বৃহস্পতিবার , ১৬ জুলাই ২০২০

সরকার কানে দিয়েছে তুলা। যে দেশের জনগণের ন্যায়বিচারের প্রত্যাশা ক্ষীণ আর দুরূহ, সে দেশের তরক্কি হয়নি।

আন্তর্জাতিকওয়ালাদের জ্বালায় ত্যক্তবিরক্ত। পত্রিকা খুললেই সাহেবদের যতসব আজগুবি জরিপের রিপোর্ট। আমাদের দেন না, আমরাও ইচ্ছেমতো ফল বানিয়ে অনায়াসেই জাতীয় রিপোর্ট বানাতে পারব।

২৩ জুনের প্রথম আলোয় আন্তর্জাতিকওয়ালাদের দু-দুটি রিপোর্টের খবর বেরিয়েছে। একটা তো খোদ প্রথম পাতায়। শিরোনাম ‘শ্রম অধিকারে বাংলাদেশ খারাপ দেশের তালিকায়’। বলা বাহুল্য, দেশ সম্পর্কে ভালো কথা কিছুই নেই। যথারীতি সবচেয়ে খারাপ দেশগুলোর তালিকায় বাংলাদেশ। প্রথম বাক্যেই বলা হয়েছে, শ্রম অধিকার নিশ্চিতে বিশ্বের সবচেয়ে খারাপ ১০টি দেশের একটি হলো বাংলাদেশ। শ্রমিক হত্যা, ইউনিয়ন করতে না দেওয়া, আন্দোলন দমনে কঠোর মনোভাব, অনিরাপদ কর্ম পরিবেশ…ইত্যাদি ইত্যাদি।

শ্রমিকদের জন্য প্রায় সবকিছুতেই আমরা প্রায় সবার চেয়েই খারাপ। রিপোর্টটি বানিয়েছে ইন্টারন্যাশনাল ট্রেড ইউনিয়ন কনফেডারেশন (আইটিইউসি)। তাদের রিপোর্টে বলে, আমাদের দেশে শ্রমিকদের অবস্থা নাকি যুদ্ধবিগ্রহে লিপ্ত ইরাক, সিরিয়া, ইয়েমেন আর লিবিয়ার মতো। বাংলাদেশে নাকি শ্রমিক খুন হয়, গুম হয়, শতকরা ১০ ভাগ গার্মেন্টস কারখানায় ট্রেড ইউনিয়ন নেই। শ্রমিকেরা দাবিদাওয়া করলে তঁাদের লাঠিপেটা করা হয়, গ্রেপ্তার করা হয় শ্রমিকদের আইনজীবীসহ।

সান্ত্বনা একটাই। ইরাক-সিরিয়ার মতো বছর বছর যুদ্ধবিগ্রহে লিপ্ত না হয়েও আমাদের সরকার দেশের শ্রমিকদের অবস্থা ওই সব দেশের কাতারে নিয়ে যেতে সফল হয়েছে। ১৩৯টি দেশের শ্রমিকদের মধ্যে আমাদের স্থান সবচেয়ে খারাপ ১০টি দেশের মধ্যে।

অন্য জরিপের রিপোর্ট ছাপা হয়েছে প্রথম আলোর তৃতীয় পাতায়। শিরোনাম ‘ইতিবাচক অভিজ্ঞতার বৈশ্বিক তালিকায় বাংলাদেশ তলানিতে’। এই রিপোর্টের আন্তর্জাতিকওয়ালা হলো গ্যালাপ। গ্যালাপ ব্যাটারা বহু যুগ ধরেই এটা-সেটা নিয়ে জরিপ করে বেড়ায়। ট্রাম্প যে জিতবেন, সেটা কি জরিপ করে বলতে পেরেছিল?

আন্তর্জাতিকওয়ালাদের কথা তো বলতে গেলে একটাই। ১৪২টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ষষ্ঠ। অর্থাৎ বাকি ১৩৬টি দেশের লোকজনের ইতিবাচক অভিজ্ঞতা আমাদের চেয়ে ভালো। এক নম্বরে বা নিকৃষ্টতম যথারীতি ইয়েমেন। যথারীতি আমরাও আছি তাদের কাছাকাছি।

যত দূর মনে পড়ে, আন্তর্জাতিকওয়ালাদের কুনজর শুরু করেছিল ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল। দুর্নীতির সূচকে প্রথম স্থান আমরা ধরে রেখেছিলাম বছর পাঁচেক, এখন অবস্থান ১২–১৩তে। তাতে কী? বিশ্বের প্রায় পৌনে দুই শ দেশকে তো পেছনে ফেলে রেখেছি।

ধারণা, আরেকটা জরিপে আমরা নির্ঘাত ফার্স্ট। কেউ কেন করছে না, কী জানি। কোন দেশে নির্বাচনে সবচেয়ে বেশি সাংসদ বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়…ধারণা, এই জরিপে আমরা ইয়েমেন, ইরাক, সিরিয়াসহ সব প্রতিদ্বন্দ্বীকে অনায়াসে ‘বিট’ করব।

২.

শব্দটি মাথায় এসেও নিজেরই একটু খটকা লাগছিল। ইদানীং, আসলে গত বইমেলা থেকে সাংঘাতিক একটা বই জোগাড় হয়েছিল। বাংলা একাডেমির তিন খণ্ডের ‘বিবর্তনমূলক বাংলা অভিধান’। আমাদের কোন শব্দ প্রথম বা প্রথম প্রথম কার লেখায় (কবিতা, গদ্য, উপন্যাস, মহাকাব্য) কে ব্যবহার করেছেন তার উল্লেখ। যে শব্দটা খুঁজতে গিয়ে এত কথা—তরক্কি। ধারণা ছিল আইয়ুব আমলে-না মোগল সুলতানি আমলে না, আমাদের পাকিস্তানি আমলের ফিল্ড মার্শাল প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খানের আমলে তরক্কি কথাটা বাংলা ভাষায় প্রবেশ করেছিল। বিবর্তনমূলক অভিধান বলছে, ১৯৪৯ সালে মাহে নও সাময়িকীতে প্রথম ব্যবহৃত হয়েছিল। তরক্কি অর্থ অর্থনৈতিক উন্নতি। তরক্কি হচ্ছে, অর্থাৎ আমাদের আর্থিক অবস্থার উন্নতি হচ্ছে। আসলে সঁাই সঁাই তরক্কি হচ্ছে।

উন্নয়ন-উন্নতি সবই হচ্ছে তরতর করে। কোনো সন্দেহ নেই, নেই কোনো বিতর্ক। এমত বাস্তবে এই আন্তর্জাতিকওয়ালারা তাদের ওয়েবসাইটে বাংলাদেশ নিয়ে এ সবক, তথাকথিত রিপোর্ট প্রকাশ করে, তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি আইন, ২০০৬–এর ৫৭ ধারা লঙ্ঘন করছে। ওই ধারা বলছে ‘কোনো ব্যক্তি যদি ইচ্ছাকৃতভাবে ওয়েবসাইটে বা অন্য কোনো ইলেকট্রনিক বিন্যাসে এমন কিছু প্রকাশ বা সম্প্রচার করেন…কেহ পড়িলে বা দেখিলে বা শুনিলে…মানহানি ঘটে…রাষ্ট্র বা ব্যক্তির ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন² হয়…’।

পাঠক নিশ্চয় অনুধাবন করছেন সহজেই যে এই আন্তর্জাতিকওয়ালাদের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত রিপোর্টে বিশ্বের দরবারে আমাদের মানহানি হয়েছে এবং হচ্ছে; রাষ্ট্র ও ব্যক্তির ভাবমূর্তি অত্যন্তভাবে ক্ষুণ্ন² হচ্ছে।

৫৭ ধারার অপরাধের শাস্তি সুবিদিত। সর্বনিম্ন ৭ বছর, সর্বোচ্চ ১৪ বছর।

ইদানীং দেশের বহু সাংবাদিক, সাধারণ নাগরিকসহ বহু ব্যক্তির বিরুদ্ধে ৫৭ ধারায় মামলা হয়েছে। হবিগঞ্জ প্রেসক্লাবের সভাপতি থেকে বন্ধু আফসান চৌধুরীর বিরুদ্ধে মামলা তো পবিত্র রমজান মাসের ঘটনা। তাঁরা যদি বা তাঁদের মন্তব্যে-বক্তব্যে কোনো কিছুর হানি ঘটিয়েও থাকেন, তা এই আন্তর্জাতিওয়ালাদের মিথ্যা, কুরুচি, জঘন্য, সাংঘাতিক তথাকথিত জরিপের কারণে আমাদের, অর্থাৎ এই দেশ আর দেশের মাননীয় রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রীসহ আমার-আপনার মতো তুচ্ছাতিতুচ্ছ সব নাগরিকের মানহানি হয়েছে, ভাবমূর্তি ভীষণভাবে ভূলুণ্ঠিত হয়েছে। এদের আর ছাড় দেওয়া যায় না। ৫৭ ধারায় মামলা করতে হবে।

এত জরিপের পর জরিপে বারবার প্রতিবার আমাদের সর্বনিকৃষ্ট ১০টি দেশের তালিকায় ফেলবে, আর আমরা চুপ করে বসে থাকব—সেটা আর হতে দেওয়া যায় না।

আর মামলা না করা মানে তো মেনে নেওয়া যে আমরা আসলেই তারা যা বলেছে তাই। অর্থাৎ জরিপ বাস্তব, আমাদের কানে কানেই তরক্কি মিথ্যা। সেটা কি সম্ভব? মোটেও না। অসম্ভব। আমার আওয়ামী আইনজীবীরা কোথায়। মামলা ঠুকে দিন, শুধু দেশি না, বিদেশি সংবাদমাধ্যমেও নাম ফাটবে। সরকারও হবে বেজায় খুশি।

 

৩.

অখাদ্য-কুখাদ্য আর খাদ্যাভাবে কঙ্কালসার শরীরের মুখটিতে রুগ্‌ণ-লিপস্টিক আর পাউডারের প্রলেপ দিয়ে, চোখ-ভুরু আর চুলে কালো রং লেপে কিছুক্ষণের জন্য বাস্তবতাকে রেখেঢেকে রাখা যায়। তবে রুগ্‌ণ-দুর্বল শরীরটা বেশি দিন চলবে না। মুখ থুবড়ে পড়ে যাবে।

দেশের মূল প্রতিষ্ঠানগুলো রুগ্‌ণ-দুর্বল, সে দেশের তরক্কি প্রায়ই ধোঁয়াশা।

আদালত কি ভালো চলছে? সোজা উত্তর না। প্রধান বিচারপতি ভালো চলার জন্য করণীয় অনেক কিছুর কথা প্রায়ই বলছেন। সরকার কানে দিয়েছে তুলা। যে দেশের জনগণের ন্যায়বিচারের প্রত্যাশা ক্ষীণ আর দুরূহ, সে দেশের তরক্কি হয়নি। সরকারপ্রধান যত বেশি দশক দেশ শাসন করুন না কেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতির নির্বাচনে সরকারদলীয় শিক্ষকেরা প্রায় সব কটি আসনেই জিতেছেন। যে বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশির শিক্ষকই সরকার-সমর্থক, সেটা আর যাই হোক উত্তম বিশ্ববিদ্যালয় থাকতে পারে না। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান কাজ প্রশ্ন তোলা, প্রশ্ন করা। এখন সরকারের কোনো নীতি-পদ-সিদ্ধান্ত নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তেমন কোনো প্রশ্ন তোলে না। একযোগে সরকারকে সমর্থন করে।

নতুন নির্বাচন কমিশনের এক শ দিন পেরিয়ে গেছে। আলাপ-আলোচনা করবে, রোডম্যাপ করবে, ভোটার তালিকা হালনাগাদ
করবে, ইত্যাদি ইত্যাদি। বাপের ব্যাটার মতো কোনো পদক্ষেপ এখনো নজরে পড়েনি।

পত্রিকায় রিপোর্ট বেরিয়েছিল, মান্যবর এক হাফ মিনিস্টার ১০ হাজার নিঃস্ব দরিদ্রের মাঝে ঈদবস্ত্র বিতরণ করেছেন। মহৎ কাজ, তবে সিটিং-মিনিস্টারের জন্য নয়। প্রতিটি দুশো টাকা করে ১০ হাজার বস্ত্রের জন্য খরচ হওয়ার কথা ২০ লাখ টাকা। এত টাকা নিশ্চয় মন্ত্রীর বেতনভাতাদি বাবদ প্রাপ্য অর্থ থেকে খরচ করেননি। মন্ত্রী তঁার ব্যবসার মুনাফা থেকে এই টাকা বিলিয়েছেন।

সংবিধান নামক একটা মোটামুটি গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ আছে। দুটো অনুচ্ছেদ সাংসদ-মন্ত্রীদের টাকাপয়সার ব্যাপারে জড়িত। অনুচ্ছেদ ৬৬ ও ১৪৭। সংশ্লিষ্ট আইন দুটি—গণপ্রতিনিধিত্বমূলক আদেশ, ১৯৭২ এবং সংসদ সদস্য (বিরোধ নিষ্পত্তি) আইন, ১৯৮০। সংবিধানের ৬৬ ও ১৪৭, গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের ১২ ধারা মন্ত্রীর জন্য আর ১৯৮০ সালের বিরোধ নিষ্পত্তি আইনটা নির্বাচন কমিশনের জন্য। মন্ত্রী নিজের ব্যবসা থেকেও মন্ত্রী থাকা অবস্থায় মুনাফা অর্জন করার জন্য সময় ও শ্রম দিতে পারেন না। আইন লঙ্ঘন করলে ১৯৮০-এর আইন অনুযায়ী মন্ত্রীকে বরখাস্ত করার ক্ষমতা নির্বাচন কমিশনের।

জানি, নির্বাচন কমিশন বলবে: ভাই! আইন পড়ে দেখেছি। আমাদের এত্তসব ক্ষমতা-টমতা নাই।

প্রতিষ্ঠানগুলো ভেঙে পড়েছে। ভাবমূর্তি রক্ষার একমাত্র উপায় হলো দেশিদের পর এখন আন্তর্জাতিকওয়ালাদের ৫৭ ধারার আওতায় আনতে হবে।

৪.

আমাদের আশঙ্কা, দেশের সমস্যাগুলো ক্রমেই সমাধান-অযোগ্য হয়ে পড়ছে। ৫৭ ধারা দিয়ে শেষ চেষ্টা সরকার নিশ্চয়ই করবে। সরকারের মন্ত্রণালয় নাকি বলেছে, পাহাড়ি এলাকায় ভূমিধসের অন্যতম প্রধান কারণ বজ্রপাত।

তাই আবারও বলছি, প্রতিষ্ঠানগুলো ভেঙে পড়ছে। সবাইকে শত্রু না ভেবে একটু ঠান্ডা মাথায় চিন্তা করুন। প্রায় সব ব্যাপারে বিশ্বের নিকৃষ্টতম দেশগুলোর একটি হওয়ার জন্য এ দেশ মুক্তিযুদ্ধ করেনি, স্বাধীন হয়নি। প্রায় সব ব্যাপারেই এই দেশটিকে বিশ্বের নিকৃষ্টতম দেশের তালিকায় কেন নিয়ে গেলেন? এই প্রশ্নটাও করছি বিশ্বের অন্যতম নিকৃষ্টতম শহরে বসে।

জবাব দিতে হবে।

ড. শাহদীন মালিক: অ্যাডভোকেট, সুপ্রিম কোর্ট। আইনের শিক্ষক, ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিক।

 

আরও

আন্তর্জাতিকওয়ালাদের জ্বালায় ত্যক্তবিরক্ত। পত্রিকা খুললেই সাহেবদের যতসব আজগুবি জরিপের রিপোর্ট। আমাদের দেন না, আমরাও ইচ্ছেমতো ফল বানিয়ে অনায়াসেই জাতীয় রিপোর্ট বানাতে পারব।

২৩ জুনের প্রথম আলোয় আন্তর্জাতিকওয়ালাদের দু-দুটি রিপোর্টের খবর বেরিয়েছে। একটা তো খোদ প্রথম পাতায়। শিরোনাম ‘শ্রম অধিকারে বাংলাদেশ খারাপ দেশের তালিকায়’। বলা বাহুল্য, দেশ সম্পর্কে ভালো কথা কিছুই নেই। যথারীতি সবচেয়ে খারাপ দেশগুলোর তালিকায় বাংলাদেশ। প্রথম বাক্যেই বলা হয়েছে, শ্রম অধিকার নিশ্চিতে বিশ্বের সবচেয়ে খারাপ ১০টি দেশের একটি হলো বাংলাদেশ। শ্রমিক হত্যা, ইউনিয়ন করতে না দেওয়া, আন্দোলন দমনে কঠোর মনোভাব, অনিরাপদ কর্ম পরিবেশ…ইত্যাদি ইত্যাদি।

শ্রমিকদের জন্য প্রায় সবকিছুতেই আমরা প্রায় সবার চেয়েই খারাপ। রিপোর্টটি বানিয়েছে ইন্টারন্যাশনাল ট্রেড ইউনিয়ন কনফেডারেশন (আইটিইউসি)। তাদের রিপোর্টে বলে, আমাদের দেশে শ্রমিকদের অবস্থা নাকি যুদ্ধবিগ্রহে লিপ্ত ইরাক, সিরিয়া, ইয়েমেন আর লিবিয়ার মতো। বাংলাদেশে নাকি শ্রমিক খুন হয়, গুম হয়, শতকরা ১০ ভাগ গার্মেন্টস কারখানায় ট্রেড ইউনিয়ন নেই। শ্রমিকেরা দাবিদাওয়া করলে তঁাদের লাঠিপেটা করা হয়, গ্রেপ্তার করা হয় শ্রমিকদের আইনজীবীসহ।

সান্ত্বনা একটাই। ইরাক-সিরিয়ার মতো বছর বছর যুদ্ধবিগ্রহে লিপ্ত না হয়েও আমাদের সরকার দেশের শ্রমিকদের অবস্থা ওই সব দেশের কাতারে নিয়ে যেতে সফল হয়েছে। ১৩৯টি দেশের শ্রমিকদের মধ্যে আমাদের স্থান সবচেয়ে খারাপ ১০টি দেশের মধ্যে।

অন্য জরিপের রিপোর্ট ছাপা হয়েছে প্রথম আলোর তৃতীয় পাতায়। শিরোনাম ‘ইতিবাচক অভিজ্ঞতার বৈশ্বিক তালিকায় বাংলাদেশ তলানিতে’। এই রিপোর্টের আন্তর্জাতিকওয়ালা হলো গ্যালাপ। গ্যালাপ ব্যাটারা বহু যুগ ধরেই এটা-সেটা নিয়ে জরিপ করে বেড়ায়। ট্রাম্প যে জিতবেন, সেটা কি জরিপ করে বলতে পেরেছিল?

আন্তর্জাতিকওয়ালাদের কথা তো বলতে গেলে একটাই। ১৪২টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ষষ্ঠ। অর্থাৎ বাকি ১৩৬টি দেশের লোকজনের ইতিবাচক অভিজ্ঞতা আমাদের চেয়ে ভালো। এক নম্বরে বা নিকৃষ্টতম যথারীতি ইয়েমেন। যথারীতি আমরাও আছি তাদের কাছাকাছি।

যত দূর মনে পড়ে, আন্তর্জাতিকওয়ালাদের কুনজর শুরু করেছিল ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল। দুর্নীতির সূচকে প্রথম স্থান আমরা ধরে রেখেছিলাম বছর পাঁচেক, এখন অবস্থান ১২–১৩তে। তাতে কী? বিশ্বের প্রায় পৌনে দুই শ দেশকে তো পেছনে ফেলে রেখেছি।

ধারণা, আরেকটা জরিপে আমরা নির্ঘাত ফার্স্ট। কেউ কেন করছে না, কী জানি। কোন দেশে নির্বাচনে সবচেয়ে বেশি সাংসদ বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়…ধারণা, এই জরিপে আমরা ইয়েমেন, ইরাক, সিরিয়াসহ সব প্রতিদ্বন্দ্বীকে অনায়াসে ‘বিট’ করব।

২.

শব্দটি মাথায় এসেও নিজেরই একটু খটকা লাগছিল। ইদানীং, আসলে গত বইমেলা থেকে সাংঘাতিক একটা বই জোগাড় হয়েছিল। বাংলা একাডেমির তিন খণ্ডের ‘বিবর্তনমূলক বাংলা অভিধান’। আমাদের কোন শব্দ প্রথম বা প্রথম প্রথম কার লেখায় (কবিতা, গদ্য, উপন্যাস, মহাকাব্য) কে ব্যবহার করেছেন তার উল্লেখ। যে শব্দটা খুঁজতে গিয়ে এত কথা—তরক্কি। ধারণা ছিল আইয়ুব আমলে-না মোগল সুলতানি আমলে না, আমাদের পাকিস্তানি আমলের ফিল্ড মার্শাল প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খানের আমলে তরক্কি কথাটা বাংলা ভাষায় প্রবেশ করেছিল। বিবর্তনমূলক অভিধান বলছে, ১৯৪৯ সালে মাহে নও সাময়িকীতে প্রথম ব্যবহৃত হয়েছিল। তরক্কি অর্থ অর্থনৈতিক উন্নতি। তরক্কি হচ্ছে, অর্থাৎ আমাদের আর্থিক অবস্থার উন্নতি হচ্ছে। আসলে সঁাই সঁাই তরক্কি হচ্ছে।

উন্নয়ন-উন্নতি সবই হচ্ছে তরতর করে। কোনো সন্দেহ নেই, নেই কোনো বিতর্ক। এমত বাস্তবে এই আন্তর্জাতিকওয়ালারা তাদের ওয়েবসাইটে বাংলাদেশ নিয়ে এ সবক, তথাকথিত রিপোর্ট প্রকাশ করে, তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি আইন, ২০০৬–এর ৫৭ ধারা লঙ্ঘন করছে। ওই ধারা বলছে ‘কোনো ব্যক্তি যদি ইচ্ছাকৃতভাবে ওয়েবসাইটে বা অন্য কোনো ইলেকট্রনিক বিন্যাসে এমন কিছু প্রকাশ বা সম্প্রচার করেন…কেহ পড়িলে বা দেখিলে বা শুনিলে…মানহানি ঘটে…রাষ্ট্র বা ব্যক্তির ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন² হয়…’।

পাঠক নিশ্চয় অনুধাবন করছেন সহজেই যে এই আন্তর্জাতিকওয়ালাদের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত রিপোর্টে বিশ্বের দরবারে আমাদের মানহানি হয়েছে এবং হচ্ছে; রাষ্ট্র ও ব্যক্তির ভাবমূর্তি অত্যন্তভাবে ক্ষুণ্ন² হচ্ছে।

৫৭ ধারার অপরাধের শাস্তি সুবিদিত। সর্বনিম্ন ৭ বছর, সর্বোচ্চ ১৪ বছর।

ইদানীং দেশের বহু সাংবাদিক, সাধারণ নাগরিকসহ বহু ব্যক্তির বিরুদ্ধে ৫৭ ধারায় মামলা হয়েছে। হবিগঞ্জ প্রেসক্লাবের সভাপতি থেকে বন্ধু আফসান চৌধুরীর বিরুদ্ধে মামলা তো পবিত্র রমজান মাসের ঘটনা। তাঁরা যদি বা তাঁদের মন্তব্যে-বক্তব্যে কোনো কিছুর হানি ঘটিয়েও থাকেন, তা এই আন্তর্জাতিওয়ালাদের মিথ্যা, কুরুচি, জঘন্য, সাংঘাতিক তথাকথিত জরিপের কারণে আমাদের, অর্থাৎ এই দেশ আর দেশের মাননীয় রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রীসহ আমার-আপনার মতো তুচ্ছাতিতুচ্ছ সব নাগরিকের মানহানি হয়েছে, ভাবমূর্তি ভীষণভাবে ভূলুণ্ঠিত হয়েছে। এদের আর ছাড় দেওয়া যায় না। ৫৭ ধারায় মামলা করতে হবে।

এত জরিপের পর জরিপে বারবার প্রতিবার আমাদের সর্বনিকৃষ্ট ১০টি দেশের তালিকায় ফেলবে, আর আমরা চুপ করে বসে থাকব—সেটা আর হতে দেওয়া যায় না।

আর মামলা না করা মানে তো মেনে নেওয়া যে আমরা আসলেই তারা যা বলেছে তাই। অর্থাৎ জরিপ বাস্তব, আমাদের কানে কানেই তরক্কি মিথ্যা। সেটা কি সম্ভব? মোটেও না। অসম্ভব। আমার আওয়ামী আইনজীবীরা কোথায়। মামলা ঠুকে দিন, শুধু দেশি না, বিদেশি সংবাদমাধ্যমেও নাম ফাটবে। সরকারও হবে বেজায় খুশি।

 

৩.

অখাদ্য-কুখাদ্য আর খাদ্যাভাবে কঙ্কালসার শরীরের মুখটিতে রুগ্‌ণ-লিপস্টিক আর পাউডারের প্রলেপ দিয়ে, চোখ-ভুরু আর চুলে কালো রং লেপে কিছুক্ষণের জন্য বাস্তবতাকে রেখেঢেকে রাখা যায়। তবে রুগ্‌ণ-দুর্বল শরীরটা বেশি দিন চলবে না। মুখ থুবড়ে পড়ে যাবে।

দেশের মূল প্রতিষ্ঠানগুলো রুগ্‌ণ-দুর্বল, সে দেশের তরক্কি প্রায়ই ধোঁয়াশা।

আদালত কি ভালো চলছে? সোজা উত্তর না। প্রধান বিচারপতি ভালো চলার জন্য করণীয় অনেক কিছুর কথা প্রায়ই বলছেন। সরকার কানে দিয়েছে তুলা। যে দেশের জনগণের ন্যায়বিচারের প্রত্যাশা ক্ষীণ আর দুরূহ, সে দেশের তরক্কি হয়নি। সরকারপ্রধান যত বেশি দশক দেশ শাসন করুন না কেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতির নির্বাচনে সরকারদলীয় শিক্ষকেরা প্রায় সব কটি আসনেই জিতেছেন। যে বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশির শিক্ষকই সরকার-সমর্থক, সেটা আর যাই হোক উত্তম বিশ্ববিদ্যালয় থাকতে পারে না। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান কাজ প্রশ্ন তোলা, প্রশ্ন করা। এখন সরকারের কোনো নীতি-পদ-সিদ্ধান্ত নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তেমন কোনো প্রশ্ন তোলে না। একযোগে সরকারকে সমর্থন করে।

নতুন নির্বাচন কমিশনের এক শ দিন পেরিয়ে গেছে। আলাপ-আলোচনা করবে, রোডম্যাপ করবে, ভোটার তালিকা হালনাগাদ
করবে, ইত্যাদি ইত্যাদি। বাপের ব্যাটার মতো কোনো পদক্ষেপ এখনো নজরে পড়েনি।

পত্রিকায় রিপোর্ট বেরিয়েছিল, মান্যবর এক হাফ মিনিস্টার ১০ হাজার নিঃস্ব দরিদ্রের মাঝে ঈদবস্ত্র বিতরণ করেছেন। মহৎ কাজ, তবে সিটিং-মিনিস্টারের জন্য নয়। প্রতিটি দুশো টাকা করে ১০ হাজার বস্ত্রের জন্য খরচ হওয়ার কথা ২০ লাখ টাকা। এত টাকা নিশ্চয় মন্ত্রীর বেতনভাতাদি বাবদ প্রাপ্য অর্থ থেকে খরচ করেননি। মন্ত্রী তঁার ব্যবসার মুনাফা থেকে এই টাকা বিলিয়েছেন।

সংবিধান নামক একটা মোটামুটি গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ আছে। দুটো অনুচ্ছেদ সাংসদ-মন্ত্রীদের টাকাপয়সার ব্যাপারে জড়িত। অনুচ্ছেদ ৬৬ ও ১৪৭। সংশ্লিষ্ট আইন দুটি—গণপ্রতিনিধিত্বমূলক আদেশ, ১৯৭২ এবং সংসদ সদস্য (বিরোধ নিষ্পত্তি) আইন, ১৯৮০। সংবিধানের ৬৬ ও ১৪৭, গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের ১২ ধারা মন্ত্রীর জন্য আর ১৯৮০ সালের বিরোধ নিষ্পত্তি আইনটা নির্বাচন কমিশনের জন্য। মন্ত্রী নিজের ব্যবসা থেকেও মন্ত্রী থাকা অবস্থায় মুনাফা অর্জন করার জন্য সময় ও শ্রম দিতে পারেন না। আইন লঙ্ঘন করলে ১৯৮০-এর আইন অনুযায়ী মন্ত্রীকে বরখাস্ত করার ক্ষমতা নির্বাচন কমিশনের।

জানি, নির্বাচন কমিশন বলবে: ভাই! আইন পড়ে দেখেছি। আমাদের এত্তসব ক্ষমতা-টমতা নাই।

প্রতিষ্ঠানগুলো ভেঙে পড়েছে। ভাবমূর্তি রক্ষার একমাত্র উপায় হলো দেশিদের পর এখন আন্তর্জাতিকওয়ালাদের ৫৭ ধারার আওতায় আনতে হবে।

৪.

আমাদের আশঙ্কা, দেশের সমস্যাগুলো ক্রমেই সমাধান-অযোগ্য হয়ে পড়ছে। ৫৭ ধারা দিয়ে শেষ চেষ্টা সরকার নিশ্চয়ই করবে। সরকারের মন্ত্রণালয় নাকি বলেছে, পাহাড়ি এলাকায় ভূমিধসের অন্যতম প্রধান কারণ বজ্রপাত।

তাই আবারও বলছি, প্রতিষ্ঠানগুলো ভেঙে পড়ছে। সবাইকে শত্রু না ভেবে একটু ঠান্ডা মাথায় চিন্তা করুন। প্রায় সব ব্যাপারে বিশ্বের নিকৃষ্টতম দেশগুলোর একটি হওয়ার জন্য এ দেশ মুক্তিযুদ্ধ করেনি, স্বাধীন হয়নি। প্রায় সব ব্যাপারেই এই দেশটিকে বিশ্বের নিকৃষ্টতম দেশের তালিকায় কেন নিয়ে গেলেন? এই প্রশ্নটাও করছি বিশ্বের অন্যতম নিকৃষ্টতম শহরে বসে।

জবাব দিতে হবে।

ড. শাহদীন মালিক: অ্যাডভোকেট, সুপ্রিম কোর্ট। আইনের শিক্ষক, ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিক।

 

About ক্রাইমবার্তা ডটকম

Check Also

সাহেদের মা সাতক্ষীরা জেলা মহিলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক থাকায় সাহেদ এমপি হতে চেয়েছিলেন

ক্রাইমর্বার্তা রিপোট: সাতক্ষীরা   রিজেন্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান সাহেদ করিম প্রতারণার অভিনব সব কৌশল রপ্ত করেছিলেন। তার …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *