ধর্ষণের বিচার না পাওয়ায় মেয়েকে নিয়ে বাবার আত্মহত্যা!

ক্রাইমবার্তা রিপোট:গাজীপুরের শ্রীপুর রেলগেট এলাকায় ঢাকা-ময়মনসিংহ রেললাইনের পাশে বাবা-মেয়ের লাশ। গাজীপুরের শ্রীপুরে শিশু মেয়েসহ চলন্ত ট্রেনের নিচে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করেছেন এক বাবা।গতকাল শনিবার সকালে শ্রীপুর রেলগেট এলাকার এন এন ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের পাশে ঢাকা-ময়মনসিংহ রেললাইনের পাশে এ ঘটনা ঘটে।

শিশু মেয়ে ধর্ষণের শিকার হওয়ার পরও বিচার না পাওয়ায় এবং নির্যাতনের শিকার হওয়ায় বাবা-মেয়ে আত্মহত্যা করেছেন পরিবারের সদস্যরা অভিযোগ করেছেন।

এ ঘটনায় পুলিশ শ্রীপুরের গোসিঙ্গা ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) ১ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য আবুল হোসেন (৫২) ও তাঁর ছেলে মিঠুনকে (৩০) জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করেছে।

নিহতরা হলো ময়মনসিংহের গফরগাঁও উপজেলার কালাই গ্রামের মৃত রিয়াজ উদ্দিন সরকারের ছেলে হজরত মাহমুদ (৬৫) ও হজরতের পালিত মেয়ে আয়েশা আক্তার (৭)। আয়েশা আক্তার শ্রীপুরের হেরা পটকা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রথম শ্রেণিতে পড়ত।

এলাকাবাসী জানায়, শনিবার সকালে হজরত মাহমুদ মেয়ে আয়েশাকে নিয়ে শ্রীপুর রেলগেট এলাকার এন এন ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের পাশে ঢাকা-ময়মনসিংহ রেললাইনের পাশে পায়চারী করতে থাকেন। সকাল ৯টার দিকে দেওয়ানগঞ্জগামী তিস্তা এক্সপ্রেস ট্রেন ওই এলাকায় পৌঁছালে হজরত মাহমুদ প্রথমে তার মেয়েকে চলন্ত ট্রেনের নিচে ছুড়ে ফেলে নিজেও ওই ট্রেনের নিচে ঝাঁপ দেন। এতে ট্রেনের নিচে কাটা পড়ে ঘটনাস্থলেই বাবা-মেয়ের মৃত্যু হয়।

নিহতের স্ত্রী হালিমা খাতুন ও স্বজনরা জানান, প্রায় ৩০ বছর আগে দিনমজুর হজরত মাহমুদ শ্রীপুর উপজেলার কর্নপুর ছিটপাড়া গ্রামের হালিমাকে বিয়ে করেন। বিয়ের পর হজরত স্ত্রীকে নিয়ে শ্বশুরবাড়িতে ঘরজামাই হিসেবে থাকেন। অভাব-অনটনের সংসারের জোগান দিতে হালিমা ভিক্ষাবৃত্তি ও অন্যের বাড়িতে ঝিয়ের কাজ করেন। নিঃসন্তান এ দম্পতি আয়েশাকে দত্তক নিয়ে লালন-পালন করতেন।

পরিবারের সদস্যরা অভিযোগ করেন, ফারুক নামের এক বখাটে যুবক প্রায় দুই মাস আগে আয়েশাকে ধর্ষণ করে। থানায় এ ব্যাপারে অভিযোগ দেওয়া হলে ফারুক ও তার লোকজন হালিমা ও তার স্বামীর ওপর ক্ষুব্ধ হয়। পরে স্থানীয় ইউপি সদস্য আবুল হোসেন এ ঘটনার বিচারের দায়িত্ব নেন। কিন্তু কোনো মীমাংসা ছাড়াই তিনি বিষয়টি ধামাচাপা দেন। এ ঘটনার পর চলতি মাসের প্রথম সপ্তাহে স্থানীয় কয়েকজন যুবকের বিরুদ্ধে শ্রীপুর মডেল থানায় গরু চুরির অভিযোগ করেন হালিমা। এ ঘটনারও মীমাংসা করে দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে দায়িত্ব নেন ওই ইউপি সদস্য আবুল হোসেন। কিন্তু এবারও তিনি কোনো সমাধান করেননি। হজরত মাহমুদ এ ঘটনার বিচারের জন্য তাগাদা দিলে এতে দুর্বৃত্তরা হালিমা ও তাঁর স্বামীর ওপর আরো বেশি ক্ষুব্ধ হয়। একপর্যায়ে তারা মারধর করার জন্য দা-লাঠি নিয়ে শুক্রবার দিনভর হজরত মাহমুদকে খোঁজাখুঁজি করে এবং হুমকি দেয়। এতে হজরতের পরিবার আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। শুক্রবার দিবাগত রাতে দুর্বৃত্তরা হজরতকে তাঁর বাড়িতে মারধর করে।
একপর্যায়ে গরু চুরি ও শিশু মেয়ে ধর্ষণের ঘটনার বিচার না পেয়ে এবং প্রভাবশালীদের নানা হুমকির পরিপ্রেক্ষিতে আতঙ্কিত হজরত ক্ষোভে ও অভিমানে শিশু মেয়েকে নিয়ে ট্রেনের নিচে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করেন।

শ্রীপুর মডেল থানার উপপরিদর্শক (এসআই) কায়সার আহমেদ স্থানীয়দের বরাত দিয়ে জানান, গরু চুরির ঘটনা সমাধান করে দেওয়ার দায়িত্ব নিয়ে গোসিঙ্গা ইউপির সদস্য আবুল হোসেন কোনো সমাধান দেননি। উপরন্তু শুক্রবার দিবাগত রাতে দুর্বৃত্তরা হজরতকে তাঁর বাড়িতে গিয়ে মারধর করে। এ ঘটনায় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ওই ইউপি সদস্য ও তাঁর ছেলেকে শনিবার আটক করা হয়েছে।

টঙ্গী রেলওয়ে পুলিশ ফাঁড়ির দায়িত্বপ্রাপ্ত উপপরিদর্শক (এসআই) সাইফুল ইসলাম জানান, ট্রেনে কাটা পড়ে নিহত দুজনের লাশ ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ মর্গে পাঠিয়েছে রেলওয়ে পুলিশ।

 

Facebook Comments
Please follow and like us: