দসই বাড়ি কিনে তুলে নিয়ে পছন্দ মতো জমিতে বসাচ্ছে।
এ বিস্ময়কর প্রযুক্তি আমি অন্য কোনো দেশে দেখিনি। শুনিওনি। কাঠের বাড়ি হলে একটা কথা ছিল। সেটা স্থানান্তর করা অত বেশি কঠিন ব্যাপার না। এখানে তো স্থানান্তর করা হচ্ছে সিমেন্টের বাড়ি! ওয়েলিংটনে যে বাড়িটি স্থানান্তর করা হয়েছিলÑ সেটি ছিলো সিমেন্টের বাড়ি।’ (সফর দর সফর : পৃষ্ঠা ৯০)।

বৈচিত্র্যের আছে আরও কিছু
বিচিত্র প্রজাতির পাখির জন্য পৃথিবীজুড়ের রয়েছে নিউজিল্যান্ডের খ্যাতি। এসব পাখি শুধু নিউজিল্যান্ডেই দেখা যায়। কররি ‘কিউয়ি’ নামীয় পাখির একটি প্রজাতি রয়েছে এখানে। ঘনবন ও অন্ধকারেই শুধু এরা বেঁচে থাকতে পারে। রুতরুয়ার অগ্নিগর্ভ পাহাড়ি এলাকার বাইরে জাদুঘরের একটি কক্ষে কৃত্রিম অন্ধকারে রাখা হয়েছে এ পাখি। আরেকটি পাখি হলো চবহমঁরহ ‘পেঙ্গুইন’।
এটি এন্টার্কটিকার তুষারপ্রবল এলাকার পাখি। শুধু বরফের মধ্যেই এরা বেঁচে থাকতে পারে। অকল্যান্ডের একটি জাদুঘরের চারদিকে কৃত্রিম বরফ তৈরি করে সেখানে পেঙ্গুইনদের রাখা হয়েছে। কাচের আড়াল থেকে দেখার ব্যবস্থা রয়েছে।
মহামহিম আল্লাহ তায়ালার সৃষ্টির কী বৈচিত্র্য যে, কেউ অন্ধকার ছাড়া বাঁচতে পারে না; তার জন্য সৃষ্টি করেছেন অন্ধকার। এ অন্ধকারেই তার রিজিকের বন্দোবস্ত। আবার কেউ কেউ বেঁচে থাকতে পারে না বরফ ছাড়া; তার জন্য ব্যবস্থা করে রেখেছেন বরফ। এখানেই তার রিজিক নিহিত। এভাবে সৃষ্টিকর্তা তাঁর মহিমা ছড়িয়ে দিয়েছেন সৃষ্টির মাঝে।

Facebook Comments
Please follow and like us: