ইসলামে শ্রম ও শ্রমিকের মর্যাদা

‘পরিশ্রমই সৌভাগ্যের প্রসূতি’। কাজেই পরিশ্রম করা ছোট কাজ নয়, তা মানুষের মর্যাদাসম্পন্ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কাজ। ক্ষুদ্র-বৃহৎ সব পেশা বা কার্যসম্পাদনের জন্যই মানুষকে অল্প-বিস্তর পরিশ্রমী হতে হয়। পার্থিব জগতে কোনো উন্নতি শ্রম ব্যতিরেকে সম্ভব হয়নি। তাই ইসলামের দৃষ্টিতে শ্রমের গুরুত্ব ও মর্যাদা অত্যন্ত তাৎপর্যময়।
হজরত আদম (আ) থেকে শুরু করে সর্বশেষ মহানবী হজরত মুহাম্মদ (স) পর্যন্ত সব নবী-রাসূল নিজ হাতে কাজ করতেন। স্বহস্তে কাজ সম্পাদন করা অতিশয় উত্তম। রসূলুল্লাহ (স) শ্রমের প্রতি অত্যধিক গুরুত্ব আরোপ ও শ্রমিকের দায়িত্ব-কর্তব্য সম্পর্কে বাণী প্রদান করে বলেছেন, ‘উত্তম উপার্জন হলো (পেশাজীবী) কর্মীর হাতের (শ্রমের) উপার্জন, যখন সে আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করে।’8
নবী করিম (স) নিজে শ্রম ব্যয় করে জীবিকা অর্জন করতেন। একদা তিনি তাঁর ফোস্কা পড়া পবিত্র হাত দেখিয়ে সাহাবায়ে কেরামের উদ্দেশে বলেছিলেন, ‘এটি এমন একটি হাত, যা আল্লাহ ও তাঁর রাসূল পছন্দ করেন।’ তিনি আরো বলেছেন, ‘নিজের হাতের কাজ ও শ্রম দ্বারা উপার্জিত খাদ্য খাওয়া অপেক্ষা উত্তম খাদ্য কেউ খেতে পারে না। হজরত দাউদ (আ) নিজের হাতের শ্রমের উপার্জিত খাবার খেতেন’ (বুখারী)।
আল্লাহ তাআলা মানুষ সৃষ্টি করে পৃথিবীতে প্রয়োজনীয় অন্নসংস্থানের বিভিন্ন উপাদান প্রদান করেছেন। মানুষ তার জীবন-জীবিকা নির্বাহ করার জন্য নিজের শ্রমকে অবশ্যই বিনিয়োগ করবে। মানব জাতির শ্রম বিনিয়োগের অধিকার ও কর্তব্য ইসলামে পূর্ণমাত্রায় স্বীকৃত। মানুষের জীবিকা অর্জনের প্রধান উপায় হচ্ছে শ্রম। এ সম্পর্কে পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন, ‘আর এই যে মানুষ তা-ই পায় যা সে করে। আর তার কর্ম অচিরেই দেখানো হবে; অতঃপর তাকে দেয়া হবে পূর্ণ প্রতিদান’ (সূরা নাজম: ৩৯-৪১)।
ইসলামী বিধানে শ্রমিক, চাষি এবং অন্যান্য শ্রমজীবীকে কেউ বিনা পারিশ্রমিকে খাটাতে পারবে না। তাদের ন্যায়সঙ্গত যথার্থ পারিশ্রমিক তাদের দিতেই হবে। তাই ইসলামের নির্দেশনা অনুসারে শ্রমিকের কাজের ফল বা মজুরি কিংবা পারিশ্রমিক যথাযথ দেয়া এবং কোনোরকম জুলুম-অন্যায়, নিপীড়ন, শোষণ বা বঞ্চনার প্রশ্রয় দেয়া উচিত নয়। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেছেন, ‘প্রত্যেকের মর্যাদা তার কাজ অনুযায়ী, এটা এজন্য যে, আল্লাহ প্রত্যেকের কর্মেও পূর্ণ প্রতিফল দিবেন এবং তাদের প্রতি অবিচার করা হবে না।’ (সূরা আহ্কাফ: ১৯)। মানুষের শ্রম করার অধিকার অত্যন্ত পবিত্র ঈমানী দায়িত্ব এবং এ অধিকার নারী-পুরুষের জন্য সর্বতোভাবে সমান মৌলিক অধিকার ও কর্তব্য হিসেবে স্বীকৃত। নিজের পছন্দমতো বৈধ ও আইনসম্মত যেকোনো পন্থায় শ্রম করা প্রতিটি মানুষের পূর্ণ স্বাধীনতাসহকারে মর্যাদাসম্পন্ন অধিকার। প্রত্যেকেই তার শ্রমের গুরুত্ব ও মর্যাদা অনুসারে মজুরি পাওয়ার অধিকার রাখে। কেউ অতিরিক্ত বা অতি উত্তম কাজ করলে তারও মজুরি বা সেজন্য ঘোষিত পুরস্কার পাওয়ার অধিকারও অবশ্যই স্বীকার করতে হবে। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেছেন, ‘কেউ অণু পরিমাণ সৎকর্ম করলে তা দেখবে এবং কেউ অণু পরিমাণ অসৎকর্ম করলে তাও দেখবে’ (সূরা যিলযাল:৭-৮)।
ইসলাম প্রতিটি মানুষের শ্রমের ফলভোগ করার অধিকার স্বীকার করে। একজন পরিশ্রম করবে, অন্যজন তার শ্রমের ফল অন্যায়ভাবে ভোগ করবে, উদ্বৃত্ত মূল্য নেবে, শোষণ করবে-তা হতে পারে না। মানুষের হাত যে কাজ করে তার কর্মফল পাওয়ার নিশ্চিত অধিকার তার অবশ্যই আছে। আল্লাহ তাআলা তাঁর বান্দাদের কর্মফলের অতিরিক্ত প্রদানের ঘোষণা করেছেন, ‘সৎকর্মশীলদের পুরস্কার কতই না উত্তম! ৃ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ মুমিনদের শ্রমফল নষ্ট করেন না’ (সূরা আল ইমরান: ১৩৬ ও ১৭১)।
রসূলুল্লাহ (স) শ্রমিককে মজুরি দান করার পরও তাকে লাভের অংশ দেয়ার জন্য উপদেশ দিয়ে বলেছেন, ‘কর্মচারীদের তাদের কাজের লভ্যাংশ দাও। কেননা আল্লাহর শ্রমিকদের বঞ্চিত করা যায় না।’ (মুসনাদে আহমদ) নবী করিম (স) শ্রমিকদের প্রতি মালিকের কর্তব্য ও শ্রমজীবীদের যেসব অধিকার নির্ধারণ করেছেন তন্মধ্যে গুত্বপূর্ণ অধিকার এই যে, তাকে শুধু পরিপূর্ণ মজুরি প্রদান করা যথেষ্ট নয়, বরং যতটা সম্ভব ত্বরিত মজুরি পরিশোধের কথাও বলা হয়েছে। মহানবী (স) বাণী প্রদান করেছেন, ‘শ্রমিককে শ্রমজনিত ঘাম শুকানোর আগেই অবিলম্বে তার মজুরি দাও’ (মুসনাদে আহমাদ)।
মজুরি না দেয়া বা কাজ অনুপাতে মজুরি কম দেয়াও ইসলামে নিষিদ্ধ। রসূলুল্লাহ (স) ইরশাদ করেছেন, ‘তিন ব্যক্তির ওপর আল্লাহ কিয়ামতের দিন অসন্তুষ্ট হবেন। তাদের একজন হচ্ছে যে ব্যক্তি কোনো শ্রমিক নিযুক্ত করে তার দ্বারা পূর্ণ কাজ করিয়ে নেয়ার পর তার মজুরি দেয়নি’ (বুখারী)।
সুতরাং ইসলামী বিধান মতে, মালিকের কর্তব্য হচ্ছে শ্রমিক নিয়োগের আগে অবশ্যই তার মজুরি নির্ধারণ করে দিতে হবে। নবী করিম (স) নির্দেশ প্রদান করেছেন যে, ‘কাজের পারিতোষিক নির্ধারণ ব্যতিরেকে কোনো শ্রমিককে কাজে নিয়োগ করবে না’ (বায়হাকী)।
ইসলামী বিধান অনুযায়ী মালিক স্বকীয় শক্তিবলে শ্রমিকের ওপর অতিরিক্ত কাজের বোঝা চাপাতে পারবে না। শ্রম করার অধিকারের পাশাপাশি শ্রমিকের কাজে অবকাশ বা ছুটি তথা বিশ্রাম পাওয়ার অধিকার আছে। কেননা আল্লাহ রাব্বুল আলামীন মানুষের সাধ্যাতীত কোনো কাজ করার দায়িত্ব চাপিয়ে দেননি। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘নিশ্চয়ই কষ্টের সাথেই স্বস্তি আছে।’ (সূরা ইনিশরাহ: ৫)
কাজেই একেবারে বিশ্রামহীন কাজ করতে শ্রমিকদের বাধ্য করা যাবে না। একসঙ্গে কয়েক ঘণ্টা কাজ করার পর অনুরূপ নিরবচ্ছিন্নভাবে কয়েকটি দিন কাজ করার পর তাকে অবসর দিতে হবে। আরাম ও বিশ্রামের সুযোগ দিতে হবে। প্রয়োজনীয় ছুটি দিতে হবে-এটিও মৌলিক মানবাধিকারের পর্যায়ে গণ্য। তাই মহানবী (স) ঘোষণা করেছেন, ‘লোকদের সহজাত দাও, কঠোরতার মধ্যে নিক্ষেপ করো না।’
ইসলামের দৃষ্টিতে শ্রমিক ও পুঁজি মালিকের পারস্পরিক সম্পর্ক ভ্রাতৃত্বের ও সাহায্যকারীর। পণ্য উৎপাদনে কিছু লোক শ্রম দিচ্ছে, অন্য কিছু লোক একান্ত জরুরি পুঁজি দিচ্ছে। আর অপর কিছু লোক দিচ্ছে ব্যবস্থাপনা, শ্রম ও সময়। তাই পণ্য উৎপাদন করে শ্রমিকরা যেমন ন্যায়সঙ্গত পরিমাণ মজুরি পাওয়ার অধিকারী, তেমনি ব্যবস্থাপনায় নিয়োজিত লোকেরা নির্দিষ্ট পরিমাণ বেতন-ভাতা ও পুঁজি মালিক উদ্যোক্তারা ন্যায়সঙ্গত মুনাফা লাভের অধিকারী। এরা একে অন্যের ওপর নির্ভরশীল। একজনকে ছাড়া অন্যজন উৎপাদনে অংশগ্রহণ করতে পারে না।
ইসলাম মূলত এমন শান্তিপূর্ণ পরিবেশ সৃষ্টি করতে চায়, যেখানে সব মানুষের অধিকারই সংরক্ষিত থাকে এবং চাওয়ার আগেই স্বতঃপ্রবৃত্ত হয়ে প্রত্যেকের অধিকার আদায় করে দিতে সবাই উদ্বুদ্ধ থাকে। প্রকৃতপক্ষে ইসলামে শ্রমের গুরুত্ব ও মর্যাদা, শ্রমিকের প্রতি মালিকের কর্তব্য এবং শ্রমের প্রতি শ্রমিকের কর্তব্য তথা মানবতার কর্মের অধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠা মানবাধিকার প্রতিষ্ঠাকামী অন্য সব প্রতিষ্ঠানের ১৪০০ বছর আগেই সুনিশ্চিত করা হয়েছে।
সূত্র : ইত্তেফাক

Facebook Comments
Please follow and like us: