আমে দুধে মিশে যাবে, আঁটি বাগানে যাবে

আমে দুধে মিশে যাবে, আঁটি বাগানে যাবে

01-14-300x214॥ বিশেষ প্রতিনিধি ॥
—————————
গ্রাম বাংলায় একটি কথা আছে। জনপ্রিয় এই বাক্যটি হচ্ছে ‘আমে দুধে মিশে যাবে, আঁটি বাগানে যাবে’। এর অর্থ হলো যে বা যারা মাঝখানে ঢুকে দুইয়ের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করেছেন, তিনি একদিন নিজেই বাদ পড়ে যাবেন। আর বিভাজিতরা নিশ্চয়ই মিলিত হবেন। এক ও অভিন্ন পথ ধরে চলবেন আবারও আগের মতো।
পাঠক প্রশ্ন করতেই পারেন হঠাৎ এই মসলা কেনো আমার মুখে। আমি উত্তর দিতে প্রস্তুত। গত বুধবার আমি শরিক হয়েছিলাম সাতক্ষীরা সার্কিট হাউসে জেলা প্রশাসকের দেওয়া ইফতার মাহফিলে। সেখানে যে অভিজ্ঞতা আমার হয়েছে তা একটু শেয়ার না করলে আম আর দুধের রহস্য উদঘাটন করা যাবে না। জেলা প্রশাসকের ওই ইফতারিতে ভিআইপি টেবিলে অনেকের মধ্যে দুই নেতা সবার নজর কেড়েছিলেন। দুইজন পাশাপাশি চেয়ারে বসেছিলেন। এক সাথে একই সময়ে  একই উপকরন  নিয়ে ইফতার করলেন তারা। মোনাজাত করলেন। নামাজ আদায় করলেন। কিন্তু অবাক বিষ্ময়ের ব্যাপার কেউ কারও দিকে ফিরেও  তাকালেন না । কুশল বিনিময় দুরে থাক কেউ কারও সাথে কথাও  বললেন না। মনে হলো কেউ কাউকে চেনেন না। অথবা চিনলেও একে অন্যের শত্রু। যে দুই ব্যক্তির কথা বলছি তারা দুজনেই আমাদের খুব কাছের মানুষ। সরকার দলীয় রাজনীতির অঙ্গনে তারা সরকারের খুব নিকটের লোক। তাদের একজন হলেন ১৯৮৬ ও ১৯৯১ এর সংসদ সদস্য, সাবেক জেলা পরিষদ  প্রশাসক এবং দীর্ঘকালের সেক্রেটারির পদ অলংকৃত করে রাখা ব্যক্তি বর্তমানে জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মুনসুর আহমেদ। তিনি একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা।  তিনি বারবার আমাদের ভোট নিয়েছেন। আরেকজন হলেন জেলা আওয়ামী লীগের সাধারন সম্পাদক ও জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান মো. নজরুল ইসলাম। কিছুদিন আগ পর্যন্ত তিনি ছিলেন সাতক্ষীরা সদর উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান। তিনিও আমাদের ভোট নিয়েছেন বারবার।  এ দুজনের কেউ কারও চেয়ে কম জনপ্রিয় নন। দুজনেই আমাদের ভোট  নিয়েই হয়েছেন জনপ্রতিনিধি। তাদেরকে আমরা দেখেছি বঙ্গবন্ধুর আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে বেড়াতে। একই দলের ছত্রছায়ায় তাদেরকে হাঁটতে দেখেছি। দেখেছি তাদের দলে শামিল হবার জন্য আমজনতাকে আহবান জানাতে। এক সাথে রাজপথে মিছিল করেছেন তারা। এক সাথে মানুষের কাছে ভোট চেয়েছেন তারা। একসাথে আন্দোলন করেছেন তারা। এক সাথে দল গুছিয়েছেন। একসাথে নির্বাচনও করেছেন তারা। সেদিন তাদের মধ্যে এতো মিল মহব্বত দেখেছি  আর আজ কি দেখলাম কেউ কারও সাথে কথা নাহি কয়। পবিত্র রমজানের শিক্ষা কি তা নিয়ে যদি ব্যাখ্যা করি তবে একটি কথা বলতে পারি রমজান শেখায় ভ্রাতৃত্ব , রমজান শেখায় মহান আল্লাহর প্রতি নিজেকে পুরোমাত্রায় সমর্পন। রমজান শেখায় ইসলামের আদর্শের প্রতি নিজেকে সমর্পন। আমাদের আলোচ্য দুই নেতা নিশ্চয়ই রমজানের সেই শিক্ষা গ্রহন করেছেন। আর সেই শিক্ষার বলে বলীয়ান হয়ে তারা জেলা প্রশাসকের দেওয়া ইফতারে শরিক হয়ে রমজানের পবিত্রতা , ভ্রাতৃত্ব রক্ষা করতে অগ্রসর হয়েছেন। দেশ ও জাতির জন্য তারা এক সাথে অভিন্ন ভাষায় মোনাজাত করেছেন। তাহলে কেনো মুখ ফিরিয়ে থাকা।
এই দুই নেতাকে আমরা  বহুকাল ধরে দেখে আসছি। তাদের চলার পথ আদর্শ সবকিছুর সাথে আমাদেরও ঘনিষ্ঠতা। কিন্তু মাঝখানে একটি নির্বাচনই তাদের মধ্যে ছেদ ঘটিয়ে দিয়েছে। এ নির্বাচনে জেলা পরিষদ প্রশাসক মুনসুর আহমেদ প্রার্থী হয়েছিলেন। আওয়ামী লীগ তাকে কেন্দ্রীয়ভাবে মনোনয়ন দিয়েছিল।  তার হাতে ছিল বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার চিঠি। অপরদিকে একই পদে প্রার্থী হয়েছিলেন জেলা আওয়ামী লীগের সাধারন সম্পাদক মো. নজরুল ইসলাম। তিনি দলের কেন্দ্রিয় সমর্থন পাননি। তবু ফলাফলে মুনসুর  আহমেদ হেরে গেলেন, আর জিতে গেলেন নজরুল ইসলাম। সেই যে দুজনের মুখ না দেখাদেখি শুরু হয়েছে তার শেষ যেনো কিছুতেই নামছে না ।  এখানে দুটি প্রশ্ন আমার মাথায় আসছে। ১. জেলা পরিষদ নির্বাচন যদি না হতো তাহলে কি হতো। ২. জেলা পরিষদ নির্বাচনে ফল যদি উল্টো হতো অর্থাৎ মুনসুর আহমেদ জিতে যেতেন এবং নজরুল ইসলাম হেরে যেতেন তাহলে কি হতো।  আমার বিশ্বাস মুখ দেখাদেখি বন্ধ হতো না। তাহলে কি বুঝবো যে জেলা পরিষদ নির্বাচনই তাদের মধ্যে ছেদ ঘটিয়ে দিয়েছে। ২৮ ডিসেম্বর ২০১৬ তারিখের সে ভোটযুদ্ধ তো শেষ হয়ে গেছে। যুদ্ধের পর তো আমরা সবাই এক জায়গাতেই আছি, সাথে রয়েছে শুধু সেদিনকার ফলাফলটা। প্রতিদ্বন্দ্বিতা তো আর নেই।  হারজিতের পালা তো সেদিনই শেষ । দেরিতে হলেও দুজনে মিষ্টিমুখ করেছেন। কোলাকুািল করে বুকে বুক মিলিয়েছেন। তাহলে আবার কেনো বিমুখ হয়ে থাকা। দেখা হলেও কথা হলো না কেনো।
এই দুই নেতা গত ৪ মে ঢাকায় প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক কার্যালয়ে ছুটেছেন। দলের নেত্রী তাদের ডেকেছিলেন। নেত্রীর হয়ে তাদের সাথে কথা বলেছেন দলের সেক্রেটারি সেতুমন্ত্রি ওবায়দুল কাদের। তাদের মধ্যে আবারও মিল ঘটিয়ে দিয়েছেন তিনি। বলেছেন দলের ভবিষ্যত গঠনের কথা। নির্বাচনের কথা। আবারও এক কাতারে এক সাথে দলকে এগিয়ে নেওয়ার কথা। দুই নেতা বিনাশর্তে তাতে সায় দিয়েছেন । বুকে বুক মিলিয়েছেন। নিজেদের ভুল নিজেরাই শুধরে নিয়েছেন। করমর্দন করে জানান দিয়েছেন যে তারা  এক ও অভিন্ন পথে এগিয়ে যাবেন। বঙ্গবন্ধুর আদর্শকে ধারন করে তারা আগের মতোই দল গোছাবেন। ২০ মে তারিখে তারা আবারও বসেছিলেন ঢাকায়। পরদিন প্রধানমন্ত্রীর সাথে বৈঠকের নির্ধারিত দিনও ছিল। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী দেশের বাইরে যাওয়ায় সে কর্মসূচি বাস্তবায়িত হয়নি। এতোসবের পরও দুই নেতার মধ্যে বিভেদ কেনো। কেনো এই বিভাজন। সামনে তো নির্বাচন। ঘর গোছানোর পালা তো এখন। এখন তো মান অভিমানের সময় নয়। মান অভিমান সবই তো শেষ হয়ে গেছে ২৮ ডিসেম্বর ভোটাভুটির দিনে।
আমরা দেখতে চাই আম আর দুধের মিল। আমরা দেখতে চাই সেই আঁটি বাগানে নির্বাসিত হোক। পবিত্র রমজান মাসে ইবাদতের সওয়াব আল্লাহ বৃদ্ধি করে দেন। এই রমজানেই হোক তাদের মিলন মেলা। আরেকটি ইফতারে বসে  আমরা দেখতে চাই আম আর দুধের মহামিলন। আমজনতা হিসাবে আমরা যারা তাদের ভোটার তাদেরই  এ প্রত্যাশা।  অপেক্ষায় থাকছি সেই দিনটির। সেই ইফতারের। যেদিন আমে দুধে মিশে যাবে , আঁটি বাগানে যাবে।
——- সুভাষ চৌধুরী , সাতক্ষীরা ডিস্ট্রিক্ট করেসপনডেন্ট, দৈনিক যুগান্তর ও এনটিভি।

Facebook Comments
Please follow and like us: